বিচারপতি লতিফুর রহমান জনগণের সামনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কমপরিধি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এ বইয়ের অবতারণা করেছেন। এতে তিনি স্বল্প কথায় জীবন বৃত্তান্ত, বিচারকের জীবন-বৃত্তান্ত, বিচারকের জীবন, প্রদঅন বিচারপতির অভিজ্ঞতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ৮৭ দিনের কার্যাবলি লিপিবদ্ধ করেছেন। ওই ৮৭ দিনে তিনি অনেক বিতর্কের ঝড় মাথায় নিয়ে অর্থাৎ তোয়াক্কা না করেই দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গুরুদায়িত পালন করেছেন। এ বইয়ে তিনি সে কথা কলেছেন।
২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। এই বইতে তিনি সংক্ষেপে নিজের জীবনকথা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নব্বই দিনের অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলি লিখেছেন।
যশোর শহরের একটি খানদানি মুসলমান পরিবারে লতিফুর রহমান জন্মেছেন। পেশায় আইনজীবী পিতা যশোর মুসলিম লীগের সভাপতি ও খান বাহাদুর উপাধিপ্রাপ্ত ছিলেন। ছেলেবেলায় বাড়িতে প্রায়শই ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীসহ অনেক সুপরিচিত রাজনীতিবিদকে দেখেছেন লতিফুর রহমান। তার পিতা এমএলএ ছিলেন। চাচা ছিলেন যুক্তফ্রন্টের আইনমন্ত্রী। তাই পারিবারিক আবহ ছিল রাজনীতি সচেতন।
যশোর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে প্রথমে জগন্নাথ ও পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। তখনকার ঢাকার সুন্দর একটি বর্ণনা বইটিতে রয়েছে।
এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ততদিনে লেখকের পিতা চোখের অসুখে অন্ধ হয়ে গেছেন। তবুও জেলা আদালতে আইনব্যবসা করতেন অসামান্য দক্ষতার সাথে। যা ছিল বিস্ময়কর। বাড়ির আর্থিক অবস্থা পড়তির দিকে। তাই নিজের খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হতো। টিউশন করিয়ে সেই খরচ মেটাতেন।
তখন ইংরেজি বিভাগে নম্বর দেওয়া হতো না। লতিফুর রহমানের সহপাঠী ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অর্নাসে দ্বিতীয় বিভাগে চতুর্থ হন লতিফুর রহমান। সেবার ইংরেজি বিভাগে অনার্সে কেউ প্রথম প্রথম শ্রেণি পায়নি।
অনার্স পাস করলে তখন চাকরির ততো অভাব হতো না। অন্তত স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা মিলে যেতো। একটি কলেজের নাইট শিফটে পড়াতেন লতিফুর রহমান। আর, দিনে মাস্টার্সের পাশাপাশি ল কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন।
মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণি পান লতিফুর রহমান। যা তার কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। কোনো থার্ড ক্লাস কলেজে শিক্ষকতা করা যেতো না। তাই শিক্ষক হওয়া হলো না লতিফুর রহমানের। তিনি স্মরণ করেছেন, তৃতীয় শ্রেণি না পেলে হয়তো তিনি শিক্ষকতায় থেকে যেতেন। এত বাঁক বদল হতো না জীবনে।
আইনপেশায় যুক্ত হয়ে কিছুদিন জেলা আদালতে কাজ করেন। কিন্তু জেলা আদালতের পরিবেশ তাকে টানেনি। ঢাকায় এসে একজন বড় আইনজীবির সহকারী হিসেবে কাজ শিখতে শুরু করেন। নবীন আইনজীবীদের সংগ্রামের কথা স্মরণ করেছেন লতিফুর রহমান। এ-ও লিখেছেন বিলেতফেরত ব্যারিস্টাররা এসেই ধনীর কন্যাদের বিয়ে করতো। যা তাদের পেশাগতজীবনে প্রতিষ্ঠালাভে সহায়ক হতো।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে হাইকোর্টে অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন লতিফুর রহমান। তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিতে আবদুস সাত্তার গড়িমসি করছিলেন। কেননা আবদুস সাত্তারের বিবেচনায় লতিফুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগঘেঁষা।
বিচারক হিসেবে জিয়া হত্যাকাণ্ডে কোর্ট মার্শালে ফাঁসির আদেশ পাওয়া বারোজনের একটি মামলা তাকে ও তার সিনিয়র বিচারকপতিকে শুনতে হয়। এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে তখন বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল যেন তাড়াতাড়ি তারা এই মামলার কাজ সমাপ্ত করেন। এমনকি রাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন করে একপ্রকার হুমকি দেওয়া হয় যেন এই মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা হয়। পরবর্তীতে কোর্ট মার্শালের রায় বজায় রেখে ও কোর্ট মার্শালের বৈধতাকে স্বীকৃতি দিয়ে রায় দেন লতিফুর রহমানের বেঞ্চ।
