গুগল ম্যাপসহ ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির সুবিধাগুলো কয়েক বছর আগেও কিছুটা কম ছিল। ২০১০ সালের সেরকম সময়েই মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম ঘুরে এসেছেন দেশের সবগুলো জেলা। সেই ভ্রমণের যে বর্ণনা শরীফ লিপিবদ্ধ করেছেন তা আজকের গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের চেয়ে কোন অংশে কম দৃশ্যমান নয়। ‘৬৪ জেলায় কি দেখেছি’ বইটি পড়ে আমি নিশ্চিত, যে কেউ শুধুমাত্র এ বইটি সাথে নিয়ে অনায়াসে বাংলাদেশের সব জেলা বেড়িয়ে আসতে পারবেন। বাংলাদেশে সাইকেল ভ্রমণের ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও এর জনপ্রিয়তা নগণ্য। এখন পর্যন্ত হাতে গোনা যে কয়জন দুই চাকার সাইকেল চেপে পুরো দেশ ভ্রমণে বের হয়েছেন, শরীফ তাঁদের অন্যতম। সুপ্রশস্ত মহাসড়ক ধরে সাইকেল নিয়ে ছুটে চলার যে কি আনন্দ তা কাউকে বলে বোঝান যাবে না। তবে শরীফের ‘৬৪ জেলায় কি দেখেছি’ বইটি পড়লে আপনার একবার হলেও ইচ্ছা করবে দেশটাকে আরো কাছ থেকে দেখতে, একবারের জন্য হলেও বেরিয়ে পড়তে। যাঁরা সাইক্লিং কমিউনিটির সদস্য, সাইকেল ভ্রমণে আগ্রহী কিংবা টুকটাক অ্যাডভেঞ্চার টুর করেছেন, তাঁদের জন্য শরীফের এই মাস্টারপিস ভ্রমণ কাহিনী আজীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। ভ্রমণের সময় শহর-বন্দর-গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হয় তাও শেখা যাবে এ বই থেকে। এছাড়া সাইকেল ভ্রমণের এমন অনেক খুঁটিনাটি অভিজ্ঞতা আপনি জানবেন, যা আপনার ভবিষ্যৎ সাইকেল কিংবা যেকোন ভ্রমণে বড় সহায়ক হিশেবে কাজ করবে। সাইকেল ভ্রমণের মত সাইক্লিংয়ের উপর লেখার সংখ্যাও আমাদের দেশে খুব কম। শরীফকে অসংখ্য ধন্যবাদ সাইকেল ভ্রমণ নিয়ে এ বই লেখার জন্য, তাঁর ৬৪ জেলা ভ্রমণের আদ্যোপান্ত আমাদের জানানোর জন্য। বইটি বাংলাদেশের ভ্রমণ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।—মাইনুল ইসলাম রাহাত
প্রচন্ড সাবলীল ভাষায় লেখা। প্রাঞ্জল লেখা বলতে যা বুঝায় সচরাচর। আবাগের কোনো আতিশয্য নেই। মনে হচ্ছিলো সদাহাস্যময় লেখক সামনে বসে গল্পের মতো করে শুনাচ্ছেন ৬৪ জেলার কথা। বাইসাইকেলে সেই ২০১০ সালে শরীফুল ভাইয়ের পুরো দেশ ঘোরার রোজনামচা। নামকরণের স্বার্থকতা রক্ষা হয়েছে। এক জেলা থেকে আরেক জেলা, যাবার রাস্তা, মানুষের আতিথেয়তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাবার সবই সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। প্রায় অধিকাংশ জায়গায় পরিচিত কারো বাসায় থেকেছেন, এমনকি পরিচিত ব্যাক্তির পরিচিত বা আত্মীয়ের বাসায়। মাঝে বেশকিছু সুন্দর ছবি রয়েছে। খুবই মানানসই প্রতিটা ছবিই। কত বিচিত্র সে অভিজ্ঞতা! আদতে ঘটনাগুলো খুব সাদামাটা মনে হলেও অনুসন্ধিৎসু মনের সুপ্ত ইচ্ছাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে গ্যারান্টি; যদি কোনো স্বপ্ন থেকে থাকে।। ঘর থেকে বেড়োতে ইন্ধন যোগাবে পড়া শুরু করলেই।
