ট্যাবলয়েড পত্রিকা 'সত্য-কলাম'কে টিকিয়ে রাখতে প্রকাশক রফিক শিকদার সাহায্যের আবেদন নিয়ে ছুটে গেলো দীর্ঘদিনের বন্ধু’র কাছে। এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখিমুখি হয়ে তার মনে পড়ে নিজের ফেলে আসা অতীতের কথা। কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো সে। আর এ সিদ্ধান্তের জন্যই রফিক শিকদার দেখলো, শুনলো এবং জানলো উদ্ভট কিছু ঘটনার কথা। অবশেষে মানতেও বাধ্য হলো, আলো'র বিপরীতেই আছে আঁধার। হার না মানা অন্ধকার। বাপ্পী খানের সুপার ন্যাচারাল ধারার এই নোভেলাতে উঠে এসেছে অদ্ভুত কিছু ভয়ের উপাখ্যান।
বাংলা ভাষায় হরর ফিকশন একটা নির্দিষ্ট ছকের মাঝে আবদ্ধ। আদ্যিকাল থেকে সেই একই নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা এদিক-সেদিক করে ব্যবহার করে হরর গল্পের প্লট সাজানো হয়ে আসছে। মৃত মানুষের হঠাৎ করে দেখা দেওয়া, অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা, বিভৎস চেহারার ভূত-পেত্নী-পিশাচ এসে নিষ্ঠুরভাবে ভিক্টিমকে হত্যা, হানাবাড়িতে ভৌতিক উপদ্রব, অতীতের কোন পুষে রাখা ক্ষোভের কারণে মৃত্যুর পর ফিরে এসে প্রতিশোধ নেয়া অথবা নিম্নবুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রাণির রূপ ধরে অলৌকিক শক্তির ঘুরে বেড়ানো- গল্পের প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, ঘুরেফিরে এক্সিকিউশন কিন্তু একইভাবে হয়ে থাকে। অর্থাৎ গল্পের শেষে এসে পাঠক আবিস্কার করে নির্দিষ্ট ফর্মুলা মেনে গল্প শেষ। ওপার বাংলার তান্ত্রিক/অশুভ দেবীর আগমণের মাধ্যমে যে গল্পগুলো সাজানো হয়ে থাকে, খেয়াল করে দেখবেন, সেগুলোও কেমন যেন ছকে বাধা।
উপমহাদেশের বাইরে বেরোতে চাইলেও পাঠককে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়। স্যাটানিজম/ কাল্ট/ ভ্যাম্পায়ার/ মিথ/ড্রাকুলা/ হন্টেড হাউজ/ এক্সট্রিম গোর - সাহেবরা হরর বলতে ঘুরেফিরে এগুলোর মাঝেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যদিও ক্লাসিক যুগে এডগার এলান পো, এইচ পি লাভক্র্যাফট, মেরি শেলি, ব্যাম স্ট্রোকার অথবা শার্লি জ্যাকসনের মতো লেখকেরা ভিন্ন ভিন্ন ধারার হরর ফিকশনে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন স্বতন্ত্র রূপে। মডার্ন হরর ফিকশনে অবশ্য জাপানিজ হরর আমার ব্যক্তিগত ভালোবাসার জায়গা। জুঞ্জি ইতোর কথাই ধরা যাক- অদ্ভুত সব গল্প আঁকেন এই মাঙ্গা আর্টিস্ট। মানুষ শামুক হয়ে যাচ্ছে, মাছেরা ডাঙায় উঠে আসছে- অদ্ভুত সব গল্প। অথচ পড়ার সময় আপনি ভেবে শিউরে উঠবেন, এমন কিছু তো আগে কখনও পড়িনি!
মডার্ন লিটারেচারে হররের বেশ আলাদা আলাদা কিছু জনরা আছে, পিওর জনরাগুলো একটা আরেকটার সাথে ব্লেন্ডিং করে গালভরা নামে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টাল সাবজনরা ক্রিয়েট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হরর রাইটাররা নানা কারণে সমালোচিত হয়ে থাকেন, সাহিত্যমানের দিক থেকেও হররকে বোদ্ধারা খাটো করে দেখেন অথবা দেখাতে চান। তবুও স্টিফেন কিং এর মতো লেখকেরা কিংবদন্তী হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন সিগনেচার স্টাইলের কারণে। হ্যাঁ, স্টিফেন কিং আমার অতি পছন্দের হরর লেখকদের একজন। মোটা দাগে স্টিফেন কিং এর হররগুলোকে ঠিক ট্রেডিশনাল হরর বলা যায় না। স্টিফেন কিং হরর এলিমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেন আপনার পরিচিত জগতকে; অতিপ্রাকৃতিক অথবা ফ্যান্টাসির পাশাপাশি স্টিফেন কিং এর বইগুলোতে প্রায়ই দেখা পাওয়া যায় স্বাভাবিক জগতের বর্ণণা- যেখানে কুয়াশায় ছেয়ে যায় গোটা শহর, ভয়ঙ্কর কুকুরের পাল্লায় আটকে পড়ে মৃত্যুভয়ে কাতর হয়ে ওঠে ভিক্টিম, ইত্যাদি ইত্যাদি। ভূতপ্রেত নয় বরং আপনার-আমার মনের গভীরে জমে থাকা ভয়গুলোকেই বইয়ের পাতায় হরর এলিমেন্ট হিসেবে নিয়ে আসেন কিং!
বাংলাদেশে হরর নিয়ে কাজ হচ্ছে; বহুদিন ধরেই হচ্ছে। তবে ওই যে বললাম, প্যাটার্ন ভেঙে বেরোনোটা হয়ে ওঠেনি অনেকদিন। হুমায়ূন আহমেদ একসময় কুটু মিয়া/ মিসির আলীর "আমি এবং আমরা"/" কহেন কবি কালিদাস" অথবা আরো কিছু দুর্দান্ত হরর লিখে গেছেন। পাঠক গোগ্রাসে সেগুলো গিলে গেলেও কেন যেন খুব বেশি আলোচনা হয়নি কখনোই।
পাশাপাশি আবার দীর্ঘ সময় ধরে অনুবাদ/এডাপ্টেশনের মাধ্যমে পাঠকের হাতে চর্বিত চর্বণ তুলে দিয়েছেন স্বঘোষিত " হরর কিং! "হরর লেখা বাচ্চাদের কাজ, মানুষ সস্তা বিনোদনের আশায় হরর বই কেনে" - এমন ভেবেও দেশে পাইকারি হারে উত্থান ঘটেছে 'কাটা মুন্ডু', 'পিশাচের হাসি', 'রক্তাক্ত অমুকতমুক" টাইটেল সম্পন্ন বইয়ের লেখকের। যার ফলে, কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে দিনদিন গ্ল্যামার হারিয়েছে হরর।
আশার কথা হচ্ছে গত তিন/চার বছরে আমরা হরর ঘরানায় স্বতন্ত্র ধারার স্বাদ পেতে শুরু করেছি। তানজীম রহমানের হাত ধরে অক্টারিনের মতো সুপাঠ্য পজেশন মিস্ট্রি অথবা আর্কনের মতো মাথা ঘুরিয়ে দেয়া এক্সপেরিমেন্টাল হরর এসেছে, তৈমূর আলমগীর স্যারের হাতে নির্মিত হয়েছে বংশালের বনলতার মতো ইতিহাস/কাল্ট নির্ভর ডার্ক ফিকশন। সৈয়দ অনির্বাণের "শোণিত উপাখ্যান" দেশী প্রেক্ষাপটে আরবান ফ্যান্টাসির ইন্ট্রোডিউসার ছিল। নসিব পঞ্চমের "মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন" ছিল ভিন্নধারার অকাল্ট ফিকশন। জাহিদ হোসেন প্রথমবারের মতো বাংলায় লাভক্র্যাফটিয়ান হরর লিখেছেন (এক জোড়া চোখ খোঁজে আরেক জোড়া চোখকে)। এবছর আসিফ রুডলফাযের "কথুলহু" বইটাও পিওর লাভক্র্যাফটিয়ান হররে নতুন এক সংযোজন। (প্রচারণার খাতিরে বলতে হয়, গতবছর গোথিক হররের ধাচ মেনে আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে নামে ১৯৩০ এর অবিভক্ত বাংলার প্রেক্ষাপটে একটি সস্তা, অসামাজিক নভেলা লিখেছিলাম। খুব একটা খারাপ রেসপন্স পাইনি... লিখে রেখো এক ফোটা দিলেম শিশির।)
দীর্ঘ আলাপের পর মূল আলোচনায় আসি। "হার না মানা অন্ধকার" বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক হরর ফিকশন ধারায় নতুন এক সংযোজন। রফিক শিকদার নামের এক ট্যাবলয়েড পত্রিকার সাংবাদিক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার সাথে। গল্প হিসেবে শুনছে, কখনো দেখা মিলছে চাক্ষুষ প্রমাণের। না, কোন ভৌতিক সত্ত্বা নয়, অশ্বত্থ গাছ থেকে ঝাপিয়ে পড়া ডাইনি নয়- ভৌতিকতার উৎস এখানে একদমই আলাদা। প্রকৃতি বারেবারে অতিপ্রাকৃতিক রূপে...না, স্পয়লার হয়ে যাচ্ছে। বই পড়লেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা।
ছোট্ট পরিসরের নভেলা, অল্প কিছু ক্যারেক্টার। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে লেখকের রাইটিং স্টাইলের ইমপ্রুভমেন্ট। আগের দুটো বইয়ের সাথে এই বইয়ের ন্যারেটিভ প্যাটার্নের বিস্তর ফারাক; ম্যাচুরিটি অতি লক্ষণীয়। স্টোরিটেলিং, প্লট মেকিং, এক্সিকিউশন - চমৎকার। উৎসর্গের পাতায় যেহেতু বিভূতিভূষণের নাম এসেছে, দায়বদ্ধতাও বেড়ে গিয়েছে অনেকটুকু। সেক্ষেত্রেও প্রশংসা করতে হয়। বিভূতি মানেই নৈস্বর্গিক প্রকৃতির বর্ণনা, আর হার না মানা অন্ধকার তো আসলে প্রকৃতিরই গল্প! পাহাড়, টিলা, ঝর্ণা, বাগান- আহা, বেশ বেশ বেশ!
