দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ সফরের সরস বিবরণ এ বই। যুদ্ধে গুলি খাওয়া শ্বেতাঙ্গ হেন্ডরিক, তার কৃষ্ণাঙ্গ স্ত্রী ও পুতুলপুত্র আমুকেলানির সংসার, ফুটপাতে গৃহহীন মানুষের ক্লেশ, এইডসে মৃত্যুর কারণে বাচ্চাকাচ্চাসহ গৃহচ্যুত মানুষের দুর্দশার বিবরণ পাঠককে আপ্লুত করবে। বিলাতি কেতার টি-রুমে তরবারি হাতে দাঁড়ানো শিখ সরদারজির নাটকীয় ঘটনা, গান্ধীজির নেতৃত্বে হামিদিয়া মসজিদে সমবেত হিন্দুস্থানিদের বর্ণবাদী পাস পোড়ানোর ইতিকথা, শ্বেতাঙ্গ তরুণী ইহোনিকার গভীর প্রেমোপাখ্যান, জন্মমুহূর্তে মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কিশোরীর ফিরে আসা ও তার শেষ পরিণতির আন্তরিক বিবরণ এই বইয়ের পাঠককে মঈনুস সুলতানের ভ্রমণগল্পের জগতে আরও একবার নিমজ্জিত করবে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
দক্ষিণ আফ্রিকার ততদিনে প্রায় সাড়ে তিন শ বছরের শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা দেশটির ভূমিপুত্র কালোদের হাতে। বাইরে থেকে শান্তির সুবাতাস অনুভূত হলেও দেশের ভেতরে তখনো হিংসা ও হানাহানির মনোভাব বিদায় নেয়নি। তাই সাদাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া কালোরা 'শেতাঙ্গ নির্মিত' সবকিছুকেই সন্দেহ ও ঘৃণার চোখে দেখে ; মহাত্মা ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে একখানা ট্রুথ আ্যন্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন হয়েছে। অপরাধ স্বীকার ও মাফ করে দেওয়ার শতসহস্র ঘটনার প্রবাহ বয়ে গিয়েছে। কিন্তু শান্তি আসেনি। মহান নেতা ম্যান্ডেলা স্ব-ইচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করেছেন। এমনই এক সময় দক্ষিণ আফ্রিকার সর্ববৃহৎ, মশহুর ও আমির শহর জোবার্গে পৌঁছেছেন মঈনুস সুলতান। দেখেছেন, সাক্ষী হয়েছেন এবং শিকার হয়েছেন জোবার্গের।
মঈনুস সুলতানকে নিয়ে আলোচনা কম হয়। অথচ এই ভদ্রলোকের বাংলায় দখল আশাতীত রকমের কাবিলে তারিফ। যদিও সবার কাছে তার গদ্যশৈলী পছন্দ হবে না। যেমন আমার হয়নি। বেশ একটা কৃত্রিম ভাব আছে।
জোহানেসবার্গের ঐতিহাসিক স্থান সফর করেননি মঈনুস সুলতান। তিনি অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন দুনিয়ার সবচেয়ে বিচিত্র প্রাণী আদম সন্তানকে।
দারিদ্র্য, হিংসা, অপরাধপ্রবণ জোবার্গ, হকারদের হাহাকার আর এইডসের ভয়ংকর প্রকোপ - দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে এসে নানা কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছেন মঈনুস সুলতান। সেসব কথা বর্ণনা করেছেন নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গিতে।
১৭৮ পাতার বইটির প্রকাশক প্রথমা। ভ্রমণকাহিনি পড়তে চাইলেই বইটি আপনার ভালো লাগবে না। বরং মঈনুস সুলতানের গদ্যরীতি আপনাকে কতটা টানে তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বইটি ভালো লাগা কিংবা না-লাগা।
জোহানেসবার্গ দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড়, ধনী এবং সহিংসতাপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ শহর। যেখানে গিয়ে মঈনুস সুলতান ছুরিকাঘাতে আহত হওয়া থেকে শুরু করে বহুভাবে বেজায় নাজেহাল হয়েছেন। তামাম দুনিয়া চষে বেড়ানো সুলতান সাহেবের যে সমস্ত লেখাজোখা এখন অবধি পড়েছি, তার কোনোটা থেকেই তাঁর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার ব্যাপারে জানতে পারিনি। মঈনুস সুলতানের পাঠকমাত্রই অবগত যে তিনি তথাকথিত ভ্রমণকাহিনী লেখেন না। তাঁর ভ্রমণগদ্যে মানুষই প্রধান। এ বইয়েও সেটার ব্যত্যয় হয়নি। যুদ্ধে গুলি খেয়ে প্রজনন ক্ষমতা হারানো হেন্ডরিক তার স্ত্রীকে এনে দেয় এক বেবি-ডল, সত্যিকারের সন্তানের মতো দেখভাল করে তারা এ পুতুলপুত্রকে। শারীরিকভাবে চেয়ে ব্যর্থ হওয়া এক প্রভাবশালীর ষড়যন্ত্রে গ্রেফতার হয় এক সন্তানের জননী নানদিপা, তার জন্য লেখকের দুশ্চিন্তা পাঠকের