দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উত্তপ্ত ও বিক্ষত জনপদ কাশ্মীর। গত প্রায় ৭১ বছর কাশ্মীরীরা আজাদির জন্য লড়ছে। একই সঙ্গে বিশাল ভারত তার সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি নিয়ে জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখে উপস্থিত। কাশ্মীর ভ্যালি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত এলাকাগুলাের একটি। বিশ্ব দেখছে, প্রতিদিন কাশ্মীরে রক্ত ঝরছে- কিন্তু সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান আপাতত কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কাশ্মীরীদের গণভােটের বহুল প্রচারিত দাবিও উপেক্ষিত এখন। বাংলাদেশ ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক মিল থাকলেও বাংলাদেশিরা ঐ জনপদের ভৌগলিক, জাতিগত এবং রাজনৈতিক বিকাশধারার বিষয়ে কমই জানে। বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যম ও একাডেমিক জগতে কাশ্মীর বিষয়ে গভীরতর মনােযােগ প্রায় অনুপস্থিত। কাশ্মীর বিষয়ে ভারত ও পশ্চিমের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণগুলােই বাংলাদেশে প্রশ্নহীনভাবে সর্বদা প্রচারিত হতে দেখা যায়। বর্তমান প্রকাশনা এই শূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এখানে জম্মু-কাশ্মীরলাদাখের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের চুম্বক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় নির্ভরযােগ্য একাডেমিক সূত্রগুলােকে ব্যবহার করে। একই সঙ্গে কাশ্মীর সংঘাতের আঞ্চলিক তাৎপর্য বুঝতেও সাহায্য করবে এই কোষগ্রন্থ।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
গবেষক আলতাফ পারভেজের 'কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই' হলো সংক্ষেপে কাশ্মীরের ইতিহাস এবং এর বিবাদ নিয়ে জানার 'হ্যান্ডবুক'।
সম্রাট আকবরের আমলে কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। এরপর শিখ রাজা রণজিৎ সিংয়ের আমলে শিখ রাজত্বের অধীনে আসে পুরো জম্মু-কাশ্মীর। ১৯৪৬ সালে শিখদের থেকে কাশ্মীর চলে যায় ইংরেজদের হাতে। শিখদের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধে তৎকালীন কাশ্মীরের ডোগরা বংশীয় শাসক গুলাব সিং সহায়তা করেছিলেন ইংরেজদের। যুদ্ধ শেষে ইনামও পান হাতে হাতে৷ ইংরেজপ্রভুরা ৭৫ লাখ শিখ টাকার বিনিময়ে জম্মু-কাশ্মীরকে বেচে দেয় গুলাব সিংয়ের কাছে। মোটকথা, কাশ্মীর উপত্যকার মানুষগুলোর দাম ওঠে ৭৫ লাখ রূপি। শুধু হয় ডোগরা রাজবংশের শাসন।
ডোগরা রাজারা ছিল হিন্দু। এদিকে জম্মুতে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু হলেও মূল কাশ্মীরে তারা লঘিষ্ঠ।
ডোগরা রাজবংশের শাসকরা সবসময় শোষণ করেছেন কাশ্মীর,জম্মুর সাধারণ মুসলমানদের। কারণ রাজার প্রশাসনসহ সবকিছুতে একাধিপত্য ছিল কাশ্মীরি পন্ডিতদের।
এই শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ান শেখ আবদুল্লাহ এবং গোলাম মোহাম্মদ। জম্মুর পুঞ্চ এলাকাসহ যেসব অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান শাসিত আজাদ কাশ্মীরের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন গোলাম মোহাম্মদ। তারই নেতৃত্বে আজাদ কাশ্মীর প্রতিষ্ঠিত হয়। মূল কাশ্মীর উপত্যকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেন শেখ আবদুল্লাহ। পুরো ভারতজুড়ে যখন 'কুইট ইন্ডিয়া' আন্দোলন চলছে। তখন কাশ্মীরে এই আন্দোলনের ডাক দেন শেখ আবদুল্লাহ । ডোগরা রাজা হরি সিং শেখ এবং তার অনুসারীদের ব্যাপকভাবে দমন করে। নয় বছর দন্ডাদেশ দেশ শেখকে।
১৯৪৭ সালে যখন দেখা গেল, হিন্দু রাজা হরি সিং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান কিংবা ভারতে যোগ দিতে চাচ্ছেন না, তখনই সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পশতুদের অস্ত্র দিয়ে, সেনাবাহিনীকে কাশ্মীর দখলের চেষ্টা করে পাকিস্তান। পরিকল্পনা ছিল স্থানীয় মুসলমানদের সহায়তা নিয়ে কাশ্মীর দখলে নেওয়া হবে। সেই চরম মুহূর্তে হরি সিং ভারতে যোগ দেন। নেহেরুও বলেছিলেন, পরে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিরা তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