বিচারপতি মোস্তফা কামালের পর আওয়ামী লীগের আমলে প্রধান বিচারপতি হন লতিফুর রহমান। তিনি প্রথম প্রধান বিচারপতি, যিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে স্মৃতিসৌধে শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে যান।
অস্থায়ী বিচারপতিকে স্থায়ী করা ও হাইকোর্টের কোনো বিচারপতিকে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার তালিকা প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। তবে রাষ্ট্রপতি কিছু করতে পারেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নেন। বিচারপতি কে এম হাসান বিএনপির আমলে হাইকোর্ট নিয়োগ পান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি একসময় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তার নিয়োগ নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। এ প্রসঙ্গে লতিফুর রহমান লিখেছেন,
'আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য যখন আমার তরফ থেকে নাম প্রেরণ করি তখন আমি প্রথম বিচারপতি কে. এম. হাসান, দ্বিতীয় বিচারপতি জে. আর. মোদ্দাসের, তৃতীয় বিচারপতি মোঃ গোলাম রাব্বানী ও চতুর্থ বিচারপতি রুহুল আমিনের নাম উল্লেখ করি। ঐ নামগুলো পাঠাবার সময় আমি সুপারিশ করেছিলাম যে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে এ নামগুলো সুপারিশ করা হলো। একজন জজের নিয়োগের ব্যাপারে সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ণয়ে প্রধান বিচারপতির সুপারিশ গ্রহণ করতো তাহলে প্রথম সুপারিশকৃত বিচারক কে.এম. হাসানকে নিয়োগ দেয়া উচিত ছিল কিন্তু সরকার আমার সে সুপারিশ গ্রহণ করেনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির মতামতকে উপেক্ষা করে সরকারের নিজস্ব মতামত চাপিয়ে দেয়া হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে না। প্রধান বিচারপতির সুপারিশকে অগ্রাহ্য করা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী এবং বিচারপতি নিয়োগের সাংবিধানিক রেওয়াজ ভঙ্গ করার সামিল । প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করাই প্রচলিত রীতি ও রেওয়াজ। প্রধান বিচারপতির সুপারিশ অগ্রাহ্য করতে হলে সরকার প্রধানের প্রধান বিচারপতির সাথে আলাপ-আলোচনা করা উচিত। '
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু শেখ হাসিনাকে রাজি করাতে পারেননি। তাই নিয়োগ আটকে যায় কে এম হাসানের। এই কে এম হাসান বিএনপির আমলে ত্রয়োদশ প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন এবং তাকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান মানা-না-মানা নিয়েই জন্ম হয় এক-এগারোর।
লতিফুর রহমানকে বিএনপি আস্থায় নিতে পারতো না। দলটি তাকে আওয়ামীপন্থি মনে করতো। কেননা তার স্ত্রীর বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াতে এবং আওয়ামী লীগের সাথে লতায়-পাতায় লতিফুর রহমানের নানা স্বজনের সম্পর্ক ছিল। এদিকে আওয়ামী লীগ বেশ আস্থাশীল ছিল। তাই লতিফুর রহমানের শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে বিএনপি আসেনি। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়।
লতিফুর রহমান লিখেছেন তিনি কীভাবে নব্বই দিন কাজ করবেন তা নিয়ে একটা প্রস্তুতি তিনি নেন। তাই দেখা যায় শপথ গ্রহণের রাতেই তিনি অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিবর্তন করেন। ডিসি-এসপি পদে বিরাট রদবদল করেন। এমনকি একযোগে দেশের সকল থানার ওসিকে বদলি করে দেন। এই সিদ্ধান্তগুলো সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করলেন, বেসামরিক ক্যু হিসেবে। তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে বারবার একটাই দাবি নিয়ে এসেছেন যে, প্রশাসনে বদলি করা যাবে না। লতিফুর রহমান উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগের চিন্তা থাকার কথা ছিল জনগণ তাদের ভোট দেবে কি না, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না। বরং তারা ব্যস্ত ছিল প্রশাসনে বদলি কেন হলো তা নিয়ে!
