দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
"Judge a man by his questions rather than by his answers. '' - Voltaire
মনীষীর কাজ প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে তোয়াজ করা না। ঘুণে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে তার চিন্তা ও লেখার মাধ্যমে সজোরে আঘাত করাই সম্ভবত বুদ্ধিজীবীর পহেলা দায়িত্ব। লোকে যা শুনলে আদর অনুভব করবে ; কর্ণকুহরে ডাকাতিয়া বাঁশির মতো শোনাবে তা শোনানোর জন্য হাটুরে রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মগুরুর অভাব নেই। অত্যন্ত অপ্রিয় অথচ পরম সত্যকে নগ্নভাবে ; কোনো ধরনের চিনি ও মিঠাইয়ের প্রলোপ না মিশিয়ে জনতার সামনে হাজির করাই বুদ্ধিজীবীর সর্বপ্রধান দায়। ফরাসিদেশের দার্শনিক ভলতেয়ার মনীষীর এই অগ্নিপরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়ে পাস করেছেন। মানবেতিহাসে তার মতো সত্যের,জ্ঞানের ও মুক্তবুদ্ধির পূজারি কতজন তা হাতে গুণে বলা দেওয়া যায়। এই মহত্তম মানুষটিকে নিয়ে মাত্র সত্তর পাতায় লিখেছেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। বইটির প্রকাশক কলকাতার প্যাপিরাস।
দার্শনিকমাত্রই আলাভোলা হবে - এমন ছাঁচীকৃত চিন্তা জনমনে অবিরল নয়। সেই ছবির সঙ্গে ভলতেয়ারকে মেলালে ভুল হবে বিলকুল। তিনি ছোটো থেকেই চটপটে। শান্ত স্বভাবের নন। বরং চঞ্চল। তাই ছেলেকে নিয়ে বিশেষ আশাবাদী তার পিতা ছিলেন না। প্যারিতে পাঠিয়ে দিলেন তরুণ ভলতেয়ারকে। যদি কিছু করে খেতে পারে - সেই চিন্তা থেকেই তাকে প্যারিতে পাঠানো।
তরুণ ভলতেয়ার প্যারি নগরীর রূপ ও রস আস্বাদন করছিলেন পরমানন্দে। এমন সময় রাজা চতুর্দশ লুই মরে গেল। রাজপুত্র নাবালক। তার হয়ে ফ্রান্সের ভার বইছেন রাজার প্রধানমন্ত তথা রিজেন্ট। ফ্রান্সে তখন রাজকোষাগারে অর্থসংকট। তাই খরচ কমানোর জন্য রাজকীয় আস্তাবলের অর্ধেক ঘোড়া বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল রিজেন্ট। এই সিদ্ধান্তকে ব্যঙ্গ করে কবিতায় তরুণ ভলতেয়ার লিখলেন,
আস্তাবলের ঘোড়ার বিদায় করার বদলে রাজসভার অর্ধেক গাধাকে বিদায় করাই ভালো হতো না কী?
রিজেন্ট মহাশয় খুশি হবেন না, তা বলাই বাহুল্য। তাই জীবনে পহেলাবারের মতো বাস্তিলদর্শন হলো তরুণ ফ্রাঁসোয়া মারি আরুয়ের, যিনি তামাম দুনিয়াময় ভলতেয়ার নামে পরিচিত।
বাস্তিলের সময়টুকু মন্দ কাটেনি ভলতেয়ারের! তিনি কারাগারে বসেই জবরদস্ত একখান কাব্যগ্রন্থ লিখে ফেলেন। ইতোমধ্যে রিজেন্টের রাগ পড়েছে। কিছু খাইখরচসহ তাকে মুক্তি দিয়েছেন ভলতেয়ারকে।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এক নতুন নিজেকে আবিষ্কার করলেন ভলতেয়ার। ফরাসিদেশের সর্বত্র তিনি বিখ্যাত হয়ে গেছেন। আজকের যুগে যাকে বলে, সেলেব্রিটি। যেখানেই যান লোকে ভিড় করে। উচুমহলের পার্টিতে তার উপস্থিতি কৌলিন্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