ভারতে চলে গেল বেশিরভাগ এলাকা। বাকি অঞ্চল গেল পাকিস্তানে। হরি সিং গদি হারাল। তার পুত্র করণ সিং রাজ্যের গভর্নর হল। প্রধানমন্ত্রী হলেন শেখ আবদুল্লাহ।
ভারতে যোগ দেওয়াকে যথোপযুক্ত ভাবলেন না শেখ আবদুল্লাহ। তার জিগরি দোস্ত নেহেরুর সাথে দূরত্ব বাড়তে লাগল। এই সময়ে শেখ আবদুল্লাহ স্বাধীনতার কথা ভাবছিলেন বল অনেকের দাবি। ১৯৫৩ সালে গভীররাতে ঘুমন্ত শেখকে জাগিয়ে তুলল তারই রাজ্যের পুলিশ। সদর ই রিয়াসত (গভর্নর) করণ সিংয়ের নির্দেশে তাঁকে গ্রেফতার করা হলো। অবশ্য মূল নির্দেশদাতা ছিলেন তারই বন্ধু নেহেরু। কাশ্মীরিরা ধাক্কা খেল। কিন্তু নেহেরু পাকা খেলোয়াড়। তিনি কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী বানালেন শেখেরই ডানহাতকে!
দীর্ঘ ১০ বছর বন্দি ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। ততদিনে ঝিলামের অনেক জল গড়িয়েছে। কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসনের পাখা ছেটে দেওয়া হয়েছে। শেখের দল ন্যাশনাল কনফারেন্সেরও সেই রমরমা নেই কাশ্মীরে। আবারও কাশ্মিরীরে শাসক হলেন শেখ আবদুল্লাহ। তাঁদের শের ই কাশ্মীর। কিন্তু এবার কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী নন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী। এরপর এই পরিবারের পরবর্তী দুই প্রজন্ম কাশ্মীরকে শাসন করেছে। শেখের বেটা ফারুল আবদুল্লাহ, যার পড়ার খরচ জুগিয়েছেন নেহেরু এবং ফারুক আবদুল্লাহর পুত্র ওমর আবদুল্লাহ।
কাশ্মীর উপত্যকার মানুষগুলো কী চায়? এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি আলতাফ পারভেজের বইতে নেই। তবে পড়ে মনে হল, তারা প্রথমত একটি নিরপেক্ষ গণভোট চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, ভারত-পাকিস্তান কেউই আজ আর এই গণভোটের পক্ষে নেই। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত গণভোটের সিদ্ধান্ত কখনোই মেনে নেয়নি ভারত।
আশিরদশকে অস্ত্র তুলে নেয় কাশ্মীরিরা। বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক এবং জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র দলের উদ্ভব ঘটে। এর পেছনে রয়েছে তীব্র স্বাধীনতাকাঙক্ষা এবং দীর্ঘদিনের আধিপত্যের প্রতি প্রতিবাদ।
ভারত ভোটের বিচারেসর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ। অথচ কাশ্মীর উপত্যকা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকায়নকৃত এলাকা। ভারতের মোট সেনাশক্তির অর্ধেক মোতায়েন জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকায়। অথচ এই এলাকা ভারতের মোট আয়তনের ৩২ ভাগের ১ ভাগ এবং মোট জনসংখ্যার ৯৫ ভাগের ১ ভাগ।
জম্মু-কাশ্মীরের এমন পরিবারের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি, যাদের এক বা একাধিক সদস্য নিখোঁজ। গুম এই অঞ্চলের সাধারণ ঘটনা। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক নারী ধর্ষণও ডালভাত। ১৯৯১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে একইসাথে ৫৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছিল ভারতীয় বাহিনীর হাতে।
'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ' পড়ে মনে হয়েছিল গবেষক ও লেখক হিসেবে আলতাফ পারভেজের অখন্ড মনোযোগ রয়েছে। কিন্তু এই বইটি পড়তে গিয়ে আমি হতাশ হলাম। একইতথ্যের পুনরাবৃত্তি। ভাষাগত মাধুর্যের ঘাটতি এবং সবচেয়ে বিশ্রী লেগেছে তিনি আসলে কাশ্মীর নিয়ে সুনির্দিষ্ট কী বলতে চেয়েছেন তাই ই বলতে পারলেন না। লেখায় তাড়াহুড়োর ছাপ লক্ষণীয়। কাশ্মীর নিয়ে আলতাফ পারভেজ দীর্ঘ কাজ করতে পারতেন। শর্টকাটে লিখতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।
