ছা-পোষা একটা কেরাণির চাকরি, সস্তায় কেনা চারটে শার্ট, সুতো ওঠা প্যান্ট আর মলিন জুতো পরে জীবন কাটাতে থাকা শওকতকে আলাদাভাবে চোখে পড়ার কোনো কারণ নেই। সিটি কর্পোরেশনের বিশাল ময়লার ডাস্টবিনের পাশে প্রায় অদৃশ্য এক গলির কংকালসার তিনতলা একটা দালানে রানুর সাথে ওর জীবন কোনরকমে পার হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু একদিন ডাক পড়ে গেলো এম.ডি আনিসুজ্জামানের কামরায়। জানালেন, অফিস শেষে গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস আনতে ওকে যেতে হবে কোথাও। কাওকে কিছু বলা যাবে না। গিয়ে পরিচয় হলো এক টেকো, রক্তমাখা, ভূড়িঅলা কসাইয়ের সাথে।
বহু বছর আগে চৌধুরি বাড়ির ছোটো ছেলে এহসান প্রায় তিন মাস পর বাড়িতে ফিরে এসেছিলো। সাথে ছিলো পাঁচ-ছয় বছর বয়সী এক শিশু। সে জানালো, এই ছেলের ঝামেলা আছে। যেই ঝামেলার কথা শুনলে অনেকেরই ঘৃণায় শরীর রি রি করে ওঠে।
এলভিস হতে চাওয়া তরুণ ওয়াসি’র আগামসি লেনের বাড়িতে একদিন ত্রিদিব বমি করে ভাসিয়ে দিলো। পাকস্থলী উগড়ে বেরিয়ে এলো কুচকুচে, লম্বা কালো একগাদা চুল। বাথরুমের মেঝে ভেসে গেলো টাটকা-কালো চুলে। এর উত্তর যার কাছে আছে সে বিশ্বাস করে, মিথ্যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত শোনালে সেটা একসময় সত্য যায়। কিন্তু ৩৫০০ বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা ‘সে’ কি এই সত্য গোপন রাখতে দিবে?
প্রতিদিনকার মতো বাড়ি ফিরছিলেন একদিন আনিসুজ্জামান। গাড়ি থেকে নেমে দেখলেন বহু বছরের পরিচিত গলি, রাস্তা, বাড়ি - সবকিছু পাল্টে গিয়েছে। কোথাও কেউ নেই। কোনো মানুষ নেই। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন এই ভয়, এই জগত কোনোভাবেই পৃথিবীর হতে পারে না। এই আতংকের জন্ম অন্য এক জগতে, অন্য এক ভুবনে।
‘অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকে তুমি’ অন্ধকারের গল্প। আতংক আর অসাড়তার গল্প। কংক্রীটের জঞ্জালের ছায়ায় লুকিয়ে রাখা গল্প। প্রতিদিনের ক্লান্তি-যাপন শেষে আমরা আর পেছনে ফিরে তাকাই না বলে এই আতংক শুধু ছায়াতেই থেকে যায় ...
স্বল্প স্যালারির ছোট একটা পদে কাজ করে শওকত। দু'জনের সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। হঠাৎ পেয়ে যায় সুযোগ অতিরিক্ত আয়ের কিন্তু অদ্ভুত কিছু কাজ করতে হবে! অফিসে একজনের কল আসে। পরিচয় দেয় নিজেকে এলভিস বলে। শওকত চমকে ওঠে। ত্রিদিবের আগমনের সময় হয়ে যায়নি তো?
লাভক্রাফটিয়ান যেখানে থাকবে অন্য জগতের কথা তো আসবেই। এই ❝অন্য জগৎ❞ নিয়ে লেখক যে গল্প বলেছেন এককথায় ❝অদ্ভুত❞! অরিত্রিকার ঘটনার বর্ণনা... নিজের চুল নেড়েচেড়ে দেখছি জীবন্ত না তো! বইয়ের দুটো থিওরি আমার অনেক বেশি ভালো লেগেছে। আর এই ভালো লাগার কারণ আমার মনেও মাঝেমধ্যে এমন চিন্তা উঁকি দেয়। প্রথমটা হলো, পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারণ মানুষ। চারিপাশে ভালোভাবে দেখলেই বুঝা যায়। মানুষ যতই উন্নতি করছে পৃথিবী যেন ততই ধ্বংস হচ্ছে, বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাণী জগৎ। মানুষ ফরেন অবজেক্ট কি? দ্বিতীয়তা হলো, কোনো মিথ্যাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে একসময় সেটাই আমাদের কাছে সত্যি মনে হয়। ফলস মেমোরিও বলা যায়।
ত্রিদিব, এহসানের ব্যাকস্টোরি দারুণ। সুন্দর একটা পরিবার হতে পারতো কিন্তু... ত্রিদিবের সাইকোলজি, ইমোশনাল কনসেপ্টটা ভালো লেগেছে। সিরিয়াস ব্যাপারের মধ্যেও তমিজ আলীর জন্য কিছুটা হিউমার যোগ হয়েছে বলে মজা পেয়েছি। শুরু যেভাবে হয়েছে সে তুলনায় শেষটা জমে নাই। হোস্টের কনসেপ্টে কিছু কনফিউশন আছে। হোস্ট বানানোর সব এলিমেন্ট অন্য জগৎ থেকে আসলে পরে পৃথিবীর মানুষ হোস্ট হয় কী করে? হোস্টকে তো স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। তৃতীয়, পঞ্চম মাত্রার জগতে প্রবেশের জন্য শরীর অদলবদলের যে ব্যাপারটা! এক্সপেরিমেন্টে আরও ডিটেলিং থাকলে সম্ভবত প্রশ্নগুলোর জবাব পাওয়া যেতো। দুজন বাদে যখন বাকিদের নিবে না তাহলে এক্সপেরিমেন্ট, পৃথিবীর মানুষদের রক্ষা ; এসব কেন টেনে জটিল করা হলো? রানু চরিত্রটা আসলেই ঘোল খাইয়ে দিয়েছে। ছিমছাম গোছানো লেখনশৈলীর জন্য পড়ে আরাম পেয়েছি। বইয়ে টুকিটাকি বেশ কিছু বানানে গন্ডগোল আছে।
বইটা তার উপযুক্ত রিডার বেইজ খুঁজে পাবে কিনা, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। কিছু বই হয় সার্বজনীন, সকলেই পড়তে পারে, ভালো লাগা কিংবা না লাগা সেক্ষেত্রে আপেক্ষিক। আর কিছু বই গুটি কয়েক পাঠকেরই হয়তো ভালো লাগবে। এই বইটা দ্বিতীয় ক্যাটেগরিতে পড়বে। জনরা বিশ্লেষণ করতে গেলে - ফ্যান্টাসি, হরর, লাভক্র্যাফটিয়ান- অনেক কিছুর সংমিশ্রণ বলা যেতে পারে। লেখক যা করতে চেয়েছেন তাতে তিনি সফল৷ তার জীবন দর্শনেরও প্রতিফলন কিছুটা পাওয়া যায়। মাঝরাতে একটি গল্প শুনিয়েছিলেন শেষে গিয়ে হতাশ করেছিলো কিছুটা, এক্ষেত্রে সেটা পুষে গেছে৷ তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি৷
