"ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং পরবর্তী শিল্পবিপ্লব থেকেই মানব সভ্যতার সূচনা, এর আগে যা কিছু ছিল তা অসভ্য, বর্বর" - পশ্চিমা সেক্যুলারদের প্রায় কাছাকাছি একটা ন্যারেটিভ প্রচলিত আছে। এই ন্যারেটিভ মিথ্যা ন্যারেটিভ। ইউরোপ যখন কুসংস্কারের অন্ধকারে হাতড়াচ্ছিল, তখন একটি জাতি আলোর মশাল হাতে ছুটে বেড়িয়েছিল হিজাজ থেকে পারস্য, দামেস্ক থেকে আন্দালুসিয়া, চীন থেকে ভারত।
এটা সত্য যে খ্রিষ্টধর্মগুরুদের পৈশাচিকতা, ইনকুইজেশন আর চার্চের ভয়ঙ্কর হিংস্র হাতের টেনে ধরা বন্ধনে হাঁসফাঁস করে ওঠা ইউরোপীয় বিজ্ঞান আর শিল্পকে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচার আগমনী সঙ্গীত শুনিয়েছিল সেক্যুলারিজম মুভমেন্ট। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকা উপমহাদেশেও যখন কপি-পেস্ট করে সেই পশ্চিমা ফর্মুলা বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, আমাদের নড়েচড়ে বসতেই হয়। আমাদের বলতে হয়–‘তোমরা ভুল করছো, তোমরা ইসলামকে অন্য ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলছ। আমরা জ্ঞানের দুয়ার রুদ্ধ করে দিই নি, দিয়েছ তোমরা। তোমাদের ফর্মুলা পার্সি-জৈন-ইহুদি-খ্রিষ্ট আর পৌত্তলিক ধর্মগুলোকে সভ্যতা নির্মাণে দমিয়ে রাখতে পারে, ইসলামকে পারবে না। এ দ্বীন এসেছেই বিজয়ী হতে’।
ধর্মকে ব্যক্তিবিশেষের চর্চার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা যত বাড়ে, ততই যেন বস্তুবাদীদের হতাশ করে তারুণ্যের ঝাঁক ইসলামকে আরো বেশি করে কাছে টেনে নেয়। মানবজীবনে কুরআন-সুন্নাহকে যত বেশি অপ্রাসঙ্গিক করে দেখানোর চেষ্টা হয়, ততই যেন নিত্যনতুন কালচারাল কনফ্লিক্ট আর সাইকোলজিক্যাল কমপ্লেক্সিটি চোদ্দশ বছর আগের সেই মহামানবের শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়।
তাই তো মক্কার মুশরিকদের মতো একালের সেক্যুলাররাও যখন ঠাট্টা করে বলে–“এ কেমন ধর্ম রে বাবা! টয়লেটে যাওয়াও শেখায়!” তখন আমরা সালমান ফারসী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)–এর মতো করেই বলি, “এটাই তো আমাদের গর্ব যে আমরা এক রাসূলের অনুসরণ করি যিনি এত ছোটখাট বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেন”।
এ এক আশ্চর্য জীবনবিধান। মিসওয়াক থেকে ড্রোন, বেডরুম থেকে গণভবন–কোথায় নেই এ ধর্ম! কোথায় নেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদর্শ!
