সুধীন্দ্রনাথ রাহা-র অনন্য অনুবাদে অলৌকিক রসের গল্প পড়তে পাওয়াটা বেশ কয়েক প্রজন্মের ছোটোবেলার অন্যতম চিহ্ন ছিল। সেই গল্পগুলো বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে এসে স্থান পেল এই সংকলনে। ভালো ছাপা, ভালো বাঁধাই, প্রচুর অলংকরণ ইত্যাদির সঙ্গে এই বইটা আমাদের কাছে পেশ করে বুকফার্ম কর্তৃপক্ষ পাঠকের নস্ট্যালজিয়া-সুবাসিত কৃতজ্ঞতা অর্জন করলেন। ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সম্পাদনা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরেই লেখাগুলো শুদ্ধ পাঠে, তথ্যসহ আমাদের সামনে এল, তাই তাঁকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
কী-কী গল্প আছে এই বইয়ে?
বাংলায় গল্পগুলোর নাম দিয়ে লাভ নেই। বরং বিশ্বসাহিত্যের যে-সব সম্পদ সরল, সরস, সহৃদয় আকারে সুধীন্দ্রনাথের সৌজন্যে আমাদের সামনে এসেছে, সেই গল্পগুলোর নাম দিই:
১] ওয়াশিংটন আর্ভিং-এর 'গেস্টস ফ্রম গিবেট-আইল্যান্ড'
২] সিসিল অসবোর্ন-এর 'ইনভিজিবল ভিলা'
৩] ই এফ বেনসন-এর 'রুম ইন দ্য টাওয়ার'
৪] মার্জরি বাওয়েন-এর 'দ্য ক্রাউন ডার্বি প্লেট'
৫] ব্র্যাডক-এর 'ইভিল হন্টিংস'
৬] সমারসেট মম-এর 'আ ম্যান ফ্রম গ্লাসগো'
৭] অস্টেস হেকলার-এর 'দ্য চেইনড গোস্ট'
৮] হিউ জার্ভিস-এর 'দ্য লিটল ওয়ানস অফ আ সেঞ্চুরি এগো'
৯] মেরি উইলকিন্স ফ্রিম্যান-এর 'দ্য সাউথ ওয়েস্ট চেম্বার'
১০] এডিথ হোয়ার্টন-এর 'অল সোলস্'
১১] জে শেরিডান লে-ফানু-র 'স্পেক্ট্রাল লাভার্স'
১২] এ এম বারোজ-এর 'গ্রিন স্কার্ফ'
১৩] ড্যাফনে-দু-মোরিয়ার-এর 'দ্য এসকর্ট'
১৪] লুইজি পিরান্দেলো-র 'ক্লোজ ফ্রেন্ডস'
১৫] স্যার আর্থার কোনান ডয়েল-এর 'দ্য সিলভার মিরর'
১৬] জেরোম নাথানিয়েল-এর 'লেট ইট নট কাম ট্রু'
১৭] ওয়াশিংটন আর্ভিং-এর 'ডলফ হেলিগার'
১৮] রিচার্ড মিডলটন-এর 'দ্য গোস্ট শিপ'
১৯] উইলিয়াম জেকবস্-এর 'দ্য মাংকিজ প'
২০] 'দ্য লিটল গার্ল' (লেখক অজ্ঞাত)
২১] রবার্ট ব্লক-এর 'আ কোশ্চেন অফ এটিকেট'
২২] এলিজাবেথ ডালি-র 'দ্য গোস্টস'
২৩] জোসেফ কনরাড-এর 'দ্য ব্ল্যাক মেট'
২৪] এডওয়ার্ড ওয়াগেনেস্ট-এর 'গোস্ট ইন দ্য চেম্বার'
২৫] এইচ টি মনরো-র 'আ লাভেবল গোস্ট'
২৬] জে শেরিডান লে-ফানু-র 'মাদাম ক্রাউলস গোস্ট'
২৭] টেড হিউজেস-এর 'দ্য রেইন-হর্স'
২৮] টি এস হাওয়েল-এর 'দ্য বিলাভেড ভ্যাম্পায়ার'
২৯] সমারসেট মম-এর 'হনলুলু'
সুধী পাঠকেরা বুঝতে পারবেন, শুধু ইংরেজি ভাষাতেই সবচেয়ে ভয়াল-ভয়ংকর পঞ্চাশটা গল্পের তালিকা বানালে তাদের মধ্যে উপরোক্ত গল্পগুলোর একটাও পড়বে কি না, সন্দেহ আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে অনুবাদকের ওপর তিনটে মস্ত সীমাবদ্ধতা আরোপিত ছিল।
প্রথমত, একমাত্র শেষ গল্পটি নবকল্লোর-এ প্রকাশিত হয়েছিল। অন্য সবক'টি কাহিনিই অনূদিত হয় 'শুকতারা' বা দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর বার্ষিকীগুলোর জন্য। ফলে গল্পে প্রাপ্তবয়স্ক উপাদান থাকলে হয় সুধীন্দ্রন্দ্রনাথ সেগুলো নির্বাচন করতে পারেননি, নয় গল্প থেকে সেগুলো ছাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে তেমন ভয়ানক গল্প এতে স্থান পায়নি।
দ্বিতীয়ত, সুধীন্দ্রনাথের সময় আন্তর্জাল ছিল না। তাঁকে অনুবাদের জন্য নির্ভর করতে হয়েছে মূলত ঊনবিংশ শতক, বা তারও আগের লেখকদের গল্পের ওপর। সেই সময়ের গল্প হত কিংবদন্তি-আধারিত। তাতে যেগুলো মারাত্মক ভয়ের উপাদান বলে ভাবা হত, আজকের পৃথিবীতে সেগুলো নেহাত পানসে ঠেকতে বাধ্য। কিন্তু সেখানেও অনুবাদকের সার্থকতা যে তিনি গল্পগুলো অত্যন্ত সুখপাঠ্য করে তুলতে পেরেছেন।
তৃতীয়ত, 'এবং ইনকুইজিশন' উত্তর বাংলা সাহিত্যে পাঠককে ভয় পাওয়ানো কিঞ্চিৎ শক্ত। তাঁরা এখন 'ভয়' পাওয়ার জন্য যা দাবি করেন, তা এই গল্পগুলোতে নেই, থাকা সম্ভব ছিলও না।
তাই শেষ বিচারে বলব, বইটা পরে ভয় পেতে চাইলে আপনি ব্যর্থ হবেন। কিন্তু সুখপাঠ্য, নির্ভার, অনাড়ম্বর অনুবাদে বেশ কিছু অলৌকিক রসের গল্প পড়তে চাইলে এটি অবশ্যই পাঠযোগ্য।
একটি তারা খসালাম পচা প্রচ্ছদ ও ভেতরে দিলীপ দাস-এর ইয়ে টাইপের অলংকরণের জন্য।