এই দুই মলাটের ভেতর এক সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবার থাকার কথা ছিল। এই পরিবারে থাকার কথা ছিল কেবল এক বড় মেয়ে লুনা। একজন বট গাছের মতো ছায়া দেয়া বাবা। এক স্নেহময়ী মা, এবং 'আমি' (কেন্দ্রীয় চরিত্র)। তবে গল্প যত এগিয়ে গেল, একজন লুনা হারিয়ে গেল অযুত মধ্যবিত্ত ঘরের বড় মেয়েদের সঙ্গে, যে নিজের সমগ্র জীবনে সুখের তোয়াক্কা না করে বিপর্যস্ত পরিবারের পাশে থাকতে চায়। একজন বাবা হারিয়ে গেলেন নিযুত মধ্যবিত্ত বাবার সঙ্গে- যিনি সারাটা জীবন চেষ্টা করেও সংসারের হাল শক্ত করে ধরতে পারেন না, মেয়ের বিয়েটা পর্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ করে দিতে পারেন না। এরপর ‘আমি’। উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে লেখা। কেন্দ্রীয় চরিত্রের কোথাও কোনো নাম নেই। আমি চেষ্টা করেছিলাম, সুন্দর এক নাম দিয়ে দিই। উপন্যাস লিখতে লিখতে এমন-কি লেখার শেষে এসেও আমি চেয়েছি, যদি একটা নাম দিয়ে দেয়া যায়। পারিনি। যখনই নাম দিতে গেছি, আমার চোখের সামনে ভেসে এসেছে মধ্যবিত্ত ঘরের অসংখ্য অসহায় যুবক মুখ। আমি এই মুখগুলো চিনি না, কখনও দেখিনি, নামও জানি না। আমার কাছে এদের সকলের পরিচয় ‘আমি’। এই ‘আমি’দের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানকে সময়ের আগে বড় হয়ে যেতে হয়। এই বড় হওয়া সমাজ দেখে না, পরিবারও না। শুধু কখনো কখনো দু' একটা কাজ দিয়ে বুঝিয়ে দেয়- আমি ছোট নেই। অভাবের সময় ভরসা করতে পার।‘ ‘আমি’কে আমি নাম দিয়ে ভিন্ন করতে পারিনি। আমার কেবলই মনে হয়েছে, এই ‘আমি’ সার্বজনীন। আপনি আপনার দুই দিনের টিফিন খরচ, কিংবা রিক্সা ভাড়া বাঁচিয়ে এই বইটি কিনে থাকলে- আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, এই ‘আমি’ আপনিও।
কিছু বই আছে, যেগুলো একবার পড়ার পর বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। গল্পটা আপনি জানেন অথচ যতবার পড়বেন ততবার নতুন মনে হবে। এই বইটি সেই তালিকার একটি। পড়ার মাঝে কতবার যে পড়া থামিয়ে 'একটা মানুষ এত সুন্দর করে গুছিয়ে কীভাবে লিখতে পারে' ভেবে অবাক হয়েছি তার হিসেব নেই।
একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের উঠা-নামা লেখক কত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, বইটা না পড়লে কেউ বুঝতে পারবেন না। বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আছেন, সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে, আপনি যদি ভালো মানের একটি উপন্যাস পড়তে চান অবশ্যই অবশ্যই 'যে জীবন বকপক্ষীর' পড়বেন।
বই : যে জীবন বকপক্ষীর লেখক : পুলক মন্ডল প্রকাশনী : নহলী মুদ্রিত মূল্য : ২৫০৳ ❤️