যতদূর জানলাম, সিরিজ হিসেবে পরিণতি ঘটবে। লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো৷ সেই সাথে রইলো অভিনন্দন।
H. P. Lovecraft এর একটা লাইন দিয়ে আলাপের ইতি ঘটাচ্ছি-
The oldest and strongest emotion of mankind is fear, and the oldest and strongest kind offear is fear of the unknown.
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: যদি সম্ভব হয়, অর্থ বা সময় অনুমতি দেয়, তাহলে সব লেখকের বই-ই একাধিকবার পড়ে দেখা দরকার। মর্নিং ডাজ নট অলওয়েজ শো দ্য ডে। কেন বলছি? যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই বলছি যে বাপ্পী খান ভাইয়ের প্রথম দুটো বই 'একা' এবং 'নিশাচর' ছিল সো-সো। ওকে ক্যাটেগরির। খুব বেশি আগ্রহী করে তোলার মতো না, আবার পড়ে যে ভালো লাগে না এমনও না। তবে হ্যাঁ, লেখকের পরের বইটা পড়ার অত্যুগ্র আগ্রহ জাগে না মনে। কিন্তু অবরুদ্ধতার গল্পতে লেখা 'জম্বা' গল্পটি পড়ে মনে হয়েছিল, যেন সম্পূর্ণ আলাদা একজন লেখকের গল্প পড়ছি! সেই ধারাবাহিকতাতেই হার না মানা অন্ধকার বইটি তুলে নেয়া। ছোট ছোট পরিচ্ছেদে বেশ কয়েকটা স্টোরি লাইন এগিয়ে গেছে। প্রত্যেকটার শেষে রয়ে গেছে কিছুটা হলেও অব্যাখ্যাত, হয়তো ট্রিলজির পরবর্তী বইতে সেটা পরিষ্কার করা হবে। কিন্তু বইটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, যেন লেখনশৈলী টেনে ধরে রেখেছে বইয়ের ভেতরে। রফিক শিকদারের চরিত্রের জবানীতে খুব সুন্দর ফুটে উঠেছে চরিত্রগুলো, এমনকী রফিকের চরিত্রও। ধোঁয়াশায় ঘেরা এই চরিত্রটি চিত্রণে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। যতটুকু আগ্রহের মিইয়ে আশা আগুনকে উসকে দেয়, ততটুকু ইনসাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে বলে বেশ ভালো লেগেছে। গল্পের প্লটগুলো অবিশ্বাস্য হলেও কেমন যেন বিশ্বাস করতে মনে চায়। মন বলে-হতেও তো পারে! আর এখানেই লেখকের সার্থকতা। আফসোসের কথা হলো, বইয়ের বানান ভুলের পরিমাণ বিরক্তিকর পর্যায়েই ছিল। একটা বই, সেটার প্রতি লেখকের যত্ন থাকেই, যত্ন কিছু প্রকাশনীর আর প্রুফ রিডারেরও থাকতে হয়। যেহেতু মানুষ আর মানুষের কাজ, তাই ভুল-ভ্রান্তি কিছু থাকা অস্বাভাবিক না। লেখকরা সাহিত্যিক, ব্যাকরণবিদ নন যে তাদের লেখা একেবারে নিখুঁত হবে। কিন্তু যদি অন্যদের কাছে সাপোর্ট না পাওয়া যায়, তাহলে হয় না। যেমন এই বইয়ের একটা অধ্যায়ের প্যারার শেষে অনেকগুলো '০০০০০০০' এর উপস্থিতি। এটা সম্ভবত অযত্নই নির্দেশ করে। একটা অক্ষর হতো তো বুঝে নিতাম যে রিপ্লেস করতে গিয়ে আর ডিলিট করার কথা মনে নেই। ০০০০০০০ কেন? তেমনি শেষ পাতায় চরিত্রের নামে সম্ভবত একটু ভুল আছে।
গল্পের প্রধান চরিত্র রফিক সাহেবের সাথে ঘটে যাওয়া প্রথম ঘটনাটা পড়েই বুঝতে পেরেছি সামনে কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য। গল্প বলার ঢং আর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি দুটোতেই লেখকের মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট । তারপর আর আমাকে ঠেকাই কে । দিলুম ছুট।
প্রত্যেকটা গল্পের প্লট অদ্ভুত সুন্দর আর ভয়ংকর। বোধ করি প্রত্যেকটা প্লট নিয়েই এক একটা মারাত্মক অতিপ্রাকৃত উপন্যাসিকা লিখে ফেলা সম্ভব। বিশেষ করে, রাঙ্গামাটির পাথরের আর হেম্মেজ ফকিরের দুটো গল্পই আমাকে চরম মুগ্ধ করেছে। প্রত্যেকটা গল্প শেষ করেই তার রেশ থেকে যাচ্ছিল মনের গভীর থেকে গভীরে । আরো কিছু জানার জন্য একটা সুপ্ত বাসনা তৈরি হচ্ছিল । পরবর্তী খন্ডের জন্য আগ্রহ এইজন্য আরো বেশি। হয়তো সেই সুপ্ত বাসনার উপযুক্ত মোচন ঘটবে। পাঁচ পাঁচটি গল্পের শেষে গিয়ে লেখক যে একখান এন্ডিং মেরেছে তাও কহতব্য না। মারাত্মক সুন্দর বললেও অত্যুক্তি হবে।
বইটার কমতি বের করা বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে পড়ার সময় একটা ব্যাপার একটু বেমানান লাগছিল। সেটা বন্ধু জিকোর গল্পে। জিকো যে পরিমাণ আতঙ্ক আর উত্তেজিত ছিল ঠিক ঐ সময়ে তার জবানিতে এতো নিখুঁত ডিটেইলস আর পরিবেশ তৈরি করে, যথেষ্ট সময় নিয়ে গল্প বলাটা একটু অসম্ভব নয় কি?
গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লেখাটা খুব বড় হয়ে যেত। তাছাড়া স্পয়লার এড়িয়ে আলোচনা করাটাও আমার জন্যে খানিকটা চ্যালেঞ্জের। তাই এড়িয়ে গেলাম।।
কনসেপ্ট ভালো, আপাত দৃষ্টিতে পাঁচটা বিচ্ছিন্ন গল্পের অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন লেখক। এর মাঝে দুইটার কথা আলাদাভাবে বলতে হয়, অন্ধ ফকিরের গল্প আর ফটোগ্রাফার জিকোর গল্প।
পড়ে ফেললাম বাপ্পী খানের হার না মানা অন্ধকার। বইটার গল্প বলার ঢঙ খুবই চমৎকার, এই ক্ষেত্রে একেবারে পাঁচে পাঁচ। শুরু করলে আপনাকে শেষ পাতা পর্যন্ত পড়িয়ে নিয়ে যাবে এই বই। এর মধ্যে বেশ কিছু অলৌকিক অভিজ্ঞতা আছে। সবচেয়ে সেরা ছিলো পাথরেরটা। ওটা আইডিয়ার বিচারে পাঁচে সাতও পেতে পারে। ;) সব মিলিয়ে হার না মানা অন্ধকার যে একটা দারুণ উপভোগ্য বই ছিলো তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এক তারা কাটা গেল হয়তো আমার দোষেই। হরর-আধিভৌতিক গল্প আমার পাথরহৃদয়ে সহজে ভয়ের অনুভূতি আনতে পারে না। যে কারণে বইটা পড়ে বিমলানন্দ পেলেও ভয়টা ঠিক ওভাবে পাইনি...
