মোটামুটি লেগেছে। সম্ভবত জীবনে এত ভৌতিক গল্প পড়েছি যে এই বইটা ভৌতিক গল্প পড়ার সেই শিহরন এনে দিতে পারেনি। অথচ ছোটোবেলায় কী ভালই না লাগতো। ছোটোবেলায় পড়লে হয়তো বেশ লাগতো। বই পড়ার ক্ষেত্রে তাই সময়কালটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
ভয় সমগ্র সিরিজ নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় রিভিউ। বিভূতিভূষণের পর এবার মঞ্জিল সেন। মোট ৩৫ টি গল্প স্থান পেয়েছে এই বইটিতে। প্রায়ই মৌলিক, কিছু বিদেশী কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে লেখা।
প্রথমে আসি গল্পগুলোর পজিটিভ দিক নিয়ে। মঞ্জিল সেন এখানে বৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। কোথাও দেখা যাচ্ছে গল্পের ভিলেন এক ভুতুড়ে আলমারি (আলমারি), কোথাও পসেসড হাত (আঙুল পিচাশ), মূর্তি (শয়তান), পুতুল (চীনা পুতুল), পেইন্টিং (অয়েল পেইন্টিং) বা পাঁচিল (প্রাচীর প্রহরী) আবার কোথাও গল্প আবর্তিত হয়েছে কুকুর (একটি কুকুর ও আমি) কিংবা সমুদ্রকে (সমুদ্রে যখন ঝড় ওঠে) কে নিয়ে। এছাড়া বিদেশি কিছু কনসেপ্ট যেমন ভ্যাম্পায়ার (রাতের আতঙ্ক), বডি ট্রান্সফরমেশন (পাখি) এসবও এসেছে।
টিপিকাল সাদা কাপড় পড়া নারী বা হাড় বের করা কঙ্কাল বা মামদো ভূতের ছা - এসবে আটকে থাকেননি মঞ্জিল সেন। তাঁর কল্পনাশক্তি ও পড়াশোনা যে বিস্তৃত তা লেখার রেঞ্জ থেকেই বুঝা যায়। হয়তো এজন্যই সত্যজিতের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি। . লেখক খুব চমৎকারভাবে বিদেশি ঐতিহাসিক কিছু হরর স্টোরি তুলে ধরেছেন। এর মাঝে লেডি আরাবেলার প্রেতাত্মা, পল্লিভবনের ভূত, ভৌতিক ঘটনা - বেশ ভালো লেগেছে। ভয় মেশানো সত্যি ইতিহাস। বিদেশি ছায়া অবলম্বনে লেখা আলফ্রেড ওয়াডহ্যামের ফাঁসি - লেখাটিও দারুণ। . এবার আসি লেখার নেগেটিভ সাইডটাতে। ব্যক্তিগতভাবে লেখকের দুটো সমস্যা চোখে লেগেছে।
১. ডেপথ এর অভাবঃ কাহিনী পরপর ঘটে যাচ্ছে। কী হচ্ছে সব গড়গড় বলে যাচ্ছেন। কিন্তু একটা যে পরিবেশ সৃষ্টি করা, ভৌতিক আবহ তৈরী করা - এটা লেখক পারেননি। অনেক জায়গায় প্রয়োজনের তুলনায় বর্ণনা কম। লাইনগুলোও একটার পর একটা গ্যাপ না দিয়ে লিখে দেয়ায় প্রতিটার গুরুত্ব কমে গেছে৷ যেমন বেগম সাহেবা, চীনা পুতুল, আত্নারা জেগে ওঠে, প্রেতাত্মার প্রতিহিংসা - ইত্যাদি গল্পে ইন্টারেস্টিং প্লট থাকলেও লেখক তার সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। আঙুল পিশাচ গল্পে তো বুঝলামই না হাতের মোটিভ কী, পাশাপাশি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, প্রোটাগনিস্ট হাতকে বাক্সে ঢুকায় আর হাত পালায়, আবার ঢুকায় আবার পালায় - এই নিয়ে কাহিনী শেষ। অথচ প্লটটা দিয়ে অনেক কিছু করা যেত। সিমিলার আরেকটি গল্প ছায়া। বসার আগেই কাহিনী শেষ।
২. প্রেডিক্টেবল কাহিনীঃ ৮০% কাহিনীর শুরুতেই বুঝা গেছে যে কে ভূত/কে ভিলেন/কী হতে যাচ্ছে। যেমন একটু চতুর পাঠক হলেই রাতের আতঙ্ক, চীনা পুতুল, নেপালি ড্রাইভার, পাখি, হাতের পাঞ্জা, রহস্যময়ী রমণী - প্রতিটাতেই দু পাতা যেতেই বুঝে যাবেন কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছে। লেখক শেষপর্যন্ত সাসপেন্স ধরে রাখতে পারেননি।
হয়ত বিভূতিভূষণ দিয়ে শুরু করার পর এক্সপেকটেশন হাই ছিল। সেই অনুযায়ী মঞ্জিল সেন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তবে একদম মন্দও লাগেনি। মিডিয়াম অনুভূতি বলা যায়।
কিন্তু মঞ্জিল সেন তাঁর লেখায় একটু সময়, বর্ণনা আর আবহ ঢাললেই যে কাহিনী দুর্দান্ত হতে পারে তার উদাহরণ - সমুদ্রে যখন ঝড় ওঠে। অনেক সময় নিয়ে এগিয়েছে কাহিনী। ফলস্বরূপ সাসপেন্স শেষতক ছিল। খুবই ভালো লেগেছে। সবচে ভালো লেখা বলবো এটাকেই।
এর পাশাপাশি পার্সোনাল ফেভারিট - আমি সুচরিতা বলছি, কয়লাখনির ভূত, বালকের প্রেতাত্মা, শয়তান, পোড়োবাড়ি ও প্রাচীর প্রহরী।
সবমিলিয়ে রেটিং ৩.৫/৫।
বই - ভয় সমগ্র - মঞ্জিল সেন (এটা প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় আরেকটি আছে), প্রকাশক - বুক ফার্ম, গায়ের মূল্য- ২৫০ টাকা।
বাজারের আর পাঁচটা ভূতের গল্পের বইয়ের থেকে ভালো, তবে আহামরি কিছু না; তবে প্রচুর অনুবাদ সাহিত্য আছে, যেটা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের পড়ে বাংলায় আবার দেখালাম। কয়েকটা গল্প বেশ জমজমাট, কিন্তু অনেকগুলোই বড্ড সাধারণ মানের...