প্রমিজিং প্লট, আরোও জমতে পারত। সচরাচর এক্সপেরিমেন্টাল লেখা ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির উদ্রেক ঘটায়। আমার এ ঘরানার লেখার স্টাইল অনেক ভাল লাগে। তাই প্লটের শেষ নিয়ে একটু হতাশা থাকলেও লেখনীর জোরে বেশ ভাল লেগেছে।
সলিড পাঁচ তারা। লেখকের প্রথম উপন্যাস 'মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন'র তুলনায় অনেকটাই এক্সপেরিমেন্টাল একটা লেখা 'অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি'। অসম্ভব ভালো লেগেছে। শেষ করার পর মনে হলো বইটা অনেকগুলো জনরার সংমিশ্রণ, তাই নির্দিষ্ট কোনো জনরায় ফেলতে পারছি না। লেখনী চমৎকার, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কয়েকটা কবিতাও আছে, সেগুলোও দারুণ। যারা একটু ভিন্নধর্মী লেখা ট্রাই করতে চান, তাদের জন্য হাইলি রেকমেন্ডেড।
হুম ছিল। ইউনিক একটা প্লট। লেখকের এর আগে দুটি বই পড়েছি। লেখনশৈলী কেমন হবে তা নিয়ে সন্দেহই ছিল না। লেখার ধরন আসলেই ভালো। ইউনিক একটা পটভূমির সার্টিং মোটামুটি ভালো ছিল কিন্তু শেষটা ছিল তাড়াহুড়োয়।
এমন একটা ইউনিক প্লটে অত্যাধিক তাড়াহুড়ো করাটা ভালো লাগেনি। যেহুতু এটা একটা হরর থ্রিলার, সেহুতু ভৌতিক বর্ণনাগুলো আরেকটু জীবন্ত হওয়াটা আবশ্যক যেন পাঠক রিলেট করতে পারে। কিন্তু এখানে তা ঘটেনি। ক্যারেক্টর ডেভোলপ ঠিকঠাক হলেও প্লটকে সুদীর্ঘ, স্ট্রং ক্যারেক্টরগুলোকে আরও সুন্দর করে প্রেজেন্ট করা ও ভৌতিক বর্ণনায় রিলেট করতে না পারাটাই হতাশ করল।
বুক স্ট্রিটের ব্যানারে প্রকাশিত বইটির মোটামুটি সবকিছু ভালো হলেও বইয়ে ব্যবহৃত ফ্রন্টটা ছিল অদ্ভুত। নরমাল ফ্রন্ট ইউজ করলে সম্ভবত পৃষ্ঠাও কমে আসত।
“যে শহর কখনো ঘুমায় না, সেই শহর একসময় পরিণত হয় দানবে।”
শওকত, কারো সাতপাঁচ না থাকা এক কর্মচারী। একদিন তার বস অচেনা, নির্জন একটা জায়গায় পাঠালেন তাকে। কি উদ্দেশ্য বসের?
আহসান একদিন বাড়িতে উঠিয়ে আনল এক শিশুকে। অদ্ভুত শিশু, কোনো এক দিক দিয়ে অস্বাভাবিক সে। একদিন বড় হল, বুঝতে পারল অনুভূতি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই তার দেহে। একদিন দুঃস্বপ্নে দেখল অরিত্রিকা নামক ভয়ানক এক সত্ত্বাকে? কি এই অরিত্রিকার রহস্য? অরিত্রিকা কিসের জন্য এসেছে পৃথিবীতে?
নসিব পঞ্চম জিহাদীর দ্বিতীয় মৌলিক উপন্যাস অরিত্রিকা ঐখানে যেওনাকো তুমি। বুকস্ট্রিট থেকে প্ৰকাশীত হয়েছিল ১৯ বইমেলায়। লেখকের প্রথম বইটা ছিল সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার জনরার। কিন্তু অরিত্রিকাকে নির্দিষ্ট কোনো জনরায় ফেলতে পারছি না। একসাথে অনেক কিছু উঠে এসেছে এই বইয়ে। শুরুই হয়েছে রহস্য দিয়ে, দ্বিতীয়ত কিছু ঘটনায় বেশ ভালোরকম ক্রিপি একটা ব্যাপার ছিল। লাভক্রাফটিয়ান ব্যাপার স্যাপারের প্রতিফলনও ভালোমতোই ঘটেছে। হতে পারে লেখকের মনের অজান্তেই। তবে হররকে ছাপিয়ে গেছে অন্য কিছু। পড়ার সময় একইসাথে অনুভব করেছি ম্যাজিক রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। বিশেষ করে ম্যাজিক রিয়েলিজমের ছাপ ছিল পুরো কাহিনী জুড়েই। কাহিনীর আরও দুটো মুখ্য জিনিস হল নিহিলিজম আর একসিস্টেনশিয়ালিজম। শুধুমাত্র এই দুটো জিনিসের ওপর ভর করেই এগিয়ে গেছে পুরো কাহিনী। এসব জিনিস বাদে রগরগে হরর খুঁজতে গেলে হতাশ হবেন পাঠক। তবে উইয়ার্ড ফিকশনের ভাবটা ছিল। সুমের, ইন্ডাস সিভিলাইজেশনের মিথ, কল্পিত সারিয়েলিস্ট আর্টিস্ট নোয়াম অ্যারন, এহসান আর আনিসের জবানিতে বলা গল্প আমার সবথেকে ভালো লেগেছে। এবার লেখনশৈলীর ব্যাপারে বলি। একেবারে নতুন যারা লিখছেন তাদের মধ্যে আলাদাভাবে চোখে পড়ে নসিব পঞ্চম জিহাদীর লেখা। মনে হয় না উনার বর্ণনা পড়ছি, মনে হয় গল্পটা শুনছি। একনাগারে আবেদন ধরে রেখে লিখে যেতে পারেন উনি। বর্ন স্টোরিটেলারের মত। সেইসাথে উনার রসবোধ মুগ্ধ করে আমাকে। শেষের দিকে কিছুটা সাইকোলজিক্যাল আর ফ্যান্টাসির ছোঁয়াও আছে।
কয়েক জায়গায় বানান ভুলের আধিক্য লক্ষ করা গেছে। যেমন ‘কেন’ হয়ে গেছে ‘কোনো’ এরকম ধরনের।
লেখকের ভাষ্যমতে বইটা একটা এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক। আমার মতে এক্সপেরিমেন্ট সফল। বিশেষ করে যাদের নিহিলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজম, সাররিয়েলিজম সেইসাথে সাইকোলজিক্যাল হরর পছন্দ তাদের ভালো লাগবে।