আমি রাতের বেলায় ড্রাকুলা পড়েও বিশেষ একটা ভয় পাইনি, এমনকি সেই অল্প বয়সে, রক্তবীজ একমাত্র বই যা আমার আত্মা ওড়াতে পেরেছিলো, কাজেই আমার এই ভয় না পাওয়ার জাজমেন্ট সর্বজনীন নাও হতে পারে। এই রিভিউ থেকে ভয় পাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তে না যাওয়ার অনুরোধ থাকলো।
ভয়ের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারা। একটা অস্বস্তি, মনের ভেতর চাপ, ঝলমলে আলোতে বসে পড়লেও পাঠক অনুভব করবে তার বসে থাকা আলোর বৃত্তের ঠিক বাইরেই ঘিরে রয়েছে অন্ধকার, তীব্র গরমেও গা শিরশির করবে শীতলতার আমেজে। বাংলা ভাষায় এর আদর্শ উদাহরণ মানি তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পগুলো, শরদিন্দু'র কামিনী, আর হুমায়ূনের বৃহন্নলা। লেখককে অভিনন্দন, এই বইয়ে তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছেন। সাংবাদিক রফিক শিকদারের সাথে ধানমন্ডি লেক হোক বা সিলেটের পাহাড় কিংবা রাঙামাটির প্রকৃতি, সবখানেই অন্ধকারের শক্তির উপস্থিতি অবিশ্বাস্য বা আরোপিত মনে হয় না। প্রকৃতির বর্ণনায় পাঠককে ডুবিয়ে দিতে পারার দক্ষতাও এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে। বড় কথা হলো, মাত্রাজ্ঞান চমৎকার; অহেতুক ঘ্যান ঘ্যান করে গল্প টানার অপচেষ্টা নেই, যেখানে দরকার সেখানেই শেষ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের নতুন লেখকদের আরো একটা প্রবণতা--ফেসবুকীয় ভাষা-সংলাপ আর শব্দের ভুলভাল প্রয়োগ বা ভুল শব্দ প্রয়োগ কিংবা বালকসুলভ বাক্যবিন্যাসও-- নেই একদমই, যার কারণে পড়তে রীতিমত আরাম লাগে। প্লটেও নতুনত্ব আছে, বিশেষ করে হেম্মেজ ফকিরের ঘটনাটায়। দুই বাংলা মিলিয়ে অনেকগুলো একঘেয়ে বিরক্তিকর হরর পড়ার পরে এই বইটা রীতিমত স্বস্তি দিয়েছে, সেজন্য ৪ তারা।
এক ঘন্টা টাইম পাসের জন্য বেশ ভালো বই। ব্রেনে মোটামুটি জট বেধে গেলে, এই টাইপের বই গুলো আসলেই উপকারে আসে। আর সত্যি বলতে লেখকের লেখনী এমেচার ধরনের হলেও দারুন সাবলিল।
আলো আঁধারের যাত্রীদের বিশ্বাস পরস্পর বিরোধী হলেও উভয় দলই আলোআঁধারের ঘটনাগুলো বেশ উপভোগ করে। এরকম কিছু ঘটনার মিশেলেই মূলত অন্ধকার ট্রিলজির প্রথম বইটির প্লট সেজেছে। অতিপ্রাকৃত ঘটনা নির্ভর ট্যাবলয়েড পত্রিকা সম্পাদক রফিক শিকদারই এই ঘটনা/অ্যাডভেঞ্চারগুলো এক্সপ্লোর করে তার পত্রিকায় ছাপাবার জন্য। এই গল্পগুলো মেদহীন, গভীর চিন্তায় ডুবিয়ে দেয়। প্রাকৃতির কিছু না জানা কথা জানায়। জানায় মানুষ আর প্রাকৃতির মাঝে সম্পর্কের কিছু গূঢ় রহস্য। যেগুলো সাধারণত আমরা কেউ ভাবি না বা কেউ আসলে সহজে এগুলো নিয়ে তেমন জানতেও পারি না। লেখাগুলো খুব সাবলীল, মায়ায় ফেলে বারংবার। আর এই ছোটছোট ঘটনাগুলো জুড়ে জুড়েই আবার রচিত হয় ভিন্ন আরেক উপখ্যান । যেহেতু বইতে বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন ঘটনা উঠে আসে তাই প্রচুর নতুন মুখ দেখতে পাই। আর প্রিয় মুখগুলোর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। দুএকজনের নাম উল্লেখ করতে হলেও অনেকগুলো নাম এসে পড়বে বলে শুধু একটিতেই থামছি। আর সেটা হলো বইয়ের মূখ্য চরিত্র রফিক শিকদার। উনার ফিলোসফি আমাকে বেশ তৃপ্তি দিয়েছে। বড় করে আরও অনেক কিছু বলার ইচ্ছে থাকলেও এখন খ্যান্ত দিচ্ছি। যাইহোক, খতেমা হলো অতিপ্রাকৃত ফ্যানদের জন্য মাস্ট্ররিড ছাড়াও যারা এরকম স্বাদের কিছু শুরু করতে চান, তাদের জন এই ট্রিলজিটা আশাকরি বেস্ট হবে।
বইয়ের কন্সেপ্ট পছন্দ হয়েছে। প্রকৃতির ভারসাম্য। প্রকৃতি যে সবসময় ভালোটাই দিবে তা তো নয়। উল্টোটাও ঘটে। প্রকৃতির অন্ধকার রূপটা লেখক তুলে ধরেছেন "সত্য-কলাম" পত্রিকার প্রকাশক রফিক শিকদারের মাধ্যমে। যিনি বিভিন্ন অপ্রাকৃত কিন্তু সত্য ঘটনাগুলো এই পত্রিকায় তুলে ধরেন৷ পুরাতন ভুত-প্রেত নয়। এখানে ভিলেন হচ্ছে প্রকৃতিমাতা নিজেই। প্রকৃতির নির্মমতা দেখানো হয়েছে প্রতিটি গল্পে। বর্ণনা সুন্দর ছিল। নতুন একটা স্টাইলে গল্প বলেছেন লেখক। এই স্টাইলটা পছন্দ হয়েছে। লেখনী আগের চেয়ে পরিণত। তবে আরো উন্নতির জায়গা রয়েছে। গল্পগুলোতে ভয়ের মাত্রা আমার জন্য কমই মনে হয়েছে। আরেকটু বেশি চাইছিলাম। বইটা পড়েছিও রাতে। শেষের সাপ গল্পটি ভালো লেগেছে বেশি। তারপর ঝর্ণার গল্প। শেষে সিকুয়েলের আভাস দিয়ে রেখেছেন লেখক। আমি চাইব লেখার পরিসর একটু বর্ধিত হোক। আরেকটু বেশি কলেবরে পরের বইটা পেতে চাই৷ লেখকের জন্য শুভকামনা। এই "অন্ধকার" সিরিজের একটা স্পিন অফ আসছে "থ্রিলার জার্নাল ২"-এ। রেটিং- ৩.৭৫/৫
বইটির শীর্নকায় কলেবরে যতটুকু সম্ভব লেখক তাঁর লেখনীর পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। গতানুগতিক ভূত-পেত্নীর গন্ডি পেরিয়ে হরর ধারায় নিয়ে এসেছেন অতিপ্রাকৃত রহস্যের সম্ভা্র। প্রকৃতির সুন্দর আলো ঝলমলে দিক যেমন রয়েছে, তেমনি এর প্রতিহিংসা পরায়ন দিকও রয়েছে। প্রকৃতির এই অন্ধকার ও রহস্যময় দিক নিয়েই বইয়ের কাহিনী এগিয়ে গেছে। বইয়ের প্রধান চরিত্র রফিক শিকদার তার ট্যাবলয়েড পত্রিকার জন্য রহস্যময় সব কাহিনীর খোঁজে ছুটে চলে দুর্গম এলাকায়। গল্পগুলোতে লৌকিকতার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হয়। বইয়ের শেষের দিকে কিছুটা ধোঁয়াশা রাখা হয়েছে সম্ভবত সিকুয়েলের জন্য। আশা করি পরবর্তি বইয়ে পাঠকের দৃষ্টির আড়ালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আলোর মুখ দেখবে।
ঝরঝরে গতিশীল লেখা, চমৎকার স্টোরিটেলিং। লেখকের আগের বইয়ের তুলনায় একদম ভিন্ন, অনেক ম্যাচিউরড রূপে দেখা যাচ্ছে। প্রথম দুই লাইন থেকেই গল্পের ভেতরে ঢুকে যাওয়া যায়। বইয়ের প্যারানরমাল সবগুলো থিমই প্রকৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট, নেচার এক্সপ্লোরেশন অংশগুলো প্রশংসাযোগ্য ছিলো। উৎসর্গপত্রে বিঁভূতির নাম থাকায় তার প্রতি হোমেজ টা টের পাওয়া যায়। গতানুগতিক হরর/সুপারন্যাচারালের কাঠামোর বাইরে প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার একটা নভেলা- একবসায় পড়ে ফেলার মতো। বিল্ড আপ ভালো হলেও ক্লাইম্যাক্স দ্রুত এবং বিক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। সেজন্য কিছুটা অপূর্ণতা থেকে গেল। ক্লিফ হ্যাংগার পছন্দ হয়েছে, পড়ের বইয়ের অপেক্ষায় থাকবো।
মোটামুটি ভালই। গল্প ছলে গোছের চেয়ে বেটার। আগ্রহ জিইয়ে রাখতে পারে। এটা মিস্ট্রি হরর জনরা ধরনের। লেখকের আর কোন লেখা আগে পড়িনি। দেখি সামনে কি হয়। বেশ ছোট কলেবরের বই, গড়গড় করে পড়ে ফেলা গেল!
