রাত যত গভীর হতে থাকে মানুষ তত একা হয়ে যায়। চারপাশে সবকিছু থাকলেও নিজেকে ভীষণ নিঃস্ব মনে হতে থাকে। ঠিক মধ্যরাতে সত্য আর মিথ্যার একধরনের বিভ্রম তৈরি হয়। একাকী মানুষ তখন সেই বিভ্রমের জালে জড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর নিয়তিতে বাঁধা সেই মানুষগুলোর কাছে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে ভ্রম হয়। যারা সেই সত্য আর মিথ্যার বিভ্রমটা ধরে ফেলতে পারে তাদের জীবনের চৌহদ্দি সুনির্দিষ্ট হয়। যারা সেই বিভ্রমটা ধরতে পারে না, তাদেরকে জীবনভর পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হয়।
লেখকের নিজের জীবনকে তিনি বই তে তুলে ধরেছেন। কয়েকটা লাইন দেই, বিষয়বস্তু নিয়ে ধারণা পাবেনঃ
-- মা ঠাকুমাদের এই সমস্যাটা প্রকট। ভালোবাসা কিছুতেই গোপন করতে অয়ারেন না।
-- এম্বুলেন্সের যাত্রাটা খুব কষ্টকর। প্রিয় কোন স্বজনের অসুস্থ শরীরটা শুইয়ে রেখে দীর্ঘ একটা পথ পাড়ি দেয়া যে কত কষ্টের, যারা এম্বুলেন্সে করে কোথাও গিয়েছে তারাই শুধু জানে।
-- মা বলেন, "কখনো কারো মায়ার বাধনে জড়াস নারে বাপ। তাহলে সারাজীবন সেই বাধনে আটকা পরে থাকতে হবে। নিজেকে ছাড়াতে পারবি না।"
-- আকাশটা তো এমনিতেই বড়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আসল ব্যাপার হলো, তুই কোন জায়গা থেকে আকাশটাকে দেখছিস। যত বড় জায়গা থেকে দেখবি আকাশটাকে তত বড় মনে হবে।
-- এখন আমার কেন জানি মনে হয় পিতামাতার কর্তৃত্বের মধ্যে থাকাতেও একধরণের আনন্দ আছে। সবকিছু পিতামাতার উপর ছেড়ে দিয়ে নির্ভার হয়ে যাওয়ার আনন্দ।
-- ব্যক্তিগত শোক পালন করতে গিয়ে বাইরের কাজকর্মে ছাড় দেয়া যাবে না।
-- তুই হবি বটবৃক্ষের মতো। মানুষ তোর কাছে এসে ছায়া চাইবে। তুই তাদেরকে ছায়া দিবি, বসার কায়গা করে দিবি। কোন অকৃতজ্ঞ মানুষ একটুখানি খোচা দিয়ে এই বটগাছকে আহত করলে বা তার একটা পাতা ছিড়ে ফেললে তাতে বটগাছের কিছু যায় আসে না। বুকের ভেতর আত্মবিশ্বাস রাখবি, কিন্তু আত্মম্ভরিতা দেখাবি না। বিনয়ী থাকবি, কিন্তু কখনো কারো কাছে নিজেকে ছোট করবি না।
-- কিছু কিছু জিনিষের কখনো বস্তুগত মূল্য হয় না। স্নেহ, ভালোবাসার ঋণ কখনো পরিশোধ করা যায় না। কখনো কখনো ভালোবাসার ঋণে ঋণী হয়ে থাকাটাও সুখের বিষয়।
-- দেখিস, একদিন সবকিছু পালটে যাবে। অনেকদিন পর তুই যখন পেছনে ফিরে তাকাবি তখন এই বাড়ির জন্য, এই বাড়ির উঠোনের জন্য তোর বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা হবে।
এই লেখকের প্রথম কোন বই পড়লাম। দারুণ লেগেছে। ছোটখাটো দৈনিন্দিন ঘটনাগুলোকে লেখক যেভাবে আবেগভরে স্মরণ করেছেন, ভালো লাগতে বাধ্য। ওনার বিশ্লেষণ ক্ষমতার প্রশংসা করতেই হবে। একটা ব্যপার বুঝতে পারছি না, গত কিছুদিন ধরে নূতন যে রাইটারের বই ই পড়ছি অনেক ভালো লাগছে। তাহলে, লেখনীর মান কমে যাওয়ার অভিযোগটা মিথ্যা? প্রত্যাশা করি সেটাই যেন হয়।
চৌহদ্দি সুনির্দিষ্ট নয় জুয়েল দেবের প্রথম উপন্যাস। এটি উত্তম পুরুষে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের মধ্যে লেখক নিজের অনেকগুলো ঘটনাও পাঠকদের সাথে শেয়ার করেছেন৷ বইটা পড়লে মনে হবে এটা উপন্যাস নয় লেখকের বাস্তব জীবনের গল্প। লেখক যেভাবে সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে উপন্যাসটিকে এক করেছেন সেটা সত্যিই দুর্দান্ত। এছাড়াও লেখক প্রতিটি বিষয়ের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন যা বইটিকে পড়ার মোহ বজায় রাখে।