এই বইটি লেখকের বিভিন্ন সময়ে লেখা তিনটি প্রবন্ধের সংকলন। লেখক মনে করেন, 'যৌনতা বিষয়ক প্রায় সব বয়ানই যেহেতু পুরুষের লেখা, আমাদের উনিশ শতকে তা আরও সত্য, যেহেতু, সর্বজনীন শিক্ষা, মতপ্রকাশের অধিকার, নিজেদের ডিজায়ারের বিবরণ মেয়েরা সেযুগে তাে বটেই, আজও বলে উঠতে পারে না, তাই তাদের যৌনতার ভাষ্য খুঁজতে হবে পুরুষের লেখা বয়ানকেই উল্টোভাবে পড়ে।' চাঁদের ওপিঠের অন্ধকারের মতােই উনিশ শতকের অবরােধবাসিনী মেয়েদের ডিজায়ার কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের চেনা অচেনা উচ্চারণে, তারই একটা খোঁজ প্রথম লেখাটি। লেখক ব্যবহার করেছেন ‘সম্বাদ রসরাজ’ পত্রিকার পুরােনাে ফাইল, জানা অজানা বেশ কয়েকটি প্রহসন, যেখানে মেয়েদের শরীর-যৌনতার উচ্চারণ, সােচ্চার ঘােষণা পুরুষতন্ত্রের চেনা থাকবন্দে রীতিমতাে অন্তর্ঘাত ঘটায়। যেমন, সেদিনকার বিয়ের রাতে বাসরঘরের চেহারা, যেখানে,সদ্যবিবাহিত বরকে নিয়ে বউ-এর সঙ্গিনীদের সমবেত হাসিঠাট্টা, শরীরী ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল ঠাট্টা-ইয়ার্কি, যা, সেদিনের ইংরেজিশিক্ষিত পুরুষতন্ত্রের ঠিক বিপরীত এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সমান্তরাল সংস্কৃতির চেহারা তুলে ধরে। কুলীন পরিবারের অবরােধবাসিনী মেয়েদের অবদমিত শরীরী আকাঙ্ক্ষা যে চোরাগােপ্তা পথে নিজেকে প্রকাশ করত, তার চেহারাও পাওয়া যায় এখানে। দ্বিতীয় প্রবন্ধের বিষয় মেয়েদের পােশাকের ডিসকোর্স, কীভাবে তথাকথিত ‘আলােকিত’নব্যযুগে মেয়েদের উপযােগী পােশাক পরিকল্পনা হয়ে উঠল জাতীয়তাবাদী পুরুষতন্ত্রের পরিসরে ক্ষমতার সঙ্গে মেয়েদের নিজস্ব বােঝাপড়া, আবার একইসঙ্গে পুরুষতন্ত্রের বয়ানের ভিতর মেয়েদের নিজস্ব আকাক্ষার অভিব্যক্তি। এই বই একেবারে সাধারণ পাঠকদের জন্য। গবেষক পন্ডিতদের কথা ভেবে লেখা নয়।
বইটি তিনটি প্রবন্ধের সংকলন, আর তিনটিই উনিশ শতকের সময়কালকে তুলে ধরেছে। প্রথম প্রবন্ধ 'উনিশ শতক বাঙালি মেয়ের যৌনতা' চাঁদের অন্ধকার দিক অনুসন্ধান করেছে,অন্দরমহলে বন্দী নারীর যৌনতা, যৌন চিন্তা ও তার পপরিতৃপ্তি অথবা অভিলাষ পূরণের একটি সামগ্রিক চিত্র এই প্রবন্ধে। বাহিরমহলে পূরুষের প্রতিপত্তি সত্ত্বেও অন্দরমহলে নারীরা কিভাবে স্বতন্ত্রা ছিল এবং পুরুষশাসিত সমাজের অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তারা কিভাবে নারীমহলের নিজস্ব ভাষায় ও আঙ্গিকে রূপায়িত করা হত তা এই প্রবন্ধের উল্লেখযোগ্য দিক।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ 'উনিশ শতক বাঙালি মেয়ের পোশাক-ভাবনা', ইংরেজি-শিক্ষিত ও ভিক্টোরিয়ান এটিকেটের পাঠরত বাঙালি (বা পুরুষ) সমাজ কিভাবে শালীনতা আর ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নারীর পোশাক নির্ধারণের নামে নারীর শরীরের ওপর শাসন কায়েম করলো এটাই এই প্রবন্ধের মূল উপজীব্য। এর সাথে এসেছে দেশীয় অতীতকে ভুলে পাশ্চাত্য অনুকরণের প্রচেষ্টা ও তৎসহ 'হিন্দু রিভাইভালিজম' এর প্রয়োগ।
