"বিক্রি:ক্যান্সারবৃদ্ধ ৬৫।আয়ু পাঁচ সপ্তাহ। দাম ৩ কোটি। ফোন:৮৯১১...."
পত্রিকার পাতায় এমন বিজ্ঞাপন খুবই সাধারণ যেই সমাজে, সেই সমাজব্যবস্থার গল্পই হলো "প্রিসিলা"।
সোজা কথায়, মানুষ কেনাবেচার গল্প।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনটি জানেন? বস্তাপচা পারিবারিক একটা ইমোশোনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।হ্যাঁ, যেই মূল গল্পটা সেখানে একই ধরণের ডায়লগ,আর কেমন একটা পরিচিত নাটক সিনেমার কাহিনি এসেই মূল ঝামেলাটা করেছে।আবার এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্ত জায়গাও এটি।কেন?
আসেন, আশেপাশে তাকাই।সমাজের তিনটি শ্রেণীর মধ্যে, সবচেয়ে অবহেলিত গোষ্ঠী, নিম্নবিত্ত যারা, তাদের কথা আগে ভাবি। কারণ এদের আসলে কোনো সুযোগ সুবিধার জন্য লড়াই করার শক্তিই নেই। এদেরকে আইন প্রণয়নের সময়ও ওপরমহলের লোকজন, পরীক্ষায় খাতায় ভুল করে লিখে আশা একটা এক্সট্রা উত্তরের মতো আগেই কেটে বাদ দিয়ে ফেলেন।
এবার ভাবেন উপরমহল বা এলিট শ্রেনীর কথা। বেশিদিন না, এই একবছর হলো, আমাদের দেশে একটা বিশাল আন্দোলন কোটাপ্রথা নিয়ে গেলো। মূল কারণ তাদের পাওয়া বিশেষ সুবিধা। যার ফলাফলে আমরা দেখেছি মিছিলে গুলিবর্ষণ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে গুলিবর্ষণ ।তারপর সরকার প্রধানের থেকে একটি কালো পোষাক পরিহিত শোকবার্তা প্রদান এবং হাত ঝাড়া দিয়ে সেই রক্তের দাগ মুছে ফেলার প্রচেষ্টা।আর সেই ঘটনার পরও, চামচ শ্রেণীর চামচ কেটে কেটে খাওয়া এলিট খাদ্যালাপে বার বার বলা, সবই দুষ্কৃতিকারীদের উস্কানির ফলাফল। এই শ্রেনির মানুষদের দেশের আইন কানুন, মানুষ, তাদের নিয়ে মাথা ব্যাথা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তারা বরং তাদের মতো সুখে থাকুক।অন্যদিকে যাই আমরা।
ভাবুন সেই শ্রেণির কথা, বরাবরের মতোই সামাজিক লড়াইয়ের আগে পিছে না থাকলেও যাদের চলে তেমন শ্রেণির মানুষ, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত মানুষ৷ তারপরও এরা সেই সমাজের সবচেয়ে জটিল থেকে কঠিন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায়, দিনশেষে রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে মরে।যাদেরকে হাতের মুঠোয় রাখতেই যত নিয়ম কানুন এবং যাদের জীবনই হয়ে ওঠে একেকটি গল্প উপন্যাসের মূল ভিত্তি।
এবার আপনি "প্রিসিলা" পড়ুন এবং তিন শ্রেণির মানুষদের মধ্যে,"এইচ এস সি সার্টিফিকেট না থাকা শ্রেনী","টাকা পয়সার অভাবে জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে চাহিদা সেটি না পূরণ করতে পারা শ্রেনী" এবং "বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনীর" কথা ভাবুন।
এবারে পলিটিকাল স্যাটায়ার হিসেবে ডার্ক একটি উপন্যাস হিসেবেই এই লেখাটি আপনার কাছে ধরা দেবে।
