বই : অধ্যায় লেখক : তকিব তৌফিক প্রকাশনী : নালন্দা প্রকাশনী প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পৃষ্টা : ১২৬ মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা।
যেখানে তুমি নেই, সেখানে কিছুই নেই হয় তুমিই থাকো,না হয় শূন্যতা-ই শ্রেয়। -Tokib Towfiq
ফ্ল্যাপের লেখা দেখে বইটা পড়ার আকর্ষণ না হলেও উপরে লাইন দুটো পড়েই মূলত বইটা পড়ার জন্য আগ্রহ জন্মেছিলো। কিছু কিছু উক্তি থাকে যা দেখলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ অত্যধিকভাবে বেড়ে যায়। এটাও ঠিক তেমন একটা বই।
মানুষের জীবন একটি বিচিত্র সমগ্র। অদ্ভুত সব অধ্যায় দিয়ে এই জীবনসমগ্র সাজানো। জীবনসমগ্রের শুরু থেকে শেষ অবধি যে কয়টি অধ্যায় দিয়ে গড়া হয় তার প্রত্যেকটি জুড়ে রয়েছে বিচিত্র সময়ে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব ঘটনার চিত্র। কখনো তা আবেগ আর মায়ায় জড়ানো,কখনো আবার ভয়ংকর আহাজারির নিদর্শন।
তেমনি ইজাজ আনসারীর জীবনের ছোট বড় কিছু অধ্যায় নিয়েই লেখা হয়েছে বইটি। বাবা-মা মরা এবং বেঁচে থাকার অবলম্বনহীন আনসারীর এলোমেলো জীবনে হঠাৎ করে ডাক্তার কনকের সাথে দেখা হয়। আর প্রথম দেখাতেই কনককে বেঁচে থাকার অবলম্বন ভেবে নেয় আনসারী। নিজের ভালোবাসার দাবী নিয়ে সামনে দাঁড়াতে না চাইলেও নিজের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কনকের কাছে একটা চিঠি লেখে আনসারী। অন্যদিকে ভাগ্যও আনসারীর সহায়ক হয়ে কনকে আনসারীর বেশ সন্নিকটে পৌঁছে দেয়। কিন্তু কনক কি ইজাজ আনসারীর ভালোবাসায় সাড়া দিবে? হয় ভালোবাসা জিতবে না হয় ভালোবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে দায়িত্বকে বরণ করে নিতে হবে এটাই তো জীবন। কনক কি করবে বা ইজাজ আনসারীর জীবনের অধ্যায়ই বা কি হবে জানতে ইচ্ছা করলে পড়তে পারেন "অধ্যায়" নামক বইটি।
নতুন লেখকদের বইয়ের ক্ষেত্রে প্রায় অনেক বানাই ভুল লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে এই বইয়ে খুব একটা বানান ভুল চোখে পড়েনি। পাঠক গল্পে ডুবে থাকলে এইটুকু ভুলও চোখে পড়বে না। ব্যক্তিগত মতামত থেকে বলছি বইয়ের প্লটটা বেশ ভালো হলেও গল্পের মূল চরিত্র আনসারীর নামটা আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। আর লেখক বইয়ে প্রায় বেশ কিছু কবিতা যুক্ত করেছেন কিছু কিছু কবিতা ভালো লাগলেও কিছু কিছু কথাবার্তার মাঝে কবিতা লেখায় অংশটুকু লেগেছে বিরক্তিকর। তবে উৎসর্গ পত্রটি ছিলো মনোমুগ্ধকর। সব মিলিয়ে ভালো একটা বই। প্রিয় কিছু লাইন:
