যারা ঘরের হননি, বাহির যাদের টানে, বেরিয়ে পড়বার ছুতোনাতা খোঁজেন, আর সবকিছু ঠিক থাকলেও একটু মোটিভেশনের অভাবে কেবল পা বাড়ানো হচ্ছে না- এই বই তাদেরই জন্য! বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সাইকেলে ঘোরা এখন প্রায় ডালভাত, পথ বাতলাবার মানুষও কম নেই, কিন্তু মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম যখন বেরিয়েছিলেন, তখন না ছিল গুগল ম্যাপ, না ছিল তার আগের কারো দৃষ্টান্ত। অবশ্য ওনার আগেও সারাদেশ সাইকেলে চষেছেন এমন মানুষ বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছেন, কিন্তু মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামের আগে আর কেউ এতটা সাড়া ফেলতে পারেননি সোশাল মিডিয়া না থাকায়, সেটা ঘুরতে নেমে লেখক নিজেও দেখতে পেয়েছেন, যখন পূর্বজ সাইকেল-পরিব্রাজকদের কারো কারো দেখা পেয়ে গেছিলেন অপ্রত্যাশিতভাবে।
লেখক, ৬৪ জেলা ঘুরে ফেলা মানুষ হিসেবে যেমন দৃষ্টান্ত গড়েছেন, তেমনি, বাজারে এই সংক্রান্ত বই খুঁজতে গেলেও ওনারটাই আগে পাওয়া যায় (তাও বহু চেষ্টায়)। তাই নিজে চুনোপুটি ভবঘুরে হয়ে অগ্রপথিকের বই হাতে নিয়েছিলাম অনুপ্রাণিত হবার আশায়। শুরুতেই খুব মন কেমন করে উঠলো, যখন পড়ছিলাম, তৎকালীন চাকরি ছেড়ে লেখক পথে নামছেন দেশ দেখতে। আমারও দেশ ঘুরতে নামার ছিল ২০২১ সনে, অর্থ-সামর্থ্য থাকলেও বাঁধা পড়েছিলাম নতুন-নতুন ঢোকা চাকরিতে। আপশোশ!
তারপর থেকে পড়ে গেলাম জেলার পর জেলা। লেখকের সাথে উত্তরবঙ্গ ঘুরে ফেলার পর মনে হতে লাগলো, বড্ড পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সেই একই সময়ে রওনা দেওয়া, পৌঁছুন, যাদের সাক্ষাত পাবার কথা সাক্ষাত নেওয়া, থাকার ব্যবস্থা করা বা সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষাত প্রাপ্তির চেষ্টা, এই-ই। এটা সত্যি, যাত্রার গতি যত ধীর হবে তত বেশি আশপাশের গল্প চোখে পড়বে। সাইকেল চালানোর সময় গন্তব্যে পৌঁছা আর পেইস (pace) ধরে রাখার মাথাব্যাথা থাকে, কিন্তু তা মেনে নিয়েও পথের অনেককিছু দেখার থাকে। একেকটা জেলা দেখার সাথে বৈচিত্র্যগুলোও লক্ষ্য করার থাকে। বইয়ের অনেকদূর অব্দি তা পাইনি।
অভিযোগ মেটালেন লেখক, রাজশাহী এসে। রাস্তায় এক উটকো শিবির কর্মীর সাক্ষাতের বর্ণনা থেকে তারপর দেখতে পাচ্ছিলাম পথে দেখা হওয়া মানুষজন, আশপাশের কথাও লিখছেন। হতে পারে, হয়তো তার আগ অব্দি নোট করে রাখেননি দিনের খুঁটিনাটি, যাত্রার ধকলে।
দক্ষিণবঙ্গে প্যানিয়ার পালটে পিঠের ব্যাগ নেওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন যেমন, তেমনি ছোটখাট অনেক কাজের কথাই লিখেছেন বিভিন্ন জায়গায়। আরেক আক্ষেপ, একটা লম্বা যাত্রা শুরু করার জন্য, আর্থিক এবং আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা কিভাবে করেছিলেন, সবচে বড় কথা- মাইন্ডসেট কিভাবে তৈরি করেছিলেন সেসব নিয়ে পর্যাপ্ত লিখেননি। শুরুর দিকের স্মৃতিতে কেবল উল্লেখ করেছেন, কার সাহায্য নিয়ে র্যুটপ্ল্যান করছেন। অথচ, সাইকেলে দেশভ্রমণের অগ্রপথিক হিসেবে এই বিষয়গুলো নিয়ে ওনার বক্তব্য খুব আশা করছিলাম ব্যক্তিগতভাবে, বিশেষত, বেশ ভাল মানের একটা চাকরি ছেড়ে ঘুরতে নামার সাহস দেখিয়েছেন যখন, লেখক। সাংঘাতিক মনের জোর।
বর্ণনাশৈলী খুব ভালো না লাগলেও কন্টেন্ট আমাকে আটকে রেখেছিল শেষ অব্দি। তবে শেষদিকে, পার্বত্য জেলায় ঢুকে যাবার পরের বর্ণনা পড়তেই বেশ লাগছিল!
সর্বোপরি, এই বিষয়ের বই মোটে অপ্রতুল, তাই মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম যতটুকু লিখেছেন বইতে, তারচে বেশি তথ্য, বেশি বর্ণনা আশা করছিলাম। তবে বই লেখার চেয়ে বড় সার্থকতা তো কাজটা করে দেখানোয় আর নিজের সন্তুষ্টি লাভ, যেটা লেখক পেরেছেন। বই পড়ে তার সবটুকু স্বাদ পেতে চাওয়া-ই বরং অর্বাচীনের মত। তাও চাই, এরপরে যাঁরা ভ্রমণ নিয়ে বাংলায় লিখবেন, বিমল মুখার্জি কিংবা রামনাথ বিশ্বাসদের উত্তরসূরী হবার নাম রাখতে আর একটু যত্নশীল হবেন।
ভারী অভিযোগ আছে প্রডাকশনের ব্যাপারে। এক পৃষ্ঠায় যত অল্প জায়গা লেখার জন্য খরচ করেছেন, তা না করলে কিছু কম পৃষ্ঠায় বইটা চলে আসতো। ছবির জন্য যে কাগজ আর বাঁধাইয়ে যেমন মলাট ব্যবহার করা হয়েছে, তা সংগ্রহের
জন্য চমৎকার, কিন্তু ভ্রমণের বই মানেই দাম দিয়ে কেনার সামর্থ্য থাকা লাগবে, এই গতানুগতিক থেকে আপনারা চাইলেই বেরোতে পারতেন। উদাহরণ? উড়ছে হাইজেনবার্গ। এমনকি ছবিও ছাপা হয়নি, কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক বইয়ে পাঁচশ টাকা খরচ করতে না চাওয়া এবং পকেটে স্মার্টফোন থাকা এখন সাধারণ বিষয়, মানতে হবে।
এই পৃথিবী বইয়ের হোক, আর জীবন হোক পথিকের!