দু’ হাজার বছর আগে রোমের লাভার্না গ্রামে বাস করতো শান্ত নম্র স্বভাবের সুদর্শন এক যুবক, নাম লিয়ামতিয়াস। দাদু আদর করে ডাকতো লিয়াম বলে। সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে মেষ চড়িয়ে বেড়াত লিয়াম। আর মাঝে মাঝে ধর্মের পবিত্র বাণী প্রচারের জন্য সেন্ট পিটারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তো দূর-দুরান্তে। প্রিয়তমা আর বৃদ্ধ দাদুই ছিল যার পুরো পৃথিবী।
ভয়ঙ্কর এক অশুভ রাত লিয়ামের পুরো জীবন ধ্বংস করে দেয়। সবুজ অরণ্যে ঘেরা প্রিয় গ্রাম ছেড়ে একেবারে হারিয়ে যায় গ্রামবাসীর অগোচরে।
শান্ত আর নম্র স্বভাবের লিয়ামতিয়াসের ক্ষিপ্র এবং নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনা। নৈতিকতা, আদর্শ, ধর্মের পবিত্র শপথ – সব বিসর্জন দিয়ে সে হয়ে উঠে হিংস্রতার এক প্রতীকী। কাঁদতে আর হাসতে চিরতরে ভুলে যায় সে। প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে তার তরবারি। তারপরও মেটে না তার রক্ততৃষ্ণা। প্রকৃত পিশাচের রক্তের সন্ধান পায় না সে। বছরের পর বছর যার রক্তে স্নান করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, ঠিক করে তার ইতিহাস সেই লিখবে…
যে ইতিহাস দু’ হাজার বছর পরও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত – “রোম যখন পুড়ছিল, নীরো তখন বীণা (লির) বাজাচ্ছিল।"
ঈশপ বলেছিলেন, একদা জিউস নাকি মানুষের সকল ভালোমন্দের নিশ্চয়তা কৌটায় পুরে এক লোকের কাছে রেখে অলিম্পাসে গিয়েছিলেন ফিরে এসে বিলিয়ে দেবেন বলে। বলে গিয়েছিলেন কৌটা যেনো না খোলা হয়। জিউসের কৌটা দেখার লোভ সে লোক সামলাতে পারেন নি। কৌটা খুলেছিলেন। খুলতেই কি সব যেনো উড়ে যাচ্ছিলো। ভয়ে তিনি কৌটা লাগিয়ে দেন। আসলে কৌটা খুলতেই সুখ-দুঃখের নিশ্চয়তা সব উড়ে গিয়েছিল, তাড়াতাড়ি কৌটা লাগিয়ে দেয়ায় নিচে পড়েছিল 'আশা'। জিউস সরল বিশ্বাসে তাই সকলের মাঝে বিলিয়ে দেন। সেই থেকে মানুষের সুখ-দুঃখের কোন নিশ্চয়তা নেই, মানুষ বেচে থাকে আশা নিয়ে.... আসলে ভুল বললাম। সবাই আশা নিয়ে বেচে থাকে না, কেউ কেউ আশা নিয়ে মরে থাকে, প্রতিদিন মরে যায়। মৃত একটা মানুষ জীবন্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তারা হয়ে থাকে জীবন্মৃত।।। হ্যা, এটা এক জীবন্মৃতের রক্ততৃষ্ণার গল্প, আরেক জীবন্মৃতের নতুন জীবন পেতে চাওয়ার গল্প, এ গল্প হয়তো এক ইতিহাসের...
সুন্দর এক জীবন ছিল লিয়ামতিয়াসের। দাদুকে নিয়ে সুন্দর এক সংসার করার স্বপ্ন ছিলো তার। কিন্তু মানুষ চিরকাল চায় এক, আর হয় আরেক। সে কি কখনো ভাবতে পেরেছিলো, জন্মই তার আজন্ম পাপ হয়ে রবে!!! আর আলিসা? তার জন্যেই হয়তো কবি লিখেছিলেন, "আপনা মাংসে হরিণা বৈরী"। এক দমকা হাওয়া শেষে অশুভ চন্দ্রগ্রহণের রাতে যে তাকিয়ে দেখেছে তার স্বপ্নগুলো.... এতো কাছে, তবু এতো দূর!!! ভীষণ না চাওয়াতেও এই দুই ভাগ্যের দেখা হয়ে যায় এক ইতিহাসের সাথে। কি ছিলো সেই ইতিহাস???
দুহাজার বছর আগের রোম এ উপন্যাসের পটভূমি। যতক্ষণ বইটা পড়বেন, আপনার মনে হবে এ এক অনিদ্যসুন্দর ঐতিহাসিক উপন্যাস। সে সময়কার রোমের ইতিহাস আমার জানা নেই তবে... ইতিহাস আমি যদ্দুর জানি, একে ঐতিহাসিক উপন্যাস না বললে ক্ষতি নেই। সম্ভবত সে সময়ের ইতিহাস উপন্যাসের উপকরণ মাত্র, অনুপ্রেরণা নয়। ইতিহাসের কিছু বিশেষ উপলব্ধি মানব ভাগ্যকে আমাদের কল্পনায় যে বিশিষ্ট তাৎপর্যে উদ্ভাসিত করে, উপন্যাসে লেখিকা তাকেই প্রাণদানের চেষ্টা করেছেন। বইয়ের সকল চরিত্রই ইতিহাসের এক বিষময় পরিবেশের শিকার। বইয়ের পাতায় তাদের সাথে চলতে গিয়ে অনুভূতি গভীরতা লাভ করে, আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়, হতাশ হৃদয় বিদীর্ণ হয়, রক্তাক্ত হয় মন। তবে সবচে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দুহাজার বছর আগের যে জীবনোপলব্ধিকে যে প্রকৃয়ায় 'রক্ততৃষ্ণা'য় উজ্জ্বলতা দান করা হয়েছে তা সর্বাংশে আধুনিক!!!
