কাব্যের আবহে এক মরমী উপন্যাস
==============================
“আমি আমার বুকের রক্ত দিয়ে ‘ডাক্তার জিভাগো’ লিখেছিলাম। কিছু প্রমাণ করতে বা কোন-কিছুকে আক্রমণ করতে চাইনি। জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতে একটি জীবনের ভাঙা-গড়া --- এই শুধু দেখাতে চেয়েছিলাম আমি।”
বলছেন বরিস পাস্টেরনাক। নিজের সমগ্র জীবন ও চিন্তাধারাকে নিংড়ে নিয়ে যে কাব্য-উপন্যাসের এক অপরূপ রূপ-আলেখ্য সৃষ্টি করেছিলেন ১৯৫৭ সালে, যা প্রকাশের ঠিক এক বছরের মধ্যেই সমগ্র বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল এবং নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল (এবং সেই নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানও করেছিলেন), বলছেন সেই উপন্যাস সম্পর্কে। সেই উপন্যাসে তিনি জিভাগো’র মুখ দিয়ে বলছেন, “জীবন এক এবং একক, কোন সময়েই সে তার সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে না, প্রতি মুহুর্তে সমন্বয় ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে পূর্ণ করেছে বিশ্বকে, নতুন করে তুলছে নিজেকে।” জীবনের এই রূপমাধুরী বয়ে যায় সম্পূর্ণ উপন্যাসে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, এক কাব্যিক-ফল্গুধারায়, এক মর্মস্পর্শী সংবেদনশীলতায়। আর তার সেই বাক্যবিন্যাসের সৌন্দর্য ও মাধুর্য্যে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন পথ পাঠকের কাছে থাকে না। পাশাপাশি যুক্ত হয় সচল চিন্তাধারা, সমসাময়িক ও পূর্বতন লেখক টলস্টয়-দস্তয়েভস্কি-মায়াকোভস্কি-গোর্কি’র চিন্তাধারা ও তাদের দ্বন্দ্বের প্রভাব ঠিক যেভাবে তৎকালীন সমাজে পড়েছিল, সমাজকে দ্বিধান্বিত করে চলেছিল ক্রমাগত, জিভাগোর স্বকীয় চিন্তার মধ্যে দিয়ে, আশেপাশের মানুষদের সাথে তার আলাপ-আলোচনা-কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে তা ফুটে ওঠে বারবার। আর তাই, জিভাগো উপন্যাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক দোলাচল প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পটভূমিকা হয়ে ওঠে। জিভাগো উপন্যাসটি তাই ‘ঈশ্বরের পবিত্রভূমি রাশিয়া’ থেকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ হয়ে ওঠারও কাহিনী।
রাশিয়ার রিভোলিউশান থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯০৫ থেকে ১৯৪৫, এই হল মোটামুটি সময়ের প্রেক্ষাপট। এই সময়ে রাশিয়ার অবস্থা টালমাটাল। এক্কেবারে যেন ত্রিভুজের চাপে ফেসে গেছে রাশিয়ার আমজনতা, ১৯০৫ সালের আগে পর্যন্ত যে দেশটি ছিল ‘হোলি রাশিয়া’। এই সময়ে জারেরা রাশিয়ার সাধারণ মানুষকে উপহার দিয়েছিলেন ‘নাউট’ আর ‘পোগ্রোম’ --- চাবুক আর সুশৃঙ্খল নির্যাতন। হাজার হাজার মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠেছিল সাইবেরিয়া। শাষকের জমির ওপর একাধিপত্য, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ও নির্বিচারে হত্যা, শ্রমিক শোষণ এবং এলিট সমাজের চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা --- মূলত এই চারটি হল রাশিয়ান রিভোলিউশানের ভিত। এর সাথে যুক্ত হল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের টানাহ্যাঁচড়ায় রাশিয়া কোনদিকে যাবে তা নির্ণয়ের অপারগতা। মস্কো আর পিটার্সবুর্গ --- প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ধ্বজাধারী