কয়েকদিন লেখালিখি না করলেই আমার পড়ার #মোমেন্টাম চলে আসে। আমি তখন সাংঘাতিক দ্রুত গতিতে পড়তে পারি। কিছু বই আবার ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে পড়তে হয় অবশ্য। যাই হোক, মাস ছয়েক টানা সময় পেলেই যে আমি বাংলা হিন্দি ইংরেজি না পড়া বইগুলো উদ্ধার করে ফেলতে পারব, এই বিশ্বাস আছে বলেই সম্ভবত বাড়ি বোঝাই হয়ে যাওয়ার পরেও বই কিনে যাচ্ছি। সব বই নিয়ে লেখার কোনও মানে হয় না, চেনা বই নিয়ে অনেকেই লিখেছে। তবে এই বইটা ব্যতিক্রম।
থ্রিলার বলতেই যে গুচ্ছের বইয়ের নাম উঠে আসে এখানে সেখানে, তাতে যে এই বইয়ের নামটা কী করে মিসিং থাকে সেটা ভাবতে গিয়েই পোস্টটা করছি। থ্রিলার - এর আঙ্গিক নিয়ে মনে হয় এখনও বিস্তর সংশয় আছে। সেইজন্যে প্রায় প্রতিটা পাঠকের কাছেই এই বইটা লেটার মার্কস পেয়েছে কিন্তু থ্রিলার হয়ে উঠতে পারেনি।
যাকগে! সোজা কথা হল, সমসাময়িক ছাত্র রাজনীতি নিয়ে এমন দুরন্ত লেখা বাংলায় নেই মনে হয়। 'হলুদ কোকাবুরা'-তে খানিকটা আভাস দেওয়া ছিল, যদিও আনকাট লেখাটা পড়িনি। ( হিন্দিতে অবশ্য আছে। নবীন চৌধুরীর জনতা স্টোর। ভাষাটা মোটামুটি জানা থাকলে পড়ে দেখতে পারেন। অসাধারণ লেখা) কুরবানি অথবা কার্নিভাল একই সঙ্গে অথেনটিক, স্মার্ট, গভীর এবং প্রচন্ড গতিমান একটা উপন্যাস। যথেষ্ট থ্রিল আছে আর সংলাপগুলো জাস্ট বোমাবাজির চেয়ে কম নয়। সিজ্জিতদা পেলে নির্ঘাত সিরিজ করে ফেলত। ( স্ট্রিমিং আইন বদলে গেছে... অতএব সে আশা না করাই ভালো)
প্রায় এক সিটিং-এ শেষ করেছি। সেলাম, শাক্যজিৎ বাবুকে। ফাটায়ে দিসেন। সকলেই আগে বলেছে জানি, আমি না হয় আরেকবার বললাম।
অল যাদবপুর গাইজ অ্যান্ড গার্লস-- আপনারা অন্তত মিস করবেন না।
যে কোন ফিকশন তা সে উপন্যাস বা ছোটগল্প, যাই হোক না কেন যতবার আমরা পড়ি, প্রত্যেকবার পাঠের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ভাবনাচিন্তা আসে, নতুন নতুন দিক যেন উন্মোচিত হয়, সময়ের সাথে সাথে পাঠক হিসেবে নিজের চিন্তাভাবনার কতটা পরিবর্তন ঘটছে, আদৌ ঘটছে কিনা, অল্প হলেও বুঝতে পারা যায়।
'কুরবানি অথবা কার্নিভাল' সেইরকম এক পাঠ, ২০১৮র শেষে, প্রায় পাঁচ বছর আগে পড়েছিলাম। তখন লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য আমার কাছে ছিলেন আনকোরা। আজ...