ইতালির শিল্পি Giusy D'Anna'র করা প্রচ্ছদটি সুন্দর লেগেছে। বইটা লম্বা ও চওড়ায় আগের দুটো বইয়ের চেয়ে বড় করা হয়েছে। ভার্জিন রেজিন অফসেট পেপার দিয়ে মুদ্রিত বইটির কাগজের মান, মুদ্রণ, বাইন্ডিং চমৎকার ও আমার অসচেতন দৃষ্টিতে নির্ভুল মনে হয়েছে। তবে বাইন্ডিং কোয়ালিটিতে এটাও প্রথম বইটার সমকক্ষ বা তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে এ বইটায় একটা বুকমার্ক ফিতা আছে, এ বিষয়টা খুব ভালো লেগেছে।
♣ যারা লেখিকার আগের দুটো বই পড়েছেন, তারা নিঃসন্দেহে দেখতে যাচ্ছেন মুদ্রার উল্টো পিঠ। আর যারা আগের দুটো বই পরেন নি, তারা পরিচিত হতে যাচ্ছেন এক নতুন মুদ্রার সঙ্গে!!!
♣ লিয়ামের জন্য আমার অদ্ভুত দুঃখ হচ্ছিলো। এখন তার সমস্ত পথ জুড়ে টলমল করছে একটি অশ্রু বিন্দু। ঐ অশ্রু বিন্দু পেরিয়ে এ জন্মে সে আর তার কাছে পৌঁছুতে পারবেনা; তাহলে আগামী জন্মগুলো সে কার দিকে আসবে ???
♣ দুঃখ হচ্ছিলো আলিসার জন্যে। কি অদ্ভুত! অবলীলাক্রমে কেউ বেছে নেয় পৃথক প্লাবন, কেউ কেউ এইভাবে চলে যায় বুকে নিয়ে ব্যাকুল আগুন!!!
♣ খারাপ লাগছিলো ইভানার জন্যে। কিছু মুগ্ধতা, কিছু অপূর্ণতা, কিছু বিস্ময় হয়তো তার কোনকালেই কাটবেনা। মুগ্ধতায় সে বলেছিলো, "এতদিন জেনে এসেছি, দেবতারা স্বর্গে বাস করেন। আমার জানায় ভুল ছিল। আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন কোন জীবন্ত দেবতা।"... অগণিত রাতেও যে মুগ্ধতা শেষ হবার নয়।।।
মায়া লাগছিল সম্রাজ্ঞী অক্টাভিয়ার জন্য, সেনাপতি কারবুলোর জন্য, সেন্ট পিটার, গুরু সেনেকা.... সবার জন্য। তবে সজ্ঞানেই এড়িয়ে গেলাম এ উপন্যাসের ভিলেন, নায়ক কিংবা কেন্দ্রীয় চরিত্রের কথা। সে সমন্ধে বিচারের ভার বই যারা পড়বেন তাদের উপর।।।
কিছু মন্দ লাগার কথাও বলতে চাই-
♦ আমি সরি, তবে বলতেই হচ্ছে, সবচে বাজে লেগেছে নামকরণটা। এই নামে অনীশ দাস অপু, মোশতাক আহমেদের বই থাকার পরও এই নামটাকেই কেন প্রয়োজন পড়লো!! কেন? কেন?? কেন??? ♦ যথারীতি এ বইয়ের পাত্রপাত্রীরাও অসাধারণ রূপবান-রূপবতী! কেন? সাধারণ কারো জন্যে কি কোন গল্প রচিত হতে পারেনা?? অবশ্য এর উত্তর হয়তো অবচেতন মনে লেখিকা দিয়ে দিয়েছেন- "অবচেতন মনেই মানুষ সৌন্দর্যের উপাসক। একজন সুদর্শন ব্যাক্তি যদি কোন কথা বলে সেই কথাটাকেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনায়....." ♦ বইয়ের সাইজটা আগেরগুলোর মতো হলে ভালো হতো। পাশাপাশি রাখতে সুবিধে হতো। দেখতে ভালো লাগতো। ♦ আগের দুই বইয়ের কিছু বিষয়কে খুব মিস করেছি। নায়ক আর খলনায়ক খোজার দ্বন্দ্বটা মিস করেছি, অসাধারণ সংলাপগুলোকে খুব মিস করেছি। ♦ এটা নিঃসন্দেহে বিশ্লেষণধর্মী উপন্যাস। কিন্তু ইতিহাসকে ধারন করতে গিয়ে কিছু সময় আমার কাছে গল্পের গাঁথুনি আলগা মনে হয়েছে। লেখিকা এ দিকে নজর দিবেন আশা রাখি।
"রক্ততৃষ্ণা" পড়েছি বেশ কিছুদিন হলো। কিন্তু এখনো আমি বাস্তবে ফিরতে পারিনি। ঘোরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টা অনেকটা এমন, টাইম মেশিনে চড়ে দুই হাজার বছর পেছনে চলে গিয়েছি। এখন সেই টাইম মেশিনটা আর খুজে পাচ্ছিনা। তাই আর ফেরা হয়ে ওঠেনি। আমি অভিভূত। গল্প, ইতিহাস, মিথ, অনুভূতির এত সুন্দর সংমিশ্রণ আমাকে অভিভূতই করেছে। প্রতিটি কথা, এমনকি না বলা কথাগুলোও আমাকে ছুয়ে গিয়েছে।
ধন্যবাদ জিমি হাইসন আপু "রক্ততৃষ্ণা" নামক টাইম মেশিনটি আবিষ্কারের জন্য।
"রক্ততৃষ্ণা"র মাধ্যমে পাঠকের বইয়ের প্রতি তৃষ্ণা যে বেড়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
টাইবার নদীর তীরে, সাত পাহাড়ের মাঝে রোমিউলাসের সুন্দরী রোম। যে রোমের বাসিন্দারা শিল্পে, স্থাপত্যে, শক্তিতে হয়ে উঠেছিল অদ্বিতীয়, সামাজ্য বিস্তার করেছিল ব্রিটেন পর্যন্ত। কালের সাথে সাথে সিজারদের অত্যাচার আর কুশাসনও গ্রাস করে নিচ্ছিলো রোমকে।
৫৪ খ্রিস্টাব্দ। সম্রাট ক্লডিয়াসকে বিষপান করিয়ে হত্যা করেছেন তারই ভাতিজি এবং স্ত্রী অ্যাগ্রিপিনা দি ইয়ংগার। বিষাক্ত মাশরুম খাইয়ে হত্যা করা হলো মৃত সম্রাটের প্রথম স্ত্রীর পুত্র ব্রিটানিকাসকেও। রোমান সাম্রাজ্যের মুকুট পরলেন অ্যাগ্রিপিনার সন্তান নীরো।
