বন্ধু, তোমার জন্যে আমার নির্দ্বিধ পরামর্শ হলো—ছুটিকালীন কোনো নীরব রাতের নির্জন প্রহরে বইটি হাতে নিয়ে বসো! দেখবে—তরতর করে কেটে যাচ্ছে নির্ঘুম রাত! আরো দেখবে—স্বপ্ন দেখে-দেখে আর সংকল্প করে-করে মহান বড়দের বড় হওয়ার শ্রেষ্ঠ মধুর কাহিনীগাথা পড়তে পড়তে—তোমার অনুভব-অনুভূতি তাঁদের মতোই বড় হওয়ার ‘স্বপ্ন’ ও ‘সংকল্পে’ টইটম্বুর হয়ে গেছে! পরের দিনের নতুন সূর্যালোকের মিষ্টি রোদে দাঁড়িয়ে মনে হবে—আজকের ভোরটা অন্যরকম এক ভোর! স্বপ্নমাখা! সংকল্প-ছাওয়া!
একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি ও যোগ্য আলেম এবং একইসাথে সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ আছে—এমন তালিকায় তিনি অন্যতম। মেদহীন লেখা ও গতি—এ দুটি গুণ তাঁর লেখায় আমি বরাবর পেয়েছি।
বই সম্পর্কে-
বইটি মূলত মাদরাসার তালিবে ইলমদের উদ্দেশ্য করে লেখা। যদিও আমার পড়াশোনা আগাগোড়া জেনারেল লাইনে এবং বইটি কিনেছিলাম লেখক ও তাঁর লেখনীর সাথে পরিচয়ের খাতিরে!
বই থেকে জানা যাবে প্রথমত শত শত মনিষীর নাম—তাঁদের জীবনের টুকরো টুকরো গল্প—ইলম হাসিলে কষ্ট মুজাহাদার বয়ান—অসামান্য ধৈর্য্য ও ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা—উসতাদের প্রতি অসামান্য ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ। মুসলিম উম্মাহর আকাশ আলো করা সেইসব তারকা পুরুষদের নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায় পাঠককে আরো ভাবুক ও পড়ুয়া হতে উৎসাহিত করবে ইনশা আল্লাহ।
বই পড়তে গিয়ে আপনি একঘেয়েমি বোধ করবেন না। লেখক সে সুযোগ রাখেননি—মনে হবে একটানে শেষ করে তবেই উঠবো! ঘুরেফিরে এসেছে ইলম পিপাসু সাহাবীদের (রাঃ) দের আলোচনা—মহান চার ইমাম ও তাঁদের ছাত্রদের কথা। এছাড়াও রয়েছে নিকট অতীতের আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কথা।
সুতরাং পাঠক ঘুরে আসবেন মক্কা, মদিনা, কুফা, বাগদাদ, সিরিয়া। ইলম অনুসন্ধানী এই মানুষদের জীবনকথা পাঠককে মনে করিয়ে দিবে ইসলামের প্রথম কথা ছিলো—পড়।
শেষ কথা-
বইয়ের শুরুতে মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে মাদরাসায় পাঠ্য হওয়ার মতো।
রাহনুমা প্রকাশনী খুউব যত্ন করে বইটি ছেপেছে। তাদের সার্বিক উন্নতি কামনা করি।
ইলম অর্জনের জন্য আমাদের সালফে সালেহীনের অনেক চেষ্টা-সাধনা করেছেন ।পরে ইলমের জন্যই আল্লাহ তা'লা তাদেরকে মানুষের হৃদয়ের বাদশা বানিয়েছেন-যেন মুকুটহীন সম্রাট। দ্বীনি ইলম অর্জনে উৎসাহ পাওয়ার জন্য এই কিতাব মলমের মতো কাজ করবে।
হাতি চড়ে রাজা যাচ্ছেন। সাথে অনেক মানুষ, সবাই রাজাকে দেখার জন্য ভীড় করছে। একজন মা তার ছেলেকে তা দেখিয়ে বললেন, “যদি লেখাপড়া করো তুমিও বড় হয়ে রাজা হবে।” ছেলে সম্মতি জানালো। কিন্তু খানিকবাদেই মাকে প্রশ্ন করে বসলো, “মা, রাজা কোনটা আর হাতি কোনটা?” বড় যদি হতে চাও বইটির শুরুর দিকে এমন একটা গল্প পাওয়া যায়। আসলে অপরিণত বয়সে আমরা গল্পের এই ছেলেটির মতোই দ্বিধায় পড়ে যাই কারা আসলে বড়? কীভাবে বড়? বড় হওয়ার মাপকাঠিটাই বা কী? এই নিয়ে। লেখক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন তার লেখার মাধ্যমে আমাদের ইতিহাসের সত্যিকারের বড়মাপের ব্যক্তিত্বদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। জানিয়েছেন এই বড়ত্বের পিছনের মূল উপাদানের কথা। ”প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন ফরজ।” আর এই জ্ঞান অর্জন হচ্ছে বড় হওয়ার মূলমন্ত্র। জ্ঞানের মাধ্যমেই একজন সাধারণ মানুষ কিংবা ক্রীতদাসও বাদশাহর চেয়ে অধিক সম্মানের অধিকারী হতে পারেন। বইটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে ইতিহাসের স্বর্ণযুগের ব্যক্তিত্বদের কথা। গল্পের আকারে এসেছে সাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ ও পরবর্তী সালাফদের জ্ঞানার্জনের জন্য করা কঠোর পরিশ্রমের গল্প। এসেছে ইমাম আবু হানীফা রহ. , ইমাম মালেক রহ. থেকে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরী রহ. এর গল্প। এছাড়াও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, এ পি জে আবদুল কালাম ও কবি আল মাহমুদের মতো সফল ব্যক্তিত্বদের স্বপ্ন দেখার ও সেই সাথে তা বাস্তবায়নের পিছনের কঠিন সংগ্রামের কথা উল্লেখিত হয়েছে সাবলীল ভাষায়। বইয়ের শেষে রয়েছে ছাত্রদের জন্য পড়াশুনায় ভালো করার জন্য কিছু সহজ দিক র্নিদেশনা। লেখক বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার লেখার মাধ্যমে পাঠককে নিরন্তর উৎসাহ যুগিয়েছেন। বইটি মূলত মাদরাসার ছাত্রদের জন্য লেখা হলেও আমার মতে যেকোন প্রতিষ্ঠানের যেকোন বিষয়ের ছাত্রের জন্য এটি একটি উপযোগী বই; যে বই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাবে। সীমাবদ্ধতা : বই আকারে আসার আগে এই বইয়ের পুরো লেখাটি মাসিক নেয়ামতে পনেরোটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। সংকলনের বা সম্পাদনের ক্ষেত্রে কিছুটা উদাসীনতা (আমার কাছে এমনটাই মনে হয়েছে :( ) ছিল বলেই হয়তো বইটিতে কয়েকটি ঘটনার হুবুহু পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সেই সাথে সালাফদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশেষণ ও পরিচয় পর্বের শব্দচয়নে একঘেয়েমি পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন: বইয়ের শুরুতে কোন সালাফের পরিচয় প্রসঙ্গে যেই বাক্যগুলো লেখা হয়েছিল বইয়ের মাঝে সেই সালাফের কথা আবার উল্লেখিত হলে শুরুর দিকের প্রসঙ্গগত সেই বাক্যগুলোর পুনরায় ব্যবহার ঘটেছে।