এ-কালের অগ্রণী কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। বিশ শতকের প্রথম চতুর্থাংশ অতিক্রান্ত হবার আগেই তাঁর জন্ম; অথচ, আশ্চর্য ব্যাপার, সেই শতকের প্রান্তরেখা সম্পূর্ণ পেরিয়ে গিয়ে যখন নূতন শতকে ঢুকছেন, তাঁর পদক্ষেপ তখনও সমান দুঃসাহসী, তখনও জরার জং ধরেনি তাঁর কবিকণ্ঠে। যৌবনবয়সে যেমন ছিল, আজও তেমনি তেজী ও টাটকা তাঁর মানসিকতা; একইসঙ্গে, কবিতার নব-নব দিগন্ত অন্বেষণে ও উন্মোচনে তিনি আজও সমান ক্লান্তিহীন। এই রুগ্ণ সমাজের ব্যাখ্যাতা তিনি, এই দুঃস্থ দিবসের ভাষ্যকার। তাঁর দৃষ্টি যখন মানবসমাজের দিকে, তাঁর চোখে তখন অপার করুণার পাশাপাশি ঝিলিক দিতে থাকে অসীম কৌতুক; আর অন্তহীন বৈপরীত্যে ভরা এই সময়ের কথা যখন বলেন তিনি, তখন তাঁর আর্তি যেমন আমাদের অভিনিবেশের দখল নিয়ে নেয়, তাঁর প্রতিবাদও তখন আমাদের মর্মমূলে বাজতে থাকে। প্রেম, প্রতিবাদ, করুণা, কৌতুক, ব্যঙ্গ, বেদনা, শ্লেষ ও সহানুভূতির এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটেছে তাঁর কবিতায়, যার দীপ্তি ও দ্যোতনা আমাদের গোটা জীবন জুড়ে ছড়িয়ে যায়। যে-কবি সব সময়েই সমকালের সঙ্গী, এবং ঐতিহ্যকে অস্বীকার না-করেই যিনি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন তার সীমানা, তাঁর মানসিক বিবর্তনের বাঁকগুলিকে যাঁরা নির্ভুল চিনে নিতে চান, নীরেন্দ্রনাথের সামগ্রিক কবিকর্ম এই কবিতাসমগ্র তাঁদের সংগ্রহ করাই চাই।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্ম ফরিদপুর জেলার চান্দ্রা গ্রামে, ১৯ অক্টোবর ১৯২৪।পিতা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের বিখ্যাত অধ্যাপক।শিক্ষা: বঙ্গবাসী ও মিত্র স্কুল; বঙ্গবাসী ও সেন্ট পল’স কলেজ।সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দৈনিক ‘প্রত্যহ’ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। একসময় ছিলেন ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা।কবিতা লিখছেন শৈশব থেকে। কবিতাগ্রন্থ ছাড়া আছে কবিতা-বিষয়ক আলোচনা-গ্রন্থ। আর আছে উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনি।শব্দ-ভাষা-বানান-শৈলী নিয়ে রচিত বিখ্যাত বই ‘বাংলা: কী লিখবেন, কেন লিখবেন’।পুরস্কার: ১৯৫৮ উল্টোরথ, ১৯৭৩ তারাশঙ্কর, ১৯৭৪ সাহিত্য অকাদেমি, ১৯৭৬ আনন্দ। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি (২০০৪-২০১১)। সাহিত্য অকাদেমির ফেলো ২০১৬। এশিয়াটিক সোসাইটির ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণপদক ২০১৫। কলকাতা (২০০৭), বর্ধমান (২০০৮), কল্যাণী (২০১০) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডি লিট।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বিদ্যাসাগর লেকচারার হিসাবে ১৯৭৫ সালে প্রদত্ত বক্তৃতামালা ‘কবিতার কী ও কেন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯০ সালে লিয়েজে বিশ্বকবি-সম্মেলনে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি।শখ: ব্রিজ ও ভ্রমণ।