তবুও পড়ুন। কাশ্মীরি কবি আগা শহিদ আলির ' কাশ্মীর উইদাউট এ পোস্টঅফিস ' সম্পর্কে জানুন।
মোঘল এবং আফগানেরা কাশ্মীর অঞ্চল একসময়ে শাসন করলেও সমস্যার শুরু হয় ১৮৪৬ সালে ডোগরা রাজবংশের শাসনের মধ্য দিয়ে। এরা জাতিতে ছিল রাজপুত এবং ধর্মে ছিল হিন্দু। ১৮০৮ সালে জম্মু শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে আসলে মহারাজা রণজিৎ সিং এর শাসনভারের দায়িত্ব দেন ডোগরা রাজবংশের শাসক গুলাব সিং কে।রণজিৎ সিং মারা যাওয়ার পর শিখ সাম্রাজ্য দূর্বল হয়ে পড়ে এবং ১৮৪৬ সালে ব্রিটিশরা জম্মু ও কাশ্মীর তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে যুদ্ধের মাধ্যমে।ব্রিটিশরা কাশ্মীর এলাকা পরে ৭৫ লাখ রূপির বিনিময়ে গুলাব সিং এর কাছে বিক্রি করে দেন এবং ডোগরা রাজবংশ প্রায় একশো বছর এই এলাকা শাসন করে। যদিও এই এলাকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল কিন্তু হিন্দু রাজবংশের শাসন স্বভাবতই মুসলিমদের বিরুদ্ধচারণে উৎসাহ যুগিয়েছে ।১৯৩০ সাল পর্যন্ত রাজার সশস্ত্র বাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনে মুসলিমদের প্রবেশাধিকার ছিল না, যা মুসলিমদের স্বাধীনতা চাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।এই এলাকার মুসলিমদের মধ্যেও বিভেদ ছিল, কাশ্মীরী ও জম্মুর মুসলিমরা নৃতাত্ত্বিকভাবে আলাদা ছিল ফলে হিন্দুরা তাদের বিভক্তিকে কাজে লাগিয়েছে।১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর একটি প্রশ্ন সামনে আসে যে কাশ্মীর কার ভাগে যাবে? নাকি তারা স্বাধীনতা পাবে? স্থানীয়রা স্বাধীনতার পক্ষেই ছিল এবং নেহেরু গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু দেশ ভাগের মাত্র দুই মাসের মাথায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং পাকিস্তানের ধীরগতির জন্য ভারত অধিকাংশ এলাকা দখল করে নেয় এবং পাকিস্তানের অল্প কিছু এলাকা আজাদ কাশ্মীর হিসেবে পরিচিতি পায়।ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রতিরক্ষা,যোগাযোগ এবং পররাষ্ট্রনীতি ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয় এবং কাশ্মীরকে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
নরেন্দ্র মোদি সরকার সংসদের উভয় কক্ষে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ভারতীয় সংবিধানের জম্মু ও কাশ্মীর এর বিশেষ মর্যাদা ধারা ৩৭০ ও ধারা ৩৫ক, ৫ই আগস্ট ২০১৯ এ রদ করে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘটান, যা কাশ্মীর সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে।(সংবিধান সংশোধন এর তথ্যটি বইটিতে নেই কারণ বইটি ঘটনার আগেই প্রকাশিত)
কাশ্মীরের নাম শুনলে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাকৃতিক ভূস্বর্গখ্যাত জিলাম নদীর অববাহিকায় জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ নিয়ে ঘটিত একটি রাষ্ট্র(পরাধীন) যার একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান এবং চীন। কত কত কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ পিপাসু পর্যটক কাশ্মীরকে নিয়ে তার মনের ক্যানভাসে কত যে রং দিয়ে কত রকমের ছবি এঁকেছে তা ইতিহাসের পাতায় আজও রঙিন। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস এই অঞ্চলটি খুবই বৈচিত্র্যময় কেননা একটা সময় আফগান ও তুর্কি শাসকরা শাসন করেছিল তারপর এসেছিল শিক সম্প্রদায় তারপর ইংরেজ এবং তারপরে ডোগরা সম্প্রদায় যারা আবার ধর্মীয়ভাবে হিন্দু ধর্মালম্বী ছিল। তারপর দেশভাগের পর ভারতভুক্তির পর থেকে কাশ্মীরের জনগণের সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তাছাড়া ৩৭০ এবং ৩৫ (ক) সাংবিধানিক ধারা সৃষ্টির মাধ্যমে আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে কাশ্মীরকে শাসন শুরু করে। কিন্তু শাসনের নামে শোষন,নির্যাতন, নিপীড়ন সহ নানা রকম ঘটনা পত্র-পত্রিকায় তা আজ বর্তমান। কিন্তু জিলাম নদীর অববাহিকায় বেড়ে ওঠা কাশ্মীরি জনগণ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বাধীন? তারা কি অন্য আর দশটা স্বাধীন রাষ্ট্রের মত তাদের বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় চর্চা, এবং সামাজিক এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে? বর্তমানে পৃথিবীতে ইসরাইল প্যালেস্টাইনের সংঘাতের পর দ্বিতীয় সংঘাতময় স্থান হচ্ছে কাশ্মীর।