প্রাচীন সুমেরীয়রা বিশ্বাস করতো নিবিরু নামের এক গ্রহ থেকে মহাজাগতিক এক প্রানী এসে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছে। এই মহাজাগতিক সত্ত্বার নিজেদের গ্রহের বায়ুমন্ডল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল৷ সেটা ঠিক করার জন্য প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ দরকার। সেই স্বর্ণ উত্তোলন করার জন্যই পৃথিবীতে আগমন তাদের। কিন্তু অচিরেই তারা আবিষ্কার করলো এই কাজ প্রচুর কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ। আর তাই তারা তাদের কাজ করার জন্যই সৃষ্টি করে আমাদেরকে তথা মানব জাতিকে। তবে একেবারেই যে খাটিয়ে মেরেছে তা নয় কিন্তু! যাওয়ার আগে আমাদের আদিপুরুষদের জ্ঞান, বুদ্ধি আর কিছু বিজ্ঞানের কৌশলও শিখিয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে আনুন্নাকি নামের এক বা একাধিক দেবতা ছিলেন, যারা মানুষদের উন্নতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।
মিথোলজি মনে হচ্ছে তাই না? তবে এখানে একটা কিন্তু আছে! উপরোক্ত তথ্য সুমেরীয় একটা প্রাচীন ফলকে পাওয়া গিয়েছিল, এমনই আরো একটা ফলক খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। যেখানে আমাদের সৌরজগতের প্রায় হুবহু মডেল আঁকা ছিল! প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে কোনো ধরণের শক্তিশালী টেলিস্কোপ ছাড়াই অমন নিখুঁত মডেল সুমেরীয়রা কিভাবে এঁকেছিল, তা আজও বিরাট এক রহস্য হয়ে আছে। তাদের সৌরজগতের মডেলের সাথে আমাদের বর্তমান মডেলের তফাৎ হলো; তাদের অঙ্কিত মডেলে চাঁদ, সূর্য সহ সর্বমোট গ্রহের সংখ্যা ১২টি। আমাদের ক্ষেত্রে যা ১১টি। এই বাড়তি একটি গ্রহ নিয়েই যতো সমস্যা। অনেকের ধারণা এটাই সেই নিবিরু গ্রহ তথা প্ল্যানেট এক্স! সুমেরীয়দের বিশ্বাস প্রতি ৩৫০০ বছর পর পর এই গ্রহ পৃথিবীর কাছ দিয়ে এসে ঘুরে যায়!
আমাদের আলোচ্য এই বইটার মূল ভিত্তিটা দাঁড়িয়ে আছে এই মিথোলজির উপরে৷ নসিব পঞ্চমীর স্টোরিটেলিং যে অনবদ্য তা আশা করি যেকোনো পাঠকই মেনে নিবেন। বইয়ে কিছু গোঁজামিল বা ভুলভাল থাকলেও এক স্টোরি টেলিং এর কারনেই উনার বই তরতরিয়ে পড়ে যাওয়া যায়।
তবে এই বইটাতে সেই দূর্দান্ত স্টোরি টেলিং কিছুটা কমই পেয়েছি বলতে হয়। তবুও শুরু থেকেই গল্পটা বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। শওকত নামের অতি সাদাসিধা নিম্ন মানের চাকুরী করা এক যুবকের রহস্যময় এক ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়া থেকে গল্পের উত্তেজনা শুরু হয়৷ কোম্পানির এমডি তাকে দিয়ে যে কাজগুলো করাচ্ছে সেগুলোর উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে শওকতের অতীতের জীবনে।
যে জীবনে রয়েছে ত্রিদিব আর এহসান চৌধুরীর ঘটনা। আর রয়েছে ওয়াসি। নিজেকে বদলে ফেলে একদম ভিন্ন এক মানুষে পরিণত হওয়ার যে কনসেপ্ট লেখক এখানে দেখাতে চেয়েছেন সেটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। কখনো কখনো কোনো মানুষের নিজেকে ভালো রাখার জন্য আগাগোড়া বদলে ফেলতে হয়।
গল্পের অতিপ্রাকৃতিক বা হরর অংশ যখন শুরু হয় তখন বেশ আগ্রহ পাচ্ছিলাম, এমন একটা গল্পে এ ধরণের মোচড় আসার কারনে। তবে আমাকে হতাশ করে দিয়ে গল্পে সেই এলিমেন্ট বেশ কমই ছিল। যতটুকুই ছিল, ততটুকুও লেখকেরই মাঝরাতে বইয়ের মতো জোরদার মনে হয়নি।
সম্ভবত বইটা লেখকের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হিসাবে ধরতে হয়। কারন লেখক একটা গল্পের মাঝে অনেক কিছুকেই টেনে এনেছেন। গল্প বলার ধরণটা অদ্ভুত এবং ভিন্ন রকমের। বাংলা মৌলিকে এমনকিছু এর আগে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার। আর তাই গল্পের শেষটা মন ভরানো না হলেও পাঠ অভিজ্ঞতাটা ভালোই বলতে হবে৷
ব্যক্তিগত রেটিং: ৭.৫/১০ (গল্পের কিছু কিছু ব্যাপার লেখক খোলাসা করেননি, কিছু জায়গায় হয়তোবা অতিরঞ্জিত লাগতে পারে। তবুও দিনশেষে বলবো একদমই ভিন্ন কিছু পড়ার স্বাদ পেতে চাইলে বইটা হাতে তুলে নিতে পারেন পাঠক)
প্রোডাকশন: বুকস্ট্রিটের প্রোডাকশন বরাবরের মতোই ভালো ছিল। প্রচ্ছদটা বেশ ভালো লেগেছে আমার কাছে। তবে বইয়ের ফন্ট সাইজ, লাইন স্পেসিং এবং সেটআপ কিছুটা চেঞ্জ করল সম্ভবত বইয়ের কলেবর আরো ২০-৩০ পাতা কমে আসতো বলে মনে হয়েছে।
বইয়ের প্রিভিউতে বেশ ভালো করেই কাহিনী সংক্ষেপ বর্ণনা করা আছে। ১৩৪ পৃষ্ঠার বইয়ের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় এর বেশি কাহিনী বলা ঠিক না, তাও চেষ্টা করছি স্পয়লার এড়িয়ে যতটুকু সম্ভব বলার।
শওকত হচ্ছে এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। প্রিভিউয়ের বর্ণনা অনুসারে সে খুব সাদাসিধে, সাধারণ, যার দিকে মানুষ একবারের বেশি দুই বার তাকায় না। খুব সাধারণ কোন গল্প মনে হচ্ছে তো? গল্পের ট্যুইস্টটা এখানেই। শওকত আপনার বা আমার মতো সাধারণ কেউ না। সে অন্য রকম। সে কি রকম? এটা বই পড়লে জানতে পারবেন!