যারা ঘরের হননি, বাহির যাদের টানে, বেরিয়ে পড়বার ছুতোনাতা খোঁজেন, আর সবকিছু ঠিক থাকলেও একটু মোটিভেশনের অভাবে কেবল পা বাড়ানো হচ্ছে না- এই বই তাদেরই জন্য! বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সাইকেলে ঘোরা এখন প্রায় ডালভাত, পথ বাতলাবার মানুষও কম নেই, কিন্তু মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম যখন বেরিয়েছিলেন, তখন না ছিল গুগল ম্যাপ, না ছিল তার আগের কারো দৃষ্টান্ত। অবশ্য ওনার আগেও সারাদেশ সাইকেলে চষেছেন এমন মানুষ বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছেন, কিন্তু মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামের আগে আর কেউ এতটা সাড়া ফেলতে পারেননি সোশাল মিডিয়া না থাকায়, সেটা ঘুরতে নেমে লেখক নিজেও দেখতে পেয়েছেন, যখন পূর্বজ সাইকেল-পরিব্রাজকদের কারো কারো দেখা পেয়ে গেছিলেন অপ্রত্যাশিতভাবে। লেখক, ৬৪ জেলা ঘুরে ফেলা মানুষ হিসেবে যেমন দৃষ্টান্ত গড়েছেন, তেমনি, বাজারে এই সংক্রান্ত বই খুঁজতে গেলেও ওনারটাই আগে পাওয়া যায় (তাও বহু চেষ্টায়)। তাই নিজে চুনোপুটি ভবঘুরে হয়ে অগ্রপথিকের বই হাতে নিয়েছিলাম অনুপ্রাণিত হবার আশায়। শুরুতেই খুব মন কেমন করে উঠলো, যখন পড়ছিলাম, তৎকালীন চাকরি ছেড়ে লেখক পথে নামছেন দেশ দেখতে। আমারও দেশ ঘুরতে নামার ছিল ২০২১ সনে, অর্থ-সামর্থ্য থাকলেও বাঁধা পড়েছিলাম নতুন-নতুন ঢোকা চাকরিতে। আপশোশ! তারপর থেকে পড়ে গেলাম জেলার পর জেলা। লেখকের সাথে উত্তরবঙ্গ ঘুরে ফেলার পর মনে হতে লাগলো, বড্ড পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সেই একই সময়ে রওনা দেওয়া, পৌঁছুন, যাদের সাক্ষাত পাবার কথা সাক্ষাত নেওয়া, থাকার ব্যবস্থা করা বা সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষাত প্রাপ্তির চেষ্টা, এই-ই। এটা সত্যি, যাত্রার গতি যত ধীর হবে তত বেশি আশপাশের গল্প চোখে পড়বে। সাইকেল চালানোর সময় গন্তব্যে পৌঁছা আর পেইস (pace) ধরে রাখার মাথাব্যাথা থাকে, কিন্তু তা মেনে নিয়েও পথের অনেককিছু দেখার থাকে। একেকটা জেলা দেখার সাথে বৈচিত্র্যগুলোও লক্ষ্য করার থাকে। বইয়ের অনেকদূর অব্দি তা পাইনি। অভিযোগ মেটালেন লেখক, রাজশাহী এসে। রাস্তায় এক উটকো শিবির কর্মীর সাক্ষাতের বর্ণনা থেকে তারপর দেখতে পাচ্ছিলাম পথে দেখা হওয়া মানুষজন, আশপাশের কথাও লিখছেন। হতে পারে, হয়তো তার আগ অব্দি নোট করে রাখেননি দিনের খুঁটিনাটি, যাত্রার ধকলে। দক্ষিণবঙ্গে প্যানিয়ার পালটে পিঠের ব্যাগ নেওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন যেমন, তেমনি ছোটখাট অনেক কাজের কথাই লিখেছেন বিভিন্ন জায়গায়। আরেক আক্ষেপ, একটা লম্বা যাত্রা শুরু করার জন্য, আর্থিক এবং আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা কিভাবে করেছিলেন, সবচে বড় কথা- মাইন্ডসেট কিভাবে তৈরি করেছিলেন সেসব নিয়ে পর্যাপ্ত লিখেননি। শুরুর দিকের স্মৃতিতে কেবল উল্লেখ করেছেন, কার সাহায্য নিয়ে র্যুটপ্ল্যান করছেন। অথচ, সাইকেলে দেশভ্রমণের অগ্রপথিক হিসেবে এই বিষয়গুলো নিয়ে ওনার বক্তব্য খুব আশা করছিলাম ব্যক্তিগতভাবে, বিশেষত, বেশ ভাল মানের একটা চাকরি ছেড়ে ঘুরতে নামার সাহস দেখিয়েছেন যখন, লেখক। সাংঘাতিক মনের জোর। বর্ণনাশৈলী খুব ভালো না লাগলেও কন্টেন্ট আমাকে আটকে রেখেছিল শেষ অব্দি। তবে শেষদিকে, পার্বত্য জেলায় ঢুকে যাবার পরের বর্ণনা পড়তেই বেশ লাগছিল!