তখনো বেশীদিন হয়নি, বহু ঈশ্বরবাদী প্যাগান ধর্মের অনুসারী রোমানরা যীশুর সাম্য ও একেশ্বরবাদের বাণী সহ্য করতে না পেরে ক্রুশবিদ্ধ করেছে তাঁকে। তবু তাঁর অনুসারীরা লুকিয়ে প্রচার করতে থাকলেন খ্রিস্টধর্ম। সেই বার্তা পৌঁছুলো রোমান রাজধানীর অদূরে লাভার্না নামের ছোট্ট এক গ্রামে।
সেখানে কুটিরে বাস করে লিয়ামতিয়াস, তার দাদুকে নিয়ে। লিয়ামের যখন দু'বছর, তখন অত্যাচারী স্বৈরশাসক ক্যালিগুলা সিজারের সৈন্যবাহিনী তুলে ��িয়ে যায় তার মা'কে, বাধা দিতে গিয়ে মারা যান বাবাও। সেই থেকে লিয়াম ও তার দাদা নিকোসা একে অন্যের অবলম্বন হয়ে বেঁচে আছে।
আঠারো বছরে পা দিয়েছে লিয়াম। সেইন্ট পিটার ও পলের সাথে প্রায়ই দূর দূরান্তে যায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারে। বাদবাকি সময় পাহাড়ে পাহাড়ে মেষ চড়ায়। দেখতেও সে সুদর্শন, গ্রামের মেয়েরা তার প্রতি আকৃষ্ট। কিন্তু লিয়ামের মন পড়ে থাকে নদীর ওপারে পাথরের উপর বসে থাকা ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটির কাছে। সেই ছোটবেলা থেকে, মেষ চড়াতে গিয়ে রোজ তাকে দেখে লিয়াম। কবে যেন ভালোও বেসে ফেলেছে, কখনো কথা না বলেই।
একদিন সাহস করে চলে গেলো পাহাড় পেরিয়ে মেয়েটির বাড়িতে। নাম তার আলিসা। ফেরালো না তাকে আলিসা, মন বিনিময় হলো। খ্রিস্টধর্মের চাদরের নিচে নিয়ে এলো লিয়াম প্রিয়তমাকেও। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল দুজনের।
কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। বিয়ের আর মাত্র চারটে দিন বাকি। ধর্ম প্রচারে রেভিটে গিয়েছে লিয়াম। ফিরে এসে দেখল সব তছনছ হয়ে গেছে। দুর্বৃত্তের হামলা হয়েছে আলিসার ওপর, দাদুর ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে আছে কমিটিয়ামের পাশে।
জেনে গেলো লিয়াম, তার পরমশত্রুটি কে! প্রতিশোধের আগুনে জ্বলন্ত জীবন শুরু হলো লিয়ামতিয়াসের। আলিসাকে উদ্ধার করবে, তার আগে তরবারির ফলার আঘাতে টুকরো টুকরো করবে শত্রুকে।
লিয়ামতিয়াস কি পারবে তার রক্ততৃষ্ণা মেটাতে?
জিমি হাইসনের লেখা 'রক্ততৃষ্ণা' উপন্যাসটি ইতিহাস আশ্রিত হওয়ায় আমার এমনিতেই বইটির প্রতি আগ্রহ ছিল একটু বেশি। লেখিকা তার উপন্যাসের পটভুমি সাজিয়েছেন রোমান সাম্রাজ্যকে কেন্দ্র করে। প্রাচীন রোমান সভ্যতা, খ্রিস্টধর্মের প্রসার, আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা উঠে এসেছে গল্পে।
গল্পটার মূল ভিত্তি লিয়াম - আলিসার প্রেম হলেও, তাতে বহুলাংশে স্থান পেয়েছে রোমান সম্রাট নীরোর জীবনকাহিনী। নীরোর অত্যাচার, বহুগামীতা, খামখেয়াল, রাগ আর কুপ্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে করা কর্মকান্ড একসাথে করে লেখিকা ফুটিয়ে তুলেছেন ভয়ংকর এক চরিত্র। যে কখনো অন্য নারীর লোভে মস্তকচ্ছেদ করছে নির্বাসিত স্ত্রীর, খুন করেছে মা'কে, পেটে লাথি মেরে হত্যা করেছে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে, পথ চলতে চলতে খেয়ালের বশে গলা কেটে ফেলেছে নিরীহ ফলওয়ালার। মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে শত শত খ্রিষ্টানের, তার সেনাপতি ও নিকটজনদের। ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে বিদ্রোহ আর প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, এত মানুষের আর্তনাদ আর অভিশাপ তাড়া করে বেড়িয়েছে নীরোকে।
অন্যদিকে ছিল প্রতিশোধের অনলে দগ্ধ লিয়াম আর তার অপেক্ষায় জীবন্মৃতের মত বেঁচে থাকা আলিসার গল্প। আলিসাকে নিয়ে সুন্দর সংসারের স্বপ্ন পাশে সরিয়ে রেখে রক্ত পিপাসাকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিল লিয়াম। কিন্তু তার জন্য তাকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য, শান্ত - কোমল তরুণ পরিণত হয়েছে ঘৃণায় ভরা এক পাথরের মূর্তিতে, অন্তর থেকে কেড়ে নিয়েছে প্রেম।
ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস আমার সবসময়ই প্রিয়। লেখিকা গল্পকে বাড়তি তথ্য দিয়ে একঘেয়ে করেননি, তবে ছুঁয়ে গেছেন নীরোর জীবনের বেশীরভাগ ঘটনাই। উপন্যাসটি নীরো ও রোমান সভ্যতা সম্পর্কে আরো জানতে আমাকে আগ্রহী করেছে। ক্লডিয়াস, ক্যালিগুলা, অ্যাগ্রিপিনা, অক্টাভিয়ার মধ্যকার সম্পর্কগুলো পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে জেনেছি। উপন্যাসের শুরুতে খ্রিস্টাব্দের হিসেবে একটু গরমিল রয়েছে, যেটা পরে কোনো মুদ্রণে লেখিকা হয়তো শুধরে নেবেন।