দুই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দুতে আস্তে আস্তে জন্ম নিতে শুরু করল অষন্তোষ। এর সাথে যুক্ত হল জাপানের কাছে যুদ্ধে পরাজয়। রাশিয়ায় জন্ম হল সমাজতন্ত্রের দাবীতে বিভীষিকাবাদ, নিহিলিজ্ম। এরা কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হল চরম ব্যর্থ। আর তাই যেখানে যেখানে শ্রমিক ও কৃষক জাগরণ হল, সেখানে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হল স্বতঃস্ফুর্ত জাগরণ, তারা অনাহুতের মতো যোগ দিতে লাগল মিছিলে, কিন্তু জনতার আবেগ থেকে তারা শতহস্ত দূরে। জিভাগোয় আমরা পড়ি --- “১৭ই অক্টোবর ইস্তাহার বেরুবার পর এক বিরাট মিছিল বেরুলো; ... কয়েকটি বিদ্রোহী দল পরামর্শ ক’রে ঠিক করেছিল এটা, তারপর ঝগড়া-ঝাটি করে ব্যাপারটা সেখানেই চুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও নির্দিষ্ট দিনে যখন লোকজন বেরিয়ে আসতে লাগলো, তাড়াহুড়ো ক’রে কোনমতে যে যার প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিলে শোভাযাত্রার অধিনায়কত্ব করার জন্য।” জারের দমন পীড়ন হয়ে উঠলো ভয়াবহ। কসাক চালালো নির্বিচারে গণহত্যা। লেখক লিখছেন, “বাড়িগুলির পেছন দিয়ে ডুবে যেতে-যেতে সূর্য তার আঙুল বাড়িয়ে রাস্তার সব লাল রঙ কুড়িয়ে নিলে --- ঘোড়সওয়ারদের টুপীর লাল ডগা, মাটিতে লুটিয়ে-থাকা একটি লাল পতাকা, আর বরফের উপর সুতোর মতো লম্বা রক্তের রেখা, লাল লাল ফোঁটায়” --- পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা ধক্ করে ওঠে।
১৯০৫ সালের এই বিপ্লব ব্যর্থ হয়। বিপ্লব স্পষ্টতই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় – বলশেভিজম আর মেনশেভিজম। এর সাথে যুক্ত হয় ছোট ছোট আরোও বিচ্ছিন্ন বিপ্লববাদ। সাধারণ মানুষ জার আর মূলত এই দুই বিপ্লবের টানাপোড়েনে দ্বিধাবিভক্ত, হতাশগ্রস্থ, বিভ্রান্ত। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ, সর্বস্বান্ত এবং দিশাহারাদের সম্পর্কে লেখক লিখছেন, “পথের দু’পাশে যে-সব গ্রাম আর ছোট-ছোট শহর ছিল, তারা যুদ্ধের অবস্থা বুঝে ‘শাদা’ কিংবা ‘লাল’ ব’নে যেত। কোন বিশেষ মুহুর্তে তারা কোন দলের অধীনে আছে, এটা তাদের চেহারা দেখে বলা খুব শক্ত ছিল” বা কোন এক বিশেষ মুহুর্তে জিভাগো চীৎকার করে বলে ওঠে “বলশেভিক বা অন্যান্য সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে কতটা তফাৎ তা বুঝতে পারি না আমি।”
জিভাগোর জীবনে প্রেম আসে --- টোনিয়া, লারা, আর মারিনা। টোনিয়া তার স্ত্রী, ছোটবেলা থেকে তার সাথে মানুষ ও অবশেষে ঘরনী। কতটা ভালোবাসে টোনিয়াকে? “টোনিয়ার মনের শান্তি পৃথিবীর যে-কোন জিনিসের চেয়ে তার কাছে বেশি মূল্যবান। তার সন্মানরক্ষার জন্য সে সব কিছুই করতে পারে ... যে কোন মানুষকে টুকরো টুকরো ক’রে সে ছিঁড়ে ফেলতে পারে...”। তার জীবনে টোনিয়া এমনই। এক শান্তির আশ্রয়, তার অস্তিত্ব, তার সহগামিনী, তার সর্বস্ব জীবনকালের প্রেম-অপ্রেমের ধারক ও বাহক। আর লারা? যুদ্ধের দিনগুলিতে প্রেমের মুর্ত রূপ, যা একাকী জিভাগোর মনে ধরা দেয়, “এই প্রকৃতি, এই বন, এই বেলাশেষের উজ্জ্বলতা --- যা-কিছু সে এই মুহুর্তে দেখতে পাচ্ছে, সব, সব এখন তেমনি আদিম প্রবলতায় এক তরুণীর প্রতিমায় রূপান্তরিত হ’য়ে গেল। লারা।” দু’জনকেই সে ভালবাসে। দু’জনের কাছেই সে বার বার ফিরে যেতে চায়। যদিও লারা’র জীবনে যে প্রেম এসেছিল পাশার রূপ ধরে, সেই সম্পর্ককে ধরে রাখতে পারে নি দু’জনেই। পাশা পালিয়ে যায় লারা’র সর্বগ্রাসী ভালবাসার হাত থেকে বাঁচতে। “স্ত্রী’র সঙ্গে তার সম্পর্ক সুন্দর, কিন্তু যথেষ্ট সরল নয়। তার প্রতি তার স্ত্রী’র কোমলতা, তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি --- এ সবে তার হাঁফ ধরে আসে...’