সর্বোপরি, এই বিষয়ের বই মোটে অপ্রতুল, তাই মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম যতটুকু লিখেছেন বইতে, তারচে বেশি তথ্য, বেশি বর্ণনা আশা করছিলাম। তবে বই লেখার চেয়ে বড় সার্থকতা তো কাজটা করে দেখানোয় আর নিজের সন্তুষ্টি লাভ, যেটা লেখক পেরেছেন। বই পড়ে তার সবটুকু স্বাদ পেতে চাওয়া-ই বরং অর্বাচীনের মত। তাও চাই, এরপরে যাঁরা ভ্রমণ নিয়ে বাংলায় লিখবেন, বিমল মুখার্জি কিংবা রামনাথ বিশ্বাসদের উত্তরসূরী হবার নাম রাখতে আর একটু যত্নশীল হবেন।
ভারী অভিযোগ আছে প্রডাকশনের ব্যাপারে। এক পৃষ্ঠায় যত অল্প জায়গা লেখার জন্য খরচ করেছেন, তা না করলে কিছু কম পৃষ্ঠায় বইটা চলে আসতো। ছবির জন্য যে কাগজ আর বাঁধাইয়ে যেমন মলাট ব্যবহার করা হয়েছে, তা সংগ্রহের জন্য চমৎকার, কিন্তু ভ্রমণের বই মানেই দাম দিয়ে কেনার সামর্থ্য থাকা লাগবে, এই গতানুগতিক থেকে আপনারা চাইলেই বেরোতে পারতেন। উদাহরণ? উড়ছে হাইজেনবার্গ। এমনকি ছবিও ছাপা হয়নি, কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক বইয়ে পাঁচশ টাকা খরচ করতে না চাওয়া এবং পকেটে স্মার্টফোন থাকা এখন সাধারণ বিষয়, মানতে হবে।
দু'চার কিলো সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আছে, সাইকেল নিয়ে বহুত মাতামাতি করেছি একটা সময়, সাইকেল সারাই, সাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়েও খানিকটা অভিজ্ঞতা আছে। মোট কথা, যখনই শুনেছি শরীফ ভাই তার ৬৪ জেলা ভ্রমণ নিয়ে বই বের করেছেন, তা পড়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। শেষ লাইনে সযতনে "সাইকেল" শব্দটা এড়িয়ে গিয়েছি। কারণ এই বইয়ে সাইকেল চালানোর যে কষ্ট, যে পরিশ্রম, তার ছিটেফোঁটাও উল্লেখ নেই। বরং যে উদ্দেশ্যে এই "বিনা কারণে, হুদাই পাগলামি" পরতে পরতে রয়েছে তার বিবরণ। নতুবা সাইকেল চিনি বলেই বলতে পারি, ২০১০ এ যে সাইকেল নিয়ে উনি বের হয়েছিলেন, ৬৪ জেলা ঘুরতে, আজকের দিনের বাঘা বাঘা অনেক সাইক্লিস্টেরই ** খুলে পরে যাবে তা দিয়ে ৬৪ কিলোমিটার চালাতে গিয়ে!