'রক্ততৃষ্ণা' বাংলাদেশী লেখিকা জিমি হাইসনের মৌলিক উপন্যাস। লেখিকার গল্প বলার ধরণ যথেষ্ট পরিপক্ক। ইতিহাসের ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখতে মাঝে মাঝে কিছু কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ তবে ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা উপন্যাসটি পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখবে।
বইটির আকার সাধারণ বই থেকে একটু বড়, অনেকটা ছোটবেলার রূপকথার গল্পের বইয়ের মতো।চড়া দাম চুকানোর দুঃখ ভুলেছি চমৎকার বাঁধাই ও উন্নত মানের পাতার জন্য। বানানের ক্ষেত্রেও সচেতনতা ছিল। প্রচ্ছদ বেশ ভালো লেগেছে।
রাজনীতি, ধর্ম, যুদ্ধ, আর পাপিষ্ঠের অত্যাচারের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া অসমাপ্ত প্রেমকাহিনী 'রক্ততৃষ্ণা' পড়ার আমন্ত্রণ রইলো পাঠকদের প্রতি।
রিভিউ:: বইয়ের নাম : রক্ততৃষ্ণা, এক যোদ্ধার অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি। লেখক : জিমি হাইসন। জনরা : হিস্ট্রিক্যাল ফিকশন। প্রকাশনা : ঐতিহ্য প্রকাশনী প্রকাশকাল: জানুয়ারী ২০১৯ পৃষ্টা সংখ্যা: ২৪৮। মূল্য : ৫৫০ টাকা (গায়ের দাম)।
কাহিনী সংক্ষেপ ::
গল্পটা দুই হাজার বছর পূর্বেকার। প্রাচীন রোমে। রোমে তখন সিজারদের রাজতন্ত্র চলছে। সেই সময়ে লাভার্না গ্রামে বাস করতো এক বালক লিয়ামতিয়াস। শান্ত ভদ্র, এই বালকটিকে তার দাদু ভাই ডাকতো লিয়াম বলে। পাহাড়ের ধারে মেষ চড়াত আর মাঝে মাঝে সেন্ট পিটারের সাথে ধর্মের বানী প্রচার করতো। এছারাও নদীর ওপারে এক মেয়ের সাথে ভাব ছিল। সময়ের সাথে সাথে ভাব প্রনয় হলো। মেয়েটির নাম আলিসা। তো লিয়াম এর জীবনে দাদুভাই নিকোসা, আলিসা আর মেষ গুলোই ছিল সব।
তখন রোম এ চলছি নীরো সিজার এর রাজতন্ত্র। শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত আর কাব্য পাঠে সিজার নীরো ছিল অনন্য। পুরো রোম জুড়ে গড়ে তুলেছেন কাব্য পাঠের আসর। সেই সাথে নীরো সিজার ছিল প্রচন্ড রকম নারী লোভী। প্রজাদের ঘরে থেকে নারী উৎচ্ছেদ করে সম্ভ্রান্ত্র লুট করাই ছিল তার কাজ। তাছারা ব্যাভিচারি কর্ম অহরহ করতেন নীরো। আবার প্রজাদের মনও জয় করে নিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে লিয়াম সেন্ট পিটার এর সাথে ধর্ম প্রচারে গিয়েছে। ফিরে এসে তার বাগদত্তা আলিসার সাথে বিয়ে হবে। কিন্তু হায় ভয়াংক নিয়তি তে ছিল না সেসব। ফিরে এসে লিয়াম যা দেখল তা হয়ত কখনো ভাবেননি। ভংকর সেই রাত লিয়াম এর পুরো জীবন ধংস করে দেয়। লিয়াম গ্রাম ত্যাগ করে। শান্ত ভদ্র লিয়াম হয়ে উঠে বিক্ষিপ্ত প্রতিশোধ পরায়ন আর আবেকহীন নিষ্ঠুর। ধর্মের নামে নৈতিকতা,আদর্শ সব জলাঞ্জলী দিয়ে লিয়াম হয়ে উঠে হিংস্র। শতশত লোক মারা যায় লিয়াম এর তরবারির ধারে। তবুও মিটে না তার রক্ততৃষ্ণা। বছরের পর বছর ঘুরে চলছে সেই রক্তের জন্য যে রক্তে মিটাবে তার রক্ততৃষ্ণা। লিয়ামতিয়াস কি পারবে মিটাতে তার রক্ততৃষ্ণা।
শুরু হয় রোমান আর্মেনিয়ার যুদ্ধ, ক্রুশ বদ্ধ হয় সেন্ট পিটার, একে একে করে খ্রিষ্টানদের বলি দেয় নীরো । শুরু হয় রোমান ইহুদীদের যুদ্ধ আর শতাব্দীর ভয়নাক অগ্নিকান্ড। ভয়নাক সেই রাত পুড়ে যাচ্ছে সমগ্র রোম তখন মোহনীয় এক সুরে বীনা বাজাচ্ছে নীরো।
রোম যখন পুড়ছিলো নীরো তখন বীণা (লির) বাজাচ্ছিলো।
পাঠপ্রতিক্রিয়া :: রক্ততৃষ্ণা, এক যোদ্ধার অসমাপ্ত প্রেমকাহিনী। প্রথমত্ব পাঠ প্রতিক্রিয়ায় বলবো গল্পটি সত্যি খুব দারুন লেগেছে। রোমান প্রেক্ষাপট, প্রেম ভালোবাসা, আবেগ যুদ্ধবিগ্রহ প্রতিশোধ মিথ কি ছিলো না এটায়? গল্পটি মূলত প্রেম ভালোবাসার হলেও গল্পটিতে বড় অবস্থানে আছে সম্রাট নীরো সিজার এর শাসনকাল। তার অত্যাচার ব্যাভিচার, খামখেয়ালীপনা,মাতৃহত্যা কিংবা প্রেমিকাকে লাথি দেয়া কিংবা গুরু সেনেকা কে হত্যা ইত্যাদি ভ��কর চরিত্র গুলো লিখিকা তুলে ধরছেন খুব সুন্দর ভাবে। রোমান অগ্নিকান্ড, রোমান ইহুদীদের যুদ্ধ আর নীরো শাসনকাল ইত্যাদি ইতিহাস ছিল ভালো লাগার মতোই। অন্যদিকে প্রতিশোধ পরায়ণ লিয়াম আর অসহায় নিরুপায় আলিসা চরিত্র দুটোই ছিল অসাধারন। তাই মূখ্য চরিত্র সৃষ্টিতে লেখিকা সার্থক। এরি পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্র গুলোও চোখে পরার মতো। তাই বলা যায় গল্প ও চরিত্র সৃষ্টিতে লেখিকা সার্থক। রক্ততৃষ্ণা বইটার প্রতি আমার আকর্ষন শুরু থেকেই ছিল যখন ট্রিজার ট্রেইলার এ জানতে পারি গল্পটি নীরোর মিথটা নিয়ে। তো ফাইনালি বইটি পড়ে শেষ করলাম। শেষ করে একটি ঘোর লাগনো মুহর্তে আছি।