প্রাচ্য-প্রতীচ্য দাপিয়ে বেড়ানো সেই আলোর মশাল আজ নিভুনিভ। এসময় সেই মশালের আগুন ধার করে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে কিছু তরুণ। তারা শপথ নিয়েছে, আলোটাকে হারিয়ে যেতে দেবে না। মশাল নিভুক, কিন্তু একটি একটি করে জ্বালানো প্রদীপের আলোয় একের পর এক ঘরকে ভরিয়ে দেবে। গড়ে তুলবে একেকটি প্রদীপ্ত কুটির।
এই বইটি তেমনই দুজন তরুণ-তরুণীর গল্প। অপসংস্কৃতির নিকষ অন্ধকার যখন পতনের হতাশার পালে হাওয়া দেয়, তখন তাদের ঘর থেকে বেরোয় দীপ্তি। এই দীপ্তি সত্যের, এই দীপ্তি জ্ঞানের, এই দীপ্তি আদর্শের।
যে সুন্নাহ মুসলিমদের করতলে বিশ্বকে এনে দিয়েছিল, সেই সুন্নাহ আজ ঘর থেকেই হারিয়ে গেছে। মাহির ও লাফিজা আপ্রাণ চেষ্টা করছে তা ফিরিয়ে আনার। ওরা দুজন স্বামী-স্ত্রী। একে অন্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ভুলটাকে শুধরে দেয়, সত্যের পথে থাকতে অবিচল প্রেরণা যোগায়।
বলে রাখা ভালো, এই স্বামী-স্ত্রীর চরিত্র কিংবা তাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো স্রেফ গল্প উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবেই আনা হয়েছে, গল্পের উদ্দেশ্য চরিত্রের ফোকাস নয় বরং সুন্নাহগুলোকে তুলে ধরা। ----------------------------------------------------------------------- হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, যার বাঁশির সুরের সম্মোহনী টানে শহরের হাজারো ইঁদুর তার পিছু নেয়। অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন ইঁদুররা জানতোই না যে, তারা ছুটছে মৃত্যুর পানে। ভেজার নদীর তীরে গিয়ে বাঁশিওয়ালা যখন বাঁশি বাজানো বন্ধ করলো, উন্মাদ ইঁদুরগুলো তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লো ভেজার নদীতে।
যেই বাঁশিওয়ালার প্ল্যানে হ্যামিলন ইঁদুরমুক্ত হয় সেই বাঁশিওয়ালার সাথে প্রতারণা করেন হ্যামিলনের মেয়র। পরের বছর হ্যামিলনবাসীর উপর প্রতিশোধ নেবার মনস্থ করলো বাঁশিওয়ালা। এবার একটা অন্যরকম সুর বাজাতে লাগলো সে। সেই সুরের টানে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো হ্যামিলনের শিশুরা। পাগল করা সুরের পেছনে ছুটতে ছুটতে লা-পাত্তা হয়ে যায় শিশুগুলো! এরপর থেকে হ্যামিলনে আর কখনো ঐ বাঁশিওয়ালার দেখে মেলেনি।
হ্যামিলনে ঐ বাঁশিওয়ালার কখনো দেখে না মিললেও আমাদের সমাজে হ্যামিলনী বাঁশিওয়ালাদের অভাব নাই। সেইসব বাঁশিওয়ালারা নন-স্টপ বাঁশি বাজিয়েই যাচ্ছেন। তারা চায় আমরাও যাতে ডুবে মরি।
অবুঝ শিশুদের মতো আমরাও তাদের পিছু নিয়েছি। সুরের টানে ছুটে চলছি মৃত্যুপানে। গণমাধ্যম, শিল্পসাহিত্যে এসব বাঁশিওয়ালাদের সয়লাব। তাদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা গাচ্ছি জীবনের জয়গান। অথচ সেই মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা জীবনের দৌড় তো ভেজার নদী পর্যন্ত।
এই সমাজ যখন হ্যামিলনী মিছিলে সামিল হয়েছে, মাহির-লাফিজারা তখন স্রোতের বিপরীতে ছুটছে। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার সংকল্প করেছে। ভুলে যাওয়া সুন্নাতগুলো একজন আরেকজনকে মনে করিয়ে দেয়। ভুলে যাওয়া সুন্নাতগুলো যখন মনে পড়ে, তখন খুঁজে পাওয়া মুক্তোর মতো সেগুলোকে আগলে রাখে, সুন্নাত মেনে চলার চেষ্টা করে। দৈনন্দিন জীবনের সুন্নাত অনুসরণ করার গল্প নিয়েই বইটি সাজানো হয়েছে।
