বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে হিমু শুধু একটি চরিত্র নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক ফেনোমেনন । নব্বইয়ের দশকের শুরুতে 'ময়ূরাক্ষী'র মাধ্যমে যার যাত্রা শুরু, 'চলে যায় বসন্তের দিন' সেই জনপ্রিয় হিমু সিরিজের একাদশতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই উপন্যাসটি লেখকের সৃজনশীলতার সেই পর্যায়কে নির্দেশ করে, যখন তিনি সাধারণ গল্প বলার কৌশল থেকে সরে এসে জীবন ও সমাজের গভীরতম দার্শনিক প্রশ্নগুলিকে হালকা মেজাজে ছুঁয়ে দেখতে শুরু করেন।
বইটির শিরোনাম "চলে যায় বসন্তের দিন" পাঠকের মনে তাৎক্ষণিক কৌতূহল সৃষ্টি করে এবং হিমুর মৌলিক জীবনদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করে। উপন্যাসের শুরুতেই হিমুর স্বগতোক্তি এর মূল সুরটি বেঁধে দেয়:
"চলে যায় বসন্তের দিন! কী অদ্ভুত কথা! বসন্তের দিন কেন চলে যাবে? কোনো কিছুই তো চলে যায় না। এক বসন্ত যায়, আরেক বসন্ত আসে। স্বপ্ন চলে যায়, আবারো ফিরে আসে। আমি হিমু!" ।
এই জিজ্ঞাসা আসলে স্থায়িত্ব ও ক্ষণস্থায়িত্বের দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে হিমুর নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। বসন্তের দিন চলে যাওয়ার মতো জাগতিক বাস্তবতাগুলিকে অস্বীকার করে এক চিরন্তন সত্যের সন্ধান করাই হলো হিমুর 'মহাপুরুষ' হওয়ার সাধনা। এই দর্শন চরিত্রটিকে সাধারণ মানবীয় আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে এক নিরাসক্ত দ্রষ্টার আসনে স্থাপন করে।
উপন্যাসের ভূমিকাংশ, 'প্রসঙ্গ: হিমু'-তে লেখক নিজেই হিমু চরিত্রের সামাজিক প্রভাব স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমার ত্রিশ বছর লেখালেখির ফসল যদি হয় কিছু হিমু তৈরি করা—তাহলে তাই সই। আমি এতেই খুশি।" । এই উক্তিটি চরিত্রটির সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করে। হিমু সেই তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যারা জীবনের গতানুগতিক ছক (চাকরি, বৈষয়িকতা, সামাজিক স্ট্যাটাস) ভেঙে এক সরল, স্বাধীন এবং আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতে চায়।
◻️আখ্যানভাগ ও ন্যারেশন কৌশল:
উপন্যাসটির ন্যারেশন কৌশল প্রথম পুরুষের জবানিতে (হিমু) রচিত, যা হিমু সিরিজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই রীতির প্রধান সুবিধা হলো পাঠক সরাসরি হিমুর ভাবনার গভীরে প্রবেশ করতে পারে, তার খেয়ালী সিদ্ধান্ত এবং অদ্ভুত যুক্তিগুলিকে অন্তর থেকে অনুভব করতে পারে। এটি হিমু চরিত্রের রহস্যময়তাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।
কাহিনির সূত্রপাত ঘটে একটি চিরাচরিত পারিবারিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে। হিমুর মাজেদা খালার একটি চিঠি এই আখ্যানের প্রাথমিক উপাদান। মাজেদা খালা, যিনি মধ্যবিত্ত সমাজের অস্থিরতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি অতি-সচেতনতার প্রতীক, তার একমাত্র 'অতি অতি অতি ভালো ছেলে' জহিরের একটি অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক নিয়ে দিশেহারা। জহির প্রেমে পড়েছে 'ফুলফুলিয়া' নামের এক মেয়ের, যার বাবা একজন যাত্রাদলের হারমোনিয়াম বাদক। মাজেদা খালার চোখে, একজন কেবিনেট সেক্রেটারির ছেলের জন্য এই "ভাড়া খাটা টাইপ" মেয়ের সম্পর্ক তার পরিবারের সামাজিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
হিমুকে এই সম্পর্ক ভাঙার জন্য 'গোয়েন্দা' হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মাজেদা খালার ট্রেডমার্ক অভ্যাস—চিঠির সাথে একটি চকচকে পাঁচশ টাকার নোট স্ট্রেপল করে দেওয়া—লেখকের কৌতুক ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের এক সূক্ষ্ম উদাহরণ। এই টাকা হলো জাগতিক সমস্যা সমাধানের উপকরণ, যা হিমুর আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনের বিপরীত।