স্বাধীন রাজ্যের মধ্যে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ কাশ্মীরের জনগণ। এজন্য স্বাধীন রাজ্যের ভেতর একটি পরাধীন রাজ্য।
"I've found a prisoner's letter to a lover - One begins: " These words may never reach you. " ( Aga Shahid Ali)
কাশ্মীর এর ভূস্বর্গ জনিত আবেগ ও তার রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে টুকটাক খবরের শিরোনাম চোখ পিটপিট করে তাকানো ছাড়া আমরা অধিকাংশ যেহেতু কিছু করি নাই তাই এই বই আমাদের জন্য দরকারী।
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও তার মধ্যে লুকায়িত রাজনৈতিক সামাজিক যোগসাজশে প্রতারণা থেকে শুরু করে আজাদীর আকাঙ্ক্ষা প্রায় সবকিছুর মোটামুটি পাঠ তো একে বলাই যায় ।
ইউসুফ শাহ চাক থেকে মুঘল তারপর পাঠান শিখ এর হাতে এরপর ইংরেজ এবং এক্কেবারে শেষে উপস্থিত হয় দেশভাগের বলি হওয়া দুই দেশ ভারত পাকিস্তান। কাশ্মীর এর আজাদি লড়াইয়ের ইতিহাস মূলত সামজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে লুকায়িত অপরায়নের ইতিহাসও বলা যায়। এখানের মধ্যে প্রতারণা ও আছে তা বলা বাহুল্য।
প্রতারণার এই আলোচনায় ইউসুফ শাহ চাক এর মোঘলদের হাতে বন্দী উউল্লেখযোগ্য সবার আগে। বন্দী হওয়ার পরে ছোট একটি অঞ্চল এর জায়গির দেওয়া হয় তাকে। এরপর তার পুত্র ও একসময় মোগলদের হাতে বন্দী হন। তাকে হত্যা করা হয় বিষ প্রয়োগে।
মোঘলরা দূর্বল হতে থাকলে কাশ্মীর চলে যায় পাঠান ( আফগান)দের হাতে। এরপর শিখরা আসে। শিখরা ১৮৪৬ সালে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলে পরাজয় বরণ করে। এরপর এই ভূখন্ড চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গুলাব সিং বা ডোগরাদের কাছে এটি পরে বিক্রি করে দেয়। এই ডোগরা রাজবংশ মূলত সমস্যার অনেকখানি জুড়ে আছে। এটা এই বই পড়লেই বোঝা যায়।
বই রিলেটেড নোট আমারঃ গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে আমার নোটে জায়গা পেয়েছেন ১. হরিসিং ২. নেহেরু ( প্রতারণার আরো বড় উদাহরণ দুই মুখো সাপ) ৩. জেনারেল আকবর খান ৪. প্রেমনাথ বাজাজ ( পন্ডিত হয়েও আজাদীর সমর্থক) ৫. ইউসুফ চাক ৬. শেখ আবদুল্লাহ ৭. চৌধুরী গোলাম আব্বাস ৮. আসিফা বানু ৯. আফজাল গুরু। আরো অনেক নাম অবশ্যই আছে। তবে এদের কাজ ও কর্মই নজরকাঁড়া বেশি।
কাশ্মীর এর অপরায়ন সমস্যা প্রকট। মুসলিমদের শিয়া সুন্নী বিভক্তি। লাদাখ এর মুসলিম, কাশ্মীর এর মুসলিম ও জম্মুর মুসলিম এর আলাদা সংস্কৃতি সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর রাজনৈতিক চাহিদা যা আজাদীর লড়াই তাকে আঘাত করেছে। নেহেরুর প্রতিস্রুত গণভোট না হওয়া, ট্রিটি আফ অম্রিতসর ১৯৪৬) , শেখ আবদুল্লাহ যে কিনা হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মীর এর প্রধাণ নেতা তার ভারতমুখীতা এবং জম্মুর প্রধাণ নেতা চৌধুরী গোলাম আব্বাস এর পাকিস্তান প্রীতিও আমার দৃষ্টিতে আজাদীর লড়াই এর জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। এরবাইরে প্রিন্সলি স্টেইট হিসেবে জম্মু-কাশ্মীর এ মর্যাদা রক্ষা না হওয়াও পরাধীনতার প্রথম ধাপ। এখন আসলে এমন প্রিন্সলি স্টেইট আসলে এককথায় পরাধীন ছিলো। সীমিত স্বায়ত্তশাসন এরা ভোগ করতো ইংরেজদের অধীনে। প্রিন্সলি স্টেইট ছিলো ইংরেজ শাসনে কেননা তারা ( জম্মু-কাশ্মীর এর শাসকরা) ১৮৫৭ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতার জন্য কাজ না করে ইংরেজ দের সাহায্য সহোযোগিতা করেছিলো। একটা প্রশ্ন আসে এই কাজের জন্যই কী কাশ্মীরে পরাধীন শব্দ এমন অভিশাপ হয়ে লেগে আছে?
