বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্বের প্রতিটা বস্তুকণা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। জগতের কোনো মানুষই ব্যক্তিগত নয়, কোনো গল্পই একান্ত নিজের নয়। প্রতিটা গল্প শিকলবদ্ধ হয়ে যায় অন্য কারো সাথে, প্রতিটা হাহাকার মিশে যায় অন্য কারো রক্তে।
সুইসাইড নোটে গান লিখে আত্মহত্যা করেছে এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। নন্দিনী চৌধুরী নামের অপরূপা সুন্দরী নারী শুধু গান লিখলেন না, আত্মহত্যা করার আগে করলেন মরণোত্তর দেহ দান। ইনভেস্টিগেশন অফিসার জাহিদ হাসান এই রহস্যময় নারীর স্বরূপ উদঘাটন করতে গিয়ে আবিষ্কার করল জীবনের অদ্ভুত সব গলিপথ। যে গলিপথে প্রবেশ করে এক সময় সে নিজেই হারিয়ে যেতে বসল, হারাতে বসল তার জগত, তার সংসার, তার ভালোবাসা।
জীবনের গলিতে হাঁটতে হাঁটতে জাহিদ হাসান একে একে খুঁজে পায় জীবনের কঠিন সব নির্মমতা, অদ্ভুত সব ভালোবাসা, একাকীত্বের হাহাকার, কাম কিংবা লোভে ডুবে যাওয়া কুৎসিত সব মুখ। সে অনুভব করে প্রায় প্রতিটা মানুষ নিঃসঙ্গ হলেও তাদের গল্প নিঃসঙ্গ নয়। মানুষের জীবন যে রহস্যময় অদ্ভুত শিকলে আবদ্ধ সেই শিকলের কোথাও শুরু নেই, কোথাও শেষও নেই...
জয়নাল আবেদীনের লেখা প্রথম কোন বই পড়লাম। প্রথমত প্রচ্ছদ দেখে বই আমি কিনি না বলতে গেলে কিন্তু এই বইয়ের প্রচ্ছদ কেমন জানি একটা কৌতূহল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলো।
সমসাময়িক উপন্যাস হলেও মাঝখানের দিকে থ্রিলারের মতো উত্তেজনা কাজ করেছে। বইয়ের আরেকটি ভালো দিক হলো সুন্দর সাবলীল লেখনী। লেখক ক্যারেক্টর বিল্ড আপ করতে ভালোই সময় নিয়েছেন মোটামুটি ১৩০ পেজের মতো ধীরগতির ছিলো শেষের দিকে মনে হলো তারাহুরো করে শেষ করেছেন। ৫০% বই পড়েই হয়তো কাহিনী প্রেডিকশন করতে পারবেন কিন্তু চমৎকার লিখনশৈলীর জন্য শেষ করতে বাধ্য হবেন। কিছু টপিক বা যুক্তি তেমন ভালো লাগেনি। লেখকের প্রথম বই হিসেবে এসব অনেক কিছুই ছাড় দেয়া যায়। সব মিলিয়ে বলা যায় উপভোগ করেছি ভবিষ্যতে আরো ভালো বই পাওয়ার আশায় রইলাম।
গল্পের স্টার্টিং বেশ ভালো ছিল। মাঝে গল্প খুবই ধীরগতির হয়ে পড়েছে৷ প্রথম ১৫০পেজে গল্পের তেমন অগ্রগতিই ছিল না। স্টোরি এন্ড ক্যারেক্টার বিল্ডাপের জন্য হয়ত লেখক সময় নিয়েছেন।