অদ্ভুত ভারসাম্য রয়েছে আমাদের এই জগৎসংসারে। সত্যের বিপরীতে রয়েছে মিথ্যা, ভালোর বিপরীতে রয়েছে মন্দ আর আলোর বিপরীতে? অন্ধকার!
কাহিনী সংক্ষেপ: ট্যাবলয়েড পত্রিকা 'সত্য-কলাম'কে টিকিয়ে রাখতে প্রকাশক রফিক শিকদার সাহায্যের আবেদন নিয়ে ছুটে গেলো দীর্ঘদিনের বন্ধু’র কাছে। এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখিমুখি হয়ে তার মনে পড়ে নিজের ফেলে আসা অতীতের কথা। কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো সে। আর এ সিদ্ধান্তের জন্যই রফিক শিকদার দেখলো, শুনলো এবং জানলো উদ্ভট কিছু ঘটনার কথা। অবশেষে মানতেও বাধ্য হলো, আলো'র বিপরীতেই আছে আঁধার। বাপ্পী খানের সুপার ন্যাচারাল ধারার এই নোভেলাতে উঠে এসেছে অদ্ভুত কিছু ভয়ের উপাখ্যান।
মতামত: লেখক বাপ্পী খানের তৃতীয় নোভেলা হার না মানা অন্ধকার। আগের বারের তুলনায় এবারকার নোভেলার বিষয় বস্তু অন্যরকমের। হরর জনারাতে বেশির ভাগ সময় কোন প্রাণী বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাহিনী গড়ে ওঠে, কিন্তু এখানে কাহিনী গড়ে উঠেছে প্রকৃতিকে নিয়ে। বেশি জানাতে গিয়ে আর স্পয়লার না দেয়াটাই ভালো। বরাবরের মত সুখপাঠ্য ছিল লেখকের লেখা। অনেক চেষ্টা করেও তেমন কোন খুঁত পাইনি। কয়েকটা জায়গায় বানান ভুল এবং ৬০ ও ৬১ পৃষ্ঠায় হেম্মেজ ফকিরের স্বভাব গম্ভীর থেকে চঞ্চল হয়ে যাওয়া ছাড়া কোন ব্যাপার চোখে পড়েনি। বইয়ের বাঁধাই বেশ ভালো ছিল। আর প্রচ্ছদশিল্পী রাজু ভাইয়ের প্রথম কাজ ছিল এটা, একবাক্যে বলতে গেলে সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন উনি। আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে যেসব ব্যাপার দৃষ্টিকটু লেগেছে সেগুলো সংশোধন করা হবে।
বেশ সহজ সরল করে লেখা সুপারন্যাচারাল থ্রিলার। পড়ে ভালোই সময় পার করা যায়। কোন রকম জটিলতা নেই। নিছক বিনোদনের জন্য লেখা বইটা। অনেক সময় এই ধরনের বই ও বেশ আনন্দ দেয়। টিনএজ থেকে সব বয়সের পাঠকই পড়তে পারবে এটাই এই গল্পের বিশেষত্ব। গল্পের কনসেপ্টও বেশ ভালো, একদম গাজাখুড়ি কিছু না যে পড়লে মনে হবে সময় নষ্ট। দেশীয় সুপারন্যাচারাল থিমে লেখা বলে, ভালোই লাগে পড়তে। 🙂
# হার না মানা অন্ধকার - বাপ্পী খান - বাতিঘর প্রকাশনী - পৃষ্ঠাঃ ১০৯ ; মুদ্রিত মূল্যঃ ১৫০ টাকা।
==============================================
গল্পের প্রটাগনিস্ট রফিক শিকদার। একদমই সাদা-সিধে চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ। তথাকথিত নায়কোচিত কোন গুণ নেই তার মধ্যে। একদম বাস্তবিক চরিত্র। এই ব্যাপারটা খুবই ভালো লেগেছে। এছাড়া তার চরিত্রের দুটো দিক আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে তিনি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেন ( আমি নিজেও বিশ্বাসী ) । এবং অন্য কারণটি হচ্ছে তিনি দারুণ সাহসী......তবে সেই দুঃসাহসটা অবাস্তব লাগে না......এক্ষেত্রে লেখককে বাহবা দিতেই হবে।
ছাত্রাবস্থায় ধানমন্ডি লেকে ঘটে যাওয়া একটি রোমাঞ্চকর অতিপ্রাকৃত ঘটনা তার জীবনযাত্রার মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে দেয়। তবে তা সম্পূর্ণ ঘুড়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী উপন্যাসিকাটির দ্বিতীয় আখ্যান......অর্থাৎ তার বন্ধু জিকোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি। এই ঘটনাটিই মূলত ভবিষ্যতে রফিক শিকদার ও তার অপ্রাকৃত সিরিজকে বারংবার বইয়ের পাতায় পাওয়ার পেছনের প্রধান কারণ হয়ে থাকবে! জোস! :D
উপন্যাসিকাটি মূলত পাঁচটি রহস্যময় - রোমাঞ্চকর - অতিপ্রাকৃত কাহিনীর সমন্বয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই মূলত প্রকৃতির অন্ধকার দিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ এই উপন্যাসিকাটির অ্যান্টাগনিস্ট অন্যসব (প্রায়) হররের মতো ভূত/মানুষ নয়......এখানে মূল খলনায়ক হচ্ছে প্রকৃতি! যা বাংলাদেশের হরর সাহিত্যে খুব অপরিচিত একটি বিষয়। ব্যাপারটা আকর্ষণ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এরমধ্যে প্রথম গল্পটির কথা তো শুরুতেই একবার বললাম। ধানমন্ডি লেকের পাশের ঘটনাটি। বইতে এই গল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে <দেও> । এটি বইয়ের অন্যতম পছন্দের গল্প। বেশ ইউনিক লেগেছে। আর এই গল্পের পরিবেশটাই লেখক সবথেকে ভালো গড়ে তুলেছেন আমার মতে।
পরের গল্পটি হচ্ছে বন্ধু জিকোর সাথে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সেই ঘটনা। পত্রিকার কাজে জিকোর সিলেটের খাসিয়া পল্লিতে যাওয়ার পরে যে ঘটনা গোড়াপত্তন।
তৃতীয় গল্পটি হেম্মেজ ফকিরের সাথে ঘটা অস্বাভাবিক এবং প্রচণ্ড অলৌকিক একটি ঘটনার আলোকে। গল্পটির পটভূমি চট্টগ্রামে। হেম্মেজ ফকির, যে একসময় দুর্দান্ত ছবি আঁকত - বাঁশি বাজাতো - গান গাইতো......ঘরে যাকে রাখাই দায় ছিল......সেই হেম্মেজ ফকিরই আজ বহুবছর যাবত গুহায় বসবাস করে আসছে! পরের তিনটি কাজ ছেড়ে দিলেও প্রথম কাজটি সে ছাড়েনি! কারণ ইহাই তার মুক্তির পাথেয়! কিন্তু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের একটি ইন্দ্রিয় যে আজ তার পক্ষে নেই! বেশ ভালো লেগেছে গল্পটি।
চতুর্থ গল্পটি রাঙামাটির গভীরের গল্প। প্রকৃতির সাথে সবথেকে বেশি ঘনিষ্ঠ গল্প এটিই! দেও এর সাথে এই গল্পটি এই উপন্যাসিকায় আমার অন্যতম প্রিয় গল্প। দারুণ প্লট। ইহা আমাকে অকওয়ার্ড হররের বস জুনজি ইতোর গল্পগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে!! জুনজি ইতোর মতো অতটা ডার্কাজব (ডার্ক+আজব) না হলেও বাংলায় এই প্রথম এরকম কিছু পেলাম! গল্পজুড়ে পাথরের পরশ দারুণ লেগেছে! :P
শেষ গল্পটি রফিক শিকদারের পুরনো এক বন্ধু এবং তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু সর্পাকৃতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে! ঘটনার ভয়াবহতার দিক দিয়ে চিন্তা করলে সবথেকে রোমহর্ষক ঘটনা এটিই। ভালো লেগেছে। এতেও জুনজি ইতোকে খানিকটা অনুভব করেছি!