কাশ্মীর এর হিন্দুরা মূলত আরএসএস ও বিজেপি সমর্থক। এরা সেই গোষ্ঠী যারা আজাদীর বিরুদ্ধে।
কাশ্মীরকে পঙ্গু করা হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে এর সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে। এতে ভর্তুকী দেওয়া যায়। ভর্তুকীর রাজনীতি আরো মজার এতে সহজ হয় শাসন করা। ক্রমশ পরনির্ভরতা করুণার জন্ম দেয়। পরনীর্ভরতা ভারতে সরকারের বরাদ্দের উপর। যা রাজনৈতিক অধিকার ও সামাজিক অধিকার কে নিয়ন্ত্রণ করতে অর্থনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে ধরা যায়। বর্তমান সরকার মিডিয়াকে ব্যবহার করে এর পর্যটন শিল্প ধ্বংস করছে। এতে বেকারত্ব বাড়ছে। অর্থনীতি দূর্বল হচ্ছে রাজ্যের। এতে কেন্দ্রের উপর বাড়ছে নির্ভরশীলতাও। ভর্তুকির করুণায় চাপা পড়ে যাচ্ছে আজাদী।
AFSPA act 1958 - Army কে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আইন ( ১৯৪২ - Armed force special power act) এর অনুকরণে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে। যখন তখন অনুসন্ধান, ক্রসফায়ার এর ক্ষমতা আর্মিকে দেওয়ার যৌক্তিকতা এই আইন দেয় । ১৯৯১ এর ১৩ ফেব্রুয়ারী ইন্ডিয়ান আর্মি কুপওয়ারে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে ৫৩ জন নারীকে। এটা নিয়ে " Ocean of tears" নাম এর প্রামাণ্য চিত্র আছে। কাশ্মীর এর বিদ্রোহীদের ( ভারতীয় দৃষ্টিতে) দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলে জওয়ানদের ৩০ থেকে ৫০ হাজার রুপী পুরষ্কারও দেওয়া হয়। এসব কাজ ক্রমেই সেনাদের করছে অত্যাচারী ও অনিয়ন্ত্রিত।
সবশেষে আফজাল গুরুর ফাসি ও আসিফা বানুকে মন্দীরে ধর্ষণ ভারতীয় নিপীড়ন এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে জ্বল জ্বল করছে করুণ ভাবে।
বইঃ-কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই। লেখকঃ-আলতাফ পারভেজ বইয়ের ধরনঃ- রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যুদ্ধবিগ্রহ ও গণহত্যা । মলাট মূল্যঃ-১৭০ প্রকাশনীঃ-ঐতিহ্য পৃষ্ঠা-৯৫ প্রচ্ছদঃ-ধ্রুব এষ। প্রথম প্রকাশঃ-২০১৯
আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে কাশ্মীর ।বন্ধু মহলে, সোশাল মিডিয়ায়, চায়ের দোকানে বয়স্ক লোকদের কাছেও এটা তুমুল আলোচনার বিষয়।কাশ্মীরের এই অবস্থা কি শুধুই ধর্মীয় কারণে,নাকি ধর্মীয় উষ্কানির মড়কে মোড়ানো সাম্রাজ্যবাদের ভয়াল থাবা?একটু বিস্তারিত জানার জন্য ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত আলতাফ পারভেজ এর কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই বইটা পড়লাম।বইতে লেখক কাশ্মীরের অতীত ইতিহাস,সমস্যা,চীনের মালিকানা প্রাপ্তি, ,মুক্তিকামী সংগঠন, আফজাল গুরুর বিচার, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খুব সুন্দর আলোচনা করেছেন।
চলুন তবে বইয়ের ভেতর থেকে একটু ঘুরে আসা যাক---