ছাত্র রাজনীতিকে উপজীব্য করে ১৩৬ পাতার এই উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে। এইট বি, যাদবপুরের ক্যাম্পাস, ঢাকুরিয়া লেক আর দ্বিধাবিভক্ত বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ক্ষমতায় আসতে চাওয়া দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শধর্মী দলগুলি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স-ইঞ্জিনিয়ারিং-আর্টস বিভাগের ছাত্রদের আভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন হল এই উপন্যাসের নিউক্লিয়াস। একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র, রাজেন্দ্র তপাদারের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, তাই নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে দলীয় সংঘাত, সেই ঘটনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার উদ্যোগ আর সেইসব ঘটনার পটভূমিতে একজোড়া সদ্যতরুণ-তরুণী, অনির্বাণ এবং শ্রমণার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওঠা-পড়া নিয়ে ১২টি পর্বে বিস্তৃত প্রায় থ্রিলারধর্মী এক রাজনৈতিক উপন্যাস 'কুরবানি অথবা কার্নিভাল', অথচ লেখক বলেছেন 'গল্পটা প্রেমের হতে পারত'।
শাক্যজিতের এই কাহিনি, জয়দেব বসুর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। কাহিনি এগোলেই বোঝা যায়, জয়দেব বসুর 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ' উপন্যাসটির প্রতি ভালোবাসাই যেন লেখককে কোথাও গিয়ে প্রভাবিত করেছে এই উপন্যাসের জন্য। 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ' উপন্যাসটির সরাসরি উল্লেখ আছেও একটি চরিত্রের মাধ্যমে শাক্যজিতের এই উপন্যাসে। ছাত্র রাজনীতিকে উপজীব্য করে লেখা এই দুটি কাহিনির মধ্যে অবশ্যই 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ'কে আমি এগিয়ে রাখব। কিন্তু 'কুরবানি অথবা কার্নিভাল' উপন্যাসটিও ব্যক্তিগতভাবে বড় পছন্দের। শাক্যজিতের ডিটেইলড ন্যারেশন, প্রতিটি চরিত্রকে নিয়ে যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতির অলিতেগলিতে ঘোরা, আমার মত সেইসব পাঠকের জন্য, যারা যাদবপুরকে চেনেন না সেইভাবে।
লেখকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন বা বিশ্বাসে যে উপন্যাসটি জারিত, তা আলাদা করে না বললেও চলে যদিও। শুরুতেই তিনি ডিসক্লেমার দিয়েছেন, যদি বাস্তবের সঙ্গে কোনওকিছুর মিল পাওয়া যায়, তবে তা ইচ্ছাকৃত। যে কোন রাজনৈতিক উপন্যাস, আসলে উদ্দেশ্যমূলক। কোন বিশেষ নীতিকথা না থাকলেও মূল্যবোধ সব রাজনীতিরই, ছাত্র রাজনীতিরও চালিকা শক্তি।
'কুরবানি অথবা কার্নিভাল'-এ মাখোমাখো রোম্যান্স নেই, কিন্তু ছোট ছোট ভালবাসার মুহূর্তগুলো বেশ সুন্দর। মতাদর্শ আর ব্যক্তিজীবনের দোলাচল, কমরেডশিপ নিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বের আঁচে পুড়ছে চরিত্ররা — লেখকের কলমে ফুটে উঠেছে সবটাই এবং এইখানেই ভীষণভাবে ফিরে আসে জয়দেব বসু এবং তার 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ'-এর প্রাসঙ্গিকতা। সময় বদলায়, দশক বদলায়, বদলায় হয়তো রাজনৈতিক কর্মপন্থা বা ভাবনাচিন্তাও। কিন্তু শেষটা যেন একই থেকে যায়...কুরবানি আর কার্নিভাল, প্রেম ভালোবাসা এবং রাজনীতির সমার্থক হয়ে যেন হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হেঁটে চলে। অন্তিমে ফিরে আসে সেই 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ', উপন্যাসের রেফারেন্স।
|| আমি কাল তোমায় বলতে পারিনি---তোমাকেই ভালোবাসি আমি। ভালোবাসা শব্দটার এক্ষেত্রে কোনো মানে আছে কিনা জানি না, বিশেষত, যেখানে এর আগেই এক বা একাধিক সম্পর্ক পেরিয়ে এসেছি আমরা। তবু, এটা হয়তো বলা যায়, এবারের ঘটনাটা একেবারেই আলাদা। অন্য কিছুর মতো নয়। পৃথিবীতে অন্য কারও মতো নয়। কিংবা, হয়তো, এটাও বলা ভুল হল। ভালোবাসা বারে-বারেই নতুন। ফিরে-ফিরেই নতুন। ঐ যে, আবার রবীন্দ্রনাথ চলে এসেছেন...। তবু, এই আকাশ সাক্ষী, এই বাতাস সাক্ষী, এই সকালের রোদ সাক্ষী, ঘাসের উপর এখনো জমে থাকা অনাঘ্রাতা শিশিরকণারা সাক্ষী, অনেকদিন আগে শুকিয়ে যাওয়া নদীর এই স্মৃতিচিহ্ন সাক্ষী---তোমাকে ভালোবাসি আমি। এই জঙ্গলও সাক্ষী। যে জঙ্গল, পরশু সন্ধ্যায় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে, তাকে মুক্ত না করে, তাকে স্বাধীন না করে, মানুষের স্বাধীনতা বা মুক্তি সম্ভব নয় শত সমাজতন্ত্রেও। তুমি শোনো, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি শোনো... উপরের কথাগুলো একজন ভেবে যায়, কিন্তু, মুখ ফুটে বলতে পারে না। অন্যজন, ব্লাউজের ভিতর থেকে বার করে আনে একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ। সেটা বাড়িয়ে দেয় একজনের দিকে। তারা বসেছিল, শুকিয়ে যাওয়া নদীর খাতে প্রস্তরীভূত বালিতে। একজন কা��জটা হাতে নিয়ে খোলে। অন্যজন তার কাঁধে মুখ গুঁজে থাকে। একজন পড়তে থাকে মনে-মনে :--- জলের কাছে এসেছে অরুন্তুদ, তোমার মুখে অমল জলধারা--- যখন-তখন তোমার কাছে আসি, এ সংবাদে একটু ফিরে দাঁড়াও।
তোমার মুখ যেন চলচ্ছবি, উসকে তোলে বেলা, বুকের মাঝে ঐ কী গাঢ় তল জয় করেছ হেলায়
এখন আমার জীবন-যাপন বোঝো, গ্রহণ করো চিঠি, অধর্মে এই তোমার করতলে সিঁদুর পরা সিঁথি।।
কাগজটা ভাঁজ করে জামার পকেটে রাখে একজন। তারপর অন্যজনের মুখটা তুলে ধরে দু-হাতের পাতায়। আরণ্যক রোদে অন্যজনের মুখ থেকে ধুয়ে যেতে শুরু করে প্রবৃত্তির দেগে দেওয়া যাবতীয় শোক ও সন্তাপ। তার চোখের কোণায় রামধনু রঙে ঝলমল করে ওঠে এক বিন্দু জল। অনেকদিন পর, প্রকৃতি তাদের দেখে খুশি হয়ে ওঠেন। কলকাতা থেকে অনেক দূরে এইভাবেই আবার এক 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' ঘটে যায়। || [উদ্ধৃতাংশ 'লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ' থেকে]
প্রিয় বই নিয়ে আলোচনা করতে আজকাল ইচ্ছে হয় না। সময়ের অভাবও অন্যতম একটি কারণ। গুরুচন্ডালী প্রকাশনার চটি সিরিজের এই বইগুলি অনেক স্মৃতি তাও মনে করিয়ে দেয়। ২০১৮ - ২০১৯ এর কলেজস্ক্যোয়ার বইমেলায়, প্রাককোভিডকালে কোন এক বিকেলে গুরুর স্টল থেকে সংগ্রহ...