* পূর্ণিমার সন্ধ্যার শেষভাগ ভারি সুন্দর। * নিজের উপর নিজের একক স্বাধীনতা থাকা উচিৎ না। নিশ্চয়ই অন্য একজনের খুব দরকার। যাকে অবলম্বন হিসেবে ভাবা যায়। যার জন্য নিজের অনিয়ম জীবনকে নিয়মে নিয়ে আসা যায়। নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতেই হয়, ভালোবেসে কিংবা বাধ্যবাধকতা থেকে। সে যাইহোক অন্তত জীবন অগোছালো হয়ে যায় না। * নম্র চরিত্রের মাঝে লুকিয়ে থাকে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ভয়ংকর চরিত্র। *জীবন একটাই। উপভোগ আর উপলদ্ধির সময় ও সুযোগ একবারই পাবে তুমি।তাই জীবনটা আনন্দের সাথে পার করবার চেষ্টা করো। কোনোভাবেই যেন বিষণ্ণতা প্রশ্রয় না পায়। একবার প্রশয় পেলে সে তোমায় আর ছাড়বে না। *প্রত্যেক মানুষই একেকটা উপন্যাসসমগ্র, কবিতাসমগ্র। কেউ লিপিবদ্ধ করে, কেউ মনে আবদ্ধ করে এবং আরেক দল বিষয়টা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। * জীবনের গল্পগুলোতে মানুষের যে বিষাদ অধ্যায় থাকে তা শুনতে হলে অনেক সহ্য ক্ষমতার প্রয়োজন। *আমি কারো কাছে বাধ্য হওয়ার প্রত্যাশায় রোজ একটু একটু করে অবাধ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছি। *প্রত্যেক ফুলই বিষ্ময়কর এবং আলাদা আলাদাভাবে সুন্দর। * অন্ধকারে ভাবনার পরিধি অধিক গুণ বেড়ে যায়, সেই সাথে নীরবতা আলিঙ্গনে আসে বিনা আহবানে। * দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কেবল ভালোবাসারই আছে। *ভালোবাসা সময় বুঝে না, বুঝে না মেয়াদ কিংবা কোনো ধরাবাঁধা মুহূর্ত। * অতি আনন্দ কিংবা ভালোলাগা চাপা রাখা যায় না। চাপা রাখলে সেই ভালোলাগা অস্বস্তি দেয়। তাই কিছু ভালোলাগা উপড়ে দিতে পারলেই ভেতরটা হালকা হয়। * লেখালেখি কাজটা বেশ ধৈর্যের কাজ। সবাই চাইলেও পারে না। * জীবনে ভাগ্য একবার এসে নিজ দায়ে ধরা দেয়। * মানুষের জীবনে প্রেম আসে, চামড়া ঝুলানো বয়স হলেও প্রেম আসে, একবার হলেও প্রেম এসে যায়। কখন কী করে, এসে যায়, এসে যেতে পারে প্রেম তা হিসেব কষে বলা যাবে না কখনোই। * মাঝে মাঝে মিথ্যা মানুষকে দারুণভাবে আনন্দ দেয়। নতুন সুযোগ দেয়, সুযোগের পথ দেখি দেয়। *কবিতা হলো ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। * প্রেমে আবদ্ধ মেয়েদেরকে প্রেমিক ব্যতীত অন্য পুরুষ যতই পাকাপোক্ত প্রেম নিবেদন করুক না কেন তাদের কাছে সেটা দুধের বাটিতে বিষ ঢেলে দেওয়ার মতো অনুভূত হয়। * একতরফা ভালোবাসার মধ্যে এটাই যেন বেশ পরিশুদ্ধ। দেহ সম্পর্কিত ব্যাপার মাথায় চড়ে বসে না। * প্রেম মানেই আলিঙ্গন নয়, প্রেম মানে শুদ্ধতার চাপা পথ প্রসারিত হওয়া। *আঘাতপ্রাপ্ত হৃদয়ের জন্য আঘাত কিছুইনা। *দায়িত্বের কাছে ভালোবাসার হার অনিবার্য। * যখন কোনো রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থতাই বেশি প্রশয় পায় তখন চোখ বুজে কিছু না ভেবে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়াই শ্রেয়। এতে ভালো কোনো সমাধানের আশা করা যায়। শিথিল মস্তিষ্কও উপায়ের দ্বারগোড়ায় পৌঁছে দেয়।