তারপর থেকে গল্প স্পিড নেওয়া শুরু করলে, গল্প ধীরে ধীরে হয়ে পরলো হিন্দি সিরিয়াল। অতি নাটকীয়তা আমার বিশেষ পছন্দ নয়। শেষের ১২০পেজে তাড়াহুড়ার ছাপও স্পষ্ট৷
লেখনীর মধ্যে আ্যমেচার ভাব অনেক৷ বইয়ের প্রথম অংশ লেখক বেশ যত্ন করে লিখেছেন এজন্য প্রথমে তা ধরা পড়ে না। তবে গল্পের শেষে তাড়াহুড়ো করায় লেখনীর অপরিপক্কতা চোখে পড়ে।
এ ধরনের গল্প ফেসবুকের টাইমলাইনে পড়ে ফেলা যায়৷ তবে ৩৯০ পৃষ্ঠার বই আকারে ভালো লাগে না৷
জয়নাল আবেদীন বর্তমানে বেশ হাইপ তোলা লেখক। প্রি-অর্ডারেই বইয়ের প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। লেখকের লেখা পড়ার ইচ্ছা ছিল। ভূমিপ্রকাশ প্রকাশনী ও লেখককে ধন্যবাদ বইটি পাঠকের পড়ার জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য।
শিকল লেখকের প্রথম বই। লেখকের ভাষ্যমতে, এখন পর্যন্ত লেখকের সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় বই। আমার তেমন ভালো লাগে নি। রেটিং দিলে, 2.5 / 5.0
তবে লেখকের নিজের বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সম্ভবত তার ২য় বই "বিভ্রম"৷ তিনি বলেছেন, বিভ্রম মাস্টারপিসের কাছাকাছি পর্যায়ের বই। লেখকের এই বইটিও পড়ার ইচ্ছে আছে।
গত বছর বইমেলাতে এই বইটা কিনি...প্রচ্ছদটা ভালো লাগসে সাথে ফ্লাপে লেখাটাও ভালো লেগে যায় দেখে নতুন লেখক নতুন প্রকাশনি হওয়া সত্ত্বেও সাহস করে কিনে ফেলি,নানা ব্যস্ততা আর অন্যান্য বইয়ের ভীড়ে এই বইটা আর পড়া হয় নাই,এই বছরের শুরুতে আবার শেলফ গুছাতে গিয়ে আবার চোখে পরে বইটা,এইবার পড়া শুরু করি...শুরুর দিকে কাহিনি একটু ঝোলা হইলেও শেষটা পুরাই কাপায় দিসে,ভাল বইয়ের একটা অন্যতম গুন হইতেসে বই শেষ করার পরও রেশটা অনেক দিন থাকে,এই বইটার ক্ষেত্রে আমার এমনটা হইসে...লেখকের আগামিতে কোন বই পেলে কেনার প্রত্যাশা রাখি...
অরণী, অসম্ভব রূপবতী এই তরুণীর জীবনে একজনই মানুষ আছে, তার মা। মায়ের শাসন, বারণ আর ভালোবাসায় চলা অরণীর জীবনটা হঠাৎই থমকে যায় কুৎসিত এক ঘটনায়। জীবনের বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে অল্প বয়সেই। এই সিদ্ধান্ত তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা সে জানে না। জাহিদ একজন পুলিশ কর্মকর্তা। জীবনের দূর্বিষহ একটা সময়ে দুই বছরের পুরোনো একটা সুইসাইড কেস ব্যক্তিগত উদ্যোগে সুরাহা করতে চায় সে। কিন্তু এই কেস যে তার গোটা জীবনটাকে এভাবে বদলে দিবে তা কি সে ভাবতে পেরেছিল?