বইটির ফিনিশিং ব্যাপক লেগেছে। লেখক দারুণভাবে ঝুলিয়ে রেখেছেন! পরের বই নিয়ে আগ্রহ এখন রীতিমত তুঙ্গস্পর্শী!! :D
এবার আসি লেখনীর ব্যাপারে। দারুণ কাজ করেছেন লেখক। প্রকৃতির বর্ণনায় খুবই ভালো করেছেন। পড়ার পুরোটা সময় এক ফোঁটাও বিরক্ত লাগেনি। বাসে পড়ার সময় একবার তো আরেকটু হলে গন্তব্যস্থল ছেড়ে অন্য এলাকায়ই চলে গিয়েছিলাম! 😂
প্রচ্ছদ করেছেন জাহিদুল ইসলাম রাজু ভাই। যিনি এর আগে থ্রিলার জার্নালের প্রচ্ছদ এবং প্রায় সকল অলংকরণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ( অন্তত বাকি অ্যাডমিনদের ) । 😍 ছাপার কাগজে তার প্রথম কাজেও দারুণ করেছেন। সার্থক প্রচ্ছদ......লেটারিং তো দুর্দান্ত হয়েছে।
বইয়ের বাঁধাইসহ প্রকাশনা আনুষঙ্গিক সবকিছু বেশ ভালো কাজ হয়েছে। আর বানান ভুলও খুবই কম চোখে পড়েছে।
হরর আমার পছন্দের জনরা না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ রকমের বিরক্ত হই। যাই হোক, এ বইটার প্রশংসা শুনেছিলাম অনেক। অবশেষে পড়া হলো। ভালো বই। প্রশংসা করার মতোই। অনেক নতুন নতুন ব্যাপার আছে। একটানা শেষ করা গেছে... এবং একবারের জন্যও মনে বিরক্তি আসে নাই। ছোট খাটো কিছু অসংগতি থাকলেও, লেখকের ন্যারেটিভ স্টাইলটা বেশ মুগ্ধ করার মতো।
বাংলা সাহিত্যে হরর জনরার পাঠক বাড়াতে এ ধরনের বই খুবই জরুরী। বইয়ের শেষটায় মনে হয়েছে লেখক বোধহয় সিকুয়েল বের করতে চাচ্ছেন। যদি সত্যিই তাই হয়, তবে শুভকামনা। অপেক্ষায় থাকলাম আরেকবার মুগ্ধ হওয়ার জন্য।
চমৎকার বই, সাংবাদিক রফিক শিকদারের জীবনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া পাঁচটি ভয়ের কাহিনি। সেরা কাহিনি দেও, ধানমন্ডি লেকের মত ঢাকার এরকম খুব পরিচিত জায়গাকে ঘিরেও যে এরকম দুর্ধর্ষ অন্ধকারের গল্প লেখা যায় তা কল্পনা করাও কষ্টকর। পড়ে খুবই আনন্দ পেয়েছি।
ছোটো ও শেষ না হওয়া গল্পের রেশ অনেকদিন মাথায় থেকে যায়। উদগ্রীব হতে হয় পুরোটা পড়ে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নেওয়ার জন্য। তাই ‘হার না মানা অন্ধকার’ বইয়ের সাথে সিক্যুয়েলে থাকা দ্বিতীয় বইটাও কিনে রেখেছি যাতে বেশি ভোগান্তি পোহাতে না হয়। বাপ্পী খান ভাইয়ের লেখা প্রথম বই পড়ার অনুভূতি সুন্দর ছিল বলতেই হয়। উপন্যাসিকা হলেও শুরু থেকে শেষটা বেশ ভালো ভাবে সামাল দিতে পেরেছেন বলা যায়। লেখনশৈলী আকৃষ্ট করার মতো তাই প্লটের কোনো জায়গায় তেমন সমস্যা হয়নি তবে তাড়াহুড়ো ছিল কিছুটা।
বইটি নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকে বেশ প্রশংসা ঝেড়ে ফেলেছেন তাই নতুন করে তেমন কিছু লেখার নেই। তবে এত সুন্দর বইটি নিয়ে কিছু অভিযোগ রয়েছে সেটা জানাতে বাধ্য।
➲ আখ্যান—
ট্যাবলয়েড পত্রিকা 'সত্য-কলাম'কে টিকিয়ে রাখতে প্রকাশক রফিক শিকদার সাহায্যের আবেদন নিয়ে ছুটে গেলো দীর্ঘদিনের বন্ধু’র কাছে। এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখিমুখি হয়ে তার মনে পড়ে নিজের ফেলে আসা অতীতের কথা। কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো সে। আর এ সিদ্ধান্তের জন্যই রফিক শিকদার দেখলো, শুনলো এবং জানলো উদ্ভট কিছু ঘটনার কথা। অবশেষে মানতেও বাধ্য হলো, আলো'র বিপরীতেই আছে আঁধার।
হার না মানা অন্ধকার। বাপ্পী খানের সুপার ন্যাচারাল ধারার এই নোভেলাতে উঠে এসেছে অদ্ভুত কিছু ভয়ের উপাখ্যান।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
প্রথমে বলে রাখতে হচ্ছে উপন্যাসিকাটি ‘অন্ধকার’ ট্রিলজির প্রথম বই সেক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নের উত্তর বা শেষটা আপনি চাইলেও খুঁজে পাবেন না। সেটার জন্য দ্বিতীয় (প্রকাশিত) ও তৃতীয় (প্রকাশিতব্য) বইগুলো অবশ্যই পড়তে হবে।
বইটা হাতে নিয়েছি প্রথম পর্ব পড়ে ভালো লেগে গিয়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত বানান ভুল এবং কিছু বাক্যের অসংগতি অনেকটা আটকে দিয়েছে পড়ার গতিকে। বইয়ের প্রত্যকটা সিকুয়েন্স বেশ দক্ষ হাতে সাজিয়েছেন লেখক এবং চরিত্র গঠনে যে মুন্সিয়ানা ঘটিয়েছে সেটা এই ট্রিলজিকে পরবর্তীতে বেশ শক্তপোক্ত স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। অনেক বই থাকে শুধু প্লট নির্ভর অথবা চরিত্র নির্ভর কিন্তু এইখানে উভয় দিকের সামঞ্জস্যতা লক্ষণীয়। মজার বিষয় হচ্ছে প্লটের দেওয়া কাহিনির যে বর্ণনা সেটা কল্পনা করতে বেশ ভালো লাগছিল।
দেশীয় মৌলিক প্লট হিসেবে লেখক জঙ্গল নির্ভর জায়গা বেছে নিয়েছেন একই সাথে প্রায়োরিটি দিয়েছেন। এইটাই ছিল গল্পের ভিত্তি শক্ত করার আরেকটা মূল অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে হলে সবচেয়ে সহজ ও রোমাঞ্চকর জায়গা হচ্ছে বনজঙ্গল। লেখক ভয় সৃষ্টি করাতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও তাৎক্ষণিক অবস্থা বর্ণনাতে ভয়ের ছাপ ফেলতে পেরেছেন। অল্পবিস্তরে জায়গার বর্ণনা ও চরিত্রের ক্রিয়াকলাপ ভালো উপস্থাপনা করেছেন।
প্রায় পাঁচটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ছিল বইতে! অথচ কেমন যেন তাড়াহুড়ো ছিল, লেখক চাইলে পৃষ্ঠা বাড়িয়ে বর্ণনা বিশদভাবে করতে পারতেন কিন্তু করেননি। সবগুলো গল্পের শেষটাও অমীমাংসিত, হয়ত দ্বিতীয় বইতে পূর্ণাঙ্গ ভাবে রহস্য উদঘাটন হবে। গল্পের মূল চরিত্র হিসেবে রফিক শিকদার এবং শেষে কিয়াসু নামে এক আগন্তুক! গল্প হিসেবে শেষটা শেষ হয়েও হলো না, তবে বই হিসেবে শেষ টুইস্ট ভালো দিয়েছেন।
এক বসাতে পড়ে ফেলার মতো একটি বই। বিশেষ করে এখন সময়টা এই বই পড়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত। সবশেষে অন্ধকার জগতে আপনাকে স্বাগত। দেরি না করে বইটি কিনে পড়ে ফেলুন।
➢ লেখক, বানান, প্রচ্ছদ, মলাট, বাঁধাই—
বাপ্পী খান ভাইয়ের প্রথম উপন্যাস হিসেবে যাত্রাটা আনন্দদায়ক ছিল। অল্পতে সন্তুষ্ট ছিলাম। সুখকর অনুভূতি ছিল। তবে লেখক চাইলে আরেকটু বিস্তারিত টানতে পারতেন কারণ পাঁচটা ঘটনা তাও এতটুকু বইতে কিন্তু সেটার শুরু ও শেষটা করতে বড্ড তাড়াহুড়ো ছিল। সারাউন্ডিংস তৈরি করার পূর্বে সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ ভয়ের আবহ তৈরি করেছেন কিন্তু সেটার সমাপ্তি দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছেন এই অবস্থা। প্লট বিল্ডাপ ঠিক থাকলেও জাম্পিং বেশি ছিল। অর্থাৎ এক লাইনে উপসংহার টেনে নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। আশা করছি পরবর্তী বইতে এইসব কমতি গুলো অনেকটা রিকোভার হয়ে যাবে।