আমি বই পড়ুয়া হওয়ার সুবাদে আমার বউ কখনো কোন বইয়ের কথা বলে শান্তি পেত না। দেখা যেত সে বইটা ইতিমদ্ধে আমার পড়া আছে। কিন্তু এই বইটা প্রথম যে আমার বউ আগে পড়েছে গল্প আমার সাথে শেয়ার করেছে এবং খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে পড়তে দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো লেগেছে। আমিও এক নব দম্পত্তির জন্য হাদিয়া হিসেবে এই বইটি দিয়েছি।
বই: প্রদীপ্ত কুটির লেখক: আরিফুল ইসলাম সমর্পণ প্রকাশন প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০১৯ মুদ্রিত মূল্য: ১৯২ টাকা
মুসলিম হিসেবে রাসূল (সা) এর সুন্নাহগুলো সম্পর্কে জানা ও সে অনুযায়ী আমল করা আমাদের কর্তব্য৷ আমরা অনেকেই অনেক সুন্নাহ সম্পর্কে জানি, তবে সচরাচর সেগুলো আমল করা হয়ে উঠে না৷ এই বইতে আমাদের যাপিত জীবনে অনুসরণীয় সুন্নাহগুলো লাফিজা ও মাহিরের দাম্পত্য জীবনের গল্পের মাঝে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷ বইটি পড়ার পর সেই কাজগুলো করার সময় একবার হলেও সেই সুন্নাহটির কথা মনে পড়বে এবং তা পালন করার ইচ্ছে জাগবে৷
২৭টি ছোট ছোট গল্পে সাজানো বইটি৷ প্রথম গল্পে তাদের বিয়ে হয়৷ পরবর্তী গল্পগুলোর মধ্যে সালাত সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গল্প রয়েছে৷ যেমন: জামাআতে সালাতের গুরুত্ব, প্রথম কাতারের গুরুত্ব, তাহাজ্জুদের গুরুত্ব, জুমার দিনের কর্মসূচি ইত্যাদি৷ এছাড়াও জন্মদিন পালনের বিধিনিষেধ, ফরমাল পোশাকের সংজ্ঞায়ন, নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার, পরিবারের জন্য বাজার করা, দেবরদের সাথে অপ্রয়োজনে কথা-বার্তা বা হাসি-ঠাট্টা করা ইত্যাদি জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়েও সুন্নাহর নির্দেশনা নিয়ে গল্প রয়েছে৷ যেহেতু দাম্পত্য জীবনকে কেন্দ্র করে গল্পগুলো সাজানো হয়েছে, তাই বেশ খানিকটা রোমান্টিসিজম রয়েছে প্রতিটা গল্পে!
সমালোচনা: যদিও এখানে একটি আদর্শ পরিবার দেখানো হয়েছে এবং গল্পের চরিত্রকে ফোকাস না করে শিক্ষার দিকে মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে, তবুও বলছি - গল্পের মেকিংগুলো অতিমাত্রায় ইউটোপিয়ান হয়ে যাওয়াতে ততটা ভালো লাগে নি৷ পাশাপাশি শেষের কয়েকটি গল্পের প্লট কিছুটা বিক্ষিপ্ত মনে হয়েছে৷ সবমিলিয়ে ভালো, ৪/৫ দিবো৷
This book is about a couple. Who gets married during varsity life so they can complete their Deen. An arranged marriage for the sake of Allah. So that they don't have to look for love from Haram relationships. And it's also a story where they help each other with practicing Sunnah in everything they do. From waking up in morning till going to the bed at night. How beautiful a religion is where we gain Sawab for even looking at spouse with love, or feeding them with own hand or combing each other's hair! If a couple wants it Islamic way, nothing can make the family sad emotionally and feel poor financially. I really do believe if these bonds are strong enough, nothing can ruin a relationship. Anyone getting ready for marriage or wish for a marriage should really read this book. Even if not for Islamic way, it's a good couple counselling book I'm sure.
