যতবারই আমরা মৌর্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের কথা বলি বা পড়ি, তাঁর সাথে অবধারিতভাবে চাণক্যের নামটাও চলে আসে। কারণ চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন চাণক্য। শুধুই কি প্রধানমন্ত্রী? তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ। এক 'অর্থশাস্ত্র' লিখেই ভারতবর্ষের রাজনীতি ও অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
"জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো" এই নীতি বাক্যটা কতবার পড়েছেন বলুন তো? স্কুল-কলেজের ভাব সম্প্রসারণে প্রায়ই এই জিনিস লিখতে হতো। এইটাও কিন্তু চাণক্যের মস্তিষ্কপ্রসূত বাক্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে দিয়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হলেও, পর্দার আড়ালে বসে বুদ্ধির কলকাঠি নেড়েছিলেন চানক্য।
চাণক্য দেখতে খুব একটা সুন্দর ছিলেন না, শারীরিকভাবেও দুর্বল ছিলেন। যার কারণে সমবয়সীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রখর প্রতিভাধর কুটিলবুদ্ধি-সম্পন্ন ব্রাহ্মণ। তাঁর মেধা দেখে ৩ বছর বয়সে ব্রজমোহন তাঁকে নিজের টোলে ভর্তি করিয়ে নেন। মেধায় সমবয়সীদের ছাড়িয়ে যেতে তাঁর একদমই সময় লাগে না। অল্প বয়সেই রাজধর্ম, অর্থনীতির উপর লাভ করেন অগাধ আধিপত্য ও পাণ্ডিত্য। এরপর তিনি চলে যান তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানচর্চার স্থান তক্ষশীলায় (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত)। সেখানে বসেই তিনি লেখেন 'অর্থশাস্ত্র'।
ঘটনাক্রমে তাঁর সাথে দেখা হয় চন্দ্রগুপ্তের। অত্যাচারী রাজা নন্দরাজকে হটিয়ে পুনর্গঠন করেন মগধ সাম্রাজ্য। শুধু কি তাই? মহাবীর আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করে বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করার সময় চাণক্যই গ্রিকদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। চাণক্য যেন চন্দ্রগুপ্তের মস্তিষ্ক ছিলেন! . . বইটা আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। বেশ কিছু লেখা ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম, হিন্দু পুরাণ কিংবা ইতিহাসের অন্যান্য লেখার সাথে এর কোনো সামঞ্জস্য নেই। এখানে চন্দ্রগুপ্ত আর চাণক্যের দেখা হওয়ার কাহিনি সম্পূর্ণই ভিন্ন। কোনো জায়গায় লেখা জঙ্গলে পলাতক থাকার সময় চন্দ্রগুপ্তের সাথে চাণক্যের দেখা হয়, আবার আরেক জায়গায় লেখা ছোটবেলায় চন্দ্রগুপ্তকে দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সে রাজপুত্র। বইয়েও এমনটাই লেখা, তবে সেখানে চন্দ্রগুপ্তের পালকপিতা ময়ূর পুষতেন, গরু না। যাই হোক, এত আগের ইতিহাস, তার উপর ফিকশন, কিছু কাহিনি তো লেখকের মনগড়া হবেই। তবে বইটা পড়ে মনে হলো না এত আগের গল্প লেখক তুলে ধরেছেন। কারণ লেখকের শব্দচয়ন খুবই আধুনিক। আর শুরুতে যতটা আশা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, হতাশ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। চাণক্যের পরিবার নিয়ে কিছুই বলা হলো না, কাহিনিগুলোও খাপছাড়া। তাই শুধু ইতিহাস জানার জন্য এই বই খুব একটা কার্যকরী না।
গল্পটা মহামতি চানক্যকে নিয়ে, যার বুদ্ধির জোরে পত্তন হয়েছিল মৌর্য সাম্রাজ্য। ইতিহাসে তিনি কৌটিল্য নামেই বেশি পরিচিত। তাই তাঁর ওপরে বই দেখে লোভটা সামলাতে পারলাম না। কিন্ত বলতে গেলে হতাশ হলাম। দুইশ পৃষ্ঠা এই মহান লোকের কাহিনী বলার জন্য খুবই কম। তাই শুরুটা ভাল হলেও, প্রথম পাচ পাতার পরে কাহিনী যেন দৌড়ে শেষ হয়ে গেল। তার চানক্য ছাড়া অন্যদের শুধু কাহিনীতে উপস্থিতি মাত্র ছিল, কিন্তু ফুটে উঠতে পারেনি কেউই। লেখকের বাচনভঙ্গিও কাহিনীর সময়ের সাথে যায় না, বড় বেশি আধুনিক লেগেছে, বিশেষ করে সংলাপগুলি। এক বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হলেও, লেখক সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে পারেন নি।