হুমায়ূন আহমেদের আত্নজীবনীগুলো আমার ওনার করা কাজগুলোর মধ্যে পছন্দের শীর্ষে। নিজের যাপিত জীবনটাকে এত সাবলীল সাধারণভাবে তুলে ধরার কাজটা সহজ নয়। লেখক হিসেবে ভালো বলেই হুমায়ূন পেরেছেন। ওনার পর সিডনি শেলডনের জীবনী আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করলো।
মানুষ হিসেবে সিডনি শেচটেল শুধু সাধারণই ছিলেন না,তিনি ছিলেন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবার কোন নির্দিষ্ট চাকরি ছিলো না। আজ বিরাট বড় পেন্থহাউজে পরিবার নিয়ে বাস করছেন তো কাল বস্তিতে গিয়ে উঠছেন। সিডনি জীবনে এমন কোন কাজ বোধহয় নেই যা করেননি। ভাবা যায় বিশ্বখ্যাত এই থ্রিলার লেখক একসময় জুতার দোকানের সেলসম্যান ছিলেন। একসময় সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতেন,"আসুন ভালো সিনেমা আছে,দেখে যান,জায়গা আছে..."
জীবনে অনেক বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিলো সিডনির বরাবরই। কিন্তু ছোটখাটো এসব কাজ করেই সারাজীবন কাটাতে হবে ভেবে আত্নহত্যা করতে যান একবার। বাবা ধরে ফেলেন তাকে। তিনি বলেন, "জীবন তো একটা উপন্যাসের মতো,যখন তখন পাতা উল্টাতে পারে। আর তুমি যেহেতু লেখক তোমার জীবনের পরের পাতাটা তুমিই লিখবে।"
তখন থেকেই সিডনি শুরু করেন তার জীবনের উপন্যাসের পাতা উল্টানো,একেকটা সাফল্যকে একেকটা পাতা হিসেবেই উল্লেখ করেছেন তিনি। সিডনি শেচটেল থেকে সিডনি শেলডন হয়ে ওঠার পুরো জার্নিটা আসলেই চমৎকার এক উপন্যাস।
লিখেছেন গান, বানিয়েছেন নাটক, সিনেমা। প্রথম জীবনে রিডারের কাজ করেছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দিন থেকে রাত। একগাদা পার্টটাইম জব করার ফাঁকে ফাঁকেও লিখে গেছেন। কখনো কোন চাকরির অফার বা কোন নাটক/সিনেমা লেখার অফার সময়ের স্বল্পতার জন্য ফিরিয়ে দেননি। মনে মনে ভেবেছেন, "সম্ভব না" কিন্তু মুখে বলেছেন,"করবো"। এইভাবেই সাফল্য তার কাছে ধরা না দিয়ে পারেনি।
আমেরিকায় যুদ্ধ লাগলে সিডনি পাইলট হিসেবে দেশের কাজেও যোগ দেন, ফাঁকে ফাঁকে চালিয়ে গেছেন লেখালেখি। একটা মানুষ কত যে পরিশ্রম করতে পারে!
সিডনির সবচেয়ে বড় গুন উনি জানতেন যে উনি বড় কিছু একটা হবেনই। জ্যোতিষি তার হাত দেখে বলেছিলো,"তুমি একদিন বিশ্ববিখ্যাত হবে",সিডনির মা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন সেটা। আজ মানুষ তার সেই খ্যাতিটাই দেখে,এর পেছনে কত যে গল্প আছে তা জানতে হলে বইটি পড়তেই হবে। মানুষ কত কষ্ট কত ক্লান্তি সহ্য করতে পারে সফল হবার জন্য তা জানতে হলে সিডনিকে দেখতে হবে। তুমুল জনপ্রিয় এই লেখক একসময় তার লেখা নিয়ে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও জবাব পাননি। এটা অবশ্য নতুন কিছু না। নতুনদের লেখা প্রকাশকরা না পড়েই রিজেক্ট করে দেন বরাবরই, বিখ্যাত অনেক মানুষের সাথেই এসব হয়েছে। কিন্তু সিডনি তার জন্য লেখা থামাননি। কোন অফার ফিরিয়ে দেননি,শত কাজের চাপেও লেখার জন্য সময় করে নিয়েছেন। একসময় নিউইয়র্ক,শিকাগো,সানফ্রান্সিসকো শহরে বিখ্যাত সিডনি শেলডন পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন কারণ তার বাসভাড়া ছিলো না, হলিউডের দরজা থেকে ফিরে এসেছেন,করেছেন টেলিফোন সার্ভিস,হোটেলের বয়, ওষুধের দোকানের সেলসম্যানের চাকরির মত তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজগুলো। নিজেকে নিয়ে এত স্বপ্ন ছিলো তার যে যেখানেই যেতেন নিজেকে সেখানকার ভবিষ্যত মালিক কল্পনা করতেন,কারত তিনি জানতেন টিকে থাকতে পারলে তার দ্বারা এটা সম্ভব।
একবার হলিউডে কাজের সুযোগ পেয়েই যে হুহু করে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছেন তাও না। শুরুতে কিছু বি গ্রেড মুভি তৈরি করার জন্য বড় কাজ পেতেও ঝামেলা হয়েছে তার। কেউ তার লেখা পড়ে নাক সিঁটকিয়ে বলেছেও, "এটা কি লিখেছো? হলিউডের নাম তুমিই ডোবাবে।"
সেই সিডনি শেলডন আজ একাধিক ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার থ্রিলার উপন্যাসের লেখক, একগাদা বিখ্যাত ব্যবসাসফল হলিউড মুভির গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। একনামে তাকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পাঠকই চিনে যায়। কিন্তু তিনি তার সাধারণ জীবন সংগ্রামের কথা ভুলে যাননি,লিখে রেখে গেছেন এই বইটাতে। বইটা শুধুমাত্র সিডনি শেলডনের জীবনী হিসেবে না দেখে যদি মোটিভেশনাল বইয়ের মতোও পড়েন তবুও শিখতে পারবেন অনেক কিছুই। জীবনের কোথাও হয়তো আপনি হাল ছেড়ে দেবার কথা ভাবছেন,এই বইটি পড়া থাকলে লেখক আপনাকে দ্বিতীয়বার ভাবাবেন। হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
বরাবরের মতোই সিডনির চমৎকার গল্পের মতোই ইন্টারেস্টিং লেখনী,বোর করবে না এক মূহুর্তের জন্যও। পড়তে পড়তে ভুলেই গিয়েছিলাম অনুবাদ পড়ছি,এতটাই সাবলীল। অনুবাদক লিখেছেন, "এটা সিডনি শেলডনের জীবনের সবটা না, কিছু অংশ মাত্র!" এক জীবনে একটা মানুষের কত অভিজ্ঞতা হতে পারে তার সামান্য কিছু উদাহরণ নিয়ে এই জীবনীটি। একজন সফল লেখক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সিডনি তার জীবনের এইসব অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছেন। সব ধরনের কাজের খুঁটিনাটি সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞান।
পাঠক, শুধু সিডনির গল্প পড়ে মুগ্ধ হলেই হবে? লেখককে জানুন।