গত সাড়ে তিন বছরের পাঠক জীবনে এটা আমার পড়া প্রথম বই যেখানে লেখক নিজে লেখক হওয়ার আগে থেকেই আমি তার ফ্যান। ফেসবুকে জয়নাল ভাইয়ের লেখালিখি আমার খুবই ভালো লাগত। একটা সময়ে গোটা ফেসবুক যখন স্রেফ ট্রল নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন উনি সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রায়ই লেখালেখি করতেন। উনার চিন্তাভাবনার বিশুদ্ধতা আমাকে মুগ্ধ করেছে সবসময়। অনেক কিছু শিখেছি আমি উনার কাছ থেকে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচয়টা গভীর এবং অনেকটাই পারিবারিক হয়ে গিয়েছে। আর তাই অবশেষে ২০০+ রিভিউ লেখার পর, এই প্রথম আমি ভাই ব্রাদার গোত্রের কারো মৌলিক বইয়ের রিভিউ দিতে যাচ্ছি।
প্রতিটা নিঃসঙ্গ মানুষ করুণাযোগ্য
শুরু থেকে দুটো ভিন্ন পরিবারের ঘটনাবলী নিয়ে এগিয়ে চলে বইয়ের গল্প। একদিকে রয়েছে সিলেটে বাস করা অরণীর পরিবারের চার সদস্যের বিভিন্ন মানসিক টানাপোড়েন আর বিপদ আপদ। অপরদিকে রয়েছে ঢাকায় বসবাসরত জাহিদের পারিবারিক ট্রমা আর ডিপ্রেশনের গল্প। এভাবেই ধীরে ধীরে বইয়ের মূখ্য চরিত্রদের সাথে পাঠকের সংযোগ ঘটিয়ে দেন লেখক।
অরণীদের গল্পের বেশিরভাগ অংশ তাদের বাসার ভিতরেই আবর্তিত হয়েছে। প্রথম থেকেই এই বাসার চরিত্রদের কর্মকাণ্ড কিছুটা বেখাপ্পা লাগে। মনে হয় যেন পরিবার তো আছে, তবে কোথাও যেন সেটার সুর কেটে গিয়েছে। লেখক এই অংশটা অনেক যত্ন নিয়ে গড়েছেন। যে কারনে প্রতিটা চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অংশটুকু বেশ ভালোভাবে অনুভব করা যায়। তবে এই যত্ন নিতে গিয়ে বেশ লম্বা সময় এবং অনেকগুলো পেইজ খরচ করে ফেলেছেন। গল্পের বুনট কিছু ক্ষেত্রে অতি নাটকীয় কিংবা খাপছাড়া লেগেছে। তবে পড়ে গিয়েছি সমানতালেই। অন্তত বিরক্তি জন্মাবার মতো পরিস্থিতি কখনোই আসেনি। অরণীর পাশাপাশি তার মা জাহানারার চরিত্র নিয়েও বেশ খেটেছেন লেখক। অরণী মেয়েটার জন্য মায়া না লেগে উপায় নেই। কিছু ক্ষেত্রে লেখককে আমার নিষ্ঠুর মনে হয়েছে। এত কঠিন জীবনবোধ না দেখালেও পারতেন তিনি! লেখকের লিখনশৈলী বেশ ভালো, সাবলীল। কিছু বাক্য আছে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো। রিভিউর শুরুতে তেমনই একটা বাক্য বেছে নিয়েছি। উদাহরণস্বরূপ আরেকটা দিলাম,
ভালবাসতে না পারার মতো কেউ না থাকলে মানুষ যতটা না একা হয়, রাগ করার মতো কেউ না থাকলে একা হয় তারচেয়ে অনেক বেশি।'
দীর্ঘদিনের গভীর ক্ষতে সব স্পর্শই আঘাতের মতো অনুভূত হয়