মনে করিয়ে দেয়, 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল'-এর ভারে যেন চাপা না পড়ে যায় 'গোরা নকশাল', সেইরকম 'শেষ মৃত পাখি' পড়ে পাঠক যেন খুঁজে পড়েন শাক্যজিতের অন্যান্য লেখাও...
বই - কুরবানি অথবা কার্নিভ্যাল লেখক - শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য প্রকাশক - গুরুচন্ডালী প্রকাশনা মুদ্রিত মূল্য - ১৫০/-
সাধারণত প্রেমের বই আমি একেবারেই পড়ি না, কিনিও না। কিন্তু লেখা যখন প্রিয় লেখকের এবং বিষয়বস্তু দেখে বুঝেছি শুধুই প্রেমের উপন্যাস এটা নয় তখন বাধ্য হই কিনে নিতে। বইমেলাতে এই বই লট লট এসে শেষ হয়ে যাচ্ছে এটাও দেখেছি। বইটা শেষ করে বলছি, একটুও ভুল করিনি বইটা কিনে, আর আমার বিশ্বাস আরো যারা কিনেছেন তারাও ভুল করেননি।
গল্পটা যতটা না প্রেমের তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনীতির। দুই বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী অনি ও শ্রমনার লুকিয়ে রাখা প্রেমের থেকেও অনেক বেশি অংশ জুড়ে এই বইতে আছে যাদবপুর ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতি। একই পন্থায় বিশ্বাসী হয়েও দুটি বিরোধী সংগঠন এবং অন্য আরেকটি পন্থায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক সংগঠনেরও ঘাত প্রতিঘাত সমস্ত কিছু নিয়ে তৈরী এই উপন্যাস। শত্রু বন্ধু কূটনীতি রাজনীতি সবটাই লেখক বিস্তারে লিখেছেন।
যাদবপুর ক্যাম্পাস নিয়ে যাদের একেবারেই কোনো ধারণা নেই তাদের ধারণা করবার জন্যেও এই বই ভালো। শুধুমাত্র ছাত্র রাজনীতির দিক দিয়েই নয় বরং ক্যাম্পাসের বর্ণনার দিক দিয়েও। এছাড়া যারা যাদবপুরের ছাত্র ছাত্রী তাদের তো ভালোই লাগবে পড়তে। আবার প্রেম ভালোবাসাও আছে এই উপন্যাসে ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকুই। কোথাও অতিরিক্ত প্যানপ্যানে ন্যাকামো নেই। কোথাও গিয়ে কোনো চরিত্রকেই কোনোভাবে দোষ দেওয়া যায় না, আবার চরমভাবে মনে কেউ দাগ কেটেও যায় না। তাদের সাধারণত্বই তাদেরকে আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে অনেকটা। লেখনী যথেষ্ট গতিময়। কোনো বাড়তি লেখা নেই, ঠিক যেখানে শেষ হওয়া উচিৎ সেখানেই শেষ হয়েছে। যাতে বোঝা যায় চরিত্রগুলোর একটা সময়েই শুধু সাক্ষী আমরা, তাদের সমগ্র জীবনের নয়।
আমারই মতো যারা আদর্শগত রোম্যান্টিক উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন না তারা অনায়াসে এই বই পড়ে ফেলতে পারেন, কোনোরকম অসুবিধা হবে না। এছাড়া রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বই পড়তে ভালোবাসলে তো এটা অবশ্যই পড়ুন। শেষে বলব, বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার মতে আরো ভালো হতে পারত। বাকি পৃষ্ঠা, ছাপা, বাঁধাই এসব নিয়ে কোনো কমপ্লেন নেই।