'বিবিয়ানা' পুড়ে যাওয়া জীবনের গল্প। আস্ত জীবন নয়, জীবনের কোনো এক খণ্ড যেন। আচমকাই শুরু আবার বোকা বানিয়ে ফুরিয়ে যায়। জীবনের নাটাই অন্য কারও হাতে। লেখকের সাধ্য নেই এই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার! লেখক দূর বা কাছ থেকে দেখতে পারেন আর অনুভব করে গল্পটা বলে যেতে পারেন এতটুকুনই।
'বিবিয়ানা' সহজ সরল জীবনের জটিলতা নিয়ে কথা বলে। এই মায়া মেশানো জটিলতা পাঠকের মন জয় করুক। সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার মত 'বিবিয়ানা' নামের এই উপন্যাসটিও যদি কোনো একটা ভাল লাগার অনুভূতির নাম হয়ে ওঠে তবেই এই লেখক জীবন, সংগ্রাম, ছোটাছুটি সার্থক মনে হবে।
বইটি ২০১৯ এর বইমেলায় "বহুল প্রচারিত" একটি বই। যেভাবে বইটি নিয়ে তখন বিজ্ঞাপন, ছবি আর ফেসবুকে প্রচার হয়েছিলো সেটা কোন নতুন লেখকের বই নিয়ে সাধারণত হয়না, যার বেশিরভাগই কৃত্তিম মনে হয়েছিল। এই লেখক সামনের বইমেলাতে হয়ত এভাবে থাকবে না বলেই আশঙ্কা করেছিলাম, যেভাবে অনেকেই আছে কিন্তু এই লেখককে এবার ২০২০ এর বইমেলাতে সেভাবে পাওয়া যায়নি বা "ব্যবসা করেত দেখা যায়নি"!
বইতে কি আছে আসলে সেটা বোঝার জন্য নিজে একবার বইটি পড়ে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা পড়তে এক বছর লেগে গেল এবং আমার আশঙ্কা সত্যি করে "বইটি আমার সময় নষ্ট করল"!
বইটি নিয়ে আরও নেতিবাচক কথা বলার আগে বলে নিই প্রচ্ছদ। আমার ধারনা এই বইটি বইমেলাতে এই বিক্রির পেছনে শুধু ব্যপক প্রচারণাই না, এই প্রচ্ছদও বড় ভুমিকা রেখছে। চমৎকার একটা প্রচ্ছদ আর যুতসই নাম। বইয়ের চ্যাপ্টারগুলোকে আলাদাভাবে একটি শিরোনাম, একটা ছবি আর একটা ছোট ট্যাগ লাইন দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এটিও একটি অনন্য দিক।
এবার আসি ...
কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদের বা নামের সাথে বইয়ের গল্পের কোন মিলই নাই। "ডোন্ট জায এ বুই বাই ইটস কভার" - এটি এই বইয়ের ক্ষেত্রে বিপরীতভাবে সত্যি। বইয়ের প্রচ্ছদ যতটা ভালো ভেতরের লেখা ততটাই না-ভালো। ভেতরে ইচ্ছেমত কিছু ছবি ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলো বিভিন্ন হাতের আঁকা এবং বইয়ের ভেতরের সৌন্দর্য্য নষ্ট করেছে। ১৮৩ পৃষ্ঠার মোটা পাতার বড় হরফে ছাপানো ৪০০ টাকা দামের বই বলে কথা!
দূর্বল গল্পের গাঁথুনি, বারবার টেনে গল্প লম্বা করার চেষ্টা, গল্প বলতে গিয়ে পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এগুলো লেখকের লেখায় ফুটে ওঠে। গল্পের চরিত্রগুলোকে খুব স্পষ্টভাবে চিত্রায়িত করার অভাব রয়েছে, চরিত্রের মুখের ভাষার অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, কিছু কিছু জায়গায় একেবারেই প্রচলিত বা খেলো শব্দের ব্যবহার যেমন আছে তেমনি প্রচলিত বা অঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার করে আবার পাশে লিখে দেয়াটা উপন্যাসের ছন্দ পতন ঘটায়।
আমি নিজে চিকিৎসক হিসেবে পড়তে গিয়ে লেখকের লেখায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের সম্পর্কে নীচু মানসিকতা আবিষ্কার করেছি যেটা শুধুমাত্র চরিত্রের প্রয়োজনে নয় বরং লেখকের নিজস্ব চিন্তাধারার প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে।
উপন্যাসের চরিত্র কালা মিয়া, তার স্ত্রী ফজিলাত আর দুই সন্তান সৈকত আর রোখসানা। কালা মিয়ার ছোট ভাই জালাল যে কিনা দরিদ্র কৃষকশ্রেণী থেকে উঠে এসে শিক্ষিত হয়ে শহরে নীড় খোঁজে। সেখানে তার স্ত্রী সাভেরা ধনীর সন্তান।
স্বাভাবিকভাবেই জালাল আর সাভেরার মাঝে একটা দুরত্ব থাকে, বিয়ের পরেও ভীতি, অবজ্ঞা ব্যপারটাকে ছাপিয়ে প্রেম আসেনা। যদিও শেষ দৃশ্যে চুড়ান্ত সত্যের মুখোমুখি হয়ে সাভেরাকে বদলে যেতে দেখা যায়। এই নাটকীয়তাটুকু খারাপ না লাগলেও এখানে গল্পের গাঁথুনি ভালো হয়নি। জালালের চরিত্র নিয়ে লেখক অকারণ এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। তার চরিত্রকে স্থিরতা দেননি, যদিও এমন চরিত্র খুব দৃঢ়চেতা হবার কথা। মাঝে আকারণে জালালে সাথে মল্লিকা চরিত্র এনেছেন এবং সেটিও মাঠে মারা গিয়েছে।
গল্পের ফজিলাত চরিত্রকে যথেষ্ট পরিনত মনে হয়েছে। জীবন সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে গেলে এমনভাবেই এগোতে হয় যদিও সেখানেও কিছু অমীমাংসিত বক্তব্য আছে। রোখসানা চরিত্রটিও বেশ সুন্দর চিত্রন তবে তার সাথে সবুজ চরিত্রটি আরও একটু বিকশিত হতে পারত। সৈকত চরিত্র নিতান্তই দায়সারা।
শুধুমাত্র গল্পের প্রয়োজনে কালাম চরিত্রকে এনেছেন এবং সেটিও স্বচ্ছভাবে আকেননি। সাভেরার বাবাকে এনেছেন গল্পের মোড় ঘোরাতে কিন্তু তার বাস্তবিক ভূমিকা রাখেন নি।
সবমিলে আরও কিছু অসংগতি মনে আসছে কিন্তু এই বই নিয়ে অতকিছু লিখতেও ইচ্ছে করছে না।
অনেকদিন পর মনে হলো বর্ণনানির্ভর একটি উপন্যাস পড়েছি। বর্তমানে যারা উপন্যাস লিখছেন তারা বর্ণনার অংশ এতটাই কমিয়ে দিচ্ছেন যে, উপন্যাস না বলে সেগুলোকে নাটক বললেই বোধ হয় ভালো হতো।
কিঙ্কর আহসানের লেখা "বিবিয়ানা" ছোট ছোট বাক্যে রচিত বর্ণনা নির্ভর এক উপন্যাস। সংলাপ থেকে বর্ণনা'কেই এই উপন্যাসে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
