আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক-অধ্যাপক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল-এর বাংলা ভাষায় রচিত এই অনন্য প্রবন্ধ-সংগ্রহে রয়েছে চোদ্দটি অসামান্য আলোচনা। এ-গ্রন্থের নাম-প্রবন্ধটি যখন ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখন থেকেই বাঙালী বিদ্বৎসমাজের সপ্রশংস দৃষ্টি বিমলকৃষ্ণের প্রতি, ন্যায় ও নীতিতত্ত্বের সার্থক সমাহারে ঋদ্ধ তাঁর গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল—এ-যুগে সাহিত্য-আলোচনায় যা প্রায় দুর্লভ। তাঁর এই সুদীর্ঘ প্রবন্ধে কৃষ্ণ ও রামকে দেবতা হিসেবে চিত্রিত না করে চরিত্র দুটির নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যদ্বয়ের সাহিত্য-বিচারেই এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বিমলকৃষ্ণ। ‘ইতিহাসের রাম’—এই রচনারই যোগ্য সঙ্গী, যেখানে রামায়ণ-চর্চার এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বিবৃত। অন্যান্য প্রবন্ধে তাঁর আলোচনার বিষয় শ্রীচৈতন্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, মহিলাসমাজে দর্শনচর্চা, জুয়া ভাগ্য ও দৈব, প্রিয়েরে দেবতা, মুষল-মুদগর প্রভৃতি। সরস, মনোজ্ঞ ও সারবান এই নিবন্ধগ্রন্থের পরিসরে বিমলকৃষ্ণ, বলা যেতে পারে যে, পাঠককে করিয়েছেন এক চমকপ্রদ ‘ভারতদর্শন’।
এই অসামান্য বইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যত্র পাঠ্যপুস্তক, কি নিদেনপক্ষে অবশ্যপাঠ্য সন্দর্ভের মর্যাদা পায়নি কেন?!? আজ্ঞে হ্যাঁ, এই চিৎকৃত অভিমত দিয়েই আলোচনা শুরু করতে হল। এই ক্ষুদ্র বইয়ের অধিকাংশ নিবন্ধ মূলত রামায়ণ ও মহাভারতের কিছু বিতর্কিত তথা বিবাদের জন্মদায়ী অংশের বিশ্লেষণ করেছে। তারই পাশাপাশি এখানে এসেছে আরও তিনটি প্রসঙ্গ, যাদের প্রতিটিই প্রতিনিয়ত চায়ের পেয়ালায়, ফেসবুকে, সমাজে, এমনকি আইনসভায় তুফান তোলে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই আলোচনা করা হয়েছে নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে— যার মধ্যে রাজনীতি বা ধর্মীয় ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তারপরেও এই বইটি নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করে না কেন?!? একটি নাতিদীর্ঘ 'মুখবন্ধ'-র মাধ্যমে লেখক সংকলনটি রচনার পটভূমি স্পষ্ট করেছেন। তারপর এসেছে এইক'টি লেখা~ ১. ধর্মযুদ্ধ; ২. নরচন্দ্রমার কলঙ্ক; ৩. ধর্মস্য তত্ত্বম; ৪. ন্যায়-অন্যায়ের নানা দিক; ৫. সত্য, মিথ্যা ও সত্য; ৬. সন্তান ও সিংহাসনের উত্তরাধিকার; ৭. প্রতিমা— ভরত ও কৈকেয়ী; ৮. জুয়া, ভাগ্য ও দৈব; ৯. প্রিয়েরে দেবতা; ১০. মুষল-মুদ্গর; ১১. ইতিহাসের রামায়ণ; ১২. শ্রীচৈতন্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব; ১৩. দর্শনচর্চা ও ভারতীয় মহিলা; ১৪. হিন্দুধর্ম: ঔদার্য, নিষ্ঠা ও উন্মাদনা। বইয়ের প্রথম এগারোটি লেখা বিভিন্ন সূত্র ও অভিমত বিশ্লেষণ করে প্রাচীন ভারতের সমাজ ও সংস্কারের এক ভালো-মন্দ মেশানো, যুক্তির দ্বারা সমর্থিত ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। কবি(দে)র কল্পনা, অতিশয়োক্তি এবং নানা সময়ের প্রক্ষেপের মধ্য দিয়ে কীভাবে যুগে-যুগে পাঠকের কথা ভেবে এই দুই মহাকাব্যের পরিবেশন বদলে গেছে, সেটাও আমরা দেখতে পাই এই আলোচনায়। পরবর্তী দু'টি লেখা এই বিষয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বেশ ভালোমতো ঝাঁকিয়ে দেয়। সে-সব বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত নাও হতে পারি; তবে কথাগুলো নতুন করে অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করে। এই বইয়ের শেষ লেখাটি আকারে ছোটো হলেও তার মধ্যেও কিছু বিস্ফোরক ভাবনা ও বিশ্লেষণ আছে। বইটি লেখার পর সাড়ে তিন দশক অতিক্রান্ত হলেও লেখাটি আদৌ সেকেলে হয়নি; বরং আজকের ঘটনাক্রম অনেকাংশে বোঝা যায় লেখাটি পড়ে। সব মিলিয়ে বলব, এ এক তুলনাহীন বই। যাঁরা নতুন যুগের নানা ভাবনার নিরিখে মহাকাব্যকে বিশ্লেষণ করতে চান, তাঁদের জন্য এই বই এক সুদৃঢ় ও যৌক্তিক কাঠামো গড়ে দেয়। আর সেজন্যই আবার বলি, এই অসামান্য বইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যত্র পাঠ্যপুস্তক, কি নিদেনপক্ষে অবশ্যপাঠ্য সন্দর্ভের মর্যাদা পায়নি কেন?!?