গল্পের সন্ধানে কেটে যায় আমাদের ‘এইসব দিনরাত্রি’। খবরের কাগজের সাদাকালোয়, আন্তর্জালের রঙবাহারি সত্যমিথ্যায়, নিশিযাপনের ফাঁকে হাতে তোলা রহস্য, রোমাঞ্চ, অলৌকিক বা কল্পবিজ্ঞানের বই হাতে নিয়ে আমরা ছোট্টবেলার সেই দাবিটাই জানাই বিশ্বচরাচরের কাছে, যা দিয়ে একদা জ্বালিয়েছি মা, বাবা, এবং চেনা-অচেনা নানা বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে। “গল্প বলো!” যখন মুখবই মারফৎ জানলাম যে বিভা পাবলিকেশন থেকে সদ্য প্রকাশিত একটি ঝকঝকে বইয়ে স্থান পেয়েছে পাঁচ নবীন লেখকের লেখা কুড়িটি নতুন গল্প, পাক্কা বলিউডি স্টাইলে ফয়সলা-অন-দ্য-স্পট করা গেল। সেই অনুযায়ী ২০১৯-এর প্রথম অর্ডারে শামিল হল ‘গল্প Cafe’ নামক এই বইটি। এমনধারা নাম কেন? প্রকাশক একটি নাতিদীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমার নিজের মনে হল, কাফের আড্ডায় যেমন কথার সূত্র ধরে উঠে আসে নানা গল্প, যাতে জীবনের নানা রঙ ঝিকমিকিয়ে ওঠে নিজের মতো করে, সেভাবেই এই সংকলনের কুড়িটি গল্প রহস্য থেকে প্রেম, অলৌকিক থেকে মধুর বিষাদ, এই-সব আবেগ ধরতে চেয়েছে। কতটা সফল হয়েছে এই প্রয়াস? বই শুরু হয়েছে অমৃতা কোনার-এর লেখা চারটি গল্প দিয়ে। এরা হল~ ১] বিশ্বাসঘাতক ২] রহস্যের রহস্য ৩] ডায়েরি বন্দি খেলা ৪] দোতলা বাড়িটা রহস্য, রোমাঞ্চ, অলৌকিক, এবং কল্পবিজ্ঞান, এই চারটি ধারাই স্থান পেয়েছে এই গল্পগুলোয়। গল্পগুলো তাদের স্মার্ট গদ্য, ছোট্ট-ছোট্ট আধুনিক সংলাপ, পুরোনো ভাবনার সঙ্গে সমকালীন কিছু সংশয়ের মিশ্রণ ঘটানো, এবং কাহিনির শেষে এক-একটি মোক্ষম মোচড় নিয়ে রীতিমতো উপভোগ্য হয়েছে। উন্নতনাসা কোন্ সমালোচক কী বলবেন খোদায় মালুম, আমার মতো সাবঅল্টার্ন পাঠকের কিন্তু গপ্পোগুলো বেশ লাগল। এরপরেই কিন্তু বইটা মাঠে, ঘাটে, কুয়োতলায়, এমনকি বাড়ির ছাদে প্রায় মারাই পড়েছে। অনন্যা দেবরায় তাঁর চারটি গল্পে (‘মায়ের অধিকার’, ‘সাধারণ’, ‘I’m Sorry’, ‘অনুতাপ’) আবেগসর্বস্ব সংলাপ, বস্তাপচা গল্প, সর্বোপরি সত্তর-আশির দশকের ভাবনা দিয়ে যা পেশ করেছেন তা ভয়াবহ। নেহাত জানতাম, এগুলো কোনোক্রমে পেরোলেই অন্য এক লেখকের নতুন লেখা পাব। সেই ভরসাতেই পরের রচয়িতার লেখায় যাওয়া গেল। কিন্তু... কিন্তু সেখানেও জীবন ছবি হয়ে গেল! অন্তরা বিশ্বাস তাঁর চারটি গল্পে (‘মৃত্যুতে স্বাধীনতার জন্ম’, ‘সিঙ্গেল [আমার সীমিত জ্ঞানে এটা ‘সিংগল’ হওয়া উচিত ছিল] ফাদার’, ‘তেইশে শ্রাবণ’, ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’) যা লিখেছেন তা স্টার জলসার সিরিয়ালের উৎকট লজিক আর ফিলজফি ছাড়া নতুন কিছু বলে না। মানে এগুলো যদি আধুনিক গল্প হয়, তাহলে ‘রোগুবির রোক্কে করো’ ছাড়া কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করেছিলাম, তাহলে কি এই বইয়ের প্রথম এক-পঞ্চমাংশ মারীচের মতোই আমাকে ভুলভাল কোথাও ঢুকিয়ে দিয়েছে? বইটা কি টানা যাবে? এবং তখনই ভ্যাপসা গরমে চাঁপার গন্ধ হয়ে এল পরের লট। ইপ্সিতা মজুমদার পেশ করলেন চারটি টাটকা, তাজা, চমকে দেওয়া, ভাবিয়ে তোলা গল্প। এরা হল~ ১) নেমেসিস ২) ডাইরির পাতা থেকে ৩) অবৈধ প্রেম ৪) দ্বৈত মাতৃত্ব সত্যি বলছি, এই গল্পগুলো এতটাই উজ্জীবিত করে তুলল যে রাত গভীর হলেও, এবং গল্পগুলোকে কোনোমতেই তথাকথিত থ্রিলার ইত্যাদি না বলা গেলেও, আমি এই বইয়ের শেষ পঞ্চমাংশে প্রবেশ করলাম। এবং এখানে মহুয়া দাশগুপ্ত যে চারটি গল্প লিখেছেন তাদের পড়ার পর ‘আহা!’ ছাড়া আমি কিছু বলতে পারছি না। গল্পগুলো হল~ (১) ভালোবাসা কারে কয় (২) নতুন আলো (৩) শত্তুর (৪) ভালোবাসার গল্প আমার মতো বেরসিক টাইপের লোক এই চারটি ভালোবাসার গল্প পড়ে, তাদের কখনও মোহময়, কখনও কাঠখোট্টা, কখনও সরস গদ্যে স্রেফ মজে গেল। কেন জানেন? কারণ, আপনি হয়তো এদের মধ্যে হয়তো তেমন কোনো বৈপ্লবিক ভাবনা পাবেন না, কিন্তু জীবনের স্পন্দন শুনতে পাবেন। বিশেষভাবে আমি বলব ‘ভালোবাসা কারে কয়’ নামক গল্পটির কথা। না-পাওয়ার বিষে নীল প্রেমের সেই স্পন্দন যেন যুগান্ত পেরিয়ে, কালের যাত্রার ধ্বনি ছাপিয়ে আমাদের কানে ধরা দিয়েছে রচয়িতার গদ্য সুললিত অথচ ওজস্বল বলেই। সত্যি বলছি, অ্যানায়ন-ক্যাটায়ন বা সেলফি-লাঞ্ছিত প্রেমের গল্পের বদলে এমন কাহিনি আমি যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় পড়তে চাইব। সামেশন: কুড়িটার মধ্যে গোটা পাঁচেক এক্সকুইসিট, সাতটা বেশ ভালো, আর আটটা ঢপের চপ। ছাড়-ফাড় দিয়ে বইটা যে দামে পাবেন তাতে এতগুলো পড়ার মতো গল্প ছাড়া মানে লোকসান বলেই আমার ধারণা। হাতে নিন কফির (নইলে চায়ের) কাপ, গুছিয়ে বসুন একটা আরামদায়ক চেয়ার বা সোফায়, সঙ্গে থাকুক গল্প Cafe। অন্তত আমি এই পরামর্শই দেব।
জীবনে মশাই তিনটে জিনিসই তো আছে - ফুঁক,বুক আর ফেসবুক । ফুঁক মানে কী, সেটা নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন। আর যদি না পারেন,তাহলে প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিতেও আমি পারবো না। আসলে তামাক বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে কিনা! ফেসবুক কী জিনিস সেতো আপনারা হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছেন। পড়ে রইল বুক। এই বুক হচ্ছে সেই জিনিস,যা আপনাকে আকর্ষণ করে,আবিষ্ট করে,আচ্ছন্ন করে এক আশ্চর্য মাদকতায়। তবুও চিনলেন না! তাহলে মশাই ওয়ার্ম আপ করেই কেটে গেছে আপনার সারা জীবন, প্রকৃত বুক ওয়ার্ম হয়ে উঠতে পারেননি। এই গরমে চারিদিকে যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, স্বনামধন্য বিভা প্রকাশনী ঘোষণা করল, সা..মা...র সে...ল। তাদের প্রকাশিত যে কোনো বই ৪০% ছাড়ে সংগ্রহ করার এই মস্ত সুযোগ ছেড়ে দেবার মত বেকুব আমি নই।অর্ডার করে দিই দুখানা বই, একটি থ্রিলার, অন্যটি পাঁচমেশালী গল্পের একটা সংকলন, নাম গল্প ক্যাফে। প্রশ্ন উঠতে পারে, দুখানা বই কেন? কারণ এর চেয়ে বেশি কেনার আমার রেস্ত ছিল না,আর এর চেয়ে কম কিনলে ডেলিভারি চার্জ এড়ানো যেত না।
যথাসময়ে সুদৃশ্য প্যাকিংয়ে বই দুটি পৌঁছে গেল আমার বাড়িতে। তারপরেই একটা অদ্ভুত দোটানা শুরু হল মনের মধ্যে। দুটো বইয়েরই সুন্দর প্রচ্ছদ দেখে কোন্ বই দিয়ে যে শুরু করব, সেই দোলাচলে ভুগলুম কিছুক্ষণ। এদিকে অধুনা জনপ্রিয় বেশ কিছু থ্রিলার পড়ে অম্বলে ভুগছিলুম। হজমের সমস্যায় বাড়াবাড়ি অবস্থায় শেষমেশ বঙ্কিম ডাক্তারের ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ গিয়ে সবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলুম। এই অবস্থায় পুনরায় থ্রিলারের চক্করে পড়তে সায় পেলাম না মন থেকে। অগত্যা – গল্প ক্যাফে।
