মেলার সময়ে স্টলে বসে দুয়েকবার অল্প অল্প করে কয়েক পৃষ্ঠা পড়া হলেও, পুরো বইটি পড়া হয়নি তখন। দীর্ঘ দেড় বছর পর কাল পুরোপুরিভাবে একটা বই পড়ে শেষ করলাম। মাঝে এতদিনের গ্যাপের কারণে পড়া অনেক স্লো হয়ে গেছে। গত ২ তারিখ রাত ৮ টায় বইটি নিয়ে বসছিলাম, দুয়েক পেজ পড়ার পরই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছিলো, আসছে ভোর ৫ টার পরে। পরদিন দুপুরে আবার পড়তে বসছি, ৭-৮ পেজ পড়ার পরে আবার লোডশেডিং, ফিরে আসছে সন্ধ্যায়।
তারপর ১০ টায় বসে টানা প্রায় রাত ৩ টায় বইটা শেষ দিয়েই ঘুমাতে গেলাম। আর ভাবতেছিলাম, পড়ার মাঝে ইলেক্ট্রিসিটি যে দুইটা দিন এভাবে সমস্যা করলো, এর পেছনে এল্ডার গডদের হাত নেই তো! বইয়েই প্রফেসর আর্মিটেজ বলছিল, "কিছু জ্ঞান মানুষের অজানাই থাকা উচিৎ!" :3
jokes apart 🐸
এক বসায় পড়ে শেষ দিলাম বইটি। সত্যি বলতে একটি বইয়ের মূল আকর্ষণ হচ্ছে বইয়ের নাম। হ্যাঁ, নামই। এর পরের আকর্ষণটি হচ্ছে প্রচ্ছদ। আর এই বইয়ের নামকরণের আকর্ষণে লেখক সেটার যথার্থ প্রয়োগ করেছেন। বইটির এই অদ্ভুত নামটি সবাইকেই আকর্ষণ করবে। হাওয়ার্ড ফিলপ লভক্রাফটের অন্যন্য সৃষ্ট এই কথুলহু(যেটা প্রথম প্রথম আমি কলুথুলু বলতাম মজা করে😜) নামটিও আগ্রহোদ্দীপক। আমিও যখন প্রথম নামটি শুনি/দেখি তখন থেকেই বইটি পড়ার ইচ্ছা।
আর বইটি পড়ার প্রতি আগ্রহের আরো যে-কয়েকটি কারণ ছিল, তারমধ্যমে বইয়ের ফ্ল্যাপের যেই কাহিনী সংক্ষেপ সেটি ফেসবুকের কল্যানে অনেক আগেই পড়া, আগ্রহোদ্দীপক কাহিনী সংক্ষেপ। আরেকটি কারণ হচ্ছে লভক্রাফটিয়ান থ্রিলার জনরার জন্য। লভক্রাফটের কথুলহু মিথোস নিয়ে বাংলা মৌলিক বই।
বইটি পড়ে আমার অনেক অনেক ভালো লেগেছে। দারুণ এক লভক্রাফটিয়ান থ্রিলার। এক কথায় বৈচিত্র্যময় কাহিনী। সাসপেন্স, মিস্ট্রি, সাইন্স এলিমেন্ট, মিথ সবই আছে বইয়ে। বিশাল পরিসরে, দেশীয় প্রেক্ষাপটে ঝড়ের বেগে চলেছে কাহিনী। কী নেই বইয়ে? কাল্ট, লেখকের ব্যক্তিগত দর্শন,অস্তিত্ব বিপন্নতার ভয়, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, টেকনোলজি, চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু আলো-আঁধারী অধ্যায় এবং আরো অজানা অনেক কিছু।
লেখকের লেখনী সম্পর্কে কী বলবো! লেখনী বেশ চমৎকার, বর্ণনাভঙ্গি, শব্দচয়ণ, বাক্যগঠন, সংলাপ সবকিছুই ভালো লেগেছে। কাহিনীতে গ্রামের দৃশ্যায়নটা ভালো লেগেছে, গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত ভয়ঙ্কর আবহ তৈরি করেছেন। মনে হচ্ছিলো যেন, ডক্টর জিয়া আমাকে সাথে নিয়েই চরোকি গ্রামের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আমার সাথেই সবকিছু ঘটছে ডক্টর জিয়ার সাথে সাথে। বর্ণনাভঙ্গিটা এতোটাই বাস্তবিক ও সাবলীল এবং প্রতিটা জায়গার এত সুন্দর ডিটেইল বর্ণনা দিয়েছেন, মনে হচ্ছিল লেখক আমাকে নিয়ে ওখানে ঘুরতে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে জায়গাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছেন খুব সন্দরভাবে। গল্পের ঘটনা প্রবাহে যা ঘটছে, তার সবই নিজের সাথেই অনুভব করছিলাম। লেখকের দারুণ লেখনী রহস্য, থ্রিল, সাসপেন্স ধরে রেখেছেন পুরো বইয়ে। পাঠককে বইতে ধরে রাখার মত লেখনী। গল্পের কাহিনীর মাঝে ঢুকে গেলে শেষ করেই উঠতে হবে।