মহান সাহিত্যিক দস্তয়েভস্কির 'কারামাজভ ভ্রাতা' উপন্যাসের মেজভাই ইভান বলে, “আমি ইউরোপে যাচ্ছি—জানি সেখানে এক শ্মশান দেখতে পাব; কিন্তু সে শ্মশান মহামূল্যবান।” এই ‘মহামূল্যবান শ্মশান’-এর ধারণাই যেন সাংবাদিক বিক্রমন নায়ার রচিত সফরনামা 'দুই ইউরোপের দিনলিপি'র মূল উপজীব্য। ন
নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নে ইউরোপ—বিশেষত পূর্ব ইউরোপ—ছিল এক মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রমরত। সেই সন্ধিক্ষণে সুইডেন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন নায়ার। ফলে বইটি নিছক ভ্রমণবৃত্তান্ত না হয়ে হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক সংবেদনশীল মুহূর্তের প্রত্যক্ষ দলিল।
বিক্রমন নায়ারের বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি পর্যটকের চোখে ইউরোপ দেখেন না; বরং সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও রাজনীতির ভেতর দিয়ে দেশগুলোকে পড়তে চান। সুইডেনে গিয়ে তিনি কেবল প্রকৃতি বা নগরজীবনের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকেন না; বরং বোফর্স কেলেঙ্কারি ঘিরে ভারত ও সুইডেনের রাজনীতও ও জনমতের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেন। এতে বোঝা যায়, তাঁর আগ্রহ দৃশ্যের চেয়ে প্রক্রিয়ায় বেশি।
পোল্যান্ড অংশে নায়ারের বিশ্লেষণ সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। সোভিয়েতপন্থি কমিউনিজমের পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তা দ্রুতই পূরণ করতে শুরু করে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। লেস ওয়ালেসার উত্থানকে তিনি কেবল মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেন না; বরং জনতুষ্টিবাদী প্রবণতার দিকটিও চিহ্নিত করেন। এক পাদ্রীর মুখে তিনি যে সতর্কবাণী তুলে ধরেন—ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শেষ পর্যন্ত অমঙ্গল ডেকে আনবে—তা বইয়ের অন্যতম স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এই পর্যবেক্ষণ শুধু পোল্যান্ড নয়, বিশ্বরাজনীতির এক সার্বজনীন বাস্তবতাকেই ইঙ্গিত করে।
পোল্যান্ডের নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প আউচভিচ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাও নায়ারের লেখায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে তিনি কেবল ইতিহাসের ভয়াবহতা পুনরাবৃত্তি করেন না; বরং সেই অতীতের সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন অংশে নায়ার প্রবেশ করেন আরেকটি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাম্রাজ্যের ভেতরে। গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকার যুগে এসে তিনি লক্ষ করেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে থাকলেও মতাদর্শের ভিত ইতিমধ্যেই নড়বড়ে। লেনিন, স্ট্যালিন ও ট্রটস্কিকে ঘিরে তাঁর আলোচনা প্রমাণ করে, নায়ার কেবল ভ্রমণকারী নন; তিনি একজন মনোযোগী পাঠকও। স্ট্যালিনের প্রতি তাঁর সমালোচনামূলক অবস্থান স্পষ্ট, তবে একইসঙ্গে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার স্বীকৃতিও তিনি দেন—যা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিকে একরৈখিক হতে দেয় না।
তবে বইটির একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক ক্ষেত্রে নায়ারের বিশ্লেষণ তীক্ষ্ণ হলেও তা পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক গভীরতায় পৌঁছায় না; বরং ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের স্তরেই থেকে যায়। ফলে কিছু সিদ্ধান্ত পাঠকের কাছে আংশিক বা বিতর্কযোগ্য মনে হতে পারে। এছাড়া, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো রাজনৈতিক পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত বলেও মনে হয়।বামপন্থার প্রতি পক্ষপাত তিনি গোপন করেননি। যা কিছু সময় তার দৃষ্টিকে ঘোলাতে করে দিয়েছিল সামান্য হলেও।
তবু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দুই ইউরোপের দিনলিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য। এটি শুধু ভ্রমণকাহিনি নয়; বরং এক পরিবর্তনশীল ইউরোপের রাজনৈতিক ও মানসিক মানচিত্র। যে পাঠক ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ পর্যবেক্ষণের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে লেখা পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় এক পাঠ-অভিজ্ঞতা উপহার দেবে।