অরণীর গল্পের সাথে সমান্তরালে এগিয়ে চলে জাহিদের গল্পও। অরণীর তুলনায় এই অংশটা কিছুটা গতিশীল। নীলা, জাহিদ, মিলা কিংবা সাদেক হাওলাদার প্রত্যেক চরিত্রের মাঝে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। একেকটা চরিত্রের একেক রকম মানসিক টানাপোড়েন, সবগুলোই বেশ যৌক্তিক এবং রিলেটেবল লেগেছে। পুরো বইতেই দুঃখের গল্প বলা হয়েছে। তবুও অরণীদের দুঃখ এতটাই বেশি যে তা মনে প্রবল চাপ ফেলে। আর সে কারনে জাহিদদের অংশ আসলে একটু হলেও হাঁসফাঁস কম অনুভব হয়।
বইটা থ্রিলার নয়, তবে বলতেই হয় যেটুকু পুলিশি তদন্ত ছিল, তা লেখক ভালোভাবেই সামলে নিয়েছেন। এমন এক সময়ে বইটা পড়েছি, যখন পুলিশ নিয়ে মনের মাঝে বেশ ভালো রকমের ঝামেলা চলতেছে৷ এর মাঝে পুলিশ হিসাবে জাহিদের এমন ভালোমানুষী রূপ দেখে কিছুটা ভালো লেগেছে। আরো একটা সুন্দর বাক্য উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না।
একটা স্মৃতির অতি চর্চায় আরো কিছু স্মৃতি সাময়িকভাবে হারিয়ে যায়, একটা নতুন মানুষের আগমনে অন্য আ���েকজন মানুষ মস্তিষ্ক থেকে সরে পড়ে৷ একজনের প্রতি ভালোবাসা অন্য আরেকজনের ভাগ কমিয়ে দেয়।
লেখকের শিকল, শিকলের লেখক
বইয়ের এন্ডিং যুগপৎ অনুভূতি দিয়েছে আমাকে। দারুণ ধাক্কা খেয়েছি, আবার ভালোও লেগেছে। কোথায় এসে অরণী আর জাহিদের গল্প এক সূতোয় মিলবে তার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সেটা যে এমন চমকের মাধ্যমে হবে তা কল্পনাও করিনি। হয়তো সমকালীন উপন্যাসে এমনকিছু হবে তা ভাবিনি বলে! এরপর বইয়ের বাকি অংশ পড়ে গিয়েছি গোগ্রাসে। একদিনেই প্রায় ৩০০ পেইজের মতো পড়েছি বইটার এবং বই শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছি। শেষ করার পরেও, বইটার রেশ থেকে গিয়েছে মনের মাঝে। লিখনশৈলীর দরুণ একটানা পড়া সম্ভব হয়েছে।
তবুও যথারীতি পাঠক হিসাবে কিছু সমালোচনার জায়গা তো রয়েই যায়!! ভাই ব্রাদার হিসাবে বইয়ের খামতি গুলোও জানানো উচিত বলে মনে করি। সহমত ভাই হয়ে লেখকের কোনো উন্নতি হয় না। তবে আমার সব মন্তব্যই যে একেবারে সঠিক হবে, তেমনটাও না। এখানের মধ্যে যেগুলা লেখকের আমলে নেয়া দরকার বলে মনে হবে সেগুলা উনি নিবেন। বাকিগুলা ফেলে দিবেন।