#বই_পর্যালোচনা বইয়ের নামঃ অধ্যায় লেখকঃ তকিব তৌফিক ধরণঃ উপন্যাস প্রকাশনীঃ নালন্দা প্রকাশকালঃ ২০১৯ মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০/-
কাহিনী সংক্ষেপঃ অবৈধ পথে কাঁচা পয়সা কামাতে ওস্তাদ গোফরান। পানের দোকানের আড়ালে যার রয়েছে মদের রমরমা ব্যবসা। সেই মদের দোকানে নানান কিসিমের লোকজন ভীড় জমায়। তাদেরই একজন আনসারী। প্রচারবিমূখ কবি। জগৎ সংসার সম্বন্ধে কবিরা সাধারণত যেমন হয় আর কি। টিউশনি করে দিব্যি চলে যায় তার। একদিন মাতলামো করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট এর শিকার হয়ে হাসপাতালে গিয়ে অবচেতন মনে গেঁথে যায় এক নারী চিকিৎসকের মুখাবয়ব। সুস্থ হয়ে অপেক্ষায় থাকে আরেকবার তাকে দর্শনের। আমির। আনসারীর বন্ধু। বোন পারুলকে সাথে নিয়ে একটি বাসায় থাকে। বাবা মা থাকেন দূরে। আনসারীকে বেজায় ভালোবাসে আমির। তবে পারুল যেন একটু দূরত্ব বজায় রাখে আনসারী থেকে। আমিরের জন্মদিনে আনসারীকে আমির জানায় কিছু গোপন সত্যের কথা। সব শুনে আনসারীর অবস্থা হয় খাঁচায় পোরা পাখির মতো। বুঝতে পারে সামনে বন্ধুর খুব বিপদ, ভয়াবহ বিপদ। আনসারীর মনের এহেন অবস্থার মধ্যেই দৃশ্যপটে আগমন ঘটে কনকের। আনসারীর অবচেতন মনের স্বপ্নভঙ্গকারিণী ডাক্তারের। পারুলের বান্ধবী জবার বোন। ডালপালা মেলে আনসারীর মন। সে জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে চেষ্টা করে। মাঝেমাঝে দেখা হয় তাদের। এরই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালের গেটম্যানের সহায়তায় কনককে চিঠি পাঠায় আনসারী। কিন্তু চিঠি পেয়ে জটিল হয়ে যায় পরিস্থিতি। এদিকে ছাত্র দিব্যর বাবা সোমনাথের একটি অদ্ভুত আবদারে রাজি হয়ে আমির, পারুল, কনক কাউকে না জানিয়ে ১৫ দিনের জন্য সোমনাথের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে আমেরিকা গমন করে আনসারী। উদ্দেশ্য নিজের জীবনকে আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে কনকের সামনে হাজির হওয়া। পেছনে মন সায়রে ঝড় তুলে রেখে যায় কনককে, প্রাণপ্রিয় বন্ধু এবং বন্ধুর বোন পারুল কে। ভাবে, মাত্র ১৫ দিনই তো। কিছুই হবে না। কিন্তু জীবনসমগ্রের অধ্যায় বড়ই বিচিত্র। ভাবনার চেয়েও যা অনেক রূঢ়।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া লেখকের পড়া দ্বিতীয় বই এটি। এর আগে তাঁর ‘এপিলেপটিক হায়দার’ পড়েছিলাম। প্রথম বই পড়ার পর লেখকের প্রতি যতটুকু চাহিদা তৈরি হয়েছিল, ‘অধ্যায়’ পড়ে তার খুব কমই তিনি মেটাতে পেরেছেন বলে মনে হলো। এটি সম্ভবত তিনি প্রথাগত ধারার বাইরে নিজস্ব একটি ধরণ সৃষ্টির প্রচেষ্টার কারণে। প্রথমত, লেখক তার লেখায় এক একটি বিষয়ের বিশদ বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখায় মেদ টেনেছেন বেশ। বিষয়টি অনেক পাঠকের জন্য সমস্যার মনে হতে পারে। অতিরিক্ত