ভলতেয়ার কলম থামাননি। আর, তার কলমের সুতীক্ষ্ম শব্দের চোট সইবার ভেতরে ভেতরে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাওয়া রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদীদের ছিল না। তাই ঠুনকো অজুহাতে বাস্তিলে যাওয়ার উপক্রম হয় ভলতেয়ারের। এবার তিনি বাধ্য হয়ে স্বদেশ ত্যাগ করেন। আশ্রয় নেন বিলাতে। ততদিনে ব্রিটেনে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। মার্কেন্টাইল যুগে তারা প্রবেশ করেছে। তাই ফরাসিদেশের মতো আবদ্ধ নয় ইংরেজদের সমাজ। তর্কসাপেক্ষে বলা যায়, ভলতেয়ার আপন সত্তা ও চিন্তাজগতকে নবরূপে খুঁজে পেয়েছিলেন ব্রিটেনে। তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিলেন বিজ্ঞানী নিউটন। কারণ সত্যকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন নিউটন। যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতার চাইতে মহত্তম আর কিছুই হতে পারে না - এমন বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়েছিল ভলতেয়ারের। যা আজীবনের জন্য বদলে দিয়েছিল তাকে।
আগে থেকেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে অপছন্দ করতেন ভলতেয়ার। ব্রিটেনের আবহাওয়ার প্রভাবে তিনি এবার জেঁকে বসা ধর্মতন্ত্র ও রাজতন্ত্রকে ঘেন্না করতে শুরু করেন। খোলামেলা বলতে থাকেন ধর্মগুরুদের অন্তঃসারশূন্যতা নিয়ে।
একবার পর্তুগালের লিসবনে বড়োদিনে বড়ো একটি ভূমিকম্প হয়। প্রায় তিন শ বছর আগেই সেই ভূমিকম্পে ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। চার্চের পুরোহিতের দল এই মৃত্যুর প্রতি সমবেদনা কম, মানুষের পাপের কারণে স্রষ্টা ভূমিকম্প পাঠিয়েছেন - এই তত্ত্ব বেশি প্রচার করতে থাকে। তাতেই রেগে কাঁই হয়ে গেলেন ভলতেয়ার। পুরোহিতদের উদ্দেশ্য করে কবিতায় লিখলেন,
' হয় বলো তোমাদের ঐ মঙ্গলময়টির শক্তি আছে। কিন্তু সদিচ্ছে নেই, আর না হয়তো বলো, তার সদিচ্ছে আছে, শক্তি নেই। হয় তিনি ভালো করতে চান কিন্তু পারেন না, না হয় তো তিনি ভালো করতে পারেন তবু করতে চান না। '
রাজতন্ত্রের পর তিনি পুরোহিতদের দুশমন করে তুললেন। এরপর তার আমৃত্যু স্বদেশে ফেরা হয়নি। তবে তাকে কেন্দ্র করে দিদরোসহ বেশ কিছু উদীয়মান সূর্য আবর্তিত হচ্ছিল।
ভলতেয়ারের সমকালীন রুশো। তার সঙ্গে রুশোর চিন্তার মৌলিক তফাৎ ছিল। অথচ দুজনেই ছিলেন রাজতন্ত্রের শত্রু। মানবতার পক্ষের। রুশোর চিন্তার সমালোচনা করতেই ভলতেয়ার তার অন্যতম প্রধান কীর্তি 'কাঁদিদ' রচনা করেন।
স্বদেশের জালিম রাজা ও তার মোসাহেবতন্ত্র ভলতেয়ারকে নেবে না। প্রবেশ করতে দেবে না ফরাসিদেশের চৌহদ্দিতে। ভলতেয়ার তাই ফ্রান্সের তুঁলো শহরের পাশেই সুইজারল্যান্ডে এক খণ্ড জমি খরিদ করে বসবাস করছিলেন। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সুখ তার মতো দ্রোহীর কিসমতে নেই। ফরাসিদেশে পোপপন্থি রোমান ক্যাথলিকদের জঙ্গলরাজ৷ তারা প্রটেস্ট্যান্টদের পশুর চাইতে বেহেতর মনে করে না। এমনকি পশুর কিছু কিছু অধিকার থাকতে পারে। কিন্তু পোপের অনুসারীদের রাজ্য ফ্রান্সে প্রটেস্ট্যান্টদের কোনো জায়গা হবে না। তারা ডাক্তার হতে পারবে না, ইঞ্জিনিয়ার হতে মানা, সরকারি চাকরির কথা না বলি ; এমনকি ভলতেয়ারের প্রতিবেশী শহর তুঁলোতে প্রটেস্ট্যান্টদের গৃহকর্মীর কাজ পাওয়ার সুযোগটুকু রহিত। কেউ এই নিয়ম ভাঙলে মোটা টাকা জরিমানা আদায় করত পুরোহিতদের দল। এসব শুনে ভলতেয়ার ক্ষেপে গেলেন৷ এবার কোনো কাব্য নয় ; নয় কোনো ব্যঙ্গরচনা। বরং সরাসরি ছোটো ছোটো পুস্তিকায় নিজের প্রতিবাদকে ছড়িয়ে দিলে শুরু করেন প্রবীণ ভলতেয়ার। অবিরাম লিখেছেন তিনি৷ ছোটো ছোটো পুস্তিকায় ধর্মগুরুদের অধর্মের বিরুদ্ধে এবং রাজতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিতে অনবরত লিখেছেন বয়োবৃদ্ধ ভলতেয়ার। সেই সময়ে তার লেখা কোনো কোনো পুস্তিকা তিন লাখ কপির বেশি বিক্রি হওয়ার রেকর্ডও আছে। জীবনের শেষদিনগুলোতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ভলতেয়ার। যুক্তিতে শাণ দিতে ক্রমাগত আঘাত করেছেন অজ্ঞানতাকে, ধর্মতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একনায়কতন্ত্রের আদিরূপ রাজপ্রথাকে।
ফরাসি বিপ্লবের আঘাতে বাস্তিলের পতন মহামতি ভলতেয়ার দেখেননি। বিপ্লবের এগারো বছর আগে তিনি মারা যান। তবুও বিপ্লবের মনস্তাত্ত্বিক মাস্টারমাইন্ড তিনিই।
ভলতেয়ারের জীবনীকার দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে কোনো কোনো পাঠক না-ও চিনতে পারেন। তিনি একনিষ্ঠভাবে বামপন্থায় বিশ্বাসী। যুক্তিকে তিনি সব সময় বিশ্বাসের ওপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। 'যে গল্পের শেষ নেই'সহ তার বইগুলোতে তাই সরাসরি তার বামপন্থি চিন্তার ছাপ চোখে পড়ে। ইদানীং তার বইগুলো রিপ্রিন্ট হচ্ছে। যা সুখের কথা।
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এই বইটার তথ্যউপাত্তের জন্য উইল ডুরান্টের ঋণস্বীকার করেছেন। যারা ডুরান্টের লেখা পড়েছেন, তারা জানেন অত্যন্ত সুখপাঠ্য গদ্য লেখেন ডুরান্ট। তার 'দর্শনের ইতিহাস' ধ্রুপদী গ্রন্থ। তবুও বলব, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মাত্র সত্তর পাতায় ভলতেয়ারের মতো হিমালয়সম ব্যক্তির জীবন ও বিশেষত, চিন্তাকে নিয়ে কাজ করেছেন৷ আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। হ্যাঁ, বইটা তিনি বুড়োদের জন্য লেখেননি। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ছোটোদের জন্য রচনা করেছেন 'ভোলতেয়ার'। তাতে তিনি পুরোটাই সফল। এই বয়সে বইটা পড়েও দারুণ আগ্রহী হয়ে উঠেছি তিন শ বছর আগের মানুষ অথচ চিরকাল প্রাসঙ্গিক ভলতেয়ারকে আরও খানিকটা জানার জন্য ; আরও কিছুটা তার চিন্তাকে বোঝার জন্য।
ভলটেয়ারের নাম জীবনে বহুবার শুনেছি তবে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নি। জীবনী ভিত্তিক অত্যন্ত সহজপাঠ্য এই বই অল্পতেই ভলটেয়ারের সম্পূর্ণ জীবন-কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। একাধারে কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার হিসেবে পরিচিত ভলটেয়ারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন দার্শনিক। বইটিতে ভলটেয়ারের দর্শন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি তবে ফরাসি বিপ্লবের ১১ বছর আগে মারা গেলেও এই বিপ্লবের পেছনে তার অবদানের কথা যথাযথভাবে উল্লিখিত হয়েছে। মূলত হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিমায় সার্কাজম করতেই পছন্দ করতেন তিনি। তবে বৃদ্ধ বয়সে রোমান ক্যাথলিকদের অত্যাচারের মুখে তিনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। সে সময়ে তাকে তার পুরনো ছন্দে লিখতে বলা হলে তিনি বলেন, "না, ঠাট্টাবিদ্রূপের সময় আর নেই। রসিকতা এক, আর খুনের আয়োজন এক। দেশে খুনের আয়োজন চলেছে। তাই আর রসিকতার সময় নেই।"