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিবেশের চরম অবনতি ঘটেছিল। ফেনীর জয়নাল হাজারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে। তখন তাকে গ্রেফতার করতে সারা ফেনীতে কারফিউ জারি করে বিশেষ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। ভারতে পালিয়ে যায় জয়নাল হাজারী। এই অভিযান নিয়ে সদ্যসাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমিকার নিয়ে লতিফুর রহমান লিখেছেন,
'শেখ হাসিনা সৌদি আরবে ওমরাহ করতে যাওয়ার প্রাক্কালে আমার কার্যালয়ে টেলিফোন করেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরে আমার সাথে টেলিফোনে আলাপ করেন। তিনি হাজারিকে সমর্থন করে এ তল্লা��ি অভিযানের ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁর অভিমত, জয়নাল একটু পাগলাটে টাইপের লোক কিন্তু সন্ত্রাসী নয়। '
আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে লতিফুর রহমান ও তার পরিবারকে রাজাকার আখ্যায়িত করতে থাকে। তাতে বিপর্যয় মানসিক অবস্থার কথা লিখেছেন লতিফুর রহমান।
২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা পরেই সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন শুরু করে বিএনপি। ভোটের পর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ সম্পর্কে লতিফুর রহমানের সাফাই,
'বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। আমাদের চেষ্টা সত্ত্বেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন কাজে একটু ঢিলা দেয় এবং বিএনপি সমর্থিত কর্মী বা লোকদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখায়। কারণ বিএনপি জয়লাভ করার পর সকলেই বিএনপির অবস্থানের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হলো যে, পুলিশ প্রশাসন সঠিক কাজটা করা থেকে বিরত রইল..'
এদিকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন সেনাবাহিনীকে আরও কিছুদিন মোতায়েন রাখতে রাজি ছিলেন না। তাই সবকিছু মিলে নির্বাচনের রাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাত থেকে ক্ষমতার লাগাম একদম চলে যায়।
জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে সহজেই একটা কারচুপিবিহীন সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। সাথে সেনাবাহিনীকে সীমিত আকারে গ্রেফতার ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন দুই সপ্তাহ আগে মাঠে নামালে জাতিকে উপহার দেওয়া যেতে পারে একটি অবাধ,সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।
বিচার বিভাগ থেকে নির্বাহী বিভাগকে আলাদা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ফাইল চূড়ান্ত করেছিলেন আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ। বাকি ছিল শুধু রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি। কিন্তু প্রথমবার আমলাদের চাপে এবং দ্বিতীয়বার সদ্যভোটে জয়ী বেগম জিয়ার অনুরোধে জারি করা সম্ভব হয়নি এই ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ।
আইনানুযায়ী শুধু দৈনন্দিন সরকার চালানোর কাজ করবে তত্ত্বাবধায়ক। কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। তবুও লতিফুর রহমানের নব্বই দিনের সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের নৌ ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কীভাবে নিয়েছিল তা জানতে বইটি পড়তে হবে।
লতিফুর রহমানের বইটা পড়া খুব জরুরি। কারণ তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম নেই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের রায় মানেনি। বিএনপি লতিফুর রহমানকে আওয়ামীপন্থি মনে করলেও শেষ হাসি তারাই হাসে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আস্থা ফেরাতে অসফল হওয়ার দায় লতিফুর রহমানের রয়েছে। সবচেয়ে বেশি দায় তাকে নিয়ে হবে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার জন্য। যে কারণ তিনি দেখিয়েছেন তা তিনিসহ পুরো উপদেষ্টামণ্ডলীর ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। কিন্তু এক ধরনের আত্মতুষ্টিভাব তার লেখায় পেলাম। সেভাবে পাইনি আত্মসমালোচনা।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই। রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী যে কোনো পাঠককে বইটি আকৃষ্ট করবে।
