ঠোঁটের কোণে আকাঙক্ষা মাখা হাসিটা মৃত্যুর পরও যেন মুখময় ছড়িয়ে থাকে। ভালোবাসা কাঁটাতার ভেঙে এগিয়ে যায় অনন্তের দিকে। শরীর আর মনের ভগ্নাংশে ভাগ হয়ে থাকা জীবনটাকে চিনতে হলে শুধু দিন- প্রতিদিনের সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তকে মাপলেই চলে না। কল্পনাতেও থেকে যায় আধখানা জীবন, বড়ো জীবন্ত এক বেঁচে থাকার কিসসা। শরীর জুড়ে পাপপুণ্যের বাসা। মনের ক্ষুধা মিটলেও, তৃষ্ণা মেটে কি এ শরীরের? মনের কথা বারে বারে এসে ঠেকে যায় শরীরের চৌকাঠে। সন্দেহ এসে বাসা বাঁধে। ভুলের সুতোয় ভুল এসে গাঁটছড়া বাঁধে। তারপর একদিন বিচ্ছেদ এসে সব অবিশ্বাসকে নিয়ে মৃত্যুর ওপারে চলে যায়। চাঁদের আলোয় তখন নতুন অভিসার, অপেক্ষা, গ্লানিহীন আত্মনিবেদনের আকুতি। হৃদয়ের গভীরে, কামনায়, কল্পনায় প্রতীক্ষায় মাখামাখি হয়ে থাকা দয়িতার সঙ্গে তখন নিত্যসহবাস। এমনই কিছু বাস্তব আর বাস্তব অতিরিক্ত অনুভবের ঘরে সাঁকো বেছানো কিছু আখ্যান এবার একত্রিত হল এই দুই মলাটে। আসলে জীবনের গল্পটা মৃত্যু পেরিয়েও বয়ে চলল, দিন পেরিয়ে দিনান্তের দিকে, আক্ষেপ উজিয়ে অপেক্ষার দিকে। জানিয়ে গেল ভালোবাসা কেমনভাবে অন্তহীন এক যাত্রাপথ রচনা করে...।
ইমদাদুল হক মিলন-এর জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫, ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। পৈতৃক গ্রাম— লৌহজং থানার ‘পয়শা’। ঢাকার গেন্ডারিয়া হাইস্কুল থেকে এস এস সি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্সসহ অর্থনীতিতে স্নাতক।প্রথম রচনা, ছোটদের গল্প ‘বন্ধু’, ১৯৭৩ সালে। প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রথম গ্রন্থ ভালবাসার গল্প (১৯৭৭) থেকেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত, পাঠকপ্রিয়। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এ ছাড়া পেয়েছেন বিশ্ব জ্যোতিষ সমিতি পুরস্কার(১৯৮৬), ইকো সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির সাহিত্য পুরস্কার(১৯৯২), নাট্যসভা পুরস্কার(১৯৯৩), পূরবী পদক(১৯৯৩), বিজয় পদক(১৯৯৪), মনু থিয়েটার পদক(১৯৯৫), যায় যায় দিন পত্রিকা পুরস্কার (১৯৯৫)। ২০১১ সালে ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আই আই পি এম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার।
এতটাই সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় গল্পগুলো লিখেছেন ইমদাদুল হক আমি ( আমি মানে আমার ডাকনাম মিলন) যা প্রত্যেকটি পাঠককে আটকে রাখবেন বইয়ের একদম শেষ পর্যন্ত। গল্পগুলোর কোথাও রহস্য, কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বর্ননাভঙ্গি আমাকে প্রতিমুহূর্ত অভিভূত করেছে। বইটিতে ভিন্ন স্বাদের ছয়টি গল্প স্থান পেয়েছে। ‘সোনাই বিবির চর’, ‘নেংটি ইঁদুরের জীবন’, ‘শুভদের খেলার মাঠ’, ‘গাছবন্ধু’, ‘সাহেবের ছেলে’ ও ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’।
একদম প্রথম গল্প ‘সোনাই বিবির চর’ অনেকটা লোককাহিনীর আশ্রয়ে লেখা। একই গল্পে পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে আরো দুজন মানুষের গল্প। যারা এই গল্পের কথক ও শ্রোতা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন এবং সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক রবি। রবির মুখেই সোনাই বিবির রহস্যময় কিচ্ছা শুনছিল মামুন, আর সমান্তরালে চলছিল নিজেদের গল্প। এই গল্পের মূল চরিত্র সোনাই বিবি অদ্ভুতভাবে গায়েব হয়ে যায়। দুদিন পর তার ছেলে রতন তাকে উদ্ধার করে, তাও রহস্যজনকভাবে। মায়ের মৃত্যুতে প্রচণ্ডভাবে মুষড়ে পড়া রতনও মারা যায় এরপর। গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু কীভাবে চরের নাম সোনাই বিবির চর হলো সে গল্প যে তখনো বাকি। অদ্ভুত মায়া ও বিষণ্নতায় ভরা এই গল্প আমাদের মনে দাগ কেটে যায় সহজেই।
‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’ বইয়ের শুধু নামগল্পই না শেষ গল্পও বটে। এটিও একজনের (ইব্রাহীম) বয়ানে সবাইকে শোনান ইমদাদুল হক আমি। গুনাই ইবরাহিমের স্ত্রী। শ্যামলা বর্ণের গুনাইকে অসম্ভব ভালোবাসত ইবরাহিম। তবে কামাতুর গুনাইকে ফিজিক্যালি খুশি করতে পারত না সে। যে কারণে বহুগামী হয়ে পড়ে গুনাই।কিন্তু একসময় গুনাইয়ের শরীর ভেঙে পড়ে। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে সে। সে উপলব্ধি করতে পারে ইবরাহিমের সাথে সে অন্যায় করেছে। মারা যাওয়ার আগে সে সবসময় ক্ষমা চাইত ইবরাহিমের কাছে। কিন্তু ইবরাহিম তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। এমনকি গুনাইয়ের মৃত্যুর পর নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটে ইবরাহিমের জীবনে। একসময় প্রতি পূর্ণিমার রাতে গুনাই আসত ক্ষমা চাইতে। কিন্তু গুনাইকে সে কখনো ক্ষমা করতে পারেনি। তবে অদ্ভুতভাবে সে যেদিন মনে মনে গুনাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে চরে যায়, সেদিনের পর থেকে গুনাই আর কখনো তার সামনে আসেনি। এভাবেই শেষ হয় ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’।এই গল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ গুনাইয়ের প্রতি ইবরাহিমের প্রেম। এই গল্প পড়তে পড়তে গুনাইয়ের বোধোদয় এবং ইবরাহিমের আশ্চর্যজনক নির্লিপ্ততা আমদেরকেও আক্রান্ত করে। সেই প্রেমের বন্ধন আমরাও অনুভব করতে পারি।
মাঝের চারটি গল্পও কিন্তু ফেলনা নয়। বেশ চমকপ্রদ। বিশেষ করে 'নেংটি ইঁদুরের জীবন '। বেশ থ্রিলার থ্রিলার ভাব। যাইহোক এই বইটা অনেকগুলো ভালো লাগার মধ্যে একটা।
ছোটগল্পের বই আমার বেশ ভালো লাগে। গল্পগুচ্ছ বহুবার পড়া, উপন্যাস বেশি পড়া হলেও ছোট ছোট গল্পের যত সমগ্র আছে, সেগুলোও বেশ পছন্দের আমার।
আমাদের চারপাশে প্রতিদিন অনেক ঘটনায় ঘটে। কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা হয়, কিছুর হয় না। সমাজের কালো দিক যেমন আছে, আছে আশার আলো। সেরকম ছয়টা আলাদা ধাঁচের গল্প নিয়ে এই বইটা। সমসাময়িক অনেক বিষয় রয়েছে, যেমন মাঠ কেড়ে নিয়ে কমপ্লেক্স তৈরি, আছে অসহায় এক বা একাধিক নারীর সাথে ঘটা ঘটনা, সমাজের লোভাতুর দৃষ্টির কাছে হার মানা এক মেয়ের গল্প, আছে বলাই এর মত এক নারীর গল্প, আছে গুনাই বিবির কিচ্ছা। সমাজের- সংসারের এই সব সমসাময়িক কিচ্ছা নিয়ে এই বইটা।
প্রতিটা ছোটগল্পের কী হল না হল নিয়ে অতিরিক্ত বড় করে লাভ নেই, দশ বছর আগের এই বইটা নিয়ে। অনেক কিছুই এই পঁচিশ সালে এসে নাক সিটকানোর মত মনে হবে, সেগুলো ধরা উচিৎ নয়।
প্রতিটা গল্পই ভালো লেগেছে, লেখকের লেখা সেভাবে পড়া হয়নি, তবে তার লেখা যে সাবলীল, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। সহজ বাক্য, সাবলীল ভাষায় লেখা গল্পগুলো পঁচিশ সালে এসেও প্রাসঙ্গিক। আজো মা হারা সন্তান মায়ের ডাক শোনে, মাঠ বাঁচাতে অনশনে নামে তরুণ প্রাণ, পরিবারের কারো লালসার শিকার হয় নারী।
এই তো সমাজ, আজও যা আছে, কালও তেমনই থাকবে, খালি বদলে যাবে এলাকা, অঞ্চল। কিন্তু সমাজের অলিখিত নিয়ম আর বদলে যাবে না। চোখে আঙ্গুল দিয়ে যতই সমাজের কালো দেখিয়ে দিক কেউ, আলোর দেখা কেউ পাবে না।
পড়তে গিয়ে বুঝলাম, পড়ায় অনেক স্লো হয়ে গেছি, কেমন যেন গতি হারিয়ে ফেলেছি, প্রায় দু’শ পেইজের এই বই পড়তে অনেক সময় লাগল, লাগছে। পড়া অনেক দিন ধরেই হচ্ছে না ভালো করে, শুরু করা উচিৎ তো, উচিৎ না?