"বিবিয়ানা" হলো দু'টি ভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর দুজন স্ত্রীর নিজেদের স্বামী-পরিবারকে আকড়ে ধরে রাখা, নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখা, তাদের প্রতি আবেগ-ভালোবাসার গল্প।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর ছোট ভাই জালালের সকল দায়িত্ব পালন করে বড় ভাই কালা মিয়া। নিজে ক্ষেতে-খামারে কাজ করে, ছোট ভাইকে শিক্ষিত করে। জালাল বড় অফিসার হয়। ভাইকে না জানিয়েই অভিজাত শ্রেণির এক মেয়েকে বিয়ে করে। তারপর থেকে ঘটতে থাকা নানা ঘটনা প্রবাহ। পুরো গল্প জুড়েই দুঃখ দুঃখ ভাবটা রয়ে যায়।
এই গল্প হয়ত কালা মিয়ার কিংবা জালালের। তবে তার থেকে অনেক বেশি ফজিলাত ও সাভেরার। পুরো গল্প জুড়েই তাদের 'বিবিয়ানা' অটুট থেকেছে।
গল্পের লেখার ধরণ সুন্দর। ছোট ছোট বাক্যে পুরো গল্প লিখা। এজন্য বর্ণনা প্রধান লেখা হলেও বিরক্তি লাগে নি একেবারেই। একটানে পড়ে ফেলা যায়।
নতুন লেখকদের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের লেখনীর প্রভাব অনেক বেশি প্রত্যক্ষ করা যায় আজকাল। যেহেতু কয়েক প্রজন্ম বড়ই হয়েছি হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়ে, তাই তাদের খুব একটা দোষও দেয়া যায় না।
তবে কিঙ্কর আহসান এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। 'বিবিয়ানা" বইয়ের উপর কেউ ভুলেও এই অভিযোগ তুলতে পারবে না। ছোট ছোট বাক্যে ভিন্ন এক বিষাদমাখা ধাচে পুরো গল্পটি লেখা। মুগ্ধ হয়েছি। প্রথমে ভেবেছি কিছু দূর পড়েই হয়ত এই ধাচের ছন্দপতন ঘটবে। তবে ১৮৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত লেখক এই ছন্দপতন ঘটতে দেন নি। এক্ষেত্রে তিনি বাহবা পেতেই পারেন।
উপন্যাসের প্রথম অংশ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। ক্যারেক্টার বিল্ড আপ, গল্পের গতি সবকিছুতেই মুন্সিয়ানা। কিন্তু কিছুদুর যেতেই হোচট খেতে হয়েছে। চরিত্রগুলো প্রথমে যেমন দেখানো হলো ধীরে ধীরে কেমন জানি ছন্দপতন। ঘটনাপ্রবাহ চরিত্রগুলোর সাথে মানানসই হচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে লেখক জোর করে আবেগ ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
যেখানে কোনো ভালোবাসাই ছিল না, সেখানে জোর করে ভালোবাসা এনে, বিচ্ছেদ। বিষাদের ছায়া ধরে রাখার জন্য।
মল্লিকার প্রতি জালালের হুট করে আবেগ উঠে আসা, তারপর সেই আবেগ চলে যাওয়া কোনোটিই পরিষ্কার নয়। ঠিক তার আগেই সাভেরার জালালের প্রতি দুর্বলতা দেখা দেয়। মনে হয় কেমন যেন জোর করে সবকিছু ঘটানো। এরকম বেশ কয়েক জায়গাতেই সুর কেটেছে। লেখক বিষাদমাখা লেখার ধরণটা ঠিক রাখতে যেয়ে গল্পের কাহিনীতে গোলমাল করে ফেলেছেন। চরিত্রগুলো ঠিকমত ধরতে পারেন নি।
বইটি নিয়ে বইয়ের বিভিন্ন গ্রুপে আগ্রহের অন্যতম কারণ বইটির সুন্দর প্রচ্ছদ। বইটিকে নিয়ে ফটোগ্রাফিও অনেক দেখলাম। তারা কি ফটোগ্রাফির জন্যেই বইটি কিনেছে, নাকি তারা পড়েও দেখবে তা আমার জানা নেই।
বইটি যে পরিমাণ 'হাইপ' তুলেছিল, সেই তুলনায় আশাহত হয়েছি। বইটির প্রচ্ছদ আসলেই অনেক সুন্দর। কিন্তু বলে না, Never Judge a Book by its Cover.
পৃষ্ঠার মান অনেক উন্নত। কিন্তু সেজন্য আপনার গুণতে হবে ৪০০টাকা। ১৮৪ পৃষ্ঠার বইয়ের গায়ের মূল্য ৪০০টাকা, এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যদিও বইমেলায় ২৫% ছাড়ে, ৩০০টাকায় পাবেন। তবুও এই দামকে অনেক বেশিই বলব।
এক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, দাম নির্ধারণ প্রকাশকের উপর। লেখকের কোনো ভূমিকা নেই। লেখকের ভূমিকা অবশ্যই আছে। লেখক বাধ্য নয়, ঐ প্রকাশনা থেকেই বইটি প্রকাশ করার জন্য। প্রথমেই দামের ব্যাপারটি পাঠক-ভক্তদের নাগালে রাখার ব্যাপারে কথা বলে নিলেই এরকম ঝামেলা হয় না। নামকরা লেখকদের বই যেকোনো প্রকাশনীই আগ্রহ নিয়ে প্রকাশ করতে চাইবে।
এছাড়া বইয়ে বেশ অনেক জায়গায় বানান ভুল, প্রিন্টিক মিস্টেক চোখে পড়েছে। এদিকে আরেকটু নজর দেয়া যেত।
সব মিলিয়ে বলব খারাপ না। চরিত্রগুলো আরেকটু ঠিকঠাক ফুটিয়ে তোলা হলে বেশ ভালো বলা যেত।
ভিন্ন ধাচের লেখাটি পাঠক অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩/৫। ৩.৫ দেয়া যেত। কিন্তু বইয়ের মূল্য নাগালের বাইরে রাখার জন্য ভগ্নাংশকে বাদ দেয়া হলো।
ভালবাসার দোকান খুলে বসা ফেসবুক সেলিব্রিটি লেখকের বই। তার ভাষাতে বলতে গেলে খারাপ, খুব খারাপ। ব্যাপারটা দাঁড়ালো এমন, পকেটে নাই টাকা, চলে এলাম ঢাকা। বিবিয়ানা বইটি এক কথায় পড়ে হতাশ ছাড়া কিছুই হইনি। এমন তেলাপোকা টাইপ লেখকেরা সাহিত্যে বিচরণ করলে কদিন পর মেলাতে লোক ভাড়া করে নেয়া লাগবে।
এই বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পীর প্রশংসা না করে পারছি না।অসম্ভব সুন্দর করে তিনি তার শিল্পের নিপুণতা দেখিয়েছেন!
এই বইয়ের রিভিউ আমার মতো ক্ষুদ্র পাঠকের দেয়া সম্ভব না! কেনো দেয়া সম্ভব না সেটাও বলি,একটা বই পড়লে মানুষ সেই বই থেকে জীবনবোধ, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়!সেই ভালোলাগা থেকে কিছু লেখার প্রয়াস করে।কিন্তু বইয়ের প্রথম দুই অধ্যায় পড়ে মনে হয়েছে,এসব কি!মানে এক লাইনের সাথে আরেক লাইনের তো কোন মিল নাই ই তার উপর শেষের লাইনগুলো অসহ্যকর!একটা সুস্থ,স্বাভাবিক মানুষের মানে যার বই নিয়মিত পড়ে,বুঝে তার ঠিক থাকতে পারবে না আমি একশ পারসেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।চারশ টাকা খরচ করে কি কিনছি এটা ভেবেই কূল পাচ্ছিনা!