প্রদীপ্ত কুটির - ভীষণ দীপ্তিময় এক কুটির। ঘরটা ছোট কিন্তু তা ওই অট্টালিকার থেকেও বেশি আলোকিত। ঘরটা ছোট কিন্তু তা ওই প্রাসাদের থেকেও বেশি শান্তিময়।
বইয়ের মূল চরিত্রদ্বয় হলো লাফিজা এবং মাহির। বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় লাফিজা ও মাহিরের বিবাহের মাধ্যমে। যেখানে লাফিজা, মাহিরের চেয়ে ১ বছরের বড় হওয়ায় ছোট-খাট একটা জটিলতা সৃষ্টি হলেও আল্লাহর রহমতে শান্তিপূর্ণভাবে সুন্নাহ অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এরপর পুরো বই জুড়ে বিভিন্নভাবে সুন্নাহকে তুলে ধরা হয়েছে। কখনো পরিবারের জন্য খরচ করার কথা, কখনো সুন্নতী লেবাসের কথা কখনো বলা হয়েছে স্বামী স্ত্রীর একপাত্রে পান করার কথা। বিবাহ-পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়ের আমলযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহগুলো তুলে চেষ্টা করেছেন লেখক। আল্লাহ তায়াল লেখককে উত্তম প্রতিদান দিন।
সাহিত্যের বিচারে এর ওপর হয়তো কঠোর হস্তে ছুড়ি-করাত চালানোর সুযোগ আছে। কিন্তু লেখক যে বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। মাঝে মাঝে লেখাকে লেখার উদ্দেশ্যে ছাড়িয়ে যায়। লেখকের হৃদয়ের ইশক এর উষ্ণ ধারায় সিক্ত হয়ে থাকে তার লেখা। এই লেখার উপর করাত চালাবো, আমি কি এতোই নিষ্ঠুর?
তবে, শেষ করার ক্ষেত্রে হয়তো লেখক তাড়াহুড়ো করেছেন। শেষটা আরও সুন্দর করা যেতো। পুরো বই যেখানে লাফিজা এবং মাহির এর মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। শেষ গল্পে শুধু মাহিরের উপস্থিতি আমার জন্য হতাশার। আশা করি পরবর্তীতে লেখক বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
বইটি কারা পড়বেন! খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাই পড়তে পারেন আবার সবাই না। যারা বিয়ে করার কাছাকাছি আছেন বা বিয়ে করেছেন শুধু তাদেরই আমি পড়ার পরামর্শ দেব।
বইটি সম্বন্ধে আমার একটা মজার অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি যা অনেক দিন স্মৃতিপটে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। এক রাতে বইটা অর্ধেক পড়ে ঘুমোতে গেলাম। রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমার বিয়ে হয়ে গেছে, আমার স্ত্রীকে আরবী ভাষা শেখানোর জন্য উস্তাজার তালাশ করছি।
তো, যাই হোক। আমি মনে করি লেখকের লেখার ছাপ যখন পাঠকের মনে বা জীবনে পড়ে তখনই তার লেখা চূড়ান্ত সার্থকতা পায়। শুভকামনা রইল লেখকসহ বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য। জাযাকুমুল্লাহ খাইর। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
বইটা মূলত গল্পাকারে লেখা। সাতাশটি গল্পের মেসেজগুলো পড়ে আশা করি অনেকেই উপকৃত হবেন। বিশেষ করে যারা নবদম্পতি তাদের বেশি ভালো লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিয়ে করা দুজন মানুষের জীবনের গল্প। প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'লাফিজা' ও 'মাহির'। তাদের মাধ্যমেই লেখক কুরআন-হাদিসের প্রয়োজনীয় মেসেজ জানিয়েছেন। কয়েকটি টপিক আমার অজানা ছিল বইটার মাধ্যমে জানতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ।
আ���্রহীরা পড়তে পারেন আশা করি ভালোই লাগবে।
বই ~ প্রদীপ্ত কুটির লেখক ~ আরিফুল ইসলাম প্রকাশনী ~ সমর্পণ প্রকাশন( এখন প্রকাশনী পরিবর্তন হয়েছে) মূল্য ~ ১৯২ পৃষ্ঠা ~ ১২৫