পাঁচজন লেখিকার কুড়িটি গল্প দিয়ে সাজানো এই সংকলন। লেখিকাদের নাম – অমৃতা কোনার, অনন্যা দেবরায়,অন্তরা বিশ্বাস,ইপ্সিতা মজুমদার এবং মহুয়া দাশগুপ্ত। প্রত্যেক লেখিকাই ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের ভিন্ন বিষয়বস্তু অবলম্বন করে গড়ে তুলেছেন এক একটি গল্প। গল্পগুলো কেমন লাগল,এটা বলতে একটা উদাহরণ তুলে ধরি আপনাদের সামনে। মনে করুন, দূরে কোথাও বেরিয়ে পড়েছেন আপনি একা। ট্রেন টিকিট ওয়েটিংয়ে আছে ব’লে কিঞ্চিৎ কী হয়,কী হয় ভাব! যদিও শেষ মুহূর্তে টিকিট কনফার্ম হলো আর আপনি পেয়েও গেলেন সাইড লোয়ারের ঈপ্সিত বার্থ। যাত্রা শুরু হলো ফুরফুরে মেজাজে। পরিষ্কার কামরা দেখে মন একেবারে খুশ। যাত্রাপথ দুর্দান্ত হবে,এটা যখন আপনি নিশ্চিত,ঠিক তখনই ট্রেনটা বিহারে ঢুকল। শুরু হলো রিজার্ভড কামরায় বৈধ টিকিট ছাড়া উঠে পড়া যাত্রীর ভিড়। তাদের অত্যাচারে ক্রমশ আপনার নাভিশ্বাস অবস্থা। এদিকে টিটিইরও আর টিকি পাওয়া যাচ্ছেনা।যেখ���নে সেখানে থেমে গিয়ে ট্রেন যেন বোঝাচ্ছে,সে নিতান্তই নিমরাজি গন্তব্যে যেতে। ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ কপালে,এটা যখন আপনি পরিষ্কার বুঝে নিয়েছেন,ঠিক সেইসময় ট্রেনটা বিহার পেরোলো। টিটির দেখা পেলেন। উটকো যাত্রীরা নেমে গেল কামরা থেকে। আর সমস্ত লেট পুষিয়ে দিতে ট্রেনটাও দুর্বার গতিতে ছুটতে শুরু করল। আপনি আস্তে আস্তে সমস্ত দুর্ভোগ ভুলে যেতে লাগলেন। মনে উঠল আপনার খুশির ঢেউ। তারপর একটা সময় ট্রেনটার গতি একটু কমে গেল। আপনার মনে হলো,এটা ভালোই হলো। খোলা জানালা দিয়ে অপসৃয়মান প্রকৃতির শোভা বিমুগধ বিস্ময়ে দেখতে দেখতে শেষ করে ফেললেন আপনার ট্রেন সফর। মন কেমন করে উঠলো আপনার,মনে হলো, ইস! আরো কিছুক্ষণ এ সফর চলতে থাকলে বেশ হতো।
এই বইটা পড়তে গিয়েও আমার এরকম মনে হলো। প্রথমেই দুর্দান্ত কয়েকটি গল্প দিয়ে শুরু হলো সফর। তারপর আচমকাই দুর্ভোগ। কিন্তু সবশেষে আবার গতি এবং শেষে পেয়ে গেলাম যাকে বলে অমৃতের সন্ধান।
বেশ কয়েকটি গল্প,যেগুলো মনের মণিকোঠায় স্থান পেলো,সেগুলোর উল্লেখ না করেই পারিনা। অমৃতা কোনারের বিশ্বাসঘাতক, রুদ্ধশ্বাস টানটান সার্থক থ্রিলার। ইপ্সিতা মজুমদারের অবৈধ প্রেম। বৈধ-অবৈধ এই ধারণাটাই যে আসলে আপেক্ষিক, সুন্দর ভাবে প্রতিফলিত এই গল্পে। মহুয়া দাশগুপ্তের নতুন আলো এবং ভালোবাসার গল্প। “অকারণে,অকালে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই” কোকিল ডেকে উঠেছে,গল্প দুটো পড়ার সময়।
আর বাকি গল্পগুলো? না মশাই সেগুলোও খারাপ নয়। তবে কিনা এর চেয়ে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া কেউ পড়তেই চাইবেনা, তাই এখানেই ক্ষান্ত হলুম। শুধু দুয়েকটা খারাপ লাগার কথা না বললেই নয়,তাই বলি। অন্তত একজন লেখিকার প্রায় সমস্ত গল্পেই সঠিক যতি চিহ্নের বদলে গাদা গাদা ডট চিহ্নের ব্যবহার বড্ড কষ্ট দিয়েছে চোখের। আর ‘কি’ এবং ‘কী’ এর ব্যবহার যথাযথ মনে হয়নি বেশ কিছু গল্পে। সবমিলিয়ে, পয়সা উসুল মার্কা হাতে গোনা বইয়ের মধ্যে, আজকের বাজারে গল্প ক্যাফেও অন্যতম বলেই আমার ধারণা।