রূপকের ব্যবহার যেমন করে লেখার গতিকে বেশ নামিয়ে দিয়েছে, আবার একই বাক্যকে ভিন্নরূপে উপস্থাপনার কারণে বাক্যের সৌন্দর্য হারিয়েছে অনেকবার। কাহিনীতে সর্বনামের ব্যবহার বেশ কম ছিল। বরং বিশেষ্যের ব্যবহার বাক্যকে দুর্বল করে দিয়েছে বহুলাংশে। দ্বিতীয়ত, কবিতার ব্যবহার। যদিও লেখক বইয়ের শুরুতে অদক্ষ হাতে গড়া কবিতা বলে মার্জনা চেয়ে নিয়েছেন কিন্তু পাঠক সেসব কবিতা পড়েছে আনসারীর কবিতা ভেবে। পুরো কাহিনীতে আনসারীকে যে মানের কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, কবিতায় প্রায়শই তার প্রতিফলন দেখা যায় নি। ফলে শুরু থেকে শেষ অবধি আনসারী চরিত্রটি বেশ দুর্বল লেগেছে। বরং কবিতা ব্যতিরেকে অন্য কোন ভাবে বিষয়টি টানা গেলে আনসারীর জায়গাটা আরো পোক্ত হত। তৃতীয়ত, চিঠির ব্যবহার। লেখক যেসব চিঠি উপস্থাপন করেছেন সেসব চিঠিতে মূলত চিঠির মালিকের অন্তর্নিহিত ভাবাবেগটুকু ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কিন্তু আবেগের প্রায়োগিক উপস্থাপনা তিনি করতে পারেননি। বরং অনেকক্ষেত্রেই চিঠি হয়ে গিয়েছে স্কুল-কলেজে সাহিত্যচর্চা করা আনকোড়া বালকের মতো। চতুর্থত, কাহিনীর শুরুর দিককার পারুল আর শেষের দিককার পারুলের এমন রিভার্স আচরণ দেখে পারুলকে সুবিধাবাদী মেয়ে ভাবাটা পাঠকের পক্ষে সহজ। বরং শেষের আচরণের একটা আবহ যদি শুরুর দিকে রাখা যেত তাহলে চরিত্রটি আরো বাস্তব হতো। পঞ্চমত, আনসারীর ‘সোমনাথ দ্য গ্রান্ড ফাদার’ উপন্যাস রচনা করাটা কিছুটা অবাস্তব নয় কি? যেখানে সোমনাথের জন্য আনসারীকে বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। তারচেয়ে বরং ছাত্র দিব্যকে দিয়ে সোমনাথ ও আনসারীর জীবনের গল্প নিয়ে কোন লেখা লেখাতে পারলে আরো যৌক্তিক হতো মনে করি। যেহেতু দিব্যও লেখালেখি প্র্যাকটিস করতো। ষষ্ঠত, শুরুর দিকে প্রচুর সময় নিয়ে বর্ণনা করার কারণে শেষের দিকে তাড়াহুড়া পরিলক্ষিত হয়েছে বেশ। শুরুর দিকে আরেকটু গুছিয়ে নিলে শেষের দিকে লেখক আরো গুছিয়ে বর্ণনা করার সুযোগ পেতেন। তাছাড়া আমির পারুলের প্রসঙ্গ হঠাৎ হঠাৎ দৃশ্যপটে আসায় তাদের প্রতি পাঠকের ফোকাস বেশ কম থাকে বলে মনে হয়। যেহেতু আনসারীর মনের বিরাট একটা জায়গা জুড়ে আমির রয়েছে, সেহেতু মাঝে মাঝেই তার প্রসঙ্গটি আনা যেত। সপ্তমত, গোফরানের পানের দোকানের আড়ালে মদের রমরমা ব্যবসা! পুরো ব্যাপারটিই কেমন অবাস্তব নয়? বরং কোন খাবার হোটেলের আড়ালে মদের ব্যবসা হলেও বিষয়টি গ্রহনযোগ্য হতো। সাধারণত পানের দোকান আমরা বড়জোড় টং দোকান হিসেবে দেখি। সেখানে আসলে দেয়াল দিয়ে মদের ব্যবসা করা যায় না। তাও মোটামুটি বার টাইপ মদের দোকান, যেখান থেকে পুলিশের পেটে নিয়মিত মাসোহারা যায়। তবে অন্ধকার জগতে অপরাধীর সাথে পুলিশের সম্পর্কটা কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তার