ভাই ও বোনেরা, আমার শিক্ষা হয়ে গেছে বেস্ট সেলার,হ্যানত্যান দেখে বই কেনায়।আর যাই করি জীবনের রেটিং দেখবো না,হ্যাঁ কিঙ্কর আহসানের বই অবশ্যই কিনবো না।
উফ অনেক ভালো কথা লিখলাম!আমার কথা বিশ্বাস না হইলে এই শিট(shit)কিনে নিজের ধৈর্য্যর একটা ছোটখাটো পরীক্ষা দিয়ে দিতেই পারেন!😅
বইঃ বিবিয়ানা লেখকঃ কিঙ্কর আহসান প্রকাশনীঃ অন্বেষা প্রকাশন প্রকাশ কালঃ ২০১৯ মুদ্রিত মূল্যঃ ৪০০ টাকা মাত্র
#কাহিনী_সংক্ষেপঃ গল্পটা দুইটি ভিন্ন সামাজিক পরিবেশে দাম্পত্য জীবনের দুই স্ত্রীর স্বামী-সংসারে বিবিয়ানা টিকিয়ে রাখার গল্প। মৃত বাবা মায়ের সন্তান কালা মিয়া আর জালাল দুই ভাই। সহজ সরল কালা মিয়া নিজে খেতে খামারে কাজ করে তার ছোটভাই জালালকে পড়াশোনা করিয়ছে। জালাল বড় চাকুরি করে এবং শহরে বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করেছে। বিয়ের পর থেকে দুই ভাইয়ের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
একদিকে কালা মিয়ার স্ত্রী ফজিলাতের দুই সন্তান রুখসানা ও সৈকতকে নিয়ে স্বামী-সংসার আগলে রাখার চেষ্টা। অন্যদিকে জালালের স্ত্রী সাভেরার স্বামীকে তার ভাই, ভাইয়ের সংসার থেকে আলাদা করে নিজের সংসার সাজানোর স্বপ্ন। এসব নিয়েই গল্প এগোতে থাকে।
গল্পের মাঝখানে কালা মিয়ার পরিবারে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। কালা মিয়ার ছেলে সৈকত এক্সিডেন্ট করে আহত হয়। এই দুর্ঘটনা দুই পরিবারের মাঝে যোগসূত্র তৈরি করে। অন্যদিকে সাভেরার জরায়ু ক্যান্সার ধরা পরে। এই কঠিন অসুখ হঠাৎ তার মাঝে মানসিক পরিবর্তন এনে দেয়। এভাবেই গল্প এগিয়ে যায়।
#নিজস্ব_পাঠ_প্রতিক্রিয়াঃ ১৮৫ পৃষ্ঠার বই শেষ করেছি অনেক ধৈর্য্য নিয়ে। প্রথম ১০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে রেখে দিয়েছিলাম আর নিতে পারছিলাম না বলে। পরে আবার ভাবলাম শেষ করেই মন্তব্য করা উচিত। তাই আমি আমার সবটুকু ভালো লাগা মন্দ লাগা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাই।
#ভালো_লাগাঃ ভালো লাগার প্রথমেই আসবে বইটির সুন্দর প্রচ্ছদের কথা। প্রচ্ছদটা দেখলেই পছন্দ হয়ে যায়। বিবিয়ানা নামের সাথে প্রচ্ছদের মিল রয়েছে। তবুও একটা কথা আছে, Never judge a book by its cover.
তারপর আসবে নামকরণ। বিবিয়ানা নামটি অনেক সুন্দর ছোট্ট মিষ্টি নাম। শুনে আগ্রহ জন্মায় বইটি পড়ার। নাম দেখেই প্রথমে আমার বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মেছিল।
চরিত্রগুলোর মাঝে কালা মিয়ার চরিত্রটাই মনে জায়গা করতে পেরেছে। তার ভাতৃ প্রেম ছিল অতুলনীয়।
#মন্দ_লাগাঃ এই বইটি নিয়ে আমার মন্দ লাগার পরিমাণ একটু বেশিই। সেজন্য একটু বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া প্রয়োজন।
#বর্ণনা_বিভিন্ন_ত্রুটিঃ বিবিয়ানা বর্ণনা নির্ভর উপন্যাস হলেও বর্ণনায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। কিছু জায়গায় একই প্যারায় লেখক বর্ণনায় কর্তাকে কখনো তিনি কখনো সে সম্বোধন করেছেন। যেমন ১৫৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,"নিজের স্যান্ডো গেঞ্জিটাকে মেঝে মোছার কাপড় বানায় সে।" ১৫৬ পৃষ্ঠায় এই অনুচ্ছেদের ই শেষের দিকে লিখেছেন, "তিনি চোখ মোছেন।" তিনি বর্ণনায় এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন যা বর্ণনাকে দুর্বল করেছে। যেমন, কই, অই, বাইরে ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করেছেন।
১২ পৃষ্ঠায় কালা মিয়ার আঞ্চলিক ভাষার বিবরণে লিখেছেন "একের অধিক সাপ। একটা আরেকটারে জড়াই ধইরা আছে।" "একের অধিক" কথার মত একটা ভারি কথাকে গ্রাম্য ভাষ��র সাথে কেমন যেন খাপছাড়া লাগে।
#কাহিনীর_ছন্দ_পতনঃ লেখক প্রথমে চরিত্রগুলোকে একভাবে উপস্থাপন করেছেন। মাঝখানে হঠাৎ করে চরিত্রগুলো মাঝে আবেগ ভালোবাসার উপস্থিতি ঘটিয়েছেন। যেটা গল্পের ছন্দপতন হয়েছে। যেখানে কোনো ভালোবাসা ছিল না সেখানে জোর করে এনে ভালোবাসা ঢুকিয়েছেন।
জালাল নতুন বিয়ে করে হানিমুনের সময়ই দেখা যায় সাভেরাকে প্রচন্ড ঘৃনা প্রকাশ। কিন্তু এর কোন যুক্তিসংগত কারণে লেখক দেখাতে পারেননি বইতে। হঠাৎই মল্লিকার প্রতি টান অনুভব করে কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ঠিক তার আগেই হঠাৎ সভেরা জালালের প্রতি দুর্বল হয়। কেমন যেন খাপছাড়া লাগছিল চরিত্র গুলোর সাথে এসব ঘটনা।
যে মেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিপদে পড়ে তার বাবার এখানে এসেছিল বলে, তার কান্না পেয়েছিল কারন সে তখন স্বপ্ন সাজাচ্ছিল সংসারের। এমন স্বার্থপর মেয়ে অসুস্থ হয়ে হঠাৎ শ্বশুরবাড়ির জন্য উতলা হয়ে ওঠার ব্যাপারগুলি কেমন যেন অসামঞ্জস্য লাগছিল। এরকম অনেক জায়গায়ই গল্পের সুর কেটেছে।