ওয়েল! বানান নিয়ে কিছু বলতে গেলে উদাহরণটা হবে, সুন্দর নৌকাটাকে বুড়িগঙ্গার পানিতে ডুবিয়ে দিলো অবস্থা। এইযে গেল/গেলো ও কোন/কোনো উদাহরণ টানলাম পুরো বইতে— গেল কে ‘গেলো’ (গলাধঃকরণ) ও কোনো কে 'কোন' (দিকনির্দেশনা) বলে লেখা হয়েছে। কয়েকটা উল্লেখযোগ্য বানানের ভুল চোখে লেগেছে । যাব/যাবো দুইভাবে লেখা হয়েছে। ৩৩ পৃষ্ঠায় তো ‘00000000’ এইভাবেও অহেতুক কিছু সংখ্যা এসেছে অর্থাৎ অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। শেষে এসে তো চরিত্রের নাম ‘কিয়াসু’ থেকে দুইবার ‘কিয়াসি’ হয়ে গিয়েছে। একই শব্দের বানান দুইভাবে লেখা। ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যবহারে অপ্রয়োজনীয়তার ছাপ স্পষ্ট। কিছু ভুল চাইলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব তবে বেশি হয়ে গেলে অসম্ভব।
আরেকটা লাইন যেখানে সম্পাদনার অভাব বোধ করেছি—
❝তাই হয়তো বছর দশেক আগে বছর আগে নিজ স্ত্রী'র মতোই ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগে তার পত্রিকার উত্তরাধিকার করে যান আমাকে।❞
এইরকম কয়েকটা লাইন ছিল বইতে। যেখানে সম্পাদনার দরকার ছিল। যদি কখনও এইসব ভুল পরিবর্তন করা হয় তাহলে ভালো হয়। একটা সুন্দর বইকে নষ্ট করতে উপরিক্ত কারণ গুলো যথেষ্ট।
প্রচ্ছদ করেছেন রাজু ভাই। উপরিক্ত বইয়ের একটা ঘটনার সামঞ্জস্য রেখে কাজটি করা। সব মিলিয়ে প্রচ্ছদ আরও সুন্দর হতে পারত বলে মনে করছি। ব্যাক কাভারে লেখাগুলো অস্পষ্ট আরও ভালো করা যেত বলে ধারণা।
মলাট ও বাঁধাই ঠিকঠাক। ছোটো বই হিসেবে ওকে।
➠ বই : হার না মানা অন্ধকার | বাপ্পী খান ➠ জনরা : সুপার ন্যাচারাল, হরর ফিকশন ➠ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ➠ প্রচ্ছদ : জাহিদুল ইসলাম রাজু ➠ প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী ➠ মুদ্রিত মূল্য : ১৫০ টাকা মাত্র
|| পিন্টুর পাঠ প্রতিক্রিয়া || বইঃ হার না মানা অন্ধকার লেখকঃ বাপ্পী খান প্রকাশকঃ অভিযান পাবলিশার্স (ভারত) বাতিঘর প্রকাশনী (বাংলাদেশ) প্রকাশকালঃ ১লা বৈশাখ, ১৪২৬ (ভারতীয় সংস্করণ) ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ (বাংলাদেশী সংস্করণ) প্রকৃতিঃ সুপারন্যাচারাল হরর থৃলার প্রচ্ছদঃ পার্থপ্রতিম দাস (ভারতীয় সংস্করণ) রাজু (বাংলাদেশী সংস্করণ) পৃষ্ঠাঃ ৭৯ (ভারতীয় সংস্করণ) ১১২ (বাংলাদেশী সংস্করণ) মুদ্রিত মূল্যঃ ১৫০ রুপি (ভারতীয় সংস্করণ) ১৫০ টাকা (বাংলাদেশী সংস্করণ) ধরণঃ হার্ডকভার। ____________________________________________________________ বাপ্পী খান এক বহুমুখী প্রতিভার মানুষ। লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ ছাড়াও জড়িয়ে আছেন একটি মিউশিক ব্যান্ডের সাথে। আর প্রথম বই “একা” প্রকাশিত হয়ছিল কলকাতার (ভারত) অরন্যমন প্রকাশনী থেকে, তারপর ২০১৮ সালে নিশাচর তার দ্বিতীয় মৌলিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে। “হার না মানা অন্ধকার” বাপ্পী খানের তৃতীয় মৌলিক উপন্যাস। এটি প্রথমে বাতিঘর তারপর কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। লেখকে আমি মূলত চিনি ডিব্বা প্রোডাকশন থেকে এটি একটি ইউ টিউব চ্যানেল এখানে বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা ও রিভিউ দেওয়া হয়। জীন, ভূত-প্রেত, দত্যি দানো, তন্ত্র মন্দ্র বাদ দিয়ে এমন কিছু নিয়ে লিখেছেন বা বলছেন তার ব্যাখ্যা বুদ্ধি দিয়ে মেলে না। যেমন আলো থাকলে অন্ধকার থাকে। প্রকৃতি থাকলে অপ্রকৃতি আছে। বইটি পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা সেই আদিম অন্ধকারকে নিয়ে, যার সাম্রাজ্য এখন অটুট। ____________________________________________________________ কাহিনী সংক্ষেপঃ- সত্য কলাম পত্রিকার সম্পাদক ও কর্নধার রফিক শিকদার। ধানমন্ডি লেকে লেখক সম্মুখীন হন ভয়াবহ ঘটনার। তার দাদার দেওয়া তাবিজের দৌলতে সে যাত্রায় প্রানে বেঁচে গেলেও, পালটে দেয় তার জীবন, রেখে দেয় তার শরীরে ছাপ। এই ঘটনা সত্য কলামে লিখে তরুণ লেখক হিসাবে খুব প্রশংসা পান। তার পর ই অলৌকিক ঘটনার প্রতি তার আগ্রহ জন্মায় ও পত্রিকাতে অতিপ্রাকৃত বিভাগের সূত্রপাত। রফিক শিকদারের বন্ধু “জিকো”, একজন ফটোগ্রাফার, ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের যুগে পত্রিকার কাটতি বাড়াতে জিকোর শরণাপন্ন হন। কিন্তু তার বন্ধুই তার কাছে প্রান ভিক্ষা চেয়ে সাহায্যের আবেদন করেন। ঘটনার সূত্রপাত সাতবছর আগে, যখন সত্য কলামের জন্য একটা অ্যসাইন্টমেন্ট নিয়ে সিলেটের ঝাউলা গ্রামে খাসিয়াদের উৎসবের ছবি আর তথ্য সংগ্রহ করতে। সেখানে দুর্গম পাহাড়ি বনভূমিতে পাহাড়ি ধরনার কোলে এক অপদেবতার অভিশাপের সম্মুখীন হন। তার দেওয়া অভিশাপে আজ সে মৃত্যু পথযাত্রী। তার কোণ মুক্তির পথ খোলা নেই। এখানেই শেষ নয়, পত্রিকার কাছে তাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এমনই একটা খবর পেয়ে হাজির পেয়ে হাজির রাঙ্গামাটির ভুশুণ্ডি গ্রামে। মুখোমুখি হয় হেম্মেজ ফকিরের। তার কাছে দশ বছর আগেকার এক রহস্যময় এক ঘটনার বিবৃতি শোনেনে। তারপর রাঙ্গামাটির অন্য এক গ্রামের রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী হন রফিক শিকদার। কিছু বছর আগে ভূমিকম্পের ফলে গ্রামে উঠে আসে কিছু অদ্ভুত দর্শন কালো পাথর। অন্যদিকে গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মানুষ সহ গবাদি পশু। এর পিছনে কি সেই রহস্যময় কালো পাথর? রফিক শিকদারের ঝুলিতে জমা হয় আরো এক রহস্যময় ঘটনা। তার চাচার মেয়ে আইরিনের বিয়ের পর সিলেট থেকে ঢাকাতে ফিরবার পথে দেখা হয় রাসেলের সাথে তার জবানীতে শোনেন এক অদ্ভুত ঘটনা। এক অ্যক্সিডেন্ট তার দাপত্য জীবন দুর্বিশহ করে তুলেছে। ঘটছে নানা অলৌকিক ঘটনা। এই ঘটনার সাক্ষী হতে গিয়ে তার জীবন এক হুমকির মুখে পড়েন। পৃথিবীর আরেক অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয় তার সামনে। ____________________________________________________________ পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ- সূর্যের আলোয় পৃথিবীর