তরুন লেখক লেখিকাদের মাঝে জিমি হাইসনে নাম গত কয়েক বছর যাবৎ আলোচনার টেবিলে । তার লেখার প্রেক্ষাপট প্রায় সবগুলো বইতেই রোমান দের নিয়ে । এর আগে তার রচিত এ মিস্ট্রি অফ ফোর্থ সেঞ্চুরি এবং এ ফায়ার অফ ফোর্থ সেঞ্চুরি যুগোল বই দুটো এক সাথে পড়েছিলাম। রোমান প্রেক্ষাপটে গল্প গুলো সত্যি ভালো লাগার মতো। এবং ইন্দ্রজাল বইটিও ছিল সুন্দর। জিমি হাইসনের সবগুলো গল্প ছোট ছোট ভাগ করে লিখেন আর এই স্টাইলে লেখা পাঠককে টেনে ধরে রাখে। তাছারা তার লেখা খুবই সফট, গুরুগম্ভীর শব্দ বা ভিন্ন ভাষার ব্যবহার নেই। তাই আশা করি তরুন এই লেখিকার হাত থেকে সামনে আরো বই পাবো।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর বই এর পেজ এর মান নিয়ে কথা বলা লাগে না। ক্রিম কালার এর পেজ চোখের জন্য খুবই আরামদায়ক। ছাপা ছিল সুস্পষ্ট, বানান ভুল একেবারেই নেই। বাধাঁইটা খুব ভালো। কয়েকবার পড়লেও আশাকরি নষ্ট হবেনা।
ইতালিয়ান স্টুডিও Giusy D'Anna এর করা এই প্রচ্ছদ আমার দৃষ্টিতে ২০১৯ এর বেস্ট প্রচ্ছদ।
সর্বাপরি রক্ততৃষ্ণা বইটা নিয়ে আমার দারুন একটা সময় কেটেছে। তাই আলোচনা সমালোচনা শেষ বইটিকে রেটিং দিবো ৪/৫।
ফ্ল্যাপ থেকে: দু’ হাজার বছর আগে রোমের লাভার্না গ্রামে বাস করতো শান্ত নম্র স্বভাবের সুদর্শন এক যুবক, নাম লিয়ামতিয়াস। দাদু আদর করে ডাকতো লিয়াম বলে। সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে মেষ চড়িয়ে বেড়াত লিয়াম। আর মাঝে মাঝে ধর্মের পবিত্র বাণী প্রচারের জন্য সেন্ট পিটারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তো দূর-দুরান্তে। প্রিয়তমা আর বৃদ্ধ দাদুই ছিল যার পুরো পৃথিবী।
ভয়ঙ্কর এক অশুভ রাত লিয়ামের পুরো জীবন ধ্বংস করে দেয়। সবুজ অরণ্যে ঘেরা প্রিয় গ্রাম ছেড়ে একেবারে হারিয়ে যায় গ্রামবাসীর অগোচরে।
শান্ত আর নম্র স্বভাবের লিয়ামতিয়াসের ক্ষিপ্র এবং নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনা। নৈতিকতা, আদর্শ, ধর্মের পবিত্র শপথ – সব বিসর্জন দিয়ে সে হয়ে উঠে হিংস্রতার এক প্রতীকী। কাঁদতে আর হাসতে চিরতরে ভুলে যায় সে। প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে তার তরবারি। তারপরও মেটে না তার রক্ততৃষ্ণা। প্রকৃত পিশাচের রক্তের সন্ধান পায় না সে। বছরের পর বছর যার রক্তে স্নান করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, ঠিক করে তার ইতিহাস সেই লিখবে…
যে ইতিহাস দু’ হাজার বছর পরও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত – “রোম যখন পুড়ছিল, নীরো তখন বীণা (লির) বাজাচ্ছিল।"
মূল রিভিউ:
ফ্ল্যাপের অংশ পড়লেই বুঝা যায় এটি কোনো সাধারণ প্রেমকাহিনী নয়। এ বইয়ের পটভূমি রোম, সময়কাল যীশুর মৃত্যুর কয়েক বছর পর। অত্যাচারী ক্যালিগুলা সিজারের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তারই প্রিটোরিয়ানের তরবারির আঘাতে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। এরপর ক্লডিয়াস সিজারের শাসনকাল শুরু হয়। তোতলা ও খোঁড়া হবার দৈন্যতা ঢাকতে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকেন গ্রন্থাগারে।
ক্লডিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর রোমের সিংহাসনে বসেন নীরো সিজার৷ তার রক্তে বইছে ব্যভিচারী নারী মাতা এগ্রিপিনার রক্ত। আছে অত্যাচারী সম্রাট মামা ক্যালিগুলা সিজারের রক্তও। তারপরও রোমানবাসীর বিশ্বাস রাজপুত্র নীরো হয়তো জনসাধারণের রক্ষক হবেন৷ কারন, গুরু সেনেকার সাহচর্যে তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। যুবক বয়সেও তিনি তাকে সঠিক পথ দেখাবেন। সাহিত্যের প্রতি যার প্রবল অনুরাগ, ভালো কবিতা লেখে যে, চমৎকার বীণা বাজায় যে, অভিনয় শিল্পী হিসেবে যার দক্ষতা অতুলনীয়, এমন শিল্পমনস্ক ব্যক্তির দ্বারা জনগণের ক্ষতি হতে পারে? এ তো অসম্ভব!