এই লেখকের লেখা এই প্রথম বার পড়লাম। বেশ ঝরঝরে, সাবলীল লেখা। সবচেয়ে বড় কথা, কাহিনীর প্রয়োজনে গল্পে মিথ এসেছে, ইতিহাস এসেছে। লেখক সাবলীলভাবেই এগুলো কাহিনীর সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। বইটা পড়ে আমারও মনে হচ্ছে 'ওরা' আছে! এটা অবশ্যই একটা বড় ক্রেডিট।
বইয়ের ধরন হরর / ফ্যান্টাসি টাইপের হলেও আমার কাছে হরর এলিমেন্ট কমই লেগেছে। বরং বইটাকে ফ্যান্টাসি কিংবা পরাবাস্তব কাহিনী বলাটাই আমি বেশি প্রেফার করবো। বানান ভুল চোখে পড়েনি খুব একটা, তবে ফ্ল্যাপে কেউ এর জায়গায় কেও দেখতে ভালো লাগেনি। বাঁধাই, প্রচ্ছদ, কাগজের মান ভালো। সবশেষে একটা কথা, বই পড়ে মনে হলো লেখকের হুমায়ূন আহমেদের লেখা দ্বারা কিছুটা অনুপ্রাণিত, এটা অনিচ্ছাকৃতও হতে পারব। এই সীমাবদ্ধতা থেকে তাকে বের হয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে, 'এই আতংকের জন্ম অন্য এক জগতে, অন্য এক ভূবনে। ' এই রকম লাইন হুমায়ূন আহমেদের বইতে পড়তে পড়তে ক্লিশে হয়ে গেছে। লেখকের নেক্সট বইয়ে নীলগঞ্জ বা আগামসি লেনের বদলে অন্য জায়গার নাম আশা করছি।
সবশেষ বলবো, বইটা বেশ ভালো। এক বসায় শেষ করার মতো। বই শেষ হয়ে যায় কিন্তু রেশ মাথায় রয়ে যায়। লেখকের কাছ থেকে আরো ভালো লেখা আশা করছি।
চমতকার সায়েন্স ফিকশন-মিস্ট্রি প্লট, শুরুটাও যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক্সিকিউশন ঠিক করে করা হয়নি। বইটা পড়ে মনে হল যেন একটা বড় উপন্যাসের সামারি টাইপ কিছু পড়লাম। এত সম্ভাবনাময় স্টোরিলাই���কে ১৩২ পৃষ্ঠায় গুটিয়ে এনে যা করা হয়েছে তাকে পাঠকের মজা নষ্ট করা বলে। বই হাতে নিয়ে পড়তে ভাল লাগলে পাঠকরা সাধারণত চান তাদের সেই সুখকর অভিজ্ঞতার সময়সীমাটি আরো লম্বা হোক, গল্পটি তখন গুটিয়ে গেলে বিরক্তির উদ্রেগ হওয়া স্বাভাবিক। জিহাদী ভাইয়ের এই বইটিতে তেমনি হয়েছে। তিনি নিজেও বইতে বলেছেন এটি তার একটি এক্সপেরিমেন্টাল লেখা। আরেকটু সময় দিয়ে বড় কলেবরে উপন্যাসটি সাজানোর চেষ্টাটা করলেই তিনি সফল হতেন বলে মনে হয়েছে।
History is just a way of keeping score, but it doesn't have to be who we are. - Shaun David Hutchinson, We Are the Ants - "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" - শওকত, ছা-পোষা কেরাণির চাকরি করে এক অফিসে। স্ত্রীসহ দুইজনের সংসার চালাতেই টানাপোড়েন এর মধ্যে পড়া লাগে তার। এর মাঝে অফিসের এম.ডি. একদিন তাকে ডেকে নিয়ে আসে নিজের ডেস্কে এবং অদ্ভুত এক কাজের আবদার দেয় যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এলাকার প্রতাপশালী ব্যক্তি আবুল মনসুর চৌধুরী এর ছেলে এহসান চৌধুরী বেশ ভবঘুরে স্বভাবের, বাসা থেকে প্রায়ই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এমনই এক নিরুদ্দেশকালের শেষে একটি বাচ্চাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। তার কাছ থেকে জানা যায় বাচ্চাটি বেশ অদ্ভুত, কয়েক ধরনের সমস্যা আছে তার ভিতরে। তারপরেও চৌধুরী পরিবার তাকে নিজেদের একজন ভেবেই পালতে থাকেন।
এখন কি এমন ঘটনা ঘটে শওকতের সেই কাজে যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়? এহসান চৌধুরী এর নিয়ে আসা সেই বাচ্চাটির রহস্য কি? এই সব কিছুর সাথে "অরিত্রিকা" নামটি কিভাবে জড়িত? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক ? তা জানতে হলে পড়তে লেখক নসিব পঞ্চম জিহাদী এর অতিপ্রাকৃতিক ধারার গল্প "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি"। - "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" লেখক নসিব পঞ্চম জিহাদী এর একটি অতিপ্রাকৃতিক ধারার গল্প। বইয়ের শুরুতে গল্প বলায় কিছুটা জড়তা থাকলেও কাহিনির ভিতরে ঢুকে গেলে সেই জড়তার দেখা খুব একটা পাওয়া যায় না। বইটির লেখনশৈলী এবং গল্প বলার ধরনটি লেখকের বাকি বইগুলোর মতো এ বইতেও ভালো লেগেছে। বইয়ের মূল কিছু প্লট পয়েন্ট প্রথমদিকে ধোঁয়াশার মতো লাগলেও শেষ দিকে সবকিছুর মোটামুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
"অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" গল্পের চরিত্রায়ন মূল গল্পের হিসেবে বেশ ভালোই, বিশেষ করে গল্পের মূল প্রোটাগনিস্ট বেশ ইন্টারেস্টিং এক চরিত্র। অতিপ্রাকৃতিক ধারার হলেও গল্পটি পড়ার পরে মনে হয়েছে খুবই বিশেষ শ্রেনীর পাঠকদের জন্যই বইটি লেখা হয়েছে, তাই বইতে হররের পাশাপাশি বেশ কিছু ম্যাজিক রিয়েলিজমের ছোয়াঁর সাথে সাথে কিছু কিছু এক্সমেরিমেন্টাল কাজকর্মেরও দেখা পাওয়া যায়। গল্পের ভিতরে বেশ কিছু অধ্যায়ে কবিতার ব্যবহারও ভালো লাগলো।
"অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" বইটির প্রোডাকশনের হিসেবে পেইজ, বাধাঁই বেশ ভালোই। বইটির প্রচ্ছদও মানানসই বলা যায় তবে নামলিপিতে গল্পের নামের মাঝে একটি কমা মিসিং। আর বইয়ের দামের তুলনায় প্রুফ রিড এবং সম্পাদনা আরো ভালোভাবে করা দরকার ছিলো। বইতে অনেক যুক্তবর্ণ ভাঙা আর বেশ কিছু দৃষ্টিকটু টাইপোও দেখলাম, যেগুলোর বেশিরভাগই সম্পাদনার পরে ঠিক হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। সামনে প্রকাশনীটি এদিকগুলো খেয়ালে রাখবেন আশা করি।
এক কথায়, অতিপ্রাকৃতিক ধারার গল্প হিসেবে বেশ ভিন্নধর্মী এক বই "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি"। যারা টিপিক্যাল হরর/অতিপ্রাকৃতিক ধারার গল্প পড়ার বদলে একটু এক্সপেরিমেন্টাল ধরনের গল্প পড়তে চান তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
লেখার ভাষা অন্যরকম, বিশেষ করে বাংলায় অন্ধকার দুনিয়ার কাহিনি (কিছুটা লভক্রাফটিয়ান বলা যায়) লিখতে গিয়ে এরকম ভাষার আর কবিতার প্রয়োগ আর দেখিনি। পড়তে চমৎকার লাগে। অনেক বড় একটা কাহিনি, মনে হয়েছে চাপাচাপি করে ছোট করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে দুই এক জায়গায় তাল কেটে গিয়েছে। তবে কনসেপ্টটা নিঃসন্দেহে চমৎকার।
লেখকের প্রথম মৌলিক উপন্যাস ‘মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন’ ভাল লেগেছিল আর ‘অরিত্রিকা...’ও এবার হতাশ করল না। দুটো লেখাতেই যে ব্যাপারটা প্রথমে ভাল লাগে তা হল স্লো বার্ন বিল্ড আপ, যেখানে কোন গাড় রহস্যের আভাস পাওয়া যাবে মাত্র, পরবর্তীতে যা খোলস ছাড়াতে শুরু করে আগ্রহটাকে ধরে রেখে, ধীরে ধীরে। আর ‘অরিত্রিকা’র সব থেকে এফেক্টিভ দিক ছিল এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘শওকত’কে ঘিরে বেড়ে ওঠা দানা পাকানো এক অদ্ভুত রহস্য; যেখানে পাঠক যতই চরিত্রটা সম্পর্কে জানতে শুরু করবে ততই যেন এক অন্ধকারাচ্ছন রহস্যের আকর্ষনে তার আরও গভীরে উঁকি দিতে দ্বিধা করবে না। মিস্ট্রি, হরর থেকে শুরু করে একাধিক জনরের স্বাদও পাওয়া গেছে লেখকের এই ‘এক্সপেরিমেন্টাল’ নভেলাটিতে। শুরুতে যেমন কখনো কখনো ছিল মিসির আলীর কোন সাইকোলজিক্যালি টুইস্টেড রহস্যময় চরিত্রের আমেজ, আবার তা দেখতে দেখতে রুপ নিয়েছে এমন এক ডার্ক মিস্ট্রিতে যা কিনা একটা সময় গিয়ে দিতে শুরু করল লাভক্রাফটিয়ান হরর-থ্রিলারের দ্যুতি! আর আমি মনে করি গল্পটাকে সেই আমেজেই কিছু দূর টেনে নিয়ে গিয়ে রহস্যময়তার সাথে ইতি টানলেই মনে হয় বেশি ভাল হত, আর কি আমার কাছে ‘আনিসুজ্জামান’-এর পার্টটার আগ পর্যন্তই ভাল লেগেছে বেশি। তবে লেখককেও আসলে এখানে দোষ দেয়া যায় না, স��রকম সম্ভাবনা ছিল বলেই তিনি অন্য আরেকটি পাঠকপ্রিয় ঘরোনায় প্লটটাকে শেষভাগে টেনে নিয়ে গিয়ে সমস্ত রহস্য মেলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। সবমিলিয়ে, নভেলাটির দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ধরে রাখা রহস্যের বুনটের কারণেই আমি বলব নসিব পঞ্চম জিহাদীর “অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি” বেশ স্বকীয় ও চমকপ্রদ একটি বই হতে পারে ২০১৯-এ পাঠকদের জন্য। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমি হরর সিনেমার পোকা বলেই সম্ভবত, অরিত্রিকা’র ঘন চুলের আড়ালে যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও খুঁজে পেয়েছিলাম সাদাকো (Ring) আর কায়াকোর (Ju-On) ছায়া; যদিও চরিত্রায়নের দিক দিয়ে অরিত্রিকা তাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন ও বিচিত্র!