বয়াণ টা আসলেই চমৎকার ছিল। অষ্টমত, পুরো কাহিনীতে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যায়ণ হয়েছে কনক চরিত্রের। একজন ডাক্তার মেয়ের যেরকম ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা থাকা উচিত তার প্রায় পুরোটাই কনকের মাঝে পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে মাঝেমাঝেই আমার মনে হয়েছে, লেখকের কোন মেয়ে ডাক্তারের সাথে পরিচয়ের ঘনিষ্টতা আছে কি? হা হা হা। মজা করলাম। আরো ভালো লেগেছে মফিজ, খলিলুল্লাহ, গোফরান, জবার চরিত্রায়ণ। পল্লবীর জায়গাটা ধোঁয়াশা মতো মনে হলো শেষতক। এছাড়া শেষদিকে কাহিনীর টুইস্টটা আরো জোরালো করা যেতে পারতো। সচেতন পাঠক অবচেতন মনেই টুইস্ট ধারণা করে ফেলতে পারবে। যবনিকাঃ কাহিনীর শেষভাগে গিয়ে লেখক যেভাবে পাঠকের অনুভূতিতে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন তাতে করে অনায়াসেই তাকে পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় যে, শুরুর দিকে কেন এই অনুভূতিতে নাড়া দিতে পারেননি। বলা যেতে পারে এই বইয়ের শক্তিশালী অধ্যায়টিই হচ্ছে শেষের ২০%। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার কাছে আমরা কতটা অসহায়, কনকের মহত্ত্ববোধ, ইত্যাদি খুঁটিনাটি ব্যাপার আগের ৮০% দুর্বলতার জায়গাটায় ভালোই প্রলেপ দিতে সক্ষম হয়েছে। এই ২০% জায়গাটি আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক রূপ। সেই সাথে এই জায়গাতেই বোঝা যায় লেখকের ক্ষমতা আছে পাঠককে আরো ভালো কিছু দেবার। এই পটেনশিয়াল ব্যাপারটা সবার থাকে না। লেখকের সেটা আছে। সেটাকে ধারণ করে অপেক্ষা সামনে এগিয়ে যাবার। লেখকের ক্রমশ উন্নতি দেখবার অপেক্ষায় রইলাম।
মন ধরে রাখার মতো সুন্দর প্রচ্ছদ। একটু রহস্য ঘেরা। একটু অজানা ভয় ভয় কাজ করে। কভার উল্টিয়ে ভেতরে নজর দিতেই চোখ পড়ে বাঁ পাশের ফ্ল্যাপের ভেতর।
" মানুষের জীবন একটি বিচিত্র সমগ্র। জীবনে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব ঘটনানির্ভর অদ্ভুত সব অধ্যায় দিয়ে'ই এই জীবনসমগ্র সাজানো থাকে। যার শুরু থেকে শেষ অবধি জড়িয়ে থাকা অধ্যায়গুলো জুড়ে থাকে জীবনের নানান ঘটনা।....... "
বুঝতে সমস্যা হয়না, এই উপন্যাসটি বাংলা বা সমাজ বইয়ের ' অধ্যায় 'গুলো নিয়ে রচিত না। এই উপন্যাসটি নিশ্চয়ই জীবনের 'অধ্যায়' এর উপর ভিত্তি করেই রচিত। কিন্তু এত কঠিন ভাবগম্ভীর একটা বিষয়ে তরুণ লেখক কেনই বা 'উপন্যাস' লিখেছেন তা ভাবতে ভাবতেই বইয়ের ভেতরে প্রবেশ করা হয়।
তরুণ লেখক তকিব তৌফিকের উপন্যাস 'অধ্যায়'। নালন্দা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রচ্ছদ শিল্পী হিমেল হকের করা প্রচ্ছদটি সবার মন জয় করেছে। মোট ১২৬ পৃষ্ঠার এই বইটির ভেতর আসলেই কি আছে, তা জেনে আসা যাক, চলুন...