তা উনি কেন বেড়িয়েছিলেন? এই মনে করেন খুশিতে, ঠেলায়, ঘরতে.... না সিরিয়াসলি! ঘুরে বেড়ানো তথা দেশ দেখাই ছিল তার এই পাগলামির উদ্দেশ্য। আর নানাবিধ ঘটনার সাথে পরিচিত হয়ে সে উদ্দেশ্যে তিনি সম্পূর্ণ সফল! কয়েক জেলায় ডিসি অফিসের কর্মকর্তারা তার সাথে দূর্ব্যবহার করেছে, তাকে জংগী সন্দেহ করেছে, সিরাজগঞ্জ এ জমির কৃষকেরা তাকে সাথে বসিয়ে ভাত খাইয়েছে (হায়! "চাষা" এদেশে গালি!), তিস্তা ব্যারেজে আনসার সদস্য তার জন্য বাড়ি থেকে কাথা, বালিশ, মশারির বন্দবস্ত করেছে, এলাকায় এলাকায় নাম না জানা মানুষ তার খাবারের বিল পরিশোধ করে দিয়েছে.... আরও কত ���ী, অভিজ্ঞতার ভান্ডার পরিপূর্ণ! তবে অভিজ্ঞতা বুঝি এমনই জিনিস, যতই বাড়ে ততই নিজের দৈন্যদশা টের পাওয়া যায়। লেখকের ভাষায় - "ভ্রমণ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু আমার কাছে কেন যেন ৬৪ জেলা ভ্রমণকে সংবর্ধনা দেওয়ার মত আহামরি কিছু মনে হচ্ছিল না। অবশ্য যখন তেতুলিয়া-টেকনাফ সাইকেল ভ্রমণ শেষ করেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল কিছু একটা করেছি।"!!
বইটা ভালই লেগেছে, দ্বিতীয়বার যখন জ্বর কাটিয়ে উঠছি, তার মাঝে থেমে থেমে পড়া। উৎসর্গের লেখাটা অতি চমৎকার, হৃদয় ছুয়ে যাওয়া। কিছু কিছু বানানে তালব্য-শ এর ব্যবহার চোখে লেগেছে (হিশেব)। বইটা ভ্রমণকাহিনী হিসেবে পড়তে বসেছিলাম, যা আমার ভুল। এটি আসলে শরীফ ভাইয়ের ৬৪ জেলার ভ্রমণ ডায়েরি।
ছোট্ট একটা তথ্য দিয়ে শেষ করি, ৬৪ জেলা ভ্রমণে তার মোট চালাতে হয়েছে ৩৯৮৪ কিলোমিটার, সময় লেগেছে ৫৫ দিন, আর খরচ? ৮৫৭০ টাকা! আপনার সাইকেলের আপগ্রেডেশনকালে কত টাকার রিকশা ভাড়া দিয়েছিলেন যেন?
অসাধারণ, এক কথায় অসাধারণ। বেশ সাবলীল ভাষায় লেখা। মনে হচ্ছিলো লেখকের সাথে আমিও ঘুরে এলাম সাইকেলে ৬৪টা জেলা। মেদবিহীন একটি বই। টানতে সমস্যা হয়নি। আশা করি সাইকেলে দেশ ভ্রমণের চিন্তা যারা করছেন এই বই বেশ কাজে লাগবে।
লেখক সাইকেল নিয়ে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। যাত্রাপথের নানান কাহিনী নিয়েই লিখেছেন এই বইটি। বইটি পড়ে আমার ভ্রমণপিপাষু মনও চাইছে দেশ দেখতে বের হয়ে পড়ি। ভ্রমণ নিয়ে বেশ ইন্টারেস্টিং একটি বই।
লেখকের সাইকেলযোগে সারাদেশ ভ্রমণের ডায়েরী। অতি সাধারণ সহজ ভঙ্গিতে লিখা। সাহিত্যমান বিচারে হয়তবা খুব একটা সফল বলা যাবে না কিন্তু ভ্রমণপিপাসু পাঠকের স্বপ্নের জগতটাকে আরো কিছুটা প্রশস্ত করার সামর্থ্য এই বইয়ের রয়েছে।
Banff Mountain Film festival নামের একটি অনুষ্ঠানে বিনয়ী লেখকের মুখে সরাসরি এই ভ্রমণের কিছু কথা শোনার অভিজ্ঞতা হয়। এরকম এডভেঞ্চারের গল্প সবসময় পাওয়া যায় না। লেখকের চোখে ৬৪ জেলা দেখা হলো আর দেশের নানা প্রান্তের গল্প জানা হলো।