এক পৃষ্ট আলোকিত হলেও অন্য পৃষ্ট থাকে আধার ময়। আলো যেমন সত্য তেমনি অন্ধকার। সেই আদিম অন্ধকারে জঠরে জন্ম নেয় কিছু অশুভ ও রহস্যময় বস্তু। প্রকৃতি যা সযত্নে লুকিয়ে রাখে লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ কেউ দিনশেষে সম্মুখীন হয় সেই অশুভ শক্তির। “হার না মানা অন্ধকার” সেই অন্ধকারময় জগতের কিছু গল্পের সমাহার। বাপ্পী খানের লেখনী বেশ উপভোগ্য। তার বর্ননার ধরন ও ধীরে ধীরে গল্পের রহস্য উন্মোচন বেশ সন্তোষ জনক। বইয়ে বর্নিত বেশ কিছু গল্প রীতিমত শিহরন জাগায়। আমার ব্যাক্তিগত ভাবে কালো পাথরের ঘটনাটা ভালো লেগেছে। ভারতীয় সংস্করনে আমি বানান ভুল চোখে পড়েনি। দুই সংস্করনে প্রচ্ছদ বেশ নজরকারা। লেখকের পরবর্তী কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল। গল্পের শেষে সিক্যুয়েলের পূর্ন ইঙ্গিত আছে। মানে সিরিজ কন্টিনিউ হবে। আমার সময়টা বেশ ভাল কেটেছে বইটার সাথে এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। লেখকে অগ্রিম শুভেচ্ছা পরবর্তী কাজের জন্য।
দ্রষ্টব্যঃ- বেআইনি পি.ডি.এফ বানানো বা শেয়ার করা বা পড়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে লেখক, প্রকাশক এবং এর সাথে জড়িত সব কিছু কে আর সাহিত্যকে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যা একদম গ্রহণযোগ্য নয়। বই কিনুন পড়ুন, আর শেয়ার করুন।
বইয়ের নাম: হার না মানা অন্ধকার লেখক: বাপ্পী খান প্রকাশক: বাতিঘর জনরা: অতিপ্রাকৃত/সুপার ন্যাচারাল পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১০৯। মূল্য: ১৫০ টাকা।
কাহিনী সংক্ষেপ::
গত দুমাস ধরে ধানমন্ডি লেকটার আশপাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার জন তরুণের মৃতদেহ। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, গোটা শরীর চুপসে গেছে। মনে হচ্ছে যেন গোটা শরীর থেকে প্রাণ কেউ চুষে নিয়েছে। ময়নাতদন্তে খুঁজে পাওয়া যায়নি কিছুই।
ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘সত্য-কলাম‘ -কে টিকিয়ে রাখতে প্রকাশক রফিক শিকদার সাহায্যের আশায় ফোন করেন পুরণো বন্ধু জিকো-কে। কিন্তু ফোনের অপর পাশ থেকে ভয় জর্জরিত কন্ঠে বাঁচার আর্তনাদ শুনে ঘাবড়ে যান রফিক শিকদার। কী এমন ঘটে জিকোর মতো সফল, বিখ্যাত একজন মানুষের জীবনে!
জিকোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে করিয়ে দেয় রফিক সাহেবের অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া ধানমন্ডি লেকের ঘটনা যার পর থেকে তিনি অতিপ্রাকৃত ঘটনায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন। বিশ্বাস করেন এই ঝলমলে প্রকৃতির আড়ালেও রয়েছে অন্ধকার এক জগত। এক ভিন্ন প্রকৃতি।অন্ধকার জগতের এই ঘটনাগুলো ‘অপ্রাকৃত‘ সিরিজ নামে ‘সত্য-কলামে‘ প্রকাশ করবেন বলে ঠিক করেন।
চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে দেখা হয় হেম্মেজ নামক এক অন্ধ লোকের সাথে। অতীত জীবনে যিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী। কি এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন যার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারাতে হয়েছে এবং আশ্রয় নেন একটা গুহায়!
এদিকে চট্টগ্রামের সেতুং নামে ছোট গ্রামে ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। ভূমিকম্পের ফলে মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে কিছু কালো পাথর। এরপরই শুরু হয় গ্রামের মানুষ, গরু-ছাগল নিখোঁজ হওয়া। মানুষ এবং প্রাণীদের নিখোঁজ হওয়ার সাথে কি সম্পর্ক আছে সে কালো পাথরের?
চট্টগ্রাম থেকে কালো পাথরের একটা ফ্লাস্ক নিয়ে ফেরার পথে দেখা হয় পুরনো বন্ধু রাসেল এবং তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী অহনার সাথে, যাদের গাড়ির চাকার নিচে পিষে মারা যায় পরিবারসহ একটি সাপ । তারপর কি হয়? কালো পাথরের ফ্লাক্সটা যে শোকেসে রাখা হয়েছিল ওটা অল্প অল্প করে পাথরের রূপ নিচ্ছিল কেনো? কি পরিণতি হয় রফিক শিকদার, রাসেল এবং অহনার? প্রকৃতি কোথায় নিয়ে যায় তাদের? জানতে হলে পড়তে হবে ‘হার না মানা অন্ধকার‘ বইটি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:- পাঁচটি গল্প নিয়ে রচিত বইটি। সবগুলোই অতিপ্রাকৃতিক গল্প। তবে কোনো গল্প সংকলন নয়। সবগুলো মিলে একটা হরর নভেলা। একটার সাথে আরেকটার যোগসূত্র রয়েছে। হরর গল্পগুলো সাধারণত ভূত-প্রেত বা এই টাইপের জিনিস নিয়ে লিখা হয়, তবে এই বইয়ের আসল ভিলেন প্রকৃতি। প্রকৃতির অন্ধকার দিকটা দেখতে পাবেন। স্বাদ পাবেন প্রকৃতির আরেক রূপের, দেখতে পাবেন প্রকৃতি তার নিজের রহস্যগুলো কীভাবে গোপন রাখে।
এই বইয়ের সবচেয়ে ভালোলাগার জায়গা হচ্ছে এন্ডিং টা। খুব ভালো ছিল। আপনি বুঝতে পারবেননা গল্প কোনদিকে যাচ্ছে। এদিক দিয়ে বলব বাপ্পী ভাইয়া সার্থক। সবগুলো গল্পই সমানভাবে পছন্দ করবে সবাই। তবে আমার বেশি ভালো লেগেছে প্রথম (রফিক সাহেবের সাথে ঘটে যাওয়া লেকের গল্প) এবং দ্বিতীয় (বন্ধু জিকোর) গল্পটা এবং অবশ্যই গল্পের পরিণতিটা।
এটা বাপ্পী ভাইয়ার তৃতীয় উপন্যাস তবে আমার পড়া প্রথম। নতুন লেখক হিসেবে লেখা ভালো লেগেছে, পরিণত মনে হয়েছে। অতিরিক্ত মেদ নেই, মেইন ক্যারেক্টার বিল্ড আপ ভালো ছিলো। ভাইয়ার পরবর্তী লেখার জন্য শুভকামনা।
হার না মানা অন্ধকার অন্ধকার ট্রিলজি #১ লেখক - বাপ্পী খান জেনার - অলৌকিক প্রকাশনা - অভিযান মূল্য - 200/-
ভারসাম্য এই শব্দটির উপর পুরো ব্রহ্মান্ড নির্ভর করছে, এই ভারসাম্যের কারণ এই মিথ্যা না থাকলে সত্যের কোনো দাম নেই, মন্দ আছে বলেই ভালো এর এতো কদর ঠিক তেমনিই আলোর বিপরীত দিকটাই কিন্তু অন্ধকার। এই অন্ধকার দিক নিয়েই বাপ্পী খান সাহেব লিখেছেন *হার না মানা অন্ধকার* এই বইটি অন্ধকার ট্রিলজি সিরিজ এর ফার্স্ট পার্ট। ভয় পাওয়ানোর জন্য বিষয়বস্তু বাংলা সাহিত্যে বরাবরই কম, সেই চর্বিত চর্বন ভূত, প্রেত, তন্ত্র, কালাজাদু, এই বইয়ের ৫টি গল্প কিন্তু বেশ আলাদা এখানে ভয় আছে কিন্তু কোনো আজগুবি গাঁজাখুরি আষাঢ়ে গল্প নেই। সত্যি বলতে আমরা আর কতটুকুই জানি এই পৃথিবীর গভীরে কী কী রহস্য লুকিয়ে আছে, কত অতিপ্রাকৃত বিষয় লুকিয়ে আছে যার উত্তর বিজ্ঞান এর কাছে নেই। সেই দিক গুলি নিয়েই এই ৫টি গল্পের সংকলন.