" সব উৎসর্গ এভাবে জানিয়ে দিতে নেই, কিছু কিছু উৎসর্গ আড়ালেই শোভা পায়। "
ভীষন সুন্দর এই উৎসর্গপত্র রহস্যজনক। এত সুন্দর একটি বই কাকে উৎসর্গ করা হলো, তা কেউ জানলো না। ভারী মুশকিল! উপন্যাসের ভেতরে প্রবেশের আগেই এতসব জটিল বিষয় ভাবতে ভাবতে ভূমিকা চোখে পড়বে। ভূমিকা জুড়ে লেখা আছে কবিতার কথা। আরেকটু জটিল আকার ধারণ করলো বিষয়টা। উপন্যাসের ভেতরে কি আছে, তা জানার আকাঙ্ক্ষা তখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এবার শুরু হবে উপন্যাস।
" সন্ধ্যা নেমে এলো ব্যস্ত নগর জুড়ে। আকাশে মেঘ নেই। মেঘশূন্য আকাশকে এতটা পরিচ্ছন্ন পেতেই আড়ালে থাকা পূর্ণিমা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে সম্মুখে। ঘন অন্ধকারকে পরাজিত করে চাঁদ আলো ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। শহরজুড়ে নেমে আসে পূর্ণিমা। "
কী সুন্দরভাবে শুরু! এতোটা চমৎকার করে সাজানো লেখা! সুন্দর বর্ণনায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে এবার ডুবে যেতে হবে 'অধ্যায়' এর ভেতরে। লেখকের মায়ার ভেতরে। কী সুন্দর লেখনি!
পরিবেশ-প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা দিতে দিতে পরি��য় হবে গোফরানের সঙ্গে। কর্নারের মোড়ে গোফরানের পানের দোকান। তার আড়ালে আছে মদের দোকান। রং-বেরঙের আলো ছড়ানো মদের আসর বসে পানের দোকানের আড়ালে। শহরের নামীদামি মদের বারে আর ডিস্কোতে টাকা উড়িয়ে নিঃস্ব হয়েও যারা মদের নেশা ছাড়তে পারেনি, যারা অতীত - বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে মাদকতার কাছে বিলিয়ে দিয়েছে, তারাই এসে গোফরানের মদের দোকানে ভিড় করে। গোফরানের দোকানের গল্প শুনতে শুনতে হাজির হবে আনসারী। এখানের অনিয়মিত কাস্টমার। লেখালেখির খাতিরে যেদিন আয় বেশি হয়, সেদিন ই আনসারী এখানে আসে। অর্থাৎ লেখক আনসারীর আগমন। এই আনসারী পুরো উপন্��াস জুড়ে কবিতা বলে যাবে, লিখে যাবে। আনসারীকে কেন্দ্র করেই উপন্যাস এগোতে থাকবে। একের পর এক মোড় নিতে থাকবে। প্রবাহিত হতে থাকবে নানান ঘটনা।
মদ খেয়ে, মাতাল হয়ে ঢুলতে ঢুলতে কবিতা মনে করে আনসারী। হঠাৎ করে তার রেললাইন দেখার শখ হয়। তা দেখতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে আনসারীর ঠায় হয় হাসপাতালের বেডে। এরপর আর কিছু মনে নেই। হঠাৎ সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে আহত আনসারীর ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে যেই মানুষটিকে দেখে সেই মানুষটিও উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান চরিত্র। কিন্তু, আনসারী কাকে দেখে? জানতে হলে পড়তে হবে - অধ্যায়।
আনসারীর বন্ধু আমির। আমির সাহিত্যপ্রেমী। আমিরের ছোট বোনের নাম পারুল, উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ, তাই বাসায় আছে। সকালে উঠেই পত্রিকায় চোখ বুলানো আমিরের অভ্যাস। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা না পড়া হলেও, বাজার থেকে এসে পত্রিকায় চোখ রাখতেই আনসারীর কবিতা 'বিবাদী' চোখে পড়ে। কবিতার মধ্য থেকে চারটে লাইন নীচে দেয়া হলো :
" আমাদের মধ্যে কতশত দ্বন্দ্ব আমাদের ভেতরে__ সব কেড়ে নিজে বড় হবার ছন্দ, আমরা বিবাদী; আবার আমরাই আশাবাদী আমাদের আচরণে পশুর গন্ধ। "
পারুলকে ডেকে এনে খুশি মনেই জাতীয় পত্রিকায় ছাপা আনসারীর কবিতা দেখালো আমির। আমির উল্লসিত। আনসারীর কবিতার পাঠক হলো আমির। গল্প এগোতেই আমিরের ঘরে কলিংবেল বেজে উঠে এবং উপস্থিত হন আনসারী। আমিরের জন্য উপহার নিয়ে এসেছে আনসারী, আজ আমিরের জন্মদিন বলে কথা! রাতের খাবারের দাওয়াত পায় আনসারী৷ গল্প এগোয়।
রাতে খাবারের আগে আনসারীর কাছে এমন কিছু সত্য প্রকাশ করে আমির, যা শুনে হতভম্ব হতে হতে নিজেকে সামলে নেয় আনসারী। এ যেন ভীষণ কঠিন সত্য! কিন্তু কী সেই সত্য?