০১। এই বইটার ক্ষেত্রে আমার প্রথম এবং মূল সমস্যা যেটা মনে হয়েছে তা হলো, আমি যে একটা উপন্যাস বা ফিকশন পড়ছি তা প্রতিনিয়ত অনুভব করা। আমি এমনিতে প্রচুর পরিমাণে ফিকশন পড়ি। কিন্তু তবুও কিছু গল্পের মাঝে এমনভাবে ডুবে যাই, মনে হয় যেন আমি সেই গল্পের জগতে চলে গিয়েছি। এই ব্যাপারটা শিকলের ক্ষেত্রে আমার হয়নি। আমার ধারণা এর পিছনে দায়ী বইয়ের সংলাপ। মা-মেয়ে, বাবা-মেয়ে, ভাই-বোন এমন সম্পর্কগুলোর মাঝে কেতাবি ধরণের সংলাপের কারনে সমস্যা হয়েছে আমার। এছাড়া দারোয়ান গোছের মানুষদের মুখেও একদম শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ বেমানান লেগেছে। ০২। দ্বিতীয় সমস্যা বইয়ের কারেক্টার ডেভেলপমেন্টে। বইয়ের মূল দুই চরিত্র অরণী এবং জাহিদের কারেক্টার ডেভেলপমেন্ট এতটাই ভালো হয়েছে যে পুরো বইটাই শেষ পর্যন্ত ভালো লেগে গিয়েছে স্রেফ এই দুইটা মানুষের জন্য। কিন্তু আমি যেহেতু খুঁত ধরতে বসেছি, তাই অন্য কিছু চরিত্রের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আমার মনে হয়েছে তা উল্লেখ করি, জাহানারাকে যেরকম স্ট্রং পার্সোনালিটির মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, পরিবার নিয়ে তার চিন্তাভাবনা সেরকম গোছালো মনে হয়নি। এছাড়া সাব্বির কেন এমন হয়ে গেল তার তেমন যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু রক্তের দোষ আর ৩ বছর বেকার থাকাটা তার "এই পর্যায়ের" কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা হতে পারে না। লেখক যদিও ভূমিকাতে বলেছেন সবকিছু অবাস্তব লাগতে পারে। তবুও লেখকের নিজের লেখা অনুসারেই সাব্বিরের কর্মকাণ্ডের পিছনে আরো শক্ত কারণ থাকা দরকার ছিল বলে মনে করি। বইয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মনজুর আহমেদের চরিত্রও বেশ অগোছালো। যে স্ত্রীর জন্য সব ছেড়ে এসেছেন, সেই স্ত্রীর প্রতি তার কোনো মায়া নেই। এমনকি স্ত্রীরও নেই। দুজনেই নিজ নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, এতে করে তো তাদের বন্ডিং আরও বেটার হওয়ার কথা। অথচ হয়েছে উলটো। কঠিন সব বিপদেও বাবা হিসাবে ন্যুনতম ভূমিকা না রাখা একেবারেই মেনে নেয়ার মতো নয়। তবে এটা আসলে ভুল না, এমন বাবাও দুনিয়াতে কম নেই। ০৩। এন্ডিং-এ রৌদ্র এতদিন এক জায়গায় থাকার পর, এক কথায় চলে আসতে রাজি হওয়ার ব্যাপারটা মানানসই লাগেনি। ওই জায়গাটুকু আরো গোছানো হতে পারত। ০৪। বাদলের সাথে দুইবারের দেখায় সাব্বির যে তার সাথে আড্ডা দিয়েছে এরকম কিছু অরণীকে বলে না বাদল। কিন্তু হুট করে শেষে এসে অরণী বাদলকে প্রশ্ন করে বসে, সাব্বিরের এই অবস্থার জন্য বাদলও কম দায়ী কি না? এই জায়গাটায় একটা গ্যাপ রয়ে গিয়েছে।
এতগুলা জিনিস না ধরলেও চলে, হয়তো এখানের অনেক জিনিস লেখক বা অন্য পাঠকের কাছে কোনো সমস্যাই মনে হবে না। তবুও ধরলাম, আমার ভাই ব্রাদার 'লেখক' হলে এইটুকু প্যারা নিতেই হবে!!