বিচারপতি লতিফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের তৃতীয়(সাংবিধানিকভাবে দ্বিতীয়) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বপালনের সময়টা নিয়ে তিনি এই বই লিখেছেন।
আমাদের দেশে নির্বাচনে হারার পর ব্যর্থ দলের ফলাফল মানতে না চাওয়াটা অনেক আগ থেকেই পলিটিক্যাল কালচারে রুপ নিয়েছিলো। ২০০১ এর নির্বাচনেও হেরে যাওয়া আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফল মানতে রাজি হয়নি বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে তোলে অনেকগুলো অভিযোগ। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে মূলত বইটা লেখা হলেও এই বইয়ে বিচারপতি লতিফুর রহমান তাঁর ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠাসহ, হাইকোর্টের বিপারপতি ও প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন তাঁর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন একই সাথে সাংসারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনেক বিষয়েও নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
ছোটবেলা থেকেই বিচারপতি লতিফুর রহমান বেড়ে উঠেছিলেন একটি রাজনৈতিক আবহের মধ্যে। বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেই সুবাধে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নিয়মিত তাঁদের বাসায় যাতায়াত করতেন। তাঁর বাবা আইজীবী হিসেবে ছিলেন সুপরিচিত এবং বিরল এক উদাহরণ। চোখের রেটিনা নষ্ট হওয়ায় একসময় হয়ে পড়েন পুরোপুরি অন্ধ, তবুও তিনি আইনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন মৃত্যুর আগপর্যন্ত। এতো দারুণভাবে মামলা পরিচালনা করতেন যে অনেকে মনে করতেন তিনি হয়তো চোখে দেখেন।
লতিফুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স করেন। মাস্টার্সে মাত্র ৩মার্ক কম পাওয়ায় মিস করেন দ্বিতীয় শ্রেণি। এই ৩ মার্কই লতিফুর রহমানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি দিনেরবেলা সোহরাওয়ার্দী কলেজে শিক্ষকতা করেন আর রাতে ঢাবিতে পড়তে শুরু করেন আইন। তারপর এম. এইচ খন্দকার যিনি ছিলেন বাংলাদেশের ১ম অ্যাটর্নি জেনারেল, তাঁর অধীনে শুরু করেন প্র্যাকটিস। আইনপেশায় যেয়েও তিনি শুরতে ছিলেন চরম হতাশাগ্রস্ত। তবুও তা কাটিয়ে ওঠে তিনি একসময় সুপরিচিত ও বিজ্ঞ আইনজীবী হন। বইয়ে আইনপেশার বিষয়ে তিনি বলেছেন,
"আইন ব্যবসাকে Jealous Mistress বলা হয়। একটা কথা প্রচলিত আছে যে, আইন ব্যবসায় যদি পিতা নিয়োজিত থাকেন তবে খুব ভালো। আর তা না হলে শ্বশুর যদি উকিল হন তা হলে মন্দের ভালো।"
দীর্ঘসময় আইনজীবি হিসেবে কাজ করার পর তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি এবং তারপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ গ্রহণ করেন।
সাংবিধানিক নিয়মে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার জন্যে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যিনি শপথ গ্রহণের ৩ মাসের মধ্যে একটি নির্বাচনের আয়োজন করেন। লতিফুর রহমান সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হওয়ায় সাংবিধানিকভাবে এই দায়িত্ব তাঁর উপর পড়ে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, লতিফুর রহমান প্রধান বিচারপতি থাকাবস্থায় বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার জন্যে কাজ করেন এবং তাঁর সময়ে কে. এম হাসানকে আপিল বিভাগে নিয়োগ না দেওয়াসহ আরও বেশকিছু কারণে বিএনপি সমর্থকরা ধরে নেন তিনি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। এজন্যই প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর বিদায় সংবর্ধনায় বিএনপির মতাদর্শের আইনজীবীদের বক্তৃতার মাধ্যমে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয়ের আভাস পাওয়া যায়। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থনকারীদের মধ্যে তাঁর নিরপেক্ষতার ব্যাপারে আস্থাশীল দেখা যায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি জানতে পারেন আওয়ামী লীগ সরকারও দ্রুত তাঁর অধীনেই নির্বাচন করতে চাচ্ছে। লতিফুর রহমানের প্রতি দুই দলের আস্থা-অনাস্থার বিষয়টা আরও ভালো করে লক্ষ্য করা যায় যেদিন তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন বেগম খালেদা।
মাত্র ৩ মাসের মধ্যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ। বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা পদে শপথ গ্রহণের আগ থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। শপথগ্রণের পরেই শুরু করেন সচিবদের রদবদল। একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্��ে প্রশাসনের রদবদল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই রদবল নিয়ে আওয়ামীলীগের মধ্যে শুরু হয় ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ রদবল বিএনপির দেওয়া লিস্টের মতো করে হচ্ছে। এদিকে ড. ইউনুসসহ দেশের বড়ো একটা অংশই প্রধান উপদেষ্টার এই কাজকে স্বাগত জানান। বলে রাখা ভালো এই রদবদলের পেছনে ড. আকবর আলি খানেরও বড়ো একটা ভুমিকা ছিলো।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বপালনকালে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন: অবৈধভাবে দখলকৃত সরকরি জমি উদ্ধার, যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো সন্ত্রাসবাদ নিরসনে একেরপর এক অভিযান এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান। তাঁর নেতৃত্বে তখন জয়নাল হাজারীর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এটা নিয়ে তখনকার ফেনীর জেলা প্রশাসক ২০২৪ সালে "ফেনীতে ৩২১ দিন; জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা" নামে একটি বইও লিখেছেন। বিচারপতি লতিফুর রহমান উল্লেখ করেন, বিএনপি যেখানে বারবার অস্ত্র উদ্ধার আর সন্ত্রাস নিরসনের জন্যে আরও অভিযান চালানোর কথা বলছে সেখানে আওয়ামী শুধু প্রশাসনের রদবদল করার বিরুদ্ধে কথা বলছে যা খুবই অযৌক্তিক। শেষপর্যন্ত ২০০১ এর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি জয়লাভ করে আর এই সুষ্ঠু নির্বাচন করার পেছনে প্রশাসনের বদলি করাটা অবশ্যই সবচেয়ে বেশি ভুমিকা রেখেছ।
লতিফুর রহমান ছিলেন মনেপ্রাণে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর কমিটিতে হিন্দু এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকে উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দেন। যে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, তাদেরকেও তিনি কোনোভাবে উপেক্ষা করতে চান নি। কমিটিতে নিয়োগ দেন একজন নারী উপদেষ্টা এবং নির্বাচনে এমন অনেক এলাকা চিহ্নিত করেন যেখানে নারীরা ভোট দিতো অনাগ্রহী। তাদেরকে ভোট দেওয়ায় আগ্রহী করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই তিনি চেয়েছিলেন বিচারবিভাগকে নির্বাহীবিভাগ থেকে আলাদা করতে। সবকিছু প্রায় সম্পন্ন ছিলো, শুধু রাষ্ট্রপতির সম্মতি বাাকি। তবে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির অনুরোধের কারণে এই কাজটা রাজনৈতিক দলের হাতেই ছেড়ে দেন।
এখনপর্যন্ত বিচারপতিদের লেখা বই পড়ে মনে হয়েছে সবার লেখার ধরণ একটু কঠিন। কিন্তু এই বইটা খুবই সহজ ও সাবলীল ভাষায় লেখা হয়েছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে পরিপূর্ণ একটা বই। ২০০১ এর নির্বাচন সম্পর্কে জানতে আগ্রাহী কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমন্ধে জানতে চান এমন যেকোনো পাঠকের অবশ্যই এটা পড়া উচিত!