পটভূমি - বাবা মা এর হঠাৎ সাপের কামরে মৃত্যুর পর রফিক সিকদার কে চলে আস্তে হয় ঢাকা শহরে, সেখানে সে তার চাচা এর সাথে থেকে জার্নালিজম এর কাজ ও শিখতে শুরু করে। এরপর কালক্রমে চাচা এর মৃত্যুর পর সত্য কলম পত্রিকার হাল রফিক নিজের হাত এ ধরেন এবং অতিপ্রাকৃত কলম লেখার সিদ্ধান্ত নেন। এই কলমেই উঠে আসে নিজের বন্ধু জিকোর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তার পিছনের অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত অভিশাপ এর অভিজ্ঞতা, রাঙ্গামাটির ভুশুণ্ডি গ্রামের হেম্মেজ ফকিরের চোখের দৃষ্টি হারানো অভিশাপ এর গল্প। চট্টগ্রামের সেতুং গ্রাম এ কিছু বছর আগে ভূমিকম্পের ফলে উঠে আসে কিছু অদ্ভুত দর্শন কালো পাথর। অন্যদিকে গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে মানুষ সহ গবাদি পশু। এদেরকি কোনো যোগাযোগ কাছে? সিলেট থেকে ফেরার পথে দেখা হয় রাসেল ও অহনা এর সাথে। ওদের দাম্পত্য জীবন বদলে যেতে থাকে এক এক্সিডেন্ট এর পর, যে ঘটনায় এক সাপ তার পরিবার শুদ্ধ মারা পরে, এইসব জানতে আপনাকে অবশ্যই পড়তে হবে বাপ্পী খান এর লেখা হার না মানা অন্ধকার।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ-
বাপ্পী খানের লেখনী বেশ উপভোগ্য। তার বর্ননার ধরন ও ধীরে ধীরে গল্পের রহস্য উন্মোচন বেশ সন্তোষজনক। বইয়ে বর্নিত বেশ কিছু গল্প রীতিমত শিহরন জাগায়। আমার ব্যাক্তিগত ভাবে কালো পাথরের ঘটনাটা ভালো লেগেছে।
অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক গল্প মানেই যে ভূত প্রেত তন্ত্র মন্ত্র হতেই হবে এই বই সেই মিথ টাকে ভেঙেছে, লেখকের লেখনশৈলী বা ঘটনাবলীর পর্যায়ক্রম, ভয় সত্যিই তৈরী হয়। গল্পের প্লট গুলি অবিশ্বাস হলেও কেমন যেন বিশ্বাস করতে মন চায়, আর ঠিক এখানেই অতিপ্রাকৃত গল্পের লেখকের সার্থকতা।
হার না মানা অন্ধকার... বাপ্পী খান ভাইয়ের লেখা বাতিঘর প্রকাশনীর এই বইটি পাঠক হিসেবে রাতে পড়ারই পরামর্শ দিব, তবেই এই বইটির পূর্ণ স্বাদ আপনি নিতে পারবেন। এ পৃথিবীতে যেমন আছে আলো, তেমনিই আছে ভয়ংকর অন্ধকার.. যে অন্ধকারে রয়েছে স্বার্থ, প্রতিহিংসা, হিংস্রতা; সে অন্ধকারে ক্ষমা নামক শব্দটির যেন কোন স্থানই নেই। রফিক শিকদার, একটি পত্রিকার সম্পাদক, যিনি তার চাচার কাছ থেকে উত্তরাধীকার সূত্রে পাওয়া "সত্য-কলাম" পত্রিকাটিকে সামনে এগিয়ে নিতে চান। এ পত্রিকাটির পুরানো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনবেন কিভাবে সেই চিন্তা থেকেই তার মনে পড়ে যায় কিভাবে তিনি লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন। মনে পড়ে যায় কিভাবে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন অন্ধকারের সে জগতটিকে। পত্রিকার জনপ্রিয়তা ফেরাতে সিন্ধান্ত নেন তার পুরানো বন্ধুর পরামর্শ নিবেন। কিন্তু, পরামর্শের পরিবর্তে পেলেন অন্ধকার জগতের অস্তিত্বের আরও একটি প্রমাণ। ঠিক করলেন "সত্য-কলাম" এর জনপ্রিয়তা ফেরাতে "অপ্রাকৃত" কলামে নিয়মিত প্রকাশ করবেন সেইসব অন্ধকারের গল্প, হার না মেনে ছুটে বেড়াবেন অন্ধকারের খোঁজে। এভাবেই শুরু হয় রফিক শিকদারের অভিযান। বইটি মূলত রফিক শিকদারের ডায়রির মত... যেখানে তিনি লিখেছেন নিজের কথা, লিখেছেন দেশের বিভিন্ন স্থান সিলেট, রাঙামাটি, রাজশাহীতে ঘটা অতিপ্রাকৃত সব ঘটনা। ঘটনা হিসাব করলে মোট ৫টি ঘটনা পাই বইটিতে.. শেষের ঘটনাটি পড়ে মনে হলে 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ'... ব্যক্তিগতভাবে প্রথম ঘটনাটি মোটামুটি লাগলেও পরেরগুলো বেশ চমৎকার লেগেছে। এত সাবলীলভাবে বাপ্পী খান ভাই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লিখে গিয়েছেন যে সেটার প্রশংসা না করলেই নয়। সাবলীল বর্ণনা আর চমৎকার সব ঘটনা মিলে দশে নূন্যতম আট পেতেই পারেন। 'সত্য-কলাম' পত্রিকার 'অপ্রাকৃত' কলামটি চালু থাক এটাই এই ক্ষুদ্র পাঠকের কামনা।
বেশ এঞ্জয় করলাম। গতানুগতিক হরর বইয়ের বাইরের একটা বই।এই তীব্র শীতে পড়ার জন্যই বইটা জমিয়ে রেখেছিলাম। অবশেষে উপযুক্ত আবহাওয়া পেয়ে বইটা পড়লাম সবচেয়ে সেরা লেগেছে পাথরের সেই কেসটা।ভিন্নধর্মী এবং অসাধারণ ছিল কেস টা যেন "মাইডাস টাচের" মত।
ছোট ছোট আকারের ৫ টি গল্পের অত্যন্ত চমৎকার মেলবন্ধন ..যতক্ষণ বইটি পড়েছি..কাহিনী তে ডুকে ছিলাম..কিন্তু বই এর শেষ টা খুবই .. তাড়াহুড়োয় শেষ হয়েছে..একদম হুট করে..মাত্র কাহিনী শুরু হয়েছে এর মধ্যেই শেষ..আর একটু সময় নিয়ে শেষ করলে আরো ভালো লাগতো..সিরিজ এর পরবর্তি বইটি পড়ার ইচ্ছা আছে .. ৩.৫ স্টার actually