হিমু, অবশ্য, তার নিজস্ব ভঙ্গিতে এই সমস্যাটির মুখোমুখি হয়। সে কোনো প্রচলিত সমাধান বা গোয়েন্দাগিরি করে না, বরং পরিস্থিতিকে তার নিজস্ব 'মহাপুরুষ' সুলভ ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ করে। তার এই নিরাসক্ত দৃষ্টিভঙ্গি কাহিনিতে এক ধরনের দার্শনিক দূরত্ব সৃষ্টি করে, যেখানে পাঠকের মনোযোগ সমস্যা থেকে সরে এসে হিমুর নিজস্ব জীবনবোধ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতি তার প্রতিক্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ হয়। লেখকের এই কৌশল উপন্যাসের প্লটকে গতিশীল না করেও একটি গভীর সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা দান করে।
◻️চরিত্রায়ণ ও প্রতীকী বিশ্লেষণ:
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চরিত্রগুলিকে প্রায়শই সামাজিক ও দার্শনিক প্রতীকে পরিণত করেন। 'চলে যায় বসন্তের দিন'-এর চরিত্রগুলিও এর ব্যতিক্রম নয়।
হিমু:
হিমু হলো সমাজের আরোপিত কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহের প্রতীক। হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা এবং বেকারত্ব—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য তার জাগতিক বন্ধনমুক্তির প্রতীক। তার হলুদ পাঞ্জাবি সন্ন্যাসবাদের প্রতি তার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়, আর খালি পা পৃথিবীর সাথে তার সরাসরি, কৃত্রিমতাহীন সম্পর্কের দ্যোতক। এই উপন্যাসে তার প্রধান কাজ হলো সমস্যা সমাধানে হস্তক্ষেপ না করে, বরং পরিস্থিতিকে তার নিজের নিয়মে চলতে দেওয়া। হিমু তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাঠককে শেখায় যে জীবনের জটিলতাগুলিকে সরল যৌক্তিক সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা না করে, বরং তার রহস্য নিয়ে গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।
মাজেদা খালা:
মাজেদা খালা চরিত্রটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজের সেই অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের জীবন সামাজিক প্রতিপত্তি, লোকলজ্জা এবং আর্থিক নিরাপত্তা দ্বারা চালিত। তার স্বামীর হার্ট অ্যাটাক এবং দ্বিতীয়বার শকের ভয়, তার উদ্বেগ এবং তার চিঠিতে টাকার ব্যবহার—সবই তার বস্তুবাদী মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন। তিনি সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, এমনকি হিমুকে টাকা দিয়ে সম্পর্ক ভাঙার কাজে লাগাতেও দ্বিধা করেন না। তিনি সমাজের সেই শ্রেণির প্রতিনিধি, যারা শ্রেণিসংঘাতকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়।
জহির ও ফুলফুলিয়া:
জহির, যিনি তার মায়ের কাছে 'অতি অতি অতি ভালো ছেলে', সে আসলে প্রচলিত সামাজিক সাফল্যের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছে। একটি কেবিনেট সেক্রেটারির ছেলের একটি কফি শপ খোলার স্বপ্ন দেখা, যার নাম 'শুধুই কফিতা'। এই নামকরণ তার ভেতরের কাব্যিকতা এবং সহজ জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ফুলফুলিয়া এবং তার হারমোনিয়াম বাদক বাবা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের জীবনযাত্রাকে মাজেদা খালার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী শ্রেণি হেয় করে দেখে। জহির ও ফুলফুলিয়ার সম্পর্ক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে এক সরল মানবীয় প্রেমের বিদ্রোহ।
◻️শৈল্পিক নিরীক্ষা ও দার্শনিক জিজ্ঞাসা