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৌতূহল ধরিয়ে রেখেছেন লেখক। কোথাও একটুর জন্যও ঢিল দেয়নি। কোথাও বর্ণনার আধিক্য মনে হয়নি। একদম মেদহীন চমৎকার একটি বই। লেখক শুরু থেকে রহস্যের জাল যেভাবে ছড়িয়েছেন, ঠিক সেভাবেই ধীরে ধীরে রহস্যের জাল গুটিয়েছেন নিপুণভাবে। চমৎকার প্লটে, দক্ষ স্টোরিটেলিংয়ে ভালোভাবে আবহ সৃষ্টি করেছেন লেখক।
ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট ভালো লেগেছে। মূল দুটি চরিত্রকে ঘিরে কাহিনী এগিয়েছে। জহির রায়হান, যে একজন চিত্রশিল্পী আর জিয়াউল হক, যে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। দুজনের চরিত্রায়ন অনেক ভালোভাবে করেছেন লেখক। যার কারণে জহিরের জন্য খারাপ লাগা শুরু হয়েছিল, চাচ্ছিলাম কোনোভাবে তাকে রেহাই দেওয়া হোক। অন্যান্য চরিত্রগুলোতেও লেখক ভালোভাবে কাজ করেছেন। কোনো চরিত্রই হুট করে চলে আসেনি বা হুট করে হারিয়ে যায়নি। তবে এই সাব-ক্যারেক্টারগুলোর ক্ষেত্রে চাইলে হয়তো আরো কিছু কাজ করা যেত বলে মনে হলো।
শেষের দিকে একটু ফাস্ট মনে হচ্ছিলো, আমিই কি শেষে এসে স্পিডে পড়ছিলাম নাকি লেখক তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন বুঝতেছি না। তবে, বইয়ের শেষে এসে মজার একটা ব্যপার মনে হলো। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মুভিগুলোর শেষে যেমন পরবর্তি মুভির হিন্ট হিসেবে "এন্ড ক্রেডিট সীন" থাকে, ঠিক তেমনই একটা আভাস দিয়েছেন বইয়ের সিক্যুয়ালের। যদি সত্যিই সিক্যুয়াল আসে তবে খুশি হবো।
শুরুতে বলেছিলাম বইয়ের দ্বিতীয় আকর্ষণের কথা, প্রচ্ছদ। হ্যাঁ, বইটির প্রচ্ছদটাও খুব ভালো লেগেছে। প্রচ্ছদটি এঁকেছেন নাজিম উদ দৌলা। আর নামলিপি করেছেন জুলিয়ান।
বানান ভুল নেই, প্রিন্টিং মিস্টেক—শব্দ ভেঙে যাওয়া বা শব্দ জোড়া লাগার মত শব্দও চোখে পড়েনি। কোথাও অসামঞ্জস্য ছিল না। ডায়েরির লেখার অংশের ক্ষেত্রে আলাদা ফন্টের ব্যববার ভালো লেগেছে। বইয়ের বাঁধাই, কাগজের মান ভালোই ছিল।
বইটি হররপ্রেমি, থ্রিলারপ্রেমি, রহস্যপ্রিয়, সাসপেন্স পছন্দকারিদের জন্য এবং লভক্রাফটিয়ান হরর/থ্রিলার-প্রিয় পাঠকদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। আর যাদের লভক্রাফটিয়ান হরর নিয়া ধারণা নেই, তারাও বইটি অনেক ভালোভাবে উপভোগ করবে, এবং লভক্রাফটের জগৎ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যাবেন। লেখক প্রথম বই দিয়েই বাজিমাৎ দেখিয়েছেন। পাঠকদের আমন্ত্রণ বইটি পড়ার জন্য।