ব্রিটেনের অধীনস্থ ইন্ডিয়ায় ২ ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল প্রভিন্স ও প্রিন্সলি স্টেইট ।প্রিন্সলি স্টেইট এর বাংলা অর্থ হলো স্থানীয় রাজ্য বা দেশীয় রাজ্য।দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে আবার কিছু ছিল বাড়তি মর্যাদা সম্পন্ন তাদের বলা হত সেলুট স্টেইট । এই রাজ্য ব্রিটিশ শাসকরা সরাসরি শাষন করতো না,তারা মিত্র হিসাবে কাজ করতো। তাদের উপাধি ছিল মহারাজা,রাজা, নিজাম।সেলুট স্টেইট শাসকদের ব্রিটিশরা তোপধ্বনি দিয়ে সম্মান জানাতো।শাসকদের মর্যাদা নিরুপন করতো, কে কয়টা তোপধ্বনি পেয়েছে তার উপর। কাশ্মীর ও হায়দ্রাবাদ সর্বোচ্চ ২১ টা তোপধ্বনি পেত।
রণজিৎ সিং মারা যাবার পরে শিখ সাম্রাজ্য দূর্বল হয়ে পড়ে ।এই সুযোগে ব্রিটিশরা শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শিখ রাজা ব্রিটিশদের সাথে অমৃতসর চুক্তি করে । এই পরাজয়ের পরে রণজিৎ এর পুত্র দুলিপ সিং এর কাছ থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ দেড় কোটি নানকার শাহি (শিখ মুদ্রা) দাবি করে।শিখ রাজা পুরো টাকা দিতে পারে না,তাই কাশ্মীরে সন্নিহিত এলাকা কোম্পানিকে দিয়ে দেয়।কোম্পানি আবার ওই এলাকা জম্মুর শাসক গুলাভ সিং এর কাছে ৭৫ লাখ নানকার শাহিতে বিক্রি করে দেয়।সেই সাথে বিক্রি হয়ে যায় জম্মু কাশ্মিরের লোকদের ভাগ্য।
কর আদায়ের জন্য নির্মম নির্যাতন,ইসলাম বিদ্বেষ,২ দশক মসজিদে এবাদত নিষিদ্ধ, কোরান অবমাননা, সেনা ও প্রশাসনে মুসলিমদের প্রবেশাধিকার না দেওয়াসহ নানা নির্যাতনের ঝড় বয়ে যায় ওই অঞ্চলের মুসলিমদের উপর।এর প্রেক্ষিতে ১৯৩২ সালে মুসলিম কনফারেন্স গঠন করে।১৯৪৭ সালে টালমাটাল পরিস্থিতিতে কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন রাষ্ট্র হওয়ায় স্বাধীন বা যে কোন দেশের সাথে যুক্ত হতে পারবে বলে ঘোষনা আসে। জনগন বেশির ভাগ মুসলিম হওয়ায় ভারত ভুক্তি বাদে বাকি ২ টা নিয়ে আশাবাদী ছিল।১৯৪৭ এর অক্টোবরে দেখা যায় হরি সিং কাশ্মীরকে ভারত ভুক্ত করবে এই আশংকায়,পাকিস্তান অংশের লোক অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হতে থাকে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে এর প্রতিক্রিয়ায়,সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকা হরি সিং দিল্লির শাসকদের যোগসাজগে ভারত ভুক্ত হবার চুক্তি করে। এভাবেই কাশ্মীরের এক অংশের শাষন ক্ষমতা ভারতের কাছে চলে যায়।তার পরে বয়ে গেল অনেক সময়,সময়ের পরিক্রমায় বয়ে চলছে কাশ্মীরদের দূর্ভাগ্য। কাশ্মীরের আজাদি এখন পেন্ডুলামের মত দুলছে ২ দেশের টানাটানিতে। কাশ্মীর এখন ভারতের অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে। কাশ্মীরের নদী থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর বিশাল ভান্ডার, পর্যটনশিল্প, ফল,পোষাকসহ অনেক কিছু।এমন অবস্থায় ভারত কি চাইবে কাশ্মীর হাত ছাড়া করতে ?তারা কি পাবে আজাদির স্বাদ? এখনও কি কাশ্মীরে ধর্মীয় আগ্রাসন নাকি ধর্মীয় বিদ্বেষের মোড়কে মোড়ানো সাম্রাজ্যবাদের ভয়াল থাবা?