বইটাকে কোন জনরায় ফেলবো এটা নিয়ে আমি কিছুটা কনফিউজড। তবে একটা বিষয় নিয়ে আমি একদমই কনফিউজড না। আর সেটা হলো, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ও সম্ভাবনাময় লেখকদের যদি কোন লিস্ট করা হয় তাহলে নসিব পঞ্চম জিহাদীর নাম একদম উপরের দিকেই থাকবে। নিজের প্রতি প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস না থাকলে দ্বিতীয় বইয়েই এরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো মনে হয় না সম্ভব...বইটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা থাকলো।
শুরুটা দারুণ ছিল। বিশেষ করে লেখার স্টাইল আর প্লট হুমায়ূন আহমেদের 'কুটু মিয়া'কে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো বারবার। কিন্তু শেষে এসে হতাশ হলাম। ৩০০+ রানের ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসে টেনেটুনে ২০০ রানের ম্যাচ হলে যেরকম হতাশ লাগে, সেরকম লাগলো। :|
বইয়ের প্রথম অধ্যায় যখন পড়া শুরু করলাম, পড়তে গিয়ে বিরক্তি চলে এসেছিল। আরে, প্রতিটা বাক্যের শেষেই ক্রিয়াপদ কেন? এক বাক্যের সাথে পরের বাক্যে যাওয়ার ফ্লো নাই। পুরো বইটাই এভাবে লেখা কিনা ভেবে বইটা ড্রপ করতে হবে মনে হয়েছিল। তারপর পরের অধ্যায়টা পড়া শুরু করতেই দেখলাম এত সুন্দর লেখা। আবার চোখ বুলিয়ে নিলাম প্রথম অধ্যায়ে। সমস্যাটা কী? বুঝলাম প্রথম অধ্যায়ে শওকতের বিষণ্ন-ছন্নছাড়া ভাবটা ফুটিয়ে তুলতেই ওরকমভাবে লেখা অধ্যায়টা। রাত ২টায় পড়া শুরু করেছিলাম মনে হয়। এক বসায় ১০০ পৃষ্ঠা শেষ করে ফেলেছি। গল্পটা কীভাবে বলতে হয়, পাঠককে ধরে রাখতে হয় সেটা জানেন লেখক। গল্পের একাকিত্ব, অনুভূতির শূন্যতা বেশ ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। নিহিলিজম, ইন্ডাস ও সুমেরীয় সভ্যতাকে যেভাবে ব্লেন্ড করেছেন তা চমৎকার লেগেছে। কালো চুলের সত্তার যে বর্ণনা, তাতে মনে হয়েছিল লাভক্রাফটিয়ান হয়ে যাচ্ছে নাকি! লাভক্রাফটিয়ান ধারায় মানুষ যেখানে তুচ্ছ, গ্রেট গডরা আমাদেরকে পাত্তাই দেয় না। আর এখানে তারা মানুষকে সাহায্য করতে চায়। গল্পের শেষে এসে আবার মনে হয়েছে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারই হয়ে গেল কিনা। এ গল্পটাকে কোনো জনরাতে ফেলা কষ্ট হবে। তবুও কিছুটা মিস্টিসিজম, নিবিরুদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠা নিহিলিজম সোসাইটি মিলিয়ে "অকাল্ট" জনরা হিসেবে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিছু কবিতা ছিলো বইতে, সেগুলোও চমৎকার।
বইটা টানটান উত্তেজনার বই না। তাই বেশি থ্রিল আশা করা উচিত হবে না। কারণ বইটা আসলে থ্রিলার না। তবে নতুন একটা সুন্দর গল্প পড়ার ইচ্ছা হলে বইটা হাতে নিতে পারেন। ভালো লাগার গ্যারান্টি দিতে পারব না। বইটি একটু ভিন্ন রকমের, সেরকম কিছু চাইলে ওয়েলকাম।
আপাতদৃষ্টিতে উত্তেজনাহীন এবং একঘেয়ে কেরানী শওকত তার জীবন কোনক্রমে কাটায় দিচ্ছে। তার জীবনে হঠাৎ উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যখন তার কোম্পানির এমডি তাকে ডেকে মধুর ভাষায় কিছু কাজ দেয়, ডাবল প্রমোশন আর ইনক্রিমেন্টের আশ্বাস দেয়। এরই মধ্যে শওকতকে এলভিস ফোন দেয়। জানায় একজনের শেষ নিঃশ্বাস চলছে। শুনে শওকতের কোন প্রতিক্রিয়া হয়না। কিন্তু এমডি সাবের প্রথম কাজের পরই নিজের বউ রানুকে বাড়ী পাঠায় দিয়ে শওকত চলে যায় নিজের বাড়ীতে। এরপরই ঘটনাপটের সব কিছু আমূলে পরিবর্তন হতে থাকে। শওকত তো আসলে ত্রিদিব। ত্রিদিবের জন্ম মানুষ হিসেবে নয়, আরেক প্রজাতি হতে পৃথিবীতে আগত সে। ত্রিদিব মানুষের মত নয়, কারণ তার ভেতরে আছে অনুভূতিখেকো অরিত্রিকা। বাকিটা বইয়ে পড়বেন।
লেখাটা যে নিরীক্ষাধর্মী, সেটা লেখক নিজেই বলেছেন। খুব গ্রিপিং একটা বই। যদিও শেষ পর্যায়ে এসে অনেকটা গতানুগতিক লেখা হয়ে পড়েছে, কিন্তু তাই বলে বইটার আবেদন একদম কমেনি। প্রকৃতি এবং পরিবেশের বর্ননায় লেখক সিদ্ধহস্ত। লেখায় যেন পরিবেশটা জীবন্ত হয়ে উঠছিল। তবে এই টাইপ বইয়ের পাঠক বাংলাদেশে সবে গজাচ্ছে। তাই খুব বেশী মানুষ পছন্দ করবে কিনা সন্দেহ আছে। আমার কাছে আবার এসব ভাল্লাগে। বউয়ের সাথে বসে 3 Body Problem দেখে ক্যালানি খেয়েছিলাম। সে আমাকে বলে এগুলা কি দেখ যার আগামাথা নাই। এখন আমি তো আগা এবং মাথা সবই পাই, কিন্তু সে তো এটার অডিয়েন্স নয়। ঠিক এমনই এ বইয়ের ক্ষেত্রে হবার সম্ভাবনা আছে। তারপরও বইটা পড়া রিকমেন্ডডেড।
মানুষের কল্পনার বাঁধ অবারিত। তবে পাঠক হিসেবে লেখকের সব কল্পনা আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। এই বইটা পড়ে জানতে পারলাম, এটা Lovecraftian Horror genre এর। আমার জন্যে নয় এটা। খানিকটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চলে আসে মাঝেমধ্যে। Storyline সাজানো ভালো, লেখকের experimental effort ভালো, কিন্তু ingredients আমার কাছে ভাল্লাগে নাই।
ট্রেনের বগি চ্যুত হলে যেরকম ধাক্কা বা বিহবলতা মানুষকে ঘিরে ধরে আমারও ঠিক তেমনই অনুভূতি হচ্ছিলো বইটা পড়া শেষে। বইটা মোটেই টিপিকাল কন্টেন্ট না। সোজা কথায় এই বইয়ের নির্জাস সবাই অনুভব করতে পারবে না। আমাদের চর্মচক্ষুতে গ্রাহ্য সবকিছুই যে সবকিছু না, এর বাইরেও যে অনেক কিছু আছে সেটা এই বইয়ের অন্যতম প্রতিপাদ্য। এছাড়াও নিহিলিজম সম্পর্কে হালকা কপচাকপচি আছে যা বিশেষ ভিন্নতা যোগ করে। সোজা কথায় গতানুগতিকের বাইরে যদি চক্কর কাটতে চান তবেই পড়ুন।
কথায় আছে, শেষ ভালো তো সব ভালো। আসলেই কি তাই? আর শেষ ভালো না হলে?