#অতিরিক্ত_ছোট_ছোট_বাক্য_ব্যবহারঃ লেখক বর্ণনা প্রচুর ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করেছেন। দুই শব্দের বাক্য এক শব্দের বাক্য। এমনকি কিছু বাক্য অতিরিক্তও। যেগুলো পড়তে খুবই বিরক্তিকর লাগে। প্রতিটি অনুচ্ছেদের শেষে একাধিক (?) চিহ্ন দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ছোট ছোট উত্তর তিনি দিয়েছেন যেগুলো অপ্রয়োজনীয় ছিল। সেগুলো কেবল বই থেকে স্বাস্থবান করতে সাহায্য করেছে। সুন্দৌর্য নষ্ট করেছে। এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া, বক্তৃতাকে সুন্দর করে কিন্তু বর্ণনাকে নয়।
যেমন, ১৫৪ পৃষ্ঠায়, জালাল চলে গেল কেন? সাভেরাকেও চলে যেতে হবে। পৃথিবী ছেড়ে? কবে? আচ্ছা চলে যাওয়া কখনো সুন্দর হয়? না। হয় না।
#রোবটিক_চরিত্র_চিত্রায়নঃ রোবটিক শব্দটা দেখে অবাক হচ্ছেন তো? আচ্ছা বলছি, কালা মিয়া ও ফজিলাতের মেয়ে রুখসানার চরিত্র আমার কাছে রোবটিকই মনে হয়েছে। একটা মেয়ে তার ভাইয়ের এমন অসুস্থতার সময় কিভাবে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারে? এমনকি তার বাবার মৃত্যুতেও সেই মেয়েটি সামান্যতম বিচলিত হয় না, কষ্ট পায় না। বরং বাবার লাশ দেখতে গ্রামে আসার সময় রাস্তায় বাসে হকারের থেকে সাজুগুজুর জিনিস কিনতে ব্যস্ত হয়ে।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, লেখক এমন চরিত্র কোথায় পেলেন? বাঙালি মেয়েরা কবে থেকে এতটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে? তাও আবার বাবার প্রতি! যেখানে প্রতিটা মেয়েই থাকে বাবা অন্তপ্রাণ।
লেখক লেখাটাকে বেশি বাস্তব করে তুলতে গিয়ে সিনেমাটিক করে তুলেছেন। যেমনটা সিনেমায় দেখেছিলাম রোবটের প্রেম হয়ে গিয়েছিল ঠিক তার উল্টো হল এখানে।
#যুক্তিহীন_বাক্য_প্রয়োগঃ লেখক এমন কিছু বাক্য প্রয়োগ করেছেন বইতে যেগুলো পুরোপুরিই যুক্তিহীন।
১। ১২৬ পৃষ্ঠায় আছে, "এত চোখের পানি তবুও দুনিয়ায় পানির অভাব এর কথা কিছু লোকজন কেন বলে কে জানে !"
২। ২৩ পৃষ্ঠায় আছে, "বিয়ের দরকার। বিয়ে ছাড়া থাকা যায়না।"
৩। ১৬৬ পেজটা আছে, "বাসে যেতে যেতে এই সব ডিম ছেলা মানুষগুলোকে অনেক দেখেছে দালাল এরা অনেকটাই অনুভূতি শূন্য হয়।"
#প্রচুর_বানান_ভুল_ও_শব্দ_মিসিংঃ বইটা তো প্রচুর বানান ভুল আছে এবং কিছু কিছু বাক্যে শব্দ মিসিং আছে যার কারণে পুরো বাক্যটাই বদলে গিয়েছে। ১৩, ২৪, ১১০,১১১, ১১৩,১৪০,১৭৭ এইসব পৃষ্ঠায় বানান ও বাক্য ভুল আছে।
সর্বোপরি আমি বলব, লেখকের শব্দ ভান্ডার আরো সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন, বাক্য গঠনে যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। তবেই লেখা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
কালা মিয়ার চরিত্রায়ন এবং তাকে ঘিরে ঘটনাবলী গুলো, তার চিন্তাভাবনার গতি, ধরন নিয়ে লেখাগুলো ভাল লাগছিলো। জালাল ও সাভেরার কাহিনি খুব স্বাভাবিকভাবে এগিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় আমার বিরক্ত লাগছিলো। লেখক গল্পকে বেশ টেনেছেন কিছু জায়গায়। সব মিলিয়ে পুরোটা গল্প একদমই সাধারণ গল্প। মোটামুটি ভাল লাগলো। লেখকের লেখার স্টাইল ভাল। সহজ, সাবলীল।
ভর সন্ধ্যা। কালা মিয়া পুকুর ঘাটে ওজু করতে গিয়ে দেখে পুকুরের পানির ভেতর থেকে একটা মোহরভরা কলসি উঠে আসছে, কলসির গলা পেঁচিয়ে আছে সরু সরু সুতার মতো কালো সাপ! ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো কালা মিয়া।
কালা মিয়া গ্রামের সরল নিরীহ গৃহস্থ, চাষবাস করে, গরু পালে। অভাবের সংসারে স্ত্রী ফজিলাতের চোখে সে বাতিল মানুষ। দুই ছেলে-মেয়েও তাই বাপকে ঠিক সম্মান দিতে শেখেনি। কালা মিয়ার দুর্বলতা একটাই, তার ছোট ভাই জালাল। কম বয়সে মা-বাবা মারা যাওয়ার পর কালা মিয়াই সংসারের হাল ধরে। ভাইটি মেধাবী ছিল, তাই নিজের সন্তানের মতো বুক আগলে তাকে লেখা পড়া করিয়েছে।
জালাল ঢাকায় থাকে, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। গা থেকে আঁশটে মাটির গেঁয়ো গন্ধ মুছে ফেলতে বিয়ে করে শহরের প্রতিপত্তিশীল ব্যক্তির মেয়ে সাভেরাকে। বিয়েটা অনেকটা সমঝোতাই বলা চলে। সাভেরা আর তার বাবা চেয়েছিল হাতের মুঠোয় থাকা একজনকে আর জালাল চেয়েছিল শহুরে পরবর্তী প্রজন্ম।
হিসেব কষা এই সম্পর্কের মধ্যেও কি গজাতে পারে ভালোবাসার শেকড়? নাকি সামাজিক ব্যবধান উলটো দূরে ঠেলে দিল দু'ভাইকে? মোহরের অভিশাপ কালা মিয়ার সংসারে নামালো অশান্তির ঝড়।
এসব কিছু নিয়েই পুড়ে যাওয়া জীবনের গল্প 'বিবিয়ানা'।
পাঠপ্রতিক্রিয়া: 'বিবিয়ানা' জুড়ে আছে গ্রাম এবং শহুরে জীবনের চিত্র। গ্রামের মসজিদ, পুকুরঘাট, মাছ ধরার গ্রাম্যমেলা ইত্যাদির বর্ণনা পড়তে ভালো লাগে। পুকুরে ভেসে ওঠা মোহর ভর্তি কলসির প্রতি মানুষের লোভ, অভিশাপের ভয়, এবং মসজিদের ঈমাম, চেয়ারম্যান, আবদু ডাকাইত প্রমুখ চরিত্রগুলোও ছিল গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।
