মশিউল আলমের লেখার সাথে পরিচয় প্রিসিলা বইটির মাধ্যমে। প্রিসিলা ভালো লাগাতে লেখকের অন্যান্য লেখাগুলোও পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই বইটিতে মোট দশটি গল্প আছে। অধিকাংশ গল্পের প্রেক্ষাপট উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে জয়পুরহাটে। 'আবেদালির মৃত্যুর পর' লেখকের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ। জীবন-ভাবনা, মানুষের সম্পর্ক কিংবা দারিদ্রপীড়িত জনপদের জীবনযাত্রার প্রতিফলন দেখা যায় গল্পগুলোতে।
বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ত
বিরজু গল্প কথকের সহপাঠী ছিল না, পড়তো নিচের ক্লাসে তবু তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল খেলাধুলার মাধ্যমে। মেথরের ছেলে হয়েও পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিল সে। ম্যাট্রিক পর্যন্ত তাদের একত্রে খেলাধুলা হয়েছে এবং একসময় ছিটকে যায় নিজের উপার্জনের সন্ধানে। বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার আগে এক রাখাল বালককে নিয়ে গল্প লিখেছিলেন কথক। নিম্নবর্গের মানুষকে নিয়ে গল্প লেখাতে কথকের বন্ধুরা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তাই গল্প কথক তারই একসময়ের বন্ধু বিরজুকে নিয়ে গল্প লিখেন এবং সেই গল্প লেখার কৈফিয়ত আমাদের প্রথম গল্পটি।
ক্ষুধার্ত আকালু
রৌমারিতে ধান না পাকার কারণে আরো দক্ষিণে ধান কাটতে চলে যায় আকালু। পথিমধ্যে নিজের শেষ সম্বল দশটি টাকা ভাগ্য বদলানোর জন্য এক ফকিরকে দিয়ে তাবিজ বানিয়ে নেয়। তারপর ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে যেতে যেতে প্রচন্ড ক্ষুধা পায় তার। তার মনে হয় যদি তাবিজের কারণে তার আর কোনো ক্ষুধা না থাকতো বড়ই ভালো হত। কিন্তু জীবিত ব্যক্তির ক্ষুধা থাকে, মৃত ব্যক্তির থাকেনা তাই ভেবে নিজেকে মৃত দেখতে চায় না আকালু।
আবেদালির মৃত্যুর পর
আবেদালি ক্ষেতলালের কৃষি ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ নিয়ে ছেলে জোবেদালিকে ভ্যান গাড়ি কিনে দেয়। কিন্তু সড়ক দূর্ঘটনায় জোবেদালি নিহত এবং ভ্যান চুরমার হয়ে যাওয়ায় একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অভাবে আবেদালির মাথায় হাত পড়ে। এদিকে ঋণ খেলাপির অভিযোগে আবেদালিকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ সেখানেই মারা যায় আবেদালি। তারই পরবর্তী ঘটনা নিয়ে গল্পটি।
অযোদ্ধা
এই গল্পটিও জয়পুরহাটের প্রেক্ষাপটে লেখা। মুক্তিযোদ্ধা জাহিদুর রহমান একসময় ঢাকা থেকে আসেন নিজের এলাকায় এবং সেখানের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে নিজেকে নিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে। কীভাবে তিনি আটক হলেন পাকিস্তানিদের হাতে, তারপর রাজাকার শাহেদ আলি তাকে মেরে ফেলার অনুরোধ করেন পাক-মেজরকে, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেন কিভাবে তারই বর্ননা দেখা যায় গল্পটিতে। গল্পের শেষে এমন একটি ঘটনা ঘটে যা পুরো জয়পুরহাটের লোকেদের বিস্মিত করে।
মশিউল আলমের গল্পের চরিত্রগুলো আমাদের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে। তাই চিনে নিতে খুব একটা কষ্ট হয় না। চরিত্রের ভিন্নতাই প্রমাণ করে তিনি সকল শ্রেণী-পেশার মানুষদের পর্যবেক্ষণ করেন। আঞ্চলিক সংলাপ ব্যবহার করাতে গল্পের সৌন্দর্য এতটুকুও ম্লান হয় নি; বরং বৃদ্ধি পেয়েছে বোধ করি। হ্যাপি রিডিং।