। অথচ এই পাশাই পরবর্তীকালে যখন যুদ্ধে পড়ল জড়িয়ে, অনেক অনেক দূর থেকে সে অপেক্ষা করতে লাগল তাদের জন্য, স্ত্রী আর তার কন্যার জন্য, দুই জীবনের মাঝে সে আটকে। গৃহযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে দিতে সে অপেক্ষা করে, “প্রথমে এই জীবন সে শেষ করে নিক, এই নতুন জীবন, তারপর সে ফিরে যাবে সেই পুরোনো জীবনে, যেটাতে বাধা পড়েছে হঠাৎ।” মারিনা আসে তার জীবনের শেষ লগ্নে, যখন গৃহযুদ্ধ ও রাশিয়ার অন্ধকার একে একে টোনিয়া আর লারাকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, তখন, তার আশ্রয় হয়ে। সে ত্যাগ করেছিল তার যথাসর্বস্ব, বড় নিঃশব্দ তার আত্মত্যাগ। স্বয়ং লেখকও মারিনার জন্য বেশি কিছু কাব্যিক বাক্য খরচ করেননি, কারণ জিভাগো যেন বড়ই নিঃশব্দ এই পর্যায়ে। উদাসীনভাবে কেবল এক জায়গায় লিখলেন, “ইউরির (জিভাগো) ব্যবহার ক্রমেই অদ্ভুত হয়ে উথছে, এলোমেলো নোংরা করে রাখে ঘরবাড়ি, মেজাজ মর্জি খামখেয়ালের অন্ত নেই --- সব ক্ষমা করে মারিনা। সে বোঝে ইউরি এখন স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ব’য়ে যেতে দিচ্ছে নিজেকে, তার আবদার, নালিশ, মেজাজ --- সবই মেনে নিতে হবে।”
জিভাগো এক মরমী উপন্যাস। জিভাগো আলো’র কথা বলে, অন্ধকারের কথা বলে। জন্ম-মৃত্যু, সত্য-মিথ্যা, ভয়-সাহস, জয়-পরাজয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, প্রেম-প্রীতি-ভালোভাসা, শত্রুতা --- এ সমস্ত কিছুকে মেনে নিয়ে জিভাগো দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক মাঝখানে, তার সংবেদনশীল মন নিয়ে। যে মনের মাঝে ধরা দেয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিপ্লবী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সবাইকে জিভাগো দেখে মানবরূপে, যারা আলো-অন্ধকারের মাঝে হাতড়ে হাতড়ে পথ খুঁজছে বাঁচার জন্য... সমাজকে বাঁচানোর জন্য। জিভাগোর দৃষ্টিতে তাই বহিঃপ্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতি মিলিয়ে সমগ্র সত্ত্বাটি রূপ নেয় কবিতায়। আর তাই পাস্তেরনাকের সমস্ত উপন্যাসটিই এক কাব্যকাহিনী, আর একমাত্র কবি’র চোখেই ধরা পড়ে সোনালী হেমন্তে দিনের শেষে পাতাঝরা বনের মধ্যে কচিপাতার আগুন, যুদ্ধের মাঝে গুলী চালাতে চালাতে আবিস্কার করে এক ধর্মের দুই বিভেদী রূপের মাঝখান দিয়েই অনন্ত এগিয়ে চলে উদাসীন পথিকের মতো, কিম্বা সে যেন এক দ্রষ্টা, তার চিন্তা ও চেতনার মধ্যে ধরা দেয় রাশিয়া তথা তৎকালীন সমাজচিত্রের এক ‘আনবায়াসড’ রূপ।
অনুবাদ করেছেন মীনাক্ষী দত্ত ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্পাদনায় বুদ্ধদেব বসু। এই তিন বিদগ্ধজনের হাতের ছোঁয়ায় জিভাগোর বঙ্গানুবাদ হয়ে উঠেছে মর্মস্পর্শী, সংবেদনশীল এবং যথাযথ। পড়তে পড়তে মনেই হয় না যে কোন অনুবাদ পড়ছি, আর তাই যে কোনরকম সাধুবাদই এনাদের জন্য কম মনে হয়। উপন্যাসের শেষে বুদ্ধদেব বসু’র জিভাগোর কবিতার অনুবাদগুলিও একইরকমভাবে মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়...