আনসারীর বোন পারুলের বান্ধুবীরাও আসে দাওয়াতে। তার সাথে এমন একজন আসে, যাকে আনসারী অইদিন হাসপাতালের বেডে চোখ খোলার পর দেখেছিলো! কিন্তু কে সেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র? কি ঘটবে এরপর?
সবকিছু মিলিয়েই ঘটনা প্রবাহিত হতে থাকে। নতুন নতুন চরিত্ররা আসে। প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে, একসময় লুকিয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। এত সুন্দর করে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন চরিত্রগুলোর মাঝে! বলাই বাহুল্য এই উপন্যাস অন্যতম সেরা একটি উপন্যাস! তাই আমি ঘটনাপ্রবাহের অর্ধেক বলেই থেমে গেলাম। বইটি অবশ্যই সবার পড়া উচিত এবং নিজ থেকেই সব জানা উচিত।
সচরাচর একজন লেখক যখন লেখালেখির জগতে বৃদ্ধ হয়ে উঠে কিংবা অনেক বেশি ম্যাচিউরড হয়, তখন জীবনকেন্দ্রিক এসব উপন্যাস রচনার সাহসিকতার প্রদর্শন করেন। তরুণ লেখক তকিব তৌফিক শুরুতেই এত গভীর একটা বিষয় নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন এটা জেনে যেমন থমকে দাঁড়াবেন, এই উপন্যাসটি পড়ার পর আপনি অনেক অনেক বেশি চমকে উঠবেন। তরুণ লেখক এতো সুন্দর উপন্যাস লিখলো কীভাবে! জীবনবোধের এত সুন্দর ও গভীর বিশ্লেষণ, তরুণ লেখকদের মাঝে সচরাচর দেখা যায়না! কিন্তু তকিব ভাইয়ার অনবদ্য সৃষ্টি এই "অধ্যায়" যেন চমকে দেয়ার মতই সুন্দর।
জীবন সম্পর্কে জানা যাবে। আবেগ ও দায়িত্ববোধের মধ্যকার সম্পর্ক সম্বন্ধে জানা যাবে৷ বিশাল বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে। বুঝতে পারবেন, ডুবে যাবেন জীবনের সেসব গল্পের মধ্যে। একেকটা জীবনের একেকটা অধ্যায় আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। আপনার দম বন্ধ হয়ে আসবে একসময়, একসময় আপনি মন খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন। বিচিত্র এ জগতে, সামান্য এই উপন্যাস 'অধ্যায়'-এ ডুবে যেতে যেতে অনুভব করবেন নিজের জীবনকে, জীবনের দায়িত্ব কিংবা গুরুত্ব। এত চমৎকার সব বর্ণনা!
উপন্যাসটি শেষ হবার পর যখন আপনি ঘোরের মধ্যে চলে যাবেন তখন কথা সাহিত্যিক কিঙ্কর আহসানের লেখা চোখে পড়বে। ফ্ল্যাপের মধ্যে।
" একজন লেখকের স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়। তকিব তৌফিক নিজেই আস্ত একটা স্বপ্ন। "