কিঙ্কর আহসানের লেখনী গতানুগতিক ধারা থেকে ভিন্ন। তিনি সংলাপের চেয়ে বর্ণনায় বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। বর্ণনাগুলো দীর্ঘ নয়, ছোট ছোট বাক্য গঠন ও সহজ শব্দ ব্যবহার করায় একঘেয়েমী আসে না। বর্ণনার মাঝে মাঝে তিনি ভাববাচ্য ব্যবহার করেছেন। হঠাৎ পড়তে একটু অসুবিধা হলেও নতুন ধরণের লেখার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানানো যায়।
গল্পে কিছু কিছু বর্ণনা চমৎকার ছিল। বিভিন্ন খাবারের বর্ণনা একেবারে জিভে পানি আনায়। খুব সাধারণ ডাল বা আলু ভর্তাও গরম ভাতে মেখে খেতে ইচ্ছে করবে। গভীর অন্ধকার রাতকে 'গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার' বা বজ্রপাতকে 'আকাশ থেকে কে যেন টর্চ জ্বালিয়ে কি খুঁজছে' উল্লেখ করা সুন্দর ছিল।
লেখকের ভিন্নধারার লেখা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করেছে। জায়গায় জায়গায় আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে আবার ব্র্যাকেটে তার অর্থ বলে দেওয়ার দরকার ছিল না। ত্যানা, হাউস, পাকঘর শব্দগুলো পাঠক মাত্রই জানেন। ওই'কে 'অই' লেখাটা একেবারেই ভালো লাগেনি। বইয়ের পাতায় ভাবপ্রকাশের খাতিরেও 'লম্বাআআআ' লেখাটা দৃষ্টিকটু। চরিত্রগুলো কথা বলা শুরু করছিলো চলিত ভাষায়, বাক্য শেষ করছিলো শুদ্ধভাবে। একই ব্যক্তিকে কখনো তুমি কখনো আপনি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এগুলো লেখনীকে সুখপাঠ্য না করে ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে।
প্রতিটি পরিচ্ছেদ শুরু করা হয়েছে ছোট ছোট শিরোনাম এবং এরপরে একটি পাঞ্চ লাইন দিয়ে। মাঝেমধ্যে বাক্যগুলোর সুত্রপাত বোঝা যায় না। অধ্যায়ে��� মাঝখানেও হঠাৎই এভাবে বাক্য ব্যবহার করেছেন লেখক।
গল্পে মূল সমস্যা সৃষ্টি করেছে চরিত্রগুলোর অসঙ্গতি। জালাল স্ত্রীকে ঘৃণা করে, ভালোবাসতে পারে না, অন্য নারীর প্রতি তার মোহও রয়েছে। সাভেরা যখন ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফেরার পথে কাঁদছে তখনও সে ভেবে যায় মল্লিকার কথা। সেই জালালই সাভেরার সাথে বিচ্ছেদের কষ্টে আত্মহত্যার চিন্তা করা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। ফজিলাত প্রথম থেকেই স্বামীকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে, অসুস্থ স্বামীকে গভীর রাতে পুকুরে জাল ফেলতে পাঠায়, সেই স্ত্রী কেন শেষের দিকে স্বামীর প্রতি এতোটা আকুলতা প্রকাশ করে তার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখা নেই। চরিত্রের একই রূপবদল ছিল সাভেরার মধ্যেও।
কালা মিয়ার মধ্যে দেখানো হয়েছে ছোট ভাইয়ের প্রতি মমতা, কিন্তু সন্তানদের জন্য তার তেমন অনুভূতি নেই। কেবল গল্পের শেষাংশে অসুস্থ ছেলেকে দেখতে চাওয়া ছাড়া বাকি পুরো সময়ই কালা মিয়া নিজের ভোজনরস এবং শরীর নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
রোখসানার চরিত্রটি একটু বেশিই অনুভূতি শুন্য ছিলো। ভাইয়ের চরম বিপদে বা বাপের মৃত্যুতেও তার কিছুই আসে যায় না। লেখক তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে মানবিক গুণাবলি ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে পারেননি আমার মনে হয়েছে। গল্পে ভালো লাগার মতো চরিত্র হিসেবে কালা মিয়া আর সাভেরাকে বলা যায়। এদের চরিত্র দুটো কিছুটা হলেও মন ছুঁতে পারবে।
বইয়ের মুদ্রণে ছিল প্রচন্ড অযত্নের ছাপ। ফ্ল্যাপে লেখা অংশ থেকে শুরু করে পুরো বইয়ে বানান, যতিচিহ্ন, বাক্যগঠনে অসংখ্য ভুল। কোথাও এক চরিত্রের জায়গায় অন্য চরিত্রের নাম বসানো হয়েছে।
ঝকঝকে বাইন্ডিং আর ভারি পাতার বইটির প্রচ্ছদ খুবই সুন্দর, এরজন্য প্রচ্ছদশিল্পী রহমান আজাদকে ধন্যবাদ। বইয়ের নামকরণও গল্পের জন্য মানানসই।
লেখককে ধন্যবাদ 'বিবিয়ানা'র জন্য। গল্পের পাতায় পাতায় তিনি যে জীবনের বাস্তবতা তুলে আনতে চেয়েছেন, তা পাঠকের জন্য অনেক বেশী হৃদয়গ্রাহী হওয়া সম্ভব ছিল, যদি চরিত্রের গাঁথুনি আরো শক্ত হতো।
কিঙ্কর আহসানের উচিত লেখালেখি বাদ দিয়ে বইয়ের হকার হয়ে যাওয়া। উনি লেখালেখি কম বই বিক্রি করে খ্যাতি কামাতে বেশি আগ্রহি। একই ধাচের বই সবগুলো। কোন ভ্যারিয়েসান নেই। গদবাঁধা প্লট। শেষের দিকে মনে হয়। খুব তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দিচ্ছেন। যেন ছাপানোর জন্যই বই লেখা।
কিঙ্কর আহসানের লেখা আমার পড়া প্রথম ও শেষ বই। গল্পের প্লটের যেমন কোনো ছিড়ি-ছাদ নেই, তেমনি নেই সঠিক ভাষার ব্যাবহার। বইয়ের কভার এবং রকমারী'তে রিভিউ দেখে খুব আগ্রহ নিয়ে কিনেছিলাম বইটা। সময় তো অপচয় হলোই, টাকাগুলোও উসুল হলো না।😒
অতি কষ্টে বইটা শেষ পর্যন্ত গিয়েছি। টিপিক্যাল কাহিনী, কন্টিনিউটি বলে কিচ্ছু নাই। প্রত্যেকটা চরিত্র তাদের স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাখ্যাহীন আচরণ করছে! সরি ভাই, চরম হতাশ হইছি আপনার লেখা পড়ে।
সন্ধ্যা নামলেই দোয়েল শিস বাজায় মনের আনন্দে। গোধূলি পেরিয়ে এই সন্ধ্যাবেলায়ই নীরবতা জেগে উঠে, আকাশ বাতাস গাছপালা সব যেন হু হু করে উঠে। আর সেই নির্জনতা ভেঙে আমার বারান্দা থেকে যখন দোয়েল শিস দেয় - আমার ভেতরটা আঁতকে উঠে -- ঠিক যেমনটা কিঙ্কর ভাইয়ার 'বিবিয়ানা' বইটা শেষ করে আমার ভেতরটা হু হু করে উঠেছিলো।
