Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
বিখ্যাতদের একটা নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি আমাদের মনে গাঁথা থাকে। সেই ভাবমূর্তিতেই তাদের আমরা দেখতে ভালোবাসি। অথচ তাদের কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন আছে অন্য সবার মতো। কবি আলোক সরকার একবার জীবনানন্দের বাসায় যেয়ে দেখেন কবি শুধু লুঙ্গি পরে দুই হাতে দুই বালতি নিয়ে কলতলায় যাচ্ছেন। এটা দেখে আলোক সরকার হতভম্ব হয়ে যান। ওই যে পূর্বনির্মিত ভাবমূর্তি! মশিউল আলমের উপাখ্যান "বাবা"র কেন্দ্রে আছেন সরদার ফজলুল করিম। এই প্রথিতযশা মহান ব্যক্তির প্রচলিত ভাবমূর্তি ভেঙে লেখক তার পিতৃসত্তার দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি দেশবরেণ্য দার্শনিক, বিপ্লবী ও প্রখর যুক্তিবাদী মানুষ নন, বরং তাঁর মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান আলো'র প্রতি অপত্য স্নেহে অন্ধ এক পিতা।মাত্র ৩৬ ঘণ্টার গল্পে লেখক এক হতবিহবলকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন যার পুরোটাই সম্ভবত সত্য। মশিউল আলমের গদ্য বরাবরের মতোই সরল ও নিস্পৃহ হওয়ায় তা পাঠকের মনে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করে। সত্য এতো নির্মম হয় মাঝেমাঝে!
সরদার ফজলুল করিম সম্বন্ধে অল্পবিস্তর জানা থাকলেও মশিউল আলমের এই উপন্যাসিকা যে তাঁকে নিয়ে লেখা তা এতদিন জানতাম না। সারাজীবনে তিনি জেল খেটেছেন ১১ বছর, জেলখানায় অংশ নিয়েছেন ৫৮ দিনের অনশন ধর্মঘটে, শুধু লবণগোলা পানি খেয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন টানা ১৫ দিন, ভুগেছেন দুঃসহ হাঁপানিতে, খোসপাঁচড়ায়... এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে। আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন বিপ্লবের। বন্ধুর সংগ্রামী পথে হেঁটে হেঁটে জীবন সায়াহ্নে পৌঁছেও অবসান ঘটেনি তাঁর সংগ্রামের। তিন সন্তানের একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। সেই শিজোফ্রেনিক পুত্রের সঙ্গে ৩৬ ঘন্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী এটি। ৮০ পৃষ্ঠার এই নভেলাতে ফুটে উঠেছে আজীবন লড়াকু সেই বিপ্লবীর অন্য এক রূপ- তিনি বাবা।
[বইটির প্রথম সংস্করণ প্রিন্ট আউট হওয়ার আগেই সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম। শীঘ্রই নতুন প্রচ্ছদে বইটির পুনর্মুদ্রণ আনতে চলেছে মাওলা ব্রাদার্স।]
মশিউল আলমের লেখার সাথে আমার পরিচয় ঘটে এই উপন্যাসটির মাধ্যমে, প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায়। লেখকের বর্ণনার ধরন বেশ আকর্ষণীয়। পাঠককে ধরে রাখে। এই উপন্যাস পড়ার আগে আমি সরদার ফজলুল করিমকে জানতাম না, অবশ্য এটি পড়েও জানিনি; উপন্যাস হিসেবেই পড়ে গেছি। আরো কয়েক বছর পর বুঝতে পারি, উপন্যাসের 'সরদার' আসলে কে। বাবা-কে জীবনীভিত্তিক উপন্যাস হয়তো বলা যায় না, কারণ এটি পড়ে সরদার ফজলুল করিমকে জানা দুষ্কর। এতে কেবল তাঁর প্রৌঢ় বয়সের কিছু জাগতিক সংকট প্রাধান্য পেয়েছে, আর প্রসঙ্গক্রমে শৈশব বা যৌবনের অল্পকিছু বিষয় ছাড়া-ছাড়াভাবে এসেছে। উপন্যাসটি অবশ্য ব্যক্তি সরদারকে নিয়ে নয়, 'পিতা' সরদারকে নিয়ে, যিনি তাঁর সিজোফ্রেনিয়ায় ভোগা, অপ্রকৃতস্থ মধ্যবয়সী পুত্র 'আলো'-র ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
পুনশ্চঃ আলো-র বাড়িতে গিয়ে একটি ঝামেলায় পড়ে (বলে দেয়া উচিত হবে না, পাঠক পড়ে নিন) সরদার এক পরিচিত সাংবাদিককে ফোন দিয়ে ডেকে পাঠান। এই সাংবাদিক কি মশিউল আলম নিজে? সম্ভবত।
একজন কমিউনিস্ট, একজন দার্শনিক, একজন বুদ্ধিজীবীর গল্প। কিংবা একজন বাবার গল্প যে তার এক ছেলের প্রতি একচোখা। ছেলের অন্যায় সব আবদার মেনে নেয়। নিজেকে সে জন্য নামিয়ে নেয় নিজের জায়গা থেকে। এমনিতে আহামরি কিছু না। তবে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় যেমন একটা টান থাকে, মশিউল আলমের এই লেখাটা সেই ধাঁচের। বুদ্ধিজীবীকে তিনি সরদার আকবর আলী/আলী আকবর নাম দিয়েছেন কিন্তু বর্ণনার সবকিছুই প্রমাণ করে ইনি সরদার ফজলুল করিম। তো, সরদার করিমের জীবনের ঘটনা এমন কিনা জানি না। সরদারের লেখা পড়ার লিস্টে আছে বহুদিন, পড়া হয় নাই। এবার মনে হচ্ছে তার জীবন নিয়েও একটু পড়তে হবে।
সরদারের প্রতি আমার ভালোবাসা বহুদিনের। এই গল্পটা অদ্ভুত। এইখানে সরদারের প্রতি বিরক্ত হবার মত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। তবু বিরক্ত হওয়া যায়না। ভালোবাসাটাই বাড়ে৷ দুনিয়ার সব সামাজিক 'সিচুয়েশন' বিচার করার মোড়লপনা আমাদেরকে কেউ দেয় নাই।