গ্রন্থের অন্তিম ও দীর্ঘতম (সঙ্গত কারণেই) প্রবন্ধ - 'উনিশ শতকের বাংলায় শরীর-যৌনতা -অশালীনতার এলাকা নির্মাণ'। শরীর,যৌনতা ও অশালীনতা - এই তিনটি অবিচ্ছেদ্য ধারণার ত্রিবেণী সঙ্গম এই প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন ইংরেজি জানা কলোনির প্রজা মধ্যবিত্ত বাঙালি ইউরোপীয় ধাঁচে যৌনতাকে একমাত্রিক মানদণ্ড দিয়ে বেঁধে,ব্যক্তি ও সামাজিক শরীরের ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য কায়েম করেছে। আর একইসাথে প্রাক-ঔপনিবেশিক সাব-অল্টার্ন সমস্ত টেক্সটকে এককথায় 'অশালীন' লেবেল দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
কিন্তু 'বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো'র মতো এত উদ্যোগ অবরোধ শেষ পর্যন্ত নৈতিক অবক্ষয়কে আটকাতে পারেনি,বরং 'প্রদীপের নীচেই অন্ধকার'এর মত তথাকথিত 'পিউরিটান'দের ব্যক্তিগত কার্যকলাপই তাদের আদর্শের পরিপন্থী তাও দেখানো হয়েছে।
বইটিতে অবধারিত ভাবেই বারবার এসেছে ফুকোর হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়্যালিটির উল্লেখ, এবং তা চোখে আঙুল দিয়ে সত্যকে দেখিয়েছে। যদিও তিনটি প্রবন্ধই মূলতঃ কলকাতা কেন্দ্রিক,তবে তৎকালীন বাঙালী সমাজজীবনের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার জন্য মনে হয় এই জিয়গ্রাফিক্যাল লিমিটেশন অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘ ও অনুসন্ধানী গবেষণার ফসল,লেখকের শাণিত লেখনীতে তা আরও মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে এটি বিশেষ সম্পদ।
বইটির বিষয় আগ্রহোদ্দীপক, কিন্তু এতে পাণ্ডিত্য আর সরসতার ঘাটতি আছে।
প্রবন্ধ সংকলনে বানানপ্রমাদ (বিশেষত লেখক যখন শুরুতেই নিজের ডক্টরাল থিসিসের গল্পটি সেরে নিয়েছেন) একেবারেই কাম্য নয়। বাংলা আর ইংরেজি উদ্ধৃতিতে বানান ভুলগুলো মূল উৎসে থাকলে [sic] বা বাংলায় [মূলানুগ] লেখা যেতো, ধরে নিচ্ছি সেগুলো টুকতে গিয়ে ভুল হয়েছে। ফুকোর Panopticism তাই হয়ে গেছে Panopticanism (যদিও বেন্থাম ফেঁদেছিলেন Panopticon-এর নকশা)। এ ত্রুটি বড়জোর সাময়িক ভ্রূকুটি উসকায়; কিন্তু একেবারেই ভালো লাগেনি সবিকল্প ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। বাংলায় সাহাসাহেবের দখল ভালো, তিনি চাইলে আগাগোড়া গুছিয়ে বাংলায় লিখতে পারতেন; তাঁর না চাওয়াটা চোখে পড়ে। তাঁর লেখাতেই আছে পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'বর্ণসংকর জ্ঞানচর্চা'র কথা, পরিহাস হচ্ছে, এই নির্বিচার সবিকল্প ইংরেজির যথেচ্ছ ব্যবহারও সেই বর্ণসংকর জ্ঞানচর্চারই উদাহরণ। একজন বাঙালি প্রাবন্ধিক বাংলা পরিভাষার কলেবর বাড়াবেন, এটা আশা করতেই পারি। উল্লেখ্য, 'এক্ষণ' পত্রিকায় প্রবন্ধ শুরু করার আগে একটি সংক্ষিপ্ত নির্ঘণ্টে প্রস্তাবিত বিকল্প বাংলা শব্দগুলো পাঠকের জন্যে আগাম সাজানো হতো; আমি সেটিকে প্রবন্ধের জন্যে অনুকরণীয় রীতি বলে মানি।
আটে আটে যেমন সবসময় ষোল হয় না, তেমনই কাছাকাছি কয়েকটি প্রসঙ্গে ভিন্ন সময়ে লিখিত ভিন্ন কয়েকটি প্রবন্ধ পরপর জোড়া দিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ বই হয় না। এখানে-সেখানে বিরাগোৎপাদী পুনরাবৃত্তিগুলো লেখক নিজেই দূর করতে পারতেন।
ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে ছাপাখানা সুলভ হওয়ার পর সমাজের নানা গোত্রের মধ্যে অবমাননা-বিনিময়ের চোঙাফোঁকা নানা পত্রিকা গজিয়েছিলো, সে কথা পড়েছিলাম অরুণ নাগের সুলিখিত 'চিত্রিত পদ্মে' বইটিতে, তার খানিক রাখা-ঢাকা নমুনা নীরদ চৌধুরীর লেখাতেও পড়েছিলাম। প্রতিপক্ষের কবির স্ত্রীকে প্রতিপক্ষের কবির বন্ধুর শাশুড়ির সাথে সমকামে জড়িয়ে লেখা গালগপ্পোর উদ্ধৃতি দিয়ে চৌধুরীসাহেব বোঝাচ্ছিলেন বাঙালি কত্ত খারাপ (আর আংরেজ কত্ত ভালো), সেখানে তিনি ঘৃণাবশত একটি 'কথ্য' শব্দ এড়িয়ে গেছেন। অর্ণব সাহার লেখা পড়ে জানলাম, সেটি চাক্তিমৈথুন, সম্ভবত cunnilingus এর বিকল্পে (কবি খেলায়েত খাঁ যার 'বাংলা' করেছিলেন ভোদমবুসি)। শব্দটি স্ত্রীমহলে ব্যবহৃত ছিলো, এই ধারণাটি আমি আস্থায় নিতে পারিনি; আমার সন্দেহ এটি চাখতিমৈথুনের একটি বিকল্প বানান, এবং এটি গজিয়েছে কোনো 'সম্বাদ রসরাজ'-মার্কা পুরুষের মাথা থেকেই। এখানে লেখকের গবেষণার পদ্ধতির গোড়ায় আমি একটি আপত্তির ক্ষীণকায় গজাল ঠুকতে চাই, তিনি ঊনবিংশ শতকে বাঙালি মেয়ের যৌনতার সন্ধানে পাতার পর পাতা উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেই আমলের কামসাহিত্য (যার পুরোটাই মৎলববাজ পুরুষরচিত) থেকে। একাধিক প্রবন্ধ পড়ে মনে হয়েছে, সেগুলোই তাঁর গবেষণার মূল আকর, এবং তিনি 'যা রটে তার কিছু তো বটে' যুক্তিতে কিছু উপসংহার টানতে চেয়েছেন। আমরা যদি 'মাসুদ রানা'কে প্রামাণ্য ধরে দুনিয়া জুড়ে বিংশ শতাব্দী সত্তর আর আশির দশকে বাঙালি গুপ্তচরের সক্রিয়তা নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসি, তাহলে সমস্যাটা যেমন, এখানেও তেমনই। 'ঊনিশ শতকে চটিপত্রিকা সম্পাদকের কল্পনায় বাঙালি মেয়ের যৌনতা' গোছের কোনো শিরোনাম থাকলে এ আপত্তি তোলার অবকাশ পাঠকের মিলতো না।
এমন কিছু আপত্তি তোলার পরও বইটি টানা পড়ে যাওয়ার মতো, কারণ বিচিত্র কিছু বিষয় এতে সুসজ্জাক্রমে আলোচিত; বিশেষত 'ভদ্র' বাঙালির মনের দোরে উপনিবেশের নানা খিল এঁটে বসার অংশটুকু সবচে গুছিয়ে লেখা। রবীন্দ্রনাথের ঘাড়ে চড়ে witকে আমি বলি মূর্ধন্য রস, তার ঘাটতি বইটিতে আছে। গুরু বিষয়ে লিখতে বসলে বাঙালি পণ্ডিত রীতিমতো গায়ে খেটে এ-মলাট থেকে ও-মলাট অব্দি গোমড়া হয়ে থাকে, পাছে লোকে তার পাণ্ডিত্যে খোঁচ ধরে।
পোশাকের শালীনতা-অশালীনতা নিয়ে তর্ক বির্তক সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলমান। তবে বিস্ময়ের বিষয় এই যে, যেই পাশ্চাত্য ভাবধারাপুষ্ট পোশাককে অশ্লীল বলা হয়ে থাকে, সেই পাশ্চাত্যই ছিল তৎকালীন সমাজের নিকট শালীন ও গ্রহণযোগ্য এবং দেশীয় বসন ছিল অশালীন। লেখক শুধু আলোচনা পোশাকেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, উনিশ শতকের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী নব্যধারা সৃষ্টি করতে গিয়ে কিভাবে নিজস্ব লোকায়ত সাহিত্য সংস্কৃতিকেই বিকৃত রুচি ও ভদ্রসমাজের জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে ভর্ৎসনা করেছেন, সে বিষয়েও আলোকপাত করেছেন।