নীরো বড় হতে হতে বেপরোয়া হতে থাকে। রোমের ইতিহাসে যা কখনো কেউ করেনি, সেসব ঘটনার সূত্রপাত সে ঘটাতে শুরু করে। সম্রাটদের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাদের মনোরঞ্জনের জন্য দাসী থাকে। নীরোরও দাসী আছে। তারপরও সে বন্ধু ওপ্পোর পত্নী পপ্পিয়ার প্রেমে হাবুডুবু খায়। মাতা এগ্রিপিনা, স্ত্রী সম্রাজ্ঞী অক্টাভিয়াকে তার পথের কাঁটা মনে হতে থাকে। মনে মনে তাদের পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার শয়তানী ষড়যন্ত্র করতে থাকে, যাতে ইন্ধনদাত্রী চতুর ছলনাময়ী পপ্পিয়া।
অন্যদিনে, রোমের এক গ্রাম লাভার্নায় বড় হতে থাকে লিয়াম, যে বয়সে নীরোর কাছাকাছি। লিয়াম মা-বাবা হারা অনাথ এক ছেলে, যে একমাত্র দাদুকে অবলম্বন করে বেঁচে আছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দাদুর মাধ্যমে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা লাভ করতে থাকে। সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের সাথে বিভিন্ন জায়গায় যেয়ে ধর্মের বানী প্রচার করতে থাকে। জীবনের একটা পর্যায়ে প্রেম আসে, লিয়ামের সাধারণ জীবনেও আলিসার আবির্ভাব হয়। আলিসা, পাহাড়ের ওপারে যার বাস। বাবার সাথে থাকে সে। ছোটবেলা থেকেই লিয়ামকে দেখে তার মনেও লিয়ামের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করে। একটা সময় বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু বিপত্তি বাধে বিয়ের কিছুদিন আগে লিয়াম ও বাবা ফিলোপাসের ধর্মপ্রচারে বাড়ির বাহিরে থাকায়। দাদু নিকোসার অসুস্থতা, লিয়াম ও বাবা ফিলোপাস বাহিরে থাকার কারনে আলিসা বৃদ্ধ নিকোসাকে দেখতে লিয়ামদের গ্রামে যায়। সেখানে দাদুর সাথে কিছুসময় কাটিয়ে বাড়িতে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনা ঘটে। এ অংশ অব্যক্তই থাক।
ধর্মপ্রচার শেষে বাড়ি ফিরে লিয়াম৷ এসে গ্রামবাসীর মুখে শুনে তার জীবনের মোড় ঘুরে যাবার দুটি ভিন্ন ঘটনা। একদিকে বৃদ্ধ দাদু নিকোসা, অন্যদিকে বাগদত্তা আলিসা। কোমল, শান্ত স্বভাবের লিয়াম বদলে যায় নীরব, নিষ্ঠুর এক যুবকে। হাজার হাজার মানুষের রক্তেও যার রক্ততৃষ্ণা মেটে না। রোমান সম্রাটের শেষ মর্মান্তিক পরিণতি দেখার জন্য যে বদ্ধ পরিকর!
শেষ পর্যন্ত লিয়াম কি পারবে তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে? আলিসা ও বৃদ্ধ দাদুর পরিণতি কী? জানতে হলে পড়তে হবে "রক্ততৃষ্ণা"।
চরিত্র বিশ্লেষণ (স্পয়লারযুক্ত):
১/ লিয়ামতিয়াস: এই বইয়ের মূল চরিত্র লিয়ামতিয়াস, যাকে আমার পক্ষে পুরোপুরি পছন্দ করা সম্ভব হয়নি৷ বাগদত্তা আলিসাকে সে শৈশব থেকেই ভালোবাসে, অথচ যখন বিয়ের বয়স হয় তখন তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল আলিসার সাথে গোপনে প্রণয় পর্ব চালিয়ে যাওয়া। কারণ, ধর্মপ্রচারকরা সংসারী হয় না। আবার আলিসার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবে, কিন্তু এর জন্য সে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে চক্রান্ত সাজাতে। কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে আরেকজন নির্দয়ের মত টানা নয় বছর ভোগ করলো, সে বারবার মিনতি করলো এভাবে সে বাঁচতে চায় না, আলাদা সংসার করে সুখী হতে চা���় এটা সে মানতে নারাজ। দীর্ঘ নয় বছর পর জীবনের একমাত্র প্রেমিকাকে বলে প্রতিশোধটাই আসল। বিয়ের জন্য যে আবেগ দরকার তার সেটা নাই কিন্তু তারপরও করার জন্য করবে। মানে যেহেতু প্রেমিকার সতীত্ব নাই তাই তাকে সমাজের খাতিরে দয়া করতে চায়। অথচ আলিয়া দয়া চায়নি, সে ভালোবাসা চেয়েছে। চেয়েছে তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পেতে। আমার কাছে খারাপই লেগেছে এই অংশটায়। আর মূল চরিত্রকে লেখিকা যেভাবে পোট্রে করতে চেয়েছেন ঠিক সেভাবেই আমার চোখে ধরা দিয়েছে। মূল চরিত্র হলেই যে তাকে শুধু ভালোবাসতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। তার প্রতি মনে বিরক্তি আসতে পারে, তাকে অপছন্দ হতে পারে। আবার বইয়ের শেষদিকে এসে তার খারাপ লাগার সাথে একাত্ন হয়ে বুক চিড়ে বের হতে পারে দীর্ঘশ্বাস! চরিত্রের সার্থকতা তো এখানেই!