যাদের কাশ্মির সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে এই বইটা তাদের চাহিদা মেটেতে সক্ষম।
কাশ্মীরের নতুন গভীর সংকটকালের সময়ে পড়তে বসলাম আলতাফ পারভেজের লেখা ' কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই' (ঐতিহ্য, ২০১৯)। ৯৫ পৃষ্ঠার ছোট একটা বই কিন্তু বেশ precise। কাশ্মীর নিয়ে যদি বিশেষ কিছু জানা না থাকে,তাহলে এই ভালো একটা ধারণা দিবে।গৎবাঁধা ইতিহাস বর্ণনা না করে লেখক ৪২ টা শিরোনামের মধ্য দিয়ে বৃটিশ-শিখ যুদ্ধের পর কাশ্মীরের সংকট সৃষ্টির সময় থেকে চমৎকার আলোকপাত করেছেন। কাশ্মীরের লড়াইয়ের বাইরে সেখানে জম্মু,কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়েও একটা ভালো ধারণা দিয়েছেন। কখনো ঘটনাপরম্পরা আবার কোথাও ব্যক্তিকে ফোকাস করে লেখা ভুক্তিগুলোতে দেখবেন, ইসলাম ধর্ম কিভাবে কাশ্মীরের লড়াকু জনতার অক্সিজেনের কাজ করেছে আবার স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যকার নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগত পার্থক্য নিজেদের সংকট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কথিত লিবারেল দল 'ভারতীয় কংগ্রেস ' এর নির্বাচন জালিয়াতি কিভাবে সশস্ত্র সংগ্রামে পেট্রোল ঢাললো, বিজেপি-আর এস এস এর এথনিক ক্লিঞ্জিং, আফজাল গুরুর ফাঁসির ঘটনা, কাশ্মীরিদের উপরে চালানো নির্বিচার খুন-গুম-ধর্ষণের জন্য সংবিধানের রক্ষাকবচের কথা জানলে বুঝা যায়, দুনিয়ার বৃহৎ গণতন্ত্রের দাবীদার রাষ্ট্র ভারত আসলে মুসলমানদের জন্য কতটা 'গণতান্ত্রিক '! বইয়ের দুর্বলতা মনে হয়েছে মানচিত্রের অনুপস্থিতি ও যুদ্ধগুলোর বর্ণনার অভাব। কাশ্মীরের জিওপলিটিক্যাল অবস্থান এবং পানি রাজনীতির অবস্থা আরেকটু ভালোভাবে বুঝতে মানচিত্র বেশ প্রয়োজন ছিল। এই দুই ব্যাপার বাদ দিলে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে বইটি।
In what language does rain fall over the tormented cities.
অল্পে পুরো সংগ্রামের একটা বিবরণ এই বই-মাত্র ৮১ পৃষ্ঠার মতো। অরুন্ধতীর বইয়ে কাশ্মির নিয়ে অনেক পড়েছি কিন্তু "আজাদী"র স্বপ্ন ছিলো পড়ার পরে। মনে হতো মানুষের স্বপ্ন, আজাদীর স্বপ্ন, ইনকিলাবের স্বপ্ন মিথ্যা হতে পারে না।
না, বইটা আলাদা করে নৈরাশ্যের জন্ম দেয়ার জন্য লেখা হয় নি- নৈর্ব্যক্তিক একটা বই। কিন্তু তা-ও এই উপত্যকার সংগ্রাম-আন্দোলন-লড়াই এতো বহুমুখী এবং পুরনো মনে হলো, এ বঞ্চনা-অত্যাচার শেষ হওয়ার নয়। এই হয়তো নিয়তি। নিয়তিই ঝিলম, চেনাবে আজীবন রক্ত বয়ে নিয়ে বেড়াবে। আজাদীর হয়তো এ-ই দাম! পড়তে পারেন।
লেখক আলতাফ পারভেজের লেখায় আশ্চর্য সাবলীলতা রয়েছে। পুনঃপুনঃ আগেই আলোচ্য বিষয়কে উল্লেখ করেছেন, তাতে আমার মতো অমনোযোগী পাঠকের সুবিধাই হবে।
অনেকটা এনসাইক্লোপিডিয়া ধরনের লেখা। বিশ্লেষণ কম হয়েছে, এতে অখুশি নই। এনসাইক্লোপিডিয়া ধরনের লেখা হওয়ায় পুনরাবৃত্তি হয়েছে, তাই পড়তে খানিকটা দুখপাঠ্য তো বটেই! তাছাড়া ঐতিহ্যের বইয়ে এমন যথাযথ সম্পাদনার অভাব যথেষ্ট পীড়াদায়ক।
কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাথমিক স্পষ্ট রূপ পায় ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেদিন শ্রীনগর কারাগারে আবদুল কাদির নামে এক তরুণের বিচার দেখতে জড়ো হন হাজারো মানুষ। তাঁর অপরাধ ছিল মহারাজা হরি সিং-এর শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী বক্তব্য দেওয়া। এর আগে ঈদের খুৎবা নি/ষিদ্ধ করা ও কুরআনের অবমাননার ঘটনায় ক্ষু/ব্ধ ছিল পুরো কাশ্মীর।
বিচার চলাকালে নামাজের ওয়াক্ত হয়ে যায়। একজন মুসলমান আজান দিতে গেলে তাকে গু/লি করা হয়, তারপর একে একে আরও ২১ জন শহী/দ হন সম্পূর্ণ আজান দেওয়ার চেষ্টায়। এই নির্মমতা কাশ্মীরি জনগণকে রাজনৈতিকভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং জন্ম দেয় সংগঠিত রাজনৈতিক সংগ্রা/মের—যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩২ সালে গঠিত হয় 'মুসলিম কনফারেন্স'।