আমি এই উপন্যাসটিকে পলিটিকাল স্যাটায়ার হিসেবে অনেক উঁচুতে রেখেই আপনাদের সাজেস্ট করছি। মূল ম্যাসেজটা খুবই প্রাসঙ্গিক। যা আপনাকে দেয়া হয় ওইযে, বস্তাপচা পারিবারিক কাহিনির কথা যে শুরুতেই বললাম? তার মধ্য দিয়ে। যদিও বলছে ২০৫০ এর গল্প, সেই কল্পগল্পই কখন যেনো আমাদের সামনে থেকে হাত ফসকে ত
অতীত হয়ে গিয়েছে। বলা যায় না, আবার ভবিষ্যতেও এমন গল্প আবারো ঘুরেফিরে আমাদের সামনে আসতেও পারে।
ডিস্টোপিয়ান সোসাইটি, সাই-ফাই এসব জ্ঞানের আলাপের প্রয়োজন নাই আমার।ওসব বলাই আছে উপন্যাসের ফ্ল্যাপে।ডিস্টোপিয়ান সোসাইটি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমন কাজ আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ২০০১ সালে বসে এই ঘরানায় কলম চালানোর পর, তা কতদূর গিয়েছে সেটা আমার মাথা ব্যাথার মূল কারণ। একঘেয়ে প্রেম কাহিনি,থ্রিলার,পারিবারিক উপন্যাসের বাইরে যখন এমন তরতাজা নতুন একটি জায়গায় কাজ হয়েছিলো, সেই কাজকে সাধুবাদ না জানালেই নয়।
এই উপন্যাসের একটি চমকপ্রদ দিক "প্যারাডাইজ লস্টের" সেই বিখ্যাত গল্প। এক জায়গায় লেখক হালকাভাবে তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।প্যারাডাইজে সন্তান জন্মদানের কোনো ক্ষমতা মানুষের ছিলো না, নিষিদ্ধ ফল আমাদের এই পৃথিবীর জীবনের জন্য দায়ী। প্রিসিলা আর রাসেলের সাক্ষাতকে তিনি ওই ঘটনার সাথে যখন তুলনা করেন, তখন সেই প্রাচীন সমস্যা অর্থাৎ সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা;সেটিকেই তিনি টেনে আনেন। যেই কনসেপ্টটা আমার মারাত্মক লেগেছে। অন্য কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন না দেখিয়ে তিনি এই বিষয়েই কেনো দেখালেন,সেই প্রশ্নের উত্তরও এই জায়গায় দিয়ে দিলেন।
একটি আইন, একটি পরিবারের গল্পের মাধম্যে মশিউল আলম তুলে ধরলেন গোটা একটি সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর বউ শ্বাশুড়ির ঝামেলা(জ্বি বাংলা টাইপ),স্বামী স্ত্রীর মাঝে স্বর্গীয় ভালোবাসা থাকার পরেও কেনো এতো তিক্ততা সেই বিশেষ কারণটি(টাকা না থাকলে ভালোবাসা জানলা দিয়া পালায়) আর সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনের বিরুদ্ধাচারণ না করে সেই আইনের আনুগত্য করার অলিখিত নিয়মটি।
বইটি আমার কাছে তরতাজা কনসেপ্টের লেগেছে, বাহুল্য বলতে গেলে রাখেনই নি তিনি।৭০ পৃষ্টায় মূল ম্যাসেজ দিয়ে তিনি পাঠকসমাজকে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছেন। এজন্যই উপন্যাসিকাটি আমি সবাইকে সাজেস্ট করছি, খুব বেশি সময় এক জায়গায় ব্যয় না করেই দারুণ ম্যাসেজ পাবেন সবাই।
স্পয়লার এলার্ট:
কিনে ফেলা মানুষটি মরা ছাড়া তো লাভ নাই আল্টিমেটলি। তো, টাকা দিয়ে নিজের জীবন বিক্রি করে ওই মানুষ কি করে? তার লাভ কোথায়?🐸