২/ আলিসা: আলিসার কথা লিয়ামতিয়াস অংশেই বলেছি। আলিসা চরিত্রটি সমাজের অবহেলিত নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে। যে কোনো মেয়ের স্বপ্ন থাকে একদিন তার বিয়ে হবে, তার জন্য এক রাজকুমার আসবে, তাকে যথার্থ সম্মানের সাথে ঘরের বউ করে নিয়ে যাবে। তার কোল আলো করে সন্তান আসবে, সুখের সংসার হবে। কিন্তু বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর হওয়া মেয়েদের জন্য আশীর্বাদ না, কিছুক্ষেত্রে অভিশাপও বটে! নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ মনের অধিকারী আলিসার সম্ভ্রম কেড়ে নেয়ার পর তাকে যখন লম্পট সম্রাট নীরো তার যৌনদাসী বানানোর জন্য আজীবনের জন্য নিয়ে যায়, তখন ভাবছিলাম, বর্তমানেও এ চিত্র কতখানি সাদৃশ্যপূর্ণ! এই যে প্রতিনিয়ত সমাজে নারীরা ধর্ষিত হয় এজন্যেও তো সেই নারীকেই সমাজ দোষারোপ করে। কলঙ্কের দাগ বয়ে বেড়ানোর দায় আজীবন নারীরই, পুরুষকে কলঙ্ক ছোঁয় না। বর্তমান সমাজের সাথেও এই লেখাটা অনেক বেশি যুক্ত করা যায়।
৩/ সম্রাট নীরো: সম্রাট নীরোর ইতিহাস যারা জানেন তাদেরকে আলাদাভাবে কিছু বলার নেই। তার অবদান শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্যে, সঙ্গীতে অনেক। এসবের জন্য তিনি সহজেই সমাজে সমাদৃত হতে পারতেন। কিন্তু ওই যে, গাছ যেমন তার ফলন তেমন। ব্যাভিচারিনী মা আর অত্যাচারী মামার রক্ত তার শরীরে, হাজার সদুপদেশেও কি সে পরিবর্তিত হয়? গুরু সেনেকার সাহচর্যে থেকেও তাই নিজেকে সে বদলাতে পারেনি। একদিকে গুরুকে ভক্তি করে, তাকে সমীহ করে; অন্যদিকে সে তার মা-মামাকে ঘৃণা করা সত্ত্বেও তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে। লাম্পট্য বাদেও তার অনেক ভুল সিদ্ধান্ত আর একগুয়েমির জন্য তাকে একটা সময় পর সবাই ঘৃণা করা শুরু করে। বিশেষ করে, সেনাপতি কারবুলোর নির্মম মৃত্যুর জন্য তাকে সবাই ত্যাগ করা শুরু করে। তার করুণ পরিণতি তাই শুরু থেকেই কাম্য।
পরিশেষে বলব, অনেকদিন পর জিমি তানহাব আপুর বই পড়ে ভালো লেগেছে। উনার লেখা বইগুলো ইতিহাস আশ্রিত ফিকশান। আশা করি যারা পড়েননি পড়তে পারেন৷ ভালো লাগবে আশা করি।
নিচে ছোট্ট করে একটা কবিতা দিলাম। বইটা পড়ার পর খারাপ লাগছিলো। সে খারাপ লাগা থেকেই এই কবিতা লিখেছি:
নীরোর হাতে বীণা, বীণাতে সুর তোলে সম্মুখে নিথর এক কিশোরী, বস্ত্রাবরণ ভূমিতে লুণ্ঠিত। কম্পমান প্রদীপের আলোয় ধোঁয়াটে লাগছে সব। সম্রাট নীরো, যেন সাক্ষাৎ এপোলো এপোলোর আশীর্বাদপুষ্ট সে তবুও কোন এক শূণ্যতা, আহাজারি। শত শত নারীর সতীত্ব হরণেও যার পিপাসা মেটে না। নিষ্প্রভ আলোয় স্তিমিত কিশোরীর লাঞ্চিত মনের অভিশাপে অভিশপ্ত লুসিফারের প্রণয়সুখ মেটে না। বীণা হাতে এপোলো, নাকি সাক্ষাৎ কামদেবতা। কামার্ত হায়েনার মতন ক্ষুধিতপাষাণ হৃদয়ে পরবর্তী শিকারের ছক সাজায়। হায় কিশোরী, অষ্টাদশী উর্বশী, দরিদ্র কুটির ছিল যার অভয়ারণ্য। মুহুর্তে হারিয়ে ফেললো নিজেকে, নিভে গেলো সলতের প্রান্তদেশের মতন।
This entire review has been hidden because of spoilers.
পিতামাতাহীন এক বালক লিয়ামতিয়াস দাদুর কাছেই বেড়ে উঠা । লার্ভানা নামক গ্রামের পাহাড়ে মেষ চড়াত আর পাহাড়ে নদীর ওপারে আলিসা নামের মেয়ের সাথে ছিল বাল্যকাল থেকেই কথোপকথনবিহীন চোখাচোখি প্রণয় । সময়স্রোতে লিয়াম-আলিসার প্রণয়ে পারিবারিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত ।সেন্ট পিটারের সহিত লিয়াম মাঝেমধ্যে বের হতো ধর্মের বাণী প্রচারে!
রোমে চলছে তখন সম্রাট নিরোর সাম্রাজ্য ।নিরো ছিল মাত্রাতিরিক্ত জেদি, নারীপূজারী আবার শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী ।তরুণ সম্রাট নিরো জয় করেছিল প্রজাদের মন কিন্তু সাথে সে ব্যাভিচারে লিপ্ত হতো অহরহ ।পরোয়া করত না নিজ মাতা,গুরু সেনেকা ,নিজ স্ত্রীসহ তার সাম্রাজ্যের কাউকেই ।
লিয়ামতিয়াস গিয়েছিল একবার অল্পদিনের জন্য ধর্মপ্রচারে, প্রত্যাবর্তন করেই হতো লিয়াম-আলিসা জুটির বিয়ে কিন্তু নিয়তি ,এক রাতে সম্রাট নিরোর আক্রমণে প্রিয় দাদুর মৃত্যু আর প্রেয়সী আলিসার করুণ পরিণতির ফলে লিয়াম হয়ে উঠে নিষ্ঠুরতম ব্যতিক্রম মানব ।তার শরীরের শিরায়-উপশিরায় নিরোর প্রতি প্রতিশোধের অগ্নি ঝরে অবিরাম ।ধর্মের নীতি-নৈতিকতা ত্যাগ করে লিয়ামের তরবারিতে মৃত্যু ঘটে অগণিত মানবের ।তবুও মিটে না তার রক্ততৃষ্ণা ।
লিয়াম কি পারবে নিরোর রক্তে মিটাতে তার রক্ততৃষ্ণা ? ভয়ানক অগ্নিকান্ড ,নিজ মাতা-স্ত্রী ,গুরু সেনেকাকে হত্যার পর কি হয়েছিল নিরোর ? কি পরিণতি হয়েছিল আলিসার ?
জানতে হলে পড়তে হবে পুরো উপন্যাসটি ।
অভিমত...