প্রচ্ছদ দেখে হা করে থাকতে থাকতে 'বিবিয়ানা' বইয়ের একদম পেছনের ফ্ল্যাপ উলটাই, এত সুন্দর প্রচ্ছদঅলা বইয়ের লেখক যিনি - তার সম্পর্কে জানতে চাওয়ার এই আগ্রহ যেন আমার দোষের কিছু নয়। কিন্তু অবাক হয়ে লেখক কিঙ্কর আহ্সানের প্রতি বই পড়ার শুরুতেই একটা ক্ষোভ জন্মে যায় যে, তিনি তার পরিচয়টা অত্যন্ত কায়দা করে গোপন করলেন। আমি কিঙ্কর আহ্সানকে আরও অনেক আগে থেকেই চিনি বিধায় আমি রিভিউ লেখার সময় বায়াসড হবো বা পক্ষপাতিত্ব করব - এই বিষয়ে যারা সন্দিহান, তারা এই রিভিউ পড়া এখানেই থামিয়ে দেন, দয়া করে। পুরো রিভিউ পড়ে এই কথা কেউ তুললে তার জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবেনা।
রিভিউ লেখার সময় এই কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে কি থাকবে না এই ভাবনা নিয়ে যখন আমি পড়ে যেতে নিলাম - সেই পড়ে থাকাটা খুব বেশিক্ষন স্থায়ী হয়নি কারণ যেই ঘোরের মধ্যে এই জালাল, কালা মিয়া, ফজিলাত, সাভেরা আমাকে রেখে দিয়েছে - সেখান থেকে বের হওয়া নেহায়েত সহজ কাজ নয়।
যা বলছিলাম -- কিঙ্কর আহ্সানের পরিচয় না পেয়ে যখন 'বিবিয়ানা'র শুরু হলো --
'বিবিয়ানা' পুড়ে যাওয়া জীবনের গল্প। আস্ত জীবন নয়, জীবনের কোনো এক খণ্ড যেন। আচমকাই শুরু, আবার বোকা বানিয়ে ফুরিয়ে যায়। জীবনের নাটাই এখন অন্য কারোর হাতে। লেখকের সাধ্য এই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার! "
সচরাচর অন্যান্য উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার সাথে যা হয় - ভালো উপন্যাস হলে দুয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর একটা মাদকতা পেয়ে বসে, ডুবে যাই ধীরে ধীরে, বই ছেড়ে উঠতে মন চায়না। কিন্তু সত্যি বলতে গেলে, আমি ভূমিকা পড়েই এখানে ডুব দেই। কেন দেই কীভাবে দেই, সেই উত্তর বিবিয়ানা না পড়লে জানা যাবেনা!
'বিবিয়ানা' উপন্যাস সত্যিই পুড়ে যাওয়া জীবনের গল্প। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার গল্প।
মখমলি মাফলার খুব সামান্য কিছু হলেও কালা মিয়ার বড্ড শখ ছিল এই মাফলারের��� নিজের কষ্টার্জিত অর্থে ছোট ভাইকে পড়াশোনা করিয়ে যখন প্রতিষ্ঠিত হতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কালা মিয়া - তখন আয়েশ করে ছোট ভাইয়ের কাছে এই সামান্য চাওয়া ছিলো তার। কালা মিয়ার এই মাফলারের শখ -- এই সমগ্র উপন্যাসের কোনো এক প্রাক্কালে কি পূর্ণতা পায়?
কালা মিয়ার স্ত্রী ফজিলাত কোনো এক কারণে কালা মিয়ার ছোট ভাইকে দেখতে পারে না। আপন ভাবতে পারে না। কিন্তু কি সেই কারণ?
জালাল - কালা মিয়া ; দুই ভাই -- কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি চরিত্রের মানুষ। পারিবারিক অবস্থার মাঝেও যেন আকাশ আর পাতালের পার্থক্য। এই যখন পার্থক্য, তখন একই সাথে দুই ভাইয়ের ভিন্ন দুটি প্লট টেনে নিয়ে যাওয়া এবং এমনভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া -- যাতে করে পাঠকের মনোযোগ হরণ না হয়, এই দিকটাতে লেখক কিঙ্কর সফল।
কালা মিয়ার অসহায়ত্ব, ছেলের দূর্ঘটনা, ভাইয়ের সাথে বিশাল দূরত্ব, গ্রামের অনাকাঙ্ক্ষিত সব ঘটনা এতটা নিষ্পলকভাবে টেনে নিয়ে যাবে আপনাকে -- বিশ্বাস করেন, বইটা শেষ না করে উঠতে মন চাইবেনা। আচ্ছা, শুধুই কি কালা মিয়া আর জালালের গল্প?
না। এখানে ফজিলাত, রোখসানা, সাভেরা থেকে শুরু করে প্রতিটি চরিত্রই আপনাকে আটকে রাখবে। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে বোনা এই 'বিবিয়ানা' কোনো এক সম্মোহনী শক্তি দিয়ে আপনাকে বেঁধে রাখবে, বলা মুশকিল।
শুধু এইটুকুই বলব। বই পড়ে কিংবা না পড়ে / ভালো বইয়ের খোঁজ পেয়ে কিংবা না পেয়ে বর্তমান সময়ে যারা সমালোচনার ঝুড়ি খুলে বসেন যে বর্তমান সময়ের লেখকেরা জীবন নিয়ে যাচ্ছেতাই লিখে যান -- সেই সমালোচনার বাঁধ ভেঙে দিয়ে এই 'বিবিয়ানা' নিজেই এক অনন্য উচ্চতায় বসে আছে, অসাধারণ এক গল্প নিয়ে, পুড়ে যাওয়া জীবনের গল্প!
এই গল্পে কালা মিয়ার পরিণতি কি? জালাল ভালো থাকে তো? জালালের স্ত্রী আর কালা মিয়ার স্ত্রীর মাঝে কি দ্বন্দ্ব থাকে? রোখসানা? রোখসানার ভাই কি মারা যায়?
এদের ছাপিয়েও কোন চরিত্র প্রাণ পেয়ে বসে?
অন্বেষা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কিঙ্কর আহ্সান ভাইয়ার 'বিবিয়ানা' বইটা যেন অবশ্যই পড়তে হবে। সব বাদ রেখে একটা কারণও যদি বলি --
লেখার শুরুতে বলেছিলাম যে বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখক তার পরিচয় না দেয়ায় আমি কিছুটা আশাহত হয়েছিলাম।
মাঝে মাঝে রিভিউ না পড়ে বই কিনতে ইচ্ছে করে, নতুন কোন লেখকের বই ট্রাই করতে ইচ্ছে করে, সেই ইচ্ছে থেকেই বইটা কেনা। সব সময় এর অভিজ্ঞতাটা সুখকর হয় না, মানুষ হয়ে জন্মেছি, দু-চার টা ভুল করবো না?