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৭/১০ (প্রথম বই হিসাবে উৎরে গিয়েছেন লেখক। আমার অন্তত বেশ ভালো লেগেছে। তবে উন্নতির আরো জায়গা রয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু পাব উনার কাছ থেকে)
শুরুটা বেশ ভালোই ছিলো। বাট কিছুটা সামনে এগোতেই বুঝা গেলো লেখক পুরোপুরি হুমায়ুন আহমেদ দ্বারা প্রভাবিত। পাতায় পাতায় হুমায়ুন স্টাইলের দেখা মিলে, যেটা খুবিই বিরক্তিকর। ফলে কিছুদুর পড়ার পড়েই বইটা পানসে মনে হয়েছে। পরের কাহিনী কোন দিকে যাচ্ছে অথবা কে কি করবে সেটা খুব সহজেই হুমায়ুন পাঠকরা ধরে ফেলতে পারবেন। মাঝখানে আবার রহস্য আর থ্রিলার ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে যেটা ছিলো সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর। বিশাল সাইজের বই অথচ মনে দাগ কেটে যায় এরকম কিছু লেখক তুলে ধরতে ব্যার্থ হয়েছেন। অরনীর কাহিনীটুকুই বইটির শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছে। এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো একটা কাহিনী অথচ শুধুমাত্র হুমায়ুন স্টাইলের কারনে মার খেয়ে গেছে। হুমায়ুন স্টাইল পরিত্যাগ করতে পারলে লেখকের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। না হলে অল্পতেই মার খেয়ে যাবেন।
★এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো লেখকের লেখনীতে। এতো সুন্দর ও সাবলীল লেখনী যে বইয়ের ৪০% পড়ে কাহিনী বুঝে যাবেন কিন্তু লেখনশৈলীর কারনে আপনি শেষ করতে বাধ্য হবেন।
★সমসাময়িক উপন্যাস হলেও মাঝখানে থ্রিলারের মতো উত্তেজনা কাজ করেছে।সর্বোপরি বেশ গতিশীল ছিল।
★এই বইয়ের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এর প্রচ্ছদ। আমার দেখা অন্যতম সেরা প্রচ্ছদ। এই প্রচ্ছদের কারনে আমার মনে ফার্স্ট ইম্প্রেশন সৃষ্টি হয়েছিল।
★প্রিন্টিং মিস্টেক বা বানান ভুল বলতে গেলে ছিল ই না।
★স্কয়ার বান্ডিং হওয়াতে পেজ উল্টাতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। রাউন্ড বান্ডিং হলে ভালো হতো।
এই মাত্র শিকল শেষ করলাম।এখন ভোর রাত,আমি নিজেই কেঁদে ফেরলাম।অনেক দিন থেকে কান্না আসে না,আপনার উপন্যাস পড়ে আমি ভাষাহীন হয়েগেছি।পরিবারের প্রতি ভালোবাসা বেড়ে গেল। শিকল বইটি পড়ে আমি আপনার লেখার শিকলে আঁটকে গেলাম। আর অরণীর প্রেমে পড়তে এক বিন্দু ভাবতে হলো না। আসলে লেখক এখানেই সার্থক তার উপন্যাস পড়ে মানুষ কাঁদে।ধন্যবাদ
কিনলাম, বসলাম এবং এক বসায়ই পড়া শেষ করলাম, তারপর ঘুমায়া গেলাম। ঝামেলা শুরু হইছে ঘুমানোর পর থেইক্কা। ট্রাস্ট মি, মোটামুটি সবগুলা ক্যরেক্টারকেই স্বপ্ন দেখছি এবং পুরা স্টরি অনেক দিন মাথায় নিয়া ঘুইরা বেড়াইছি। লেখক সাহেব, এই এক বইয়ে কান্দাইছেন ঠিক আছে কিন্তু বর্তমানে অরনী একটা সমস্যায় পরিণত হইছে আমার জন্য।
