হারিয়ে যাওয়া খুনিরা
বাবু ও বারবনিতা
মৃত্যুমেডেল
লেখক - দেবারতি মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক - দীপ প্রকাশন
মূল্য - 760 (একত্রে) /-
হারিয়ে যাওয়া খুনিরা সিরিজটি বিখ্যাত লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায় এর লেখা ট্রু ক্রাইম সিরিজ। এই প্রথমবার আমরা সিরিজ এর তিনটি বই সম্পর্কে একসাথে আলোচনা করছি। ট্রু ক্রাইম নিয়ে বাংলায় খুব একটা বেশি বই নেই, আমি আগের বছর লালবাজার সিরিজটি পড়েছিলাম এবং খুব এনজয় করছিলাম। সেই আগ্রহ নিয়েই লেখিকার এই সিরিজটি শুরু করেছিলাম। প্রথম দুটো পার্ট আমার কাছে বুক ফার্ম থেকে প্রকাশিত ভার্সন গুলো আছে, শেষ পার্ট মৃত্যুমেডেল দীপ প্রকাশন এর ভার্সনটি। ১৮৭০ সালের ঔপনিবেশিক শাসনে থাকা ব্রিটিশ ভারতবর্ষ থেকে ১৯৯৩ সালের আধুনিক ভারতবর্ষ, এই সুবিশাল সময়কাল নিয়ে ঘটে যাওয়া 20টি ঘটনা নিয়ে এই সিরিজটি, প্রথম পার্ট 'হারিয়ে যাওয়া খুনিরা' বইটিতে 12টি ঘটনা, দ্বিতীয় পার্ট 'বাবু ও বারবনিতা ' 2টি ঘটনা,তৃতীয় পার্ট 'মৃত্যুমেডেল ' বইটিতে 6টি ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে।
পটভূমি -
হারিয়ে যাওয়া খুনিরা ট্রু ক্রাইম সিরিজ এর প্রথম বই, এই বইটিতে 12 টি হত্যাকাণ্ড বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো হত্যাকাণ্ডের পটভূমি গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম, কোনোটির শৈলশহর দেরাদুন, কোনোটির আবার বোম্বাই শহর। ইন্দোরের দেশীয় রাজার বিলাসিতা থেকে পার্কসার্কাসের এক জাদুকরি হত্যা, এই ট্রু ক্রাইম সিরিজের প্রতিটি কাহিনির পরতে পরতে আঁকা হয়েছে অপরাধী মনস্তত্ত্ব, মোডাস অপারেন্ডি, হত্যাকাণ্ডের লোকাস ডেলিক্টি এবং রোমহর্ষক বিবরণ যার নিষ্ঠুরতা ও জটিলতার তীব্রতা বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক।
'বাবু ও বারবনিতা’ ‘হারিয়ে যাওয়া খুনীরা’ সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ড।
এই বইতে রয়েছে দুটি নন-ফিকশন উপন্যাস। একটির সময়কাল ১৮৮১ সাল ও অন্যটির ১৯৩৬ সাল। কিন্তু পটভূমি একই। সাবেক কলকাতার পতিতাপল্লী সোনাগাছি। ১৮৮১ সালে ত্রৈলোক্যতারিণী নামক সোনাগাছির এক বারবণিতা কিভাবে সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠল তার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা রয়েছে প্রথম উপন্যাসে। আর ১৯৩৬ সালে উত্তর কলকাতার দুর্ধর্ষ খাঁদা গুণ্ডা, যে কিনা ছিল একদিকে ছিল অসংখ্য খুন-ডাকাতির খলনায়ক, অন্যদিকে সোনাগাছির ‘রবিনহুড’, তার দ্বৈতসত্তার ত্রাস জাগানো কাহিনী হল দ্বিতীয় উপন্যাসের উপজীব্য। পাশাপাশি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাবু কালচার, তৎকালীন সোনাগাছির সমাজব্যবস্থাও এই বইতে আলোচনা করা হয়েছে দুই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে।
'মৃত্যুমেডেল' এই ট্রু ক্রাইম সিরিজেরই তৃতীয় খণ্ড।
এই খণ্ডে রয়েছে ছয়টি সত্য ঘটনা, যেগুলো নানা সময়ে দেশের নানাপ্রান্তে আলোড়ন তুলেছিল। সিরিজের নিয়ম মেনে প্রতিটি ঘটনারই কেন্দ্রে রয়েছে একেকটি মৃত্যু, যে মৃত্যু সেইসময় জনমানসে সৃষ্টি করেছিল তীব্র প্রতিক্রিয়া। পরে ধীরে ধীরে সময়ের প্রলেপে তা হারিয়ে গিয়েছে ইতিহাসের গর্ভে। হারিয়ে গিয়েছে কুশীলবরাও।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
ট্রু ক্রাইম সিরিজটি মূলত নন ফিকশন এর মধ্যেই পরে। লেখিকার এর আগে একটি মাত্র উপন্যাস আমি পড়েছিলাম ভালই লেগেছিলো, ট্রু ক্রাইম ঘরানা আমার বেশ পছন্দের তাই বই তিনটি তুলে নিয়েছিলাম, লেখিকা হতাশ করেননি। প্রথম পার্টটির 12টি ঘটনার নির্বাচন খুবই ভালো, তার সাথে লেখিকার কল্পনা মূল ঘটনা থেকে বিন্দু মাত্র বিচ্ছিন্ন করেনি। দ্বিতীয় পার্ট এর একটি গল্প চেনা, দারোগা প্রিয়নাথ এর বইটিতে পড়েছিলাম, এখানেও পড়লাম একটু আলাদা কিন্তু বেশ লেগেছে। আমার সবথেকে পছন্দের পার্টটি হলো তৃতীয় পার্ট মৃত্যুমেডেল, অসাধারণ কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা এখানে করা হয়েছে। মৃত্যুমেডেল গল্পটি এবং হায়েনা গল্পটি দারুন লেগেছে। লেখিকার রিসার্চ এবং পড়াশুনা সম্পর্কে কুর্নিশ জানাতেই হয়। প্রচুর তথ্যবহুল তিনটি বই। লেখার ভাষা খুব সাদামাটা, তরতর করে পড়ে ফেলা যায়। লাস্ট পার্টটিতে প্রত্যেকটি বিবরণে বেশ থ্রিলিং ব্যাপার পেয়েছি যা অন্য পার্ট গুলোয় মিসিং। লেখিকার সবথেকে বেশি সাফল্য সেখানেই গল্পগুলি পড়তে পড়তে প্রচন্ড অবাক হতে হয়েছে যে এইগুলি সত্য ঘটনা, পড়ার সময় সেটা একবারও মনে হয়নি, পড়ার মাঝে বিরতির সময় মাথায় এসেছে আরে এইসব সত্যিই ঘটেছিল। যারা ট্রু ক্রাইম নিয়ে পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য এই সিরিজটি অবশ্যই পাঠ্য।