কিছুদুর বই পড়েই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। এরপর goodreads এ কিছু নেগেটিভ রিভিউ দেখে ভেবেছিলাম আর পড়বো না। এরপরও শেষ করলাম বইটা। অসম্পূর্ণ রাখতে ভালো লাগে না।
বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী প্রশংসার দাবীদার। চমৎকার একটা প্রচ্ছদ। যেন এটাও একটা গল্প। এর সাথে যেটা বইয়ের প্রতি আরেকটু আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিলো- সেটা বইয়ের নাম। এছাড়া এই বই নিয়ে পজিটিভ কিছু বলার মত খুঁজে পেলাম না।
এবার আসি বুক রিভিউ এ ...নেগেটিভ রিভিউ লিখতে ভালো লাগে না। একটা বই একজন পাঠককে কি অনুভূত করাচ্ছে এটা বই এবং পাঠকের যদিও একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় কিন্তু কিছু বিষয় আসলে শেয়ার না করলেই নয়। বইয়ের প্রচ্ছদের বা নামের সাথে বইয়ের গল্পের কোন মিল আছে আমার তা মনে হলো না। দূর্বল গল্পের গাঁথুনি, এক লাইনের সাথে অন্য লাইনের অসামঞ্জস্যতা, যেমন: "টিউমার খুব ভালো জিনিস নয়। পরবর্তী লাইন- গুলশান পিংক সিটিতে পাকিস্তান থেকে দামি দামি সব কুর্তা আসে। " খুব বিরক্তিকর লেগেছে লেখার ধরণ। গল্পের চরিত্রগুলোকে খুব অস্পষ্টভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে গল্পের চরিত্রকে শুরু থেকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেটার বিপরীত ভাবে আবার উপস্থাপন করতে দেখা গেছে পরবর্তী চ্যাপ্টারে। চরিত্র গুলোকে গুছিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে লেখক ব্যর্থ হয়েছেন। পরিনতি নিয়ে আর ভেবে সময় ক্ষেপণ করিনি।
উপন্যাসের চরিত্র হতদরিদ্র কালা মিয়া, তার স্ত্রী ফজিলাত আর দুই সন্তান সৈকত আর রোখসানা। কালা মিয়ার ছোট ভাই জালাল যে কিনা ভাইয়ের অশেষ সাপোর্ট এ শিক্ষিত হয়ে গ্রাম থেকে উঠে এসে শহরে নীড় খোঁজে। অতীত নিয়ে লজ্জিত এবং মুঁছে ফেলতে চায়। সেখানে তার স্ত্রী সাভেরা ধনীর সন্তান।
সব গুলো চরিত্র নিয়ে অনেক অসংগতি লিখতে পারতাম, কিন্তু এই বইয়ের পিছনে আর সময় নস্ট করতে ইচ্ছে করছে না। অন্য পাঠক দের রিভিউ পড়ে জানতে পারলাম বইটি ২০১৯ এর বইমেলায় "বহুল প্রচারিত" একটা বই। এটা নিয়েও কি লিখব বুঝতে পারছিনা।
“Don’t Judge a book by it’s cover.” কথাটা এ বইটার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় প্রযোজ্য।
অপ্রচলিত তথ্য, যৌনতা, আগাগোড়া মিসোজিনিস্ট মন্তব্য আর সহজ সাবলীল লেখনও এ চারটা পিলারের উপর বইটি দাড়িয়ে আছে। বইটার প্রতিটি চাপ্টারে লেখক নতুন নতুন তথ্য দিয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করবেন যা কিছুটা অপ্রচলিত যেমন মিনি স্টু পা নামক একটি আইডিয়ার ব্যবহার। মিনি স্টু পা হচ্ছে কপালের হার দিয়ে তৈরি এক ধরনের মূর্তি যা বানানো হয় মৃত ব্যক্তির স্মৃতিতে জীবিত রাখার জন্য। লেখক এ তথ্যটিকে বইটিতে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন এবং কিছু জায়গায় এটা খানিকটা চমকপ্রদ মনে হয়। এ ধরনের তথ্যের পাশাপাশি গ্রামীণ অনেক আচার-সংস্কৃতি নিয়ে বইটিতে আলোচনা রয়েছে যা হয়ত সকলের জানা নেই।
যৌনতা নিয়ে কিছু বলার নেই। লেখকের কেন মনে হয়েছে রগরগে শব্দভান্ডার ব্যবহার করলেই বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব তা আমি বুঝতে পারি নি । যতবার নারী পুরুষ শব্দগুলো পাশাপাশি ব্যবহারের সুযোগ এসেছে ততবার লেখক রগরগে শব্দভান্ডার দিয়ে বইটাকে ঠেসে দিয়েছেন। এ ব্যাপরে লেখক বয়সের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারটাও এড়িয়ে গেছেন।
বইটাতে লেখক শুরুতে মারাত্মক মিসোজিনিস্টিক এপ্রোচে এগিয়েছেন। এখানে নারী চরিত্র ধনী পরিবারের হোক আর গরীব পরিবারের তারা যে সংসারে অশান্তির মূল কারণ তা প্রমাণ করাই মনে হচ্ছিল লেখকের মূল উদ্দেশ্য। বইয়ের শুরুতে নারী যেমন সর্বগ্রাসী সংসার বিনাশী তারাই আবার বই শেষ হতে হতে আবার ত্যাগী, ধার্মিক, সাংসারী আভূষণ বেছে নিয়েছেন।
বইটির সর্বশেষ যে বিষয়টি সমতা রক্ষা করেছে তা হচ্ছে এর সহজ সাবলীল ভাষার ব্যবহার ।বাক্যগুলোকে ছোট রাখা হয়েছে, কোন অযাচিত গাম্ভীর্যের প্রয়োগ নেই এবং স্বতস্ফুর্ত ভঙ্গিতে গল্পের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে। বইটি নিয়ে উচ্চবাক্য করার মতো কিছু নেই। রিভিউ দেয়ার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের লেখা আমাকে কেন টানে না এটা প্রমাণ করার জন্য হয়ত রিভিউটা রেখে দিলাম।
কালা মিয়া আর জালাল দুই ভাই। কালা মিয়া ঘটনাক্রমে শুধুই 🐍 দেখে। চৌধুরি সাব টাইপ বাপের একমাত্র কন্যা সাভেরাকে বিয়ে করে জালাল, ভাবে এই বুঝি জাতে উঠা হয়ে গেল সারা। জালালের মনে ঘুরে উচ্চ বংশীয় ঘরে বিয়ে হলো কিন্তু সব কিছু পেয়েও কি যেন পেলাম না, মন পরে থাকে মল্লিকার কাছে। ব্যস্ততায় বড় ভাইকে প্রায় ভুলতেই বসে জালাল, যখন বুঝতে পারে তখন কালা মিয়া এক্সপায়ার করেছে। সাভেরাও এক্সপায়ার করতে পারে দেখে নিজে থেকেই জালালের সাথে বিচ্ছেদ করে।
অনেকেই বইটাকে প্রচন্ড খারাপ বলে আখ্যায়িত করলেও আমার মতে বইটি মোটামুটি। একদম খারাপ না আবার খুব বেশি ভালো না। বইয়ে কিছু কিছু মূহুর্ত খুব ভালো লাগলেও বই শেষ করে খুব বেশি আনন্দিত হইনি। তবে লেখা পড়ে প্রচন্ড বিরক্ত হইনি। আমার মতে লেখকের ভাষা ও শব্দচয়ন অত্যন্ত সুন্দর। যা বইটাকে আকর্ষণীয় করেছে তবে অসুন্দর ও খাপছাড়া কাহিনী বইকে অনাকর্ষণীয় করেছে। পড়তে চাইলে পড়তে পারেন তবে পড়তেই হবে এমন নয়।