এই উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক নিরীক্ষা মূলত তাঁর ভাষা ও দার্শনিকতার মধ্যে নিহিত। তাঁর ভাষা অত্যন্ত সাবলীল ও স্পষ্ট, যা জটিল বিষয়বস্তুকেও সাধারণ পাঠকের কাছে সহজলভ্য করে তোলে।
ক. ডার্ক হিউমার ও সামাজিক ব্যঙ্গ: লেখকের ডার্ক হিউমার এই উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক উপাদান। মাজেদা খালার তীব্র উদ্বেগ এবং হিমুর নিরাসক্ত পর্যবেক্ষণ ও তীক্ষ্ণ মন্তব্যগুলির মধ্যে যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তা এক প্রকার হাস্যরসের জন্ম দেয়। এই কৌতুক আসলে সমাজ ও তার আরোপিত মূল্যবোধের প্রতি লেখকের সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। তিনি দেখান যে মানুষ কীভাবে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের জন্য হাস্যকরভাবে নিজেদেরকে জটিলতার জালে জড়িয়ে ফেলে।
খ. নিয়তির ভূমিকা ও অলৌকিকতা: হিমু সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অলৌকিকতা এবং নিয়তির ভূমিকা। হিমুর মাঝে মাঝে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা, যদিও তা প্রায়শই পরীক্ষামূলক বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবুও তা জীবনের উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। হিমু বিশ্বাস করে যে ঘটনাগুলি এক বৃহত্তর মহাজাগতিক ছক মেনে চলে, যেখানে মানুষের ইচ্ছাশক্তি খুব কমই প্রভাব ফেলতে পারে। উপন্যাসের সমাপ্তিতে এই নিয়তিবাদ চূড়ান্ত রূপ নেয়।
◻️সমাপ্তি ও মূল্যায়ন
'চলে যায় বসন্তের দিন' উপন্যাসের সমাপ্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা এর শৈল্পিক মানকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। কাহিনির শেষে হিমু একটি অপ্রত্যাশিত হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ে এবং জেলে যায়। জেলের ওসি সাহেবের সাথে তার কথোপকথনটি হিমু-দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ:
হিমু যখন ওসি সাহেবের কাছে তার মুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করে, তখন তা একাধারে রহস্যময় এবং দার্শনিক:
“ওসি সাহেব আপনি এত আপসেট হবেন না।জগৎ খুব রহস্যময় । হয়তো এমন কিছু ঘটবে যে আমি হাসিমুখে জেল থেকে বের হয়ে আসব। জহিরের বিয়েতে আমার সাক্ষী হওয়ার কথা। দেখা যাবে যথাসময়ে আমি কাজী অফিসে উপস্থিত হয়েছি।”
ওসি সাহেবের অবিশ্বাস সত্ত্বেও হিমু দুটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ দেখায়, যার একটি দৈব এবং অন্যটি বাস্তবতার নির্মম সত্য:
“ আমি বললাম,যে আসলেই খুনটা করেছে হয়তো দেখা যাবে সে অপরাধ স্বীকার করে পুলিশের হাতে ধরা দেবে, কিংবা পুলিশ বলবে উপরের নির্দেশে আমরা নিরপরাধ একটা লোককে ধরে এনে মামলা সাজিয়েছি।”
এই সমাপ্তিটি হুমায়ূন আহমেদের ন্যারেশন কৌশলের দক্ষতা প্রমাণ করে। তিনি এক দিকে দৈবের উপর আস্থা রাখেন, আবার অন্য দিকে সমাজের বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতি ও ত্রুটি নিয়ে কঠোর ব্যঙ্গ করেন। সমাপ্তির এই দ্বান্দ্বিকতা পাঠককে দীর্ঘ সময় ধরে উপন্যাসের গভীরতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এবং এটিই হিমু সিরিজের প্রধান আকর্ষণ।
◻️উপসংহার
"চলে যায় বসন্তের দিন" একটি নিছক প্রেমের বা পারিবারিক সমস্যার আখ্যান নয়। এটি হুমায়ূন আহমেদের দার্শনিক দৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মূল্যবোধ, শ্রেণীগত সংঘাত এবং জীবনের মৌলিক রহস্য অনুসন্ধানের একটি প্রচেষ্টা। হিমু চরিত্রের মাধ্যমে লেখক পাঠককে এই শিক্ষা দেন যে, জীবনের বসন্তের দিন চলে গেলেও, তার ফিরে আসার চক্রটি চিরন্তন। জাগতিক জটিলতাগুলিকে নিরাসক্তভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং জীবনের রহস্যময়তাটুকু মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে এক গভীর প্রশান্তি।