শওকত, সাধাসিধে সাধারণ এক কেরাণি। এতটাই সাধারণ যে - তার দিকে একবার কারো চোখ পড়লেও দ্বিতীয়বার আর কেউ ফিরে তাকায় না। অভাবের সংসারে স্ত্রী রানুর সাথে জীবন কোনোরকমে পার হয়ে যাচ্ছিলো। যেই জীবনে নেই কোনো নতুনত্ব। বাঁচার তাগিদও নেই। তবুও বাঁচতে হবে। একদিন শওকতের ডাক পড়লো তার অফিসের এম.ডি আনিসুজ্জামানের কামড়ায়। যেই এম.ডি স্যারের বদমেজাজের কারণে অফিসের সবাই ভয়ে তটস্থ থাকে। এম.ডি স্যারের নির্দেশে শওকতকে একটা জিনিস আনত�� যেতে হবে একজায়গায়। তবে গোপনে। কি জিনিস সেটা? সে জিনিস আনতে গিয়ে শওকতের পরিচয় হলো টেকো, রক্তমাখা, ভূড়িওয়ালা এক কসাইয়ের সাথে।
চৌধুরি সাহেবের ছোট ছেলে এহসান। একটু কেমন যেন। সারাদিন বইয়ের মধ্যে মুখ গুজে থাকে। মাঝেমাঝে বাসা থেকে লাপাত্তা হয়ে যায়৷ একবার সে ৩মাসের জন্য লাপাত্তা হয়ে হঠাৎ একদিন ফিরে এলো। সাথে নিয়ে আসলো ৫/৬ বছরের এক ছেলে। যেই ছেলে স্বাভাবিক না। ঝামেলা আছে। কি সেই ঝামেলা?
এলভিস হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ "ওয়াসি"র আগামসি লেনের বাড়িতে ত্রিদিব একদিন বমি করে ভাসিয়ে দিলো। বমির সাথে পাকস্থলী উগড়ে বেড়িয়ে এলো কুচকুচে কালো, লম্বা একগাদা চুল। এর উত্তর ঠিক কোথায়?
প্রতিটা ঘটনা একটার সাথে অন্যটা কানেক্টেড। এই সবগুলা খোলা সুতা একসাথে জুড়ে দেওয়ার জন্যে দরকার যে সুতার - সেই সুতার উৎস কি? আর কে এই অরিত্রিকা? কোথায় যেতে মানা করা হয়েছে তাকে?
(বইটির ফ্ল্যাপেই কাহিনী সংক্ষেপ বেশ ভালোভাবে দেয়া আছে। তাই ফ্ল্যাপের আলোকেই উপরের অংশ লেখা হয়েছে।)
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ বাংলায় প্রবাদ আছে - "প্রথমে দর্শনদারী, পরে গুণ বিচারী।" এই বইয়ের ক্ষেত্রে প্রবাদটি ষোলআনা সত্য। বইটি হাতে নেয়ার সাথে সাথে প্রথমেই যেটি আপনাকে আকর্ষণ করবে তা হলো বইটির নাম এবং এর প্রচ্ছদ। বইটির নাম যেমন আগ্রহ জাগানিয়া, প্রচ্ছদ তেমনি সুন্দর। আমার পড়া বইগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা প্রচ্ছদ এই বইটির। তাই প্রথমেই বইটির প্রচ্ছদশিল্পী "আবুল ফাতাহ" প্রশংসার দাবিদার।
এবার আসি বইয়ের কন্টেন্টে। ১৩৪ পেজের ছোট বই। নভেলা বলাই শ্রেয়। বইটি কোন জনরায় পড়বে বলা মুশকিল। হরর/মিস্ট্রি/ফ্যান্টাসি/লভক্রাফটিয়ান/সুপারন্যাচারাল থ্রিলার - সবগুলার মধ্যেই বইটি রাখা যায়। তবে বইয়ে হরর উপাদান একেবারেই কম ছিল। আমি বরং বইটিকে সুপারন্যাচারাল থ্রিলার নভেলাই বলব।
গল্পের শুরুটা দুর্দান্ত। এককথায় অসাধারণ। এক বসায় শেষ করতে অনেকটা বাধ্য করবে আপনাকে। শুরুতেই বরশি দিয়ে পাঠককে আটকে ফেলার ক্ষমতা খুব কম বইয়েই পেয়েছি। "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" - সেই স্বল্পসংখ্যক বইয়ের শেলফে নতুন এডিশন।
লেখকের লেখনী ধারালো। প্রথমেই গল্পে ডুবে যেতে হবে। আগেও বলেছি, আবার বলছি। গল্পের বিল্ডাপ দুর্দান্ত। আভাস মিলছিল অসাধারণ কিছুর। তবে গল্পের দ্বিতীয়ার্ধে গল্প ধীরে ধীরে জটিল হলো। যেই রিদমে গল্প শুরু হলো, সেখানে কেমন যেন ছেদ পড়লো। গল্পের ফিনিশিংও কিছুটা হতাশ করেছে। গল্পটি স্লো ছিল না কখনোই, প্রথম থেকেই বেশ দ্রুত গল্প এগিয়ে গেছে। তবে শেষের দিকে কেমন যেন অতিরিক্ত তাড়াহুড়া মনে হয়েছে।
ছোট করে বললে, শুরুটা যেভাবে হয়েছে, এক্সপেকটেশন অনেক বেশি ছিল।। অসাধারণ প্লটে, শেষটা যতটা ভালো হতে পারতো, তা হয় নি। তাই শেষ ভালো তো সব ভালো - "অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" এর জন্য প্রযোজ্য নয়।
গল্পে চরিত্রের ঘনঘটা ছিল না। ছোট বই, চরিত্রের সংখ্যাও কম। গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে শওকত এর ক্যারেক্টার বেশ ভালোভাবেই ফুটে এসেছে।