খুব বেশী অসাধারণ গল্প না তবে বইটা পড়ে আনন্দ পেয়েছি। চরিত্রগুলো খুব সুন্দর করে যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ২টা বিশাল প্লট হোল ছিলো। জালালের কোলকাতা যাওয়া, আর মোহরের মিথটা আরো সুন্দর করে প্রেজেন্ট করলে গল্পটা ৫/৫ হতো। তা হয় নি। যেসব চরিত্র আনা হয়েছে সবগুলোকেই যথেষ্ট সময় দেয়া হয়েছে।
বহমান জীবনের চিরপরিচিত কাহিনী 'বিবিয়ানা'-র পাতায় পাতায়। কালা মিয়া, সারাক্ষণ খাই-খাই করা লোকটা গ্রাম্য সহজ-সরলতার চূড়ান্ত প্রতিমূর্তি যেন! অল্পবয়সেই বাপ-মা হারা হয়েছিল সে। নিজের জীবনের সমস্ত কষ্ট-পরিশ্রম ঢেলে দিয়েছিল ছোট ভাই জালালকে মানুষ করে তুলবার বাসনায়। তার ইচ্ছে ভাই লেখাপড়া শিখে বিরাট বড় কিছু হবে। ভাইটিরও তার প্রতি অগাধ ভালোবাসা, পিতৃতুল্য বড়ভাইয়ের অবদান সে কখনো ভুলতে চায় না। কিন্তু যা হয় বরাবর - সময়ের স্রোতে, পরিস্থিতির আবর্তনে ভাই থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকে সে।
কালা মিয়ার বউ ফজিলাত, তার মতাদর্শ - স্বামীকে সবসময় বশে রাখতে হয়। উদাসীন কালা মিয়ার প্রত্যহই ভঙ্গুরমুখী সংসার সে নিজের ক্ষমতায় সামলে রাখে। ভবিষ্যতের ভাবনা না ভেবে ছোটভাইয়ের জন্য নিজের সমস্তটা উজাড় করে দেওয়ায় কালা মিয়ার উপর সে ক্ষুব্ধ। সারাটাক্ষণ অত্যধিক পরিমাণে উড়ু-উড়ু করতে থাকা মেয়ে রোখসানাকে নিয়ে অপরিসীম দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েও সংসারটাকে ঠিক রাখে সে। রোখসানার পড়ালেখায় মন নেই, কেবল নিজের বিয়ে আর ভবিষ্যত সংসারের চিন্তা। জীবন তার কাছে এমনই সোজা-সাপটা। কালা মিয়া আর ফজিলাতের ছেলে সৈকত, বাপ-মার ইচ্ছা সেও তার চাচার মতো বড় হবে, বড় চাকুরি করবে শহরে। মার ইচ্ছে সে ডাক্তার হবে। জীবন তার জন্য অনেকভাবেই পরিবর্তন হয়, কিন্তু সব পরিবর্তন কি চাওয়া অনুযায়ী হয়? রোখসানার সংসার-স্বপ্নই বা কতোদূর পূরণ হয়?
অন্যদিকে জালাল প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করেছে বড়লোকের দুলালী সাভেরাকে। জালালের চাওয়া ছিল ধনী ঘরের মেয়ে, সাভেরার চাওয়া ছিল টাকা-কামানো বোকা জামাই। দু'জনেরই তো ইচ্ছে পূরণ হলো। মনের মিল কতোটুকু হলো? জগত সংসার প্রতিনিয়ত বয়ে চলে অজানার পথে, সাথে তাদের ভাগ্যকেও বয়ে নিয়ে চলে অনিশ্চিত কিছুর দিকে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া - কিঙ্কর আহসানের 'মখমলি মাফলার' বইটা সংগ্রহে থাকলেও এখন পর্যন্ত পড়া হয় নি। তার লেখার ধরণ খানিকটা অন্যরকম, শুরুর দিকে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না, একটু কেমন যেন লাগছিল। ওভার-অল বলতে গেলে শেষ এক-তৃতীয়াংশ সবচেয়ে ভালো ছিল।
কালা মিয়া চরিত্রটা মনে হাহাকার সৃষ্টি করে গিয়েছে। খুব মায়া হয়েছে তার জন্য, কি অসম্ভব সরলতা! শুরু থেকে আস্তে আস্তে করে ফজিলাত চরিত্রটিও ভালো লেগে গিয়েছিল। প্রথমদিকে সাভেরা কিংবা জালাল দুইজনকেই খুব স্বার্থপর-কঠিন ধরণের মানুষ বলে মনে হতে হতে শেষে এসে তারাও কেমন বদলে গেলো!
একটা কারণে বইটা আমি পড়তে বলবো - সেটা হলো, ইদানীং প্রায়শই দেখা যায় খুব ধুমধাড়াক্কাভাবে কোনো বই শুরু হয়ে শেষদিকে যেতে যেতে সেটার কাহিনী-চরিত্র দু'টোই মিইয়ে যায়। 'বিবিয়ানা' ছিল উলটো। প্রথমদিকে ভালো নাও লাগতে পারে, বা মন নাও বসতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্পটাকে আপন করে নিতে থাকবেন। আপনি ধৈর্য ধরে পুরোটা শেষ করবেন, তারপর ভালো লাগাটা টের পাবেন। একটু বাস্তবতা, একটু করুণ জীবনের ছোঁয়ার মিশেলে সব মিলিয়ে দু'ঘণ্টার অভিজ্ঞতা মন্দ ছিলো না! ❤
বিবিয়ানা কিংকর আহসান বুক মিভিউঃ উপন্যাসের কভারটা সুন্দর। আইডিয়াটা সুন্দর। মনে হচ্ছে কারো ভয়ে চা টা ঢেলেই যাচ্ছে। কিন্তু ওদিকে যে হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে চা সেদিকে খেয়াল নেই। নিথর। পড়ছি আর ভাবছি কে সে? রোকসানা, রোকসানার মা, নাকি সাভেরা। নাহ সাভেরার তো এরকম হবার কথা না? সে নিজে থেকে চা ঢেলে খাবে মাথা খারাপ!! বাস্তব আর উপন্যাসের পাতা একভাবে চলেনা। অল্পক্ষনেই একবার সবকিছু সাভেরার চোখ দিয়ে দেখছি, মাঝে মাঝে কালা মিয়া, ফজিলাত। গ্রামের নিখুত বিবরন। বিভিন্ন চরিত্র নিজের মত করে নিয়ে মনে হয় দুনিয়াতে সবাই ঠিক। ডাকাত ও ঠিক, চেয়ারম্যান ও ঠিক। আমি যা করছি তা হয়তো ঠিকই। প্রথমটা শুরু হয়েছিল সাভেরার উপর একরাশ ঘৃনা নিয়ে। বড়লোকের মেয়ে, দেমাগী, কন্ট্রোল করতে চায়। এখন শেষটা কেমন হল।অইযে বললাম- নিজের মনের কথা কেউ বলে বা বুঝে নেবে নারে। কেউ তোকে বুঝবেনা। এই বোঝা না বোঝার অপুর্ব বানে মখমলি মাফলারে সাপ পেচিয়ে থাকে। আমরা চলে যাই। লেখক কিছু নাড়া দিয়েছেন। যতক্ষন পড়েছি আবেশিত হয়েছি। কিন্তু মাধুকরী, পার্থিব, গর্ভধারিনীতে একেকটি মৃত্যু যেভাবে নাড়া দিয়েছে, যেভাবে চরিত্রের সাথে মিশেছি- এক্ষেত্রে তা হয়নি। আরো বড় উপন্যাস চাই। ওহ হ্যা মলাটের মেয়েটি সম্ভবত সাভেরা। আসছে সামনে লেখক তিন চার বছর ধরে লেখক লিখবেন। আমরা মাসের পর মাস কলকাতা বইয়ের স্টাইলে মুগ্ধ হয়ে থাকবো, লেখকের আকাশে উড়ার সাধ পুরন হবেই।