এই ঘটনাই হয়ে ওঠে কাশ্মীরের আজাদির সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম বড় র/ক্তা/ক্ত অধ্যায়, যা আজও 'শহীদ দিবস' হিসেবে স্মরণ করা হয়।
রাজনীতি বিষয়ে বইটই পড়েন এমন মানুষজন হলে অবশ্যই 'আলতাফ পারভেজ' কে চিনেন বা নাম শুনেছেন। আমার কাছে তার এই 'এথনো-পলিটিক্স ইন সাউথ এশিয়া' সিরিজটা চমৎকার লাগে। এই সিরিজে মোট ৩টি বই আছে, এটা ২নং বই। এটি ২০১৯ সালে প্রকাশ পায়। বাকি দুইটি বই শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার কে নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়া এই তিনটি দেশের রাজনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বইটি আপনাকে কাশ্মীর ও পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে জানতে আরও আগ্রহী করবে।
বইঃ কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই লেখকঃ আলতাফ পারভেজ। প্রকাশনীঃ ঐতিহ্য
জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ, ভারত-পাকিস্তান-চীন সীমান্ত, মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রভাব মিলিয়ে বেশ জটিল রাজনৈতিক ইতিহাস। ৯৫ পাতার বইটাতে খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরেই ইতিহাসটা এসেছে অনেক রেফারেন্স সহ, স্টার্টিং পয়েন্ট হিসেবে ভালোই।
ধর্মীয়-রাজনৈতিক কনফ্লিক্টের বাইরে আরেকটা পয়েন্টে চোখ আটকে গেল। এই অঞ্চল নিয়ে বিবাদের পিছনে আরেকটা কারণ হল পানি!
ভারতের পাঞ্জাব-হরিয়ানা-রাজস্থান পানির উৎস হিসেবে আবার পাকিস্তান কৃষিকাজের জন্য এই অঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। ভারত তাদের নিয়ন্ত্রিত নদীগুলোতে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে যাতে কাশ্মীরের পানিসম্পদ বিষয়ক বিবাদ আরো বাড়বে ভবিষ্যতে৷
এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল। বইয়ে এই বিষয়ের দুটো রেফারেন্সঃ
কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী মানুষের সংগ্রামের সাথে সংহতি পোষণ করলেও এবং তাদের ওপর অব্যাহত দমন নিপীড়ন সম্পর্কে সংবেদনশীল হলেও আট দশক ধরে চলমান এই রাজনৈতিক সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত নই। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম এই আলোচিত সহিংস সংকটের বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য আলতাফ পারভেজের বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সংক্ষিপ্ত কলেবরের গ্রন্থটি কোন গবেষণামূলক রচনা নয়, বরং ঐতিহাসিক কাল থেকে ঘটমান বর্তমান পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাসের নাতিদীর্ঘ বিবরণী মাত্র। পুস্তিকা আকারের বইটি পাঠে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জ্ঞান অর্জন হয়তো সম্ভব হবে না, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক আগ্রহী পাঠকের অনুসন্ধিৎসার সূত্রপাত ঘটতে পারে এখান থেকেই।
আলতাফ পারভেজের লেখার যে দিকটা ভালো লেগেছে তা হলো অপ্রাসঙ্গিক কোনো কিছুই উনি ওনার বইটাতে আনেন নাই। অতিরিক্ত আলাপে না গিয়ে কাশ্মীর সমস্যার ব্যাসিক দিকটা খুব গোছানো আলোচনা করেছেন। কাশ্মীরের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ তথ্যের সন্নিবেশ করেছেন বইটাতে। কাশ্মীরের ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও জীবন নিয়ে জানার আগ্রহ থাকলে এই বইটা হতে পারে এ গুড ওয়ান টু বিগিন।
কাশ্মীরের রাজনৈতিক সংঘাত এবং কাশ্মীরের মানুষদের সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে একটি প্রাথমিক বই হতে পারে এটি। ইনফরমেটিভ এবং কাশ্মীর সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার দুয়ার খুলে দিবে আপনাকে।