"এই আতংক/ভয় এর জন্ম এই জগতে নয়, অন্য এক জগতে। অন্য এক ভুবনে।" এই কথাটি হুমায়ুন আহমেদের ভৌতিক উপন্যাসসমগ্রে এতটা ব্যবহৃত হয়েছে যে, এটি ক্লিশের পর্যায় চলে গেছে। "অরিত্রিকা..." বইয়েও এই লাইনটি অনেকবার এসেছে। কিছুটা বিরক্তিকর ছিল। অন্য কোনোভাবে ভৌতিক অনুভূতিটা এক্সপ্লেইন করা যেত।
বইটি ২০১৯ সালে "বুকস্ট্রিট" প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত। বুকস্ট্রিটের বইগুলির মধ্যে নতুন এক ধারায় লেখার সূচনা লক্ষ্য করছি। বেশ ভালো লেগেছে। আগামী বইগুলিতেও সেটা কতটা থাকে - দেখার বিষয়।
বইয়ের বানান ভুল তেমন ছিল না। তবে দুই-এক জায়গায় মিস প্রিন্টিং ছিল। বইয়ের বাইন্ডিং ভালো, প্রচ্ছদ সুন্দর। পেজ কোয়ালিটি এভারেজ মানের। দাম অনুযায়ী আরেকটু ভালো হতে পারতো। ১৩৪ পেজের বইটির মুদ্রিত মূল্য ২৪০টাকা।
"অরিত্রিকা, ওইখানে যেওনাকো তুমি" - নসিব পঞ্চম জিহাদীর ২য় মৌলিক বই। লেখকের প্রথম বই "মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন" - ২০১৭সালে বুকস্ট্রিট প্রকাশনী থেকেই প্রকাশিত হয়৷
সুপারন্যাচারাল থ্রিলারে আগ্রহী পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন। Happy Reading 😊
Personal Rating: 07/10 (প্রচ্ছদের জন্য 0.5 বেশি) Goodreads Rating: 3.76/5.0
বেশ কিছুদিন ধরে থ্রিলারের উপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম। একঘেয়েমি। লেখক সাহেব মনের কথা বুঝতে পারলেন। যেই টাইপের বই আমি এই মুহূর্তে খুঁজতেছিলাম, লিখে ফেললেন ঠিক তেমনই একটা এক্সপেরিমেন্টাল থ্রিলার। দুর্দান্ত প্লট। আরও দুর্দান্ত তার গল্প বলার ধরণ। আমি অভিভূত।
বি দ্রঃ শেষ করার পর ক্যান জানি মনে হচ্ছে এ বইটা সবার জন্য না। 'মাঝরাতে....' যেভাবে সকল শ্রেণীর পাঠক জামাতে উপভোগ করেছিলো, 'অরিত্রিকা...'র বেলায় সে সম্ভাবনা কিঞ্চিত কম। তবে একটা বিশেষ শ্রেণীর পাঠকদের কাছে বিগত কয়েক বছরে পড়া একটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলা থ্রিলার হতে যাচ্ছে বইটা- এ ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত।
অন্যরকম একটা বই। লেখার স্টাইল খুবই ভাল। এর আগে এই লেখকের আরেকটা বই পড়া হয়েছে। সেটা থেকে এটার জনরা একেবারেই আলাদ। লাভক্রাফট হরর। সাথে ডার্ক ইলিমেন্ট। ঢাকার পার্সপেক্টিভে এমন জনরার বই পড়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। অনেকদিন পর হরর পড়ে ভয় লাগল। লাস্ট কবে হরর জনরা ভয় পাওয়াতে সফল হয়েছে মনে পড়ে নাই। খুবই গা গুলিয়ে ওঠার মত বিতিকিচ্ছিরি ডিটেইলিং। আর লেখার ফ্লো বেশ অসাধারণ। আটকাতে হয়নি একবারও। লেখার মধ্যে দর্শনের উপস্থিতি বইয়ের ওজন বাড়িয়ে তুলেছে বেশ। এর বাইরে বইয়ের পেজ সেটাপটা চোখে আরাম জুগিয়েছে। অসাধারণ প্রচ্ছদও আছে সাথে একটা। বইয়ের ভিতরে লেখক কয়েকটা কবিতে জুড়ে দিয়েছেন। বেশ লেগেছে সেগুলো। নেগেটিভ পয়েন্ট বলতে তেমন কিছু পাইনি। এন্ডিংটা হয়ত একটু প্রেডিক্টেবল ছিল। আর আলাদা আলাদা ক্যারেক্টারের জবানে ঘটনা বর্ণ্না করাতে মনে হয়ে কাহিনি দুম করে কয়েকবার নিচে পড়ে গিয়েছিল। এসব বাদে আর কিছু খারাপ লাগে নি। অনেকদিন বাদে নিশ্চিন্তে পাচ তারকা দিতে পারছি একটা বইকে।
অনেক অনেক বছর আগে হুমায়ুন আহমেদ এর কুটু মিয়া নামের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। যে ভিষণ ভালো রান্না জানত, তার রান্না যারা খেতো একসময় তারা অলস হয়ে যেতো, জীবনের প্রতি মায়া ছেড়ে দিয়ে অদ্ভুত সব আচরণ করত এবং একসময় মারাও যেতো। অরিত্রিকা লেখকের এক্সপেরিমেন্টাল লাভক্রাফটিয়ান ধাচের উপন্যাস। সুন্দর এবং সাবলিল এবং ঘোর লাগা অনুভূতি জোগায়। পেজের পর পেজ শুধু আকর্ষন করেছে আমাকে৷