একটা বন্ধ ঘড়িও দিনে দুইবার সঠিক সময় বলে। তেমনি কোনো মানুষ পুরোপুরিভাবে অসৎ হতে পারে না। তারও থাকে কিছু কোমল জায়গা, হতে পারে, জায়গাগুলো বেশ সেনসিটিভ আর তাকে রক্ষা করতেই কঠোরতার, অন্যায়ের বূহ্য রচনা করে সে! Ignorance of law is no excuse! কিন্তু সে আইন জানে, জানে যেটা করতে যাচ্ছে তা কিছুটা হলেও অনৈতিক ।
কাজী খুররম আজাদ। দেওয়ান বাজারের বিখ্যাত কাজী বাড়ির ছেলে। বাবার চাপে আইন নিয়ে পড়লেও সেই বিদ্যা কোনো কাজে আসেনি। লাইসেন্স পায়নি সে। কিন্তু বন্ধু সামসুলের সাহায্যে মিথ্যে এডভোকেটের পরিচয়ে বিশিষ্ট শিল্পপতি আলমাস খানের পিএ র চাকরি পায় আজাদ। ন্যায় বিচারের জন্য আজাদের দাদার নামডাক ছিল অভ্রভেদী আর তার সেই বংশ কৌলিন্য এখন দ্বিতীয়ার চাঁদের মতোই ক্ষীণ। তবে এই বংশের ঠাঁট বজিয়ে রাখতে চান আজাদের বাবা। অতএব আজাদের বিশিষ্ট শিল্পপতি আলমাস খানের পিএ র চাকরি গ্রহণটা তার মনে রুচে নি!
কেসটা বড়ই গোলমেলে! একটা লোক বেঁচে থাকা অবস্থাতেই তার বেশ কিছু অর্গান দান করে যেতে চান দরিদ্র কিন্তু মৃতপ্রায় কোনো মানুষকে। বাঁচিয়ে তুলতে চান কিছু প্রাণ। আর তার জন্য রোগীর খোঁজ, আইনত সব সমস্যা দেখার দায়িত্ব বর্তায় আজাদের ঘাড়ে। কিন্তু চারিদিকে লোভে ঘেরা মানুষ আর নিজের কিছু মিথ্যার বুনিয়াদে পাওয়া আজাদর এই ক্ষমতা তাসের ঘরের মতোই ক্ষণস্থায়ী। আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পিছপা হবে না কতক স্বার্থান্ধ লোক! তার তালিকায় আলমাস খানের বাড়ির কেয়ারটেকার থেকে শুরু করে এলাকার এমপি, পুলিশ থেকে শুরু করে রাম দা কালাম, সিরাজুলের মত কুখ্যাত অপরাধীরাও।
পাঁচ কোটি টাকার পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছে কতক লোক। কারা ওরা জানা নেই! আর আছে কিছু কোড! আর অকস্মাৎ আক্রমণ হয় আজাদের পুরো পরিবারের ওপর আর তার পরদিনই আবার আক্রমণ হয় সামসুর ওপর। কে বা কারা ওরা কি তাদের উদ্দেশ্য জানা নেই কারো। ওদিকে বাড়ছে রুগ্ন গ্রহীতার সংখ্যা, বাড়ছে তাদের চাপ। আর তার মাঝে বাড়ছে প্রশ্ন। লোভ অন্যায়, সন্ত্রাসবাদ, বিশ্বাসঘাতকততা আর কিছু প্রশ্নের জবাব। গল্পটা গ্রন্থিমোচনের, গল্পটা যবনিকাপাতের, গল্পটা শেষ পর্বের শুরুর....
নাম: শেষ পর্বের শুরু লেখক: মিনহাজ মঞ্জুর জনরা: ক্রাইম থ্রিলার প্রচ্ছদ: আবুল ফাতাহ মুন্না প্রকাশনী: নহলী প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০১৯ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৬০ মুদ্রিত মূল্য: ৩০০/-
শতভাগ নিখুঁত বলতে এমন জিনিস দুর্লভই বটে। আবার তা যদি হয় মানবমন তাহলে তো কথাই নেই...