মানুষের জীবনটা কেমন? বেঁচে থাকার স্বরূপ কী? এসব প্রশ্নের উত্তর হতে পারে বিবিধ। কেউ ভালোবাসার ভাবালুতায় হাসছে, কেউ ভাসছে কষ্টের কচুরিপনায়। কারো জীবনে সচ্ছ্বলতার আনন্দ, কেউ বয়ে বেড়াচ্ছে দারিদ্র্যের দণ্ড। যাপিত জীবনের এই নানাবিধ নৈর্ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাগুলো আবার এ��ে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অদৃশ্য সুতায় সংযুক্ত দৃশ্যমান সেই সম্পর্কগুলো হতে পারত একটি মালা, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তা হয়ে ওঠে শিকল। শিকলে আবদ্ধ মানুষের ঘাত-প্রতিঘাতের ধারাপাত বর্ণনা করেছেন তরুণ কথাসাহিত্যিক জয়নাল আবেদীন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও তীব্র জীবনবোধ নিয়ে অবিশ্বাস্য অচলায়তন তুলে সাজিয়েছেন তার প্রথম উপন্যাস ‘শিকল’।
শিকলের চরিত্রগুলো আমাদের খুব চেনা। অথচ তাদের ভেতরকার গল্পগুলো অচেনা মনে হতে পারে! কার্তিক মাসের সুন্দর বিকেলে সুখময় সম্ভাবনায় যে জাহানারা-অরণীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে, তাদের জীবনে নেমে আসে ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড়। সেই ঝড়ের অসম্ভব তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয় জীবন। তুফানের অবিশ্বাস্য তোড়ে ভেসে যায় পরিবার। সুন্দরী তরুণী অরণীকে হতে হয় হাতবদলের নন্দিনী চৌধুরী। এই বাঁকপরিক্রমায় দেখতে হয় ঝাঁক ঝাঁক কুৎসিত রূপ। কুঁকড়ে উঠতে হয় তীব্র ঘৃণায়। পাঠকের বুকের ভেতর জাগে হড়হড়ে হাহাকার। গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে ওঠে। নারকীয় নিঃসঙ্গতায় ডুবে যায় সমস্ত সত্তা। ঝড়ঝাপটা ও বৃষ্টিবাদলার পর আলোছড়ানো এক ‘রৌদ্রের’ ক্রমোজ্জ্বল হয়ে ওঠা নতুন আশার সঞ্চার করে।
রহস্যময় পৃথিবীতে মানুষ কত অদ্ভুত হতে পারে, তারই স্বরূপ ‘শিকল’। সামাদ নামের একজন মনুষ্যজানোয়ারের উন্মত্ত কামকদাচার কীভাবে বিষিয়ে তোলে নিষ্পাপ অরণীর স্বপ্নলোক। বিত্তের লোভে কতটা বিচ্যূত বদমাইশ হতে পারে সাব্বির, যে নিজের বোনকেও বারবনিতা করে অন্যের হাতে তুলে দিতে একটুও কাঁপে না! নীরব নরকের এই আগুন নিয়ে সমাজের কোনো মাথাব্যথা নেই, অথচ প্রকাশ্যে স্বর্গকন্যার মুখ থেকে শীতসকালের ধোঁয়া বেরুলেও কলস কলস পানি নিয়ে হম্বিতম্বি করে। এমন বিড়ম্বিত ব্যবস্থায় মেধাবী সদ্ভাবাপন্ন বাদলদের ঠাঁই নেই। তাদের প্রতিভার প্রকাশ ঘটাতে হয় অপরাধজগতে। জীবনের এতসব জটিলতা দেখে শুধু মনে হয়, কেন এমন হয়? কেন এমনটাই ঘটে? উত্তর একটাই- সবাই শিকলে বাঁধা। চাইলেই এই শিকল খুলে ফেলা যায় না। হতে হয় অসহায় বলি।
অন্যদিকে নীলা-জাহিদের রসায়নটা কেমন? সুখী দাম্পত্য ও সম্মোহিত সম্পর্কের ভেতরেও ঢুকে পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাত। তার উৎপত্তিটাও অকস্মাৎ অঘটন থেকে। মৃত সন্তান জন্মদান এবং মা হওয়ার সম্ভাবনা হারানোর খবরে নীলা ঢুকে যায় অস্থিরতায় এক অব্যক্ত জগতে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জাহিদ হাসান নীলাকে সেই জগত থেকে আর ফেরাতে পারে না। এর মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত নন্দিনী চৌধুরি তৈরি করে সন্দেহের ফাঁদ। নন্দিনীর তদন্তে নেমে জাহিদ যেন চোরাবালিতেই ডুবতে থাকে। তলিয়ে যাওয়ার আগে মৃত নন্দিনীর রেখে যাওয়া ‘রৌদ্র’ হয়ে ওঠে উঠে আসার স্বাভাবিক সূত্র।