সুদীর্ঘ ২০০০বছর আগের প্রাচীন রোমের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটি ।প্রাচীন রোমান ইতিহাস ,প্রেম-ভালোবাসা ,মিথ,যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি লেখনীর যাদুতে উপন্যাসটি মুগ্ধ করেছে ।প্রেম-ভালোবাসার গল্প হলেও বিশেষ করে সম্রাট নীরো সিজারের শাসনকাল ,ব্যাভিচার ,মাতৃহত্যা ,স্ত্রীহত্যা ,গুরু সেনেকাকে হত্যা খুব আকষর্ণীয় করে তুলে ধরেছেন লেখনীতে ।আবার লিয়াম-আলিসা চরিত্রগুলো অসাধারণ ছিল ।
"রোম যখন পুড়ছিলো, নীরো তখন বীণা (লির) বাজাচ্ছিলো।"
কাহিনী সংক্ষেপঃ- গল্পটা দুই হাজার বছর আগের সিজার বংশীয় পঞ্চম ও শেষ রোমান শাসক নীরো সিজারের সময়ের। সৎ পিতার মৃত্যুর পর মাতা অ্যাগ্রিপিনার ষড়যন্ত্রে অনেকটা অনৈতিক ভাবেই নীরো খুব অল্প বয়সে রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সে হয়ে উঠতে থাকে স্বৈরাচারী এবং স্বার্থপর৷ সম্রাজ্ঞী অগাস্টাসকে রেখেও সে একাধিক নারীর প্রতি নিজের আকর্ষন অনুভব করতে থাকে। নিজের শাসন ধরে রাখার জন্য কঠিন থেকে কঠিন সিদ্ধন্ত নিতেও পিছপা হয়না বিন্দুমাত্র।
অন্যদিকে রোমান সাম্রাজ্যের এক পাহাড়ি গ্রামে জন্ম ও বেড়ে উঠা লিয়ামতিয়াসের। শিশু ও কিশোর বয়স কাঁটে তার পাহাড়ের চুড়ায় মেষ পালন করে৷ শান্ত আর নিবিড় স্বভাবের লিয়ামের আপনজন বলতে তার দাদুই থাকে কেবল। একসময় সে খেয়াল করে প্রতিদিন মেষ পালনের সময় পাহাড়ের অন���যদিকে নদীর ওপাড়ে তার সমবয়সী যে মেয়েটাকে চুপচাপ দুঃখীর মতো বসে থাকতে দেখে সেই মেয়েটার প্রেমে পড়েছে সে। এভাবেই শুরু হয় তার ভালোবাসার। বড় হওয়ার সাথে সাথে আলিসার আর লিয়ামের মধ্যে গড়ে উঠে সুন্দর এবং স্বাভাবিক এক সম্পর্ক। যার পরিণতি হিসেবে বিয়ে ঠিক হয় তাদের। ঠিক বিয়ের তিন দিন আগেই কোনো এক রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করে বয়ে যায় এক ঝড়। এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছু৷
এদিকে জেসাসের মৃত্যুর পর তার বার জন প্রিয় ব্যক্তি বেরিয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে খ্রীষ্ট ধর্মের বাণী ছড়িয়ে দিতে। জনাব পিটার তখন সারা রোম সম্রাজ্যে জেসাসের বাণী ছড়িয়ে দিতে শুরু করে রোমান প্যাগানদের মাঝে।
প্রিয়জনের মৃত্যু নাকি মানুষকে পাথর করে দেয়। এই লাইনটার ছোঁয়াই যেনো রয়ে যায় পুরো গল্পটা জুড়ে৷ প্রিয় জনের মৃত্যুতে শান্ত নম্র স্বভাবের লিয়াম পাথরের মতো অনঢ় হয়ে উঠে প্রতিশোধের নেশায়৷ বীর আর হিংস্র যোদ্ধা হয়ে হাজার হাজার শত্রুর রক্তে নিজের তরবারী রঞ্জিত করেও যেনো সেই রক্তের তৃষ্ণা তার মেটে না। বরং সে বছরের পর বছর ধরে কেবল মাত্র অপেক্ষা করে যায় সেই তৃষ্ণা মেটাতে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ- সবকিছু মিলিয়ে "রক্ততৃষ্ণা" দারুন একটা বই৷ পুরোটা সময় আটকে রাখছিলো দারুন ভাবেই৷ না শেষ করে উঠতেই পারছিলাম না। তৎকালীন রোমের এতো সুন্দর বর্ণনা মুগ্ধ করেছে খুব। বিশেষ করে নীরো সিজারের বাস্তব ইতিহাসের সাথে কাল্পনিক গল্পটাকে অসাধারন ভাবে ফুটিয়ে তোলাটা মুগ্ধ করেছে বেশ। প্রেম, আবেগ, যুদ্ধ, শাসন, ক্ষমতার লোভ, শোষন সবকিছুর সমন্বয়ে অনবদ্য এক রুপকথার গল্প যেনো "রক্ততৃষ্ণা"।
বেশ সুখপাঠ্য, ইতিহাস এমনিতেই বোরিং কিন্তু তার সাথে যদি মিশে থাকে অনেকটা ফ্যান্টাসি তাহলে হয়ে যায় ইন্টারেস্টিং। গল্পের প্লট খুবই গতিশীল তাই দ্রুতই পড়েফেলা সম্ভব। যদি করো রোমান ইতিহাসের ওপর আলাদা টান থাকে তবে তার কাছে খুবই ভালো লাগবে।
এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো বই। গল্পের ধারাবাহিকতায় কোথায় থামার জো নেই। ইতিহাস, সভ্যতার বিকাশ, অন্তকলহ, প্রেম ও যুদ্ধ কি নেই এতে? এক কথায় অসাধারণ একটি বই।
বই পড়ার আজ প্রায় ২ বছর পরে রিভিউ লিখতে বসেছি। তখন রিভিউ লিখলে আরো অনেক অনেক মুগ্ধতার কথা লেখা যেত!
দুই হাজার বছর আগের প্রেক্ষাপটের কোন কাহিনী যে চোখের সামনে এতটা জীবন্ত হতে পারে সেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। কিছু বলার ভাষা নেই। লিয়ামতিয়াস কে সবাই যতই নিষ্প্রাণ দেখুক সবসময়, তার আত্মার আসল মৃত্যু হয়েছে অনেক পরে, যখন শেষ আশাটাও শেষ হয়ে গেল। আর আলিসা, সব হারিয়েও কোন একদিন সুখে থাকার আশায় হাজার অত্যাচারের মাঝেও বেঁচে ছিল এক না পাওয়া সুখের আশায়। তার ধৈর্যের বাঁধ ও ভেঙে গেল একদিন। লেখিকা বইয়ের শেষে বলেছেন রোমান সম্রাট নিরোর নিষ্ঠুরতাটাই দেখে লোকে, সাহিত্যানুরাগ দেখে না। পুরো গল্প পড়ার পর নিরোর সাহিত্যানুরাগ না নিষ্ঠুরতাটাই চোখে পরে। যার জন্য এতগুলো জীবন, এতগুলো স্বপ্ন, এতগুলো আশা সব শেষ হয়ে গেল, তার জন্য ঘৃণা আর প্রতিশোধস্পৃহা ছাড়া আর কিছু কাজ করে না।
I have been reading Saratchandra's books for a long time and I have also read all his novels. Not finding any more of his books, one of my librarian friends suddenly gave me the book Your "Blood Thirst". So far I have finished reading the book. Now my only purpose is to read your other books.
**Great Writing **
This entire review has been hidden because of spoilers.