চাকরি যে লাগবেই এমন না কিন্তু বাবার টিটকারি আর সহ্য হয় না আজাদের। বন্ধু সামসুর সুবাদে পেয়ে যায় এক আজব চাকরি। আজব কারণ মৃত্যুর আগেই নিজের সব অর্গান দান করতে চান শিল্পপতি আলমাস খান আর এসবের বন্দবস্তের দায়িত্ব পড়ে আজাদের ঘাড়ে। মিথ্যের আশ্রয়ে চাকরি পেয়ে গেলেও আলমাস খানের বিশ্বাস আজাদকে ছোট করে চলেছে। হঠাৎ বুঝতে পারে আজাদ তার হাতে চলে এসেছে বিশাল ক্ষমতা। ন্যায়-অন্যায়ের দোটানায় অপরাধে জড়িয়ে যায়। পাপবোধ তো আছে তাও নিজেকে পাপ থেকে বিরত রাখতে পারে না। কিন্তু কথায় আছে না সুখ বেশিদিন টেকে না... গভীর রাতে আচমকা হামলা হয় আজাদের বাসায়। আলমাস খানের গুপ্ত কোড যে আজাদ জানে তা ডাকাতদল জানলো কী করে? সামসুকেই বা কারা উঠিয়ে নিয়ে গেল? ভয়ংকর কোন সিদ্ধান্তের জন্য রামদা কামালের শরণাপন্ন হলো আজাদ? নিজের উপরে বর্তানো দায়িত্ব কি সম্পন্ন করতে পারবে আজাদ? হঠাৎ মারা যায় খান সাহেব। রহস্য নেই তো এর পিছে?
বিশ্বাস, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, প্রতিশোধের মিশেলে প্লট। ১৬০ পেজের বইয়ে থ্রিলার অংশের শুরু বলতে গেলে ১১৩ পেজ থেকে। শুরুতে দ্বিধায় ছিলাম আসলেই থ্রিলার তো। বর্ণনা বিস্তারিতভাবেই করা হয়েছে। আজাদের পারিবারিক ঘটনা অধিকাংশই প্রথম অংশ জুড়ে। আততায়ীদের হামলার পরে থেকে ঘটনা ঘটতে থাকে দ্রুতই।
মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা যে কত বিচিত্র লেখক চরিত্রগুলোর মধ্যে তা ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কেউই সম্পূর্ণভাবে ভালো বা মন্দ নয়। নিজের প্রয়োজনে অপরাধ করতে বাঁধে না কিন্তু বিবেকও পীড়া দেয়, আজাদ চরিত্রকে এইভাবেই সাজানো হয়েছে। বাকি চরিত্রগুলোও মধ্যেও এমন ছাপ স্পষ্ট। বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশে ঘটনারই বর্ণনা রয়েছে তেমন রহস্য বা থ্রিলার কোনোটারই তেমন দেখা পাইনি তবে লেখনশৈলীর জন্য ছেড়ে উঠতেও মন সায় দেয়নি। ডাকাত হামলার পিছে কে আছে এটা আগেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অ্যাকশন সিনগুলো ভালো লেগেছে। বিশেষ করে আজাদ-সামসুর বন্ধুত্ব। তবে একটা খটকা আছে। সবার বিষয়ে খোঁজখবর নিলেও আজাদের বেলায় জোবায়ের খান কিছু করলেন না কেন? গোছানো একটা ইতি টেনেছেন লেখক। বর্তমান সময়কার আসল সমাজব্যবস্থায় যেন ফুটে উঠেছে।
বইয়ের প্রোডাকশন ভালোই তবে বাঁধাই একটু বেশিই টাইট হয়ে গেছে। ছোটখাটো কিছু বানান ভুল আছে। প্রচ্ছদ ও নামলিপি মোটামুটি লেগেছে।
বইটা পড়ে ভালো লেগেছে। লেখকের লেখার হাত ভালো৷ মারদাঙ্গা থ্রিলার গল্প এটা না। আসলে কোন শব্দ দিয়ে গল্পটিকে বিশেষায়িত করব ঠিক বুঝতে পারছি না। মানে গল্পটা আমার অথবা আপনার জীবনের গল্প। আমাদের জীবন, বিশেষ করে আমাদের সামাজিক জীবনাটাই হলো বিরাটা এক রহস্য, যার প্রতি পরতে পরতে আছে বইয়ের ভাষায় যাকে বই টুইস্ট।
লেখক সাহেব তেমনই এক রহস্য গল্প যেনো অতি নিপুণ হাতে বুনন করে আমাদের কাছে পেশ করলেন। এবং চমৎকার কিছু মেসেজ রেখে গেলেন। মিথ্যা দিয়ে কোনো কিছু শুরু করা উচিত না। হোক সে মিথ্যা অতি নগন্য। ‘ক্ষমতা’ আগে হোক বা পরে, প্রতিটা মানুষের কাছেই আসে। কারো কাছে অতি অল্প বা কারো কাছে অনেক বেশি। যাইহোক না কেনো, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয় বুঝে শুনে৷ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে সেই ক্ষমতাই আপনাকে পোড়াবে।