আপাত দৃষ্টির অবিশ্বাস্য-অসম্ভাব্য ঘটনাবলির চিত্রায়ন হলেও লেখকের মুন্সিয়ানায় তা অত্যন্ত বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। প্রথম দিকের প্রায় পঞ্চাশ পৃষ্ঠা চতুর্মুখী চরিত্র ও ঘটনার বিক্ষিপ্ততায় উপন্যাসে বুঁদ হতে পারিনি। তবে অধ্যায়ভিত্তিক সেসব অংশগুলোয় দার্শনিক ভাবভঙ্গিমা থাকায় একেকটি ছোটগল্প মনে করে সামনে এগিয়েছি। এটুকু ধৈর্যধারণের পরই মনে হয়েছে আমি শিকলে আটকা পড়েছি। এখন এর শেষ গিঁট না খুলে আর বের হওয়া সম্ভব না। উপন্যাসের আঙ্গিকের কথা চিন্তা করে বুঝতে পেরেছি, লেখক কী অসাধারণ দক্ষতায় প্রথমে চার দিকে চারটি নিরীহ খুঁটি পুঁতেছেন, একটি দিকের সঙ্গে আরেকটির জোড়া দিয়ে আকৃতি দিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর সংযোগ ঘটিয়ে নকশা করেছেন, সবশেষে সামিয়ানা খাটিয়ে এই আখ্যানপ্রাসাদের পূর্ণতা দিয়েছেন। নির্মিত এই ঘর পরিভ্রমণ শেষে পেছন দরজা দিয়ে বের হওয়ার পর অনুভব করা যায়, তা কতটা দৃষ্টিনন্দন ও সৃষ্টিসুনীল।
উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গিতে যে জীবনবোধ ও অনুভূতির প্রলেপ তা অত্যন্ত গভীর ও মজবুত। চরিত্রগুলোর স্বাতন্ত্র্যস্বভাবের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারার সংলাপ সত্যিকার স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এই দিকটা অনুভব করলে বোঝা যায়, লেখক কতটা ধ্যানে ও আন্তরিক আয়োজনে চরিত্রের গভীরে ঢুকে পড়েছিলেন। কথোপকথনে যে দিকটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, মানুষ যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে অবচেতন মন তার একটা দার্শনিকতা তৈরি করে। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো একেকটি ভাবের দার্শনিক। তাদের কত কত কথামালা যে আমার গভীরে দাগ কেটেছে, পড়ার সময় কত জায়গায় যে আমি দাগ দিয়ে রেখেছি, সেগুলো তুলে ধরতে গেলে অন্য স্বতন্ত্র সংকলন হয়ে যাবে!
রক্ষণশীল মুসলিম পারিবারিক প্লটে অনেক ধর্মীয় ধ্যানধারণা ও জীবনাচারণ উঠে এসেছে। সেই জায়গাগুলো লেখক অত্যন্ত দরদি, সংবেদনশীল ও নিরপেক্ষ ভঙ্গিমায় তুলে ধরেছেন। অনেক বিখ্যাত লেখক ধর্মীয় কুসংস্কার ও গ্রামীণ অশিক্ষিত ধর্মাচারণের অজ্ঞতা নিয়ে বলতে গিয়ে ধর্মবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন এবং নিজেদের কূপমণ্ডূকতা ও ধর্মীয় মূর্খতা ফুটিয়ে তোলেন। জয়নাল আবেদীন সেখানে গভীর জীবনবোধ ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে ব্যক্ত করেছেন।
অনেক দিন পর দীর্ঘ কলেবরের একটি উপন্যাস শেষ করতে পারার সার্থকতা অবশ্যই লেখকের প্রাপ্য। সবচেয়ে বড় কথা, শিকল-এর জীবনবোধ আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তী উপন্যাসের অপেক্ষায় থাকব। ----------- তানিম ইশতিয়াক
This entire review has been hidden because of spoilers.