মনেও ভর করবে, কেননা, জোবার্গে হালফিল পুলিশ হেফাজতে নারীদের ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে অনেক। ইহোনিকা নামের এক শেতাঙ্গ তরুণী পালিয়ে বেড়ায় তার ফিয়াসেঁর খুনি জুলু সম্প্রদায়ের চার তরুণ থেকে, বাধ্য হয়ে সে চায় দেশ ছাড়তে, শেষমেশ পারে কি না তা জানতে উদগ্রীব হবেন পাঠক। মরণব্যাধি এইডসে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষদেরকেও পাওয়া যায় এ বইয়ে। এ রকম আরও অনেক মানুষের অনেক রকম ঘটনা আছে, যা পড়ে মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। তা বলে এমন নয় যে পুরো বইটি করুণরসে ভরপুর। মঈনুস সুলতানের স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ ও তীব্র রসবোধ ভারসাম্য বজায় রেখেছে দারুণভাবে। এ ছাড়া লেখকের বিশেষত্ব—লাগসই উপমা আর পাঁচমিশালি ভাষার দুর্দান্ত ব্যবহার তো ছিলই।
তথ্যের ভারী বোঝা পাঠকদের ওপর না চাপিয়ে প্রসঙ্গক্রমে মঈনুস সুলতান বর্ণনা করেন জোবার্গের গোড়াপত্তন, নেলসন ম্যান্ডেলা আর মহাত্মা গান্ধীর কথা, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, বর্ণবিভাজন প্রথাসহ আরও অনেক কিছু। এসব থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে শেতাঙ্গ শাসনের সময় কৃষ্ণাঙ্গদের দুর্ভোগ আর কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত সময়ে শেতাঙ্গদের প্রতি অবিচারের চিত্র।
সাধারণ মানুষের কথা বাদ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহল থেকেও জোরেশোরে প্রচার করা হয় যে বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ভুল এটা। ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার শেতাঙ্গ সরকার তাদের নিজেদের ভাষায় সকল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার নির্দেশ দিলে ছাত্ররা প্রতিবাদী মিছিল বের করে, মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায় এবং কুকুর লেলিয়ে দেয়, অন দ্য স্পট নিহত হয় ১৭৬ জন ছাত্র। ভাষার জন্য রক্তদানের কথা যখন আসলো তখন আরেকটা তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। মাতৃভাষার জন্য বাঙালিদের আত্মদান বলতে শুধু বাংলাদেশী বাঙালিদের বোঝানো হয়। অহমিয়াকে আসামের একমাত্র সরকার স্বীকৃত ভাষার ঘোষণার প্রতিবাদে সিলেটি-অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার ১১ জন বাঙালি যে প্রাণ দিয়েছিলেন, আমার ধারণা তা অনেকেরই অজানা। এই যে আবেগের আতিশয্যে অন্য অনেক সত্যকে পাশ কাটিয়ে আত্মপ্রসাদে ভোগার অভ্যাস আমাদের, এটা খুবই খারাপ।
মঈনুস সুলতানের লেখা কি কারনে জানিনা, আমাকে খুব আকৃষ্ট করে সবসময়৷ অথচ সবার ভাললাগার মত লিখেন না তিনি, মানে ভাষা যেটা ব্যবহার করেন, তা সহজ নয়, যুক্তাক্ষর ও অচেনা বাংলা শব্দে মেশা একটা ভাষা ব্যবহার করেন, যা অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য লাগবে৷ তারওপর তার ভ্রমনকাহিনি ঠিক সচরাচর লেখকদের ভ্রমনকাহিনী গুলোর মতন নয়। তার লেখায় কোনো জায়গা থেকে মানুষই মুখ্যতা পায় বেশি৷ মানুষকে খুটিয়ে খুটিয়ে তুলে ধরেন তিনি আমাদের সামনে৷ তখন আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সেই মানুষটা, তার জীবন, সংগ্রাম -- সব৷ চিনিনা জানিনা মানুষটাও আপন লাগে আমার কাছে৷ এই স্বভাবটা আমার মধ্যে আছে। জায়গাটা উপভোগ করি, কিন্তু মনে রাখি মানুষগুলোকে৷
লেখকের সাথে পরিচয় প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকিতে লেখা পড়ে৷ তারপর প্রতিবছর তার বই প্রথমা থেকে কেনাটা আমার অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে, তা আমি বইমেলায় থাকি বা না থাকি৷
কাহিনিটা শুরু বেশ আগের , মানে উক্ত জার্নাল টা ২০০৫ এর দিকের, তখনো নেলসন ম্যান্ডেলা বেচে আছেন৷ লেখক খুজে বেড়াচ্ছেন স্থায়ীভাবে থাকার কোনো জায়গা, খোদ জর্জ বুশের দেশ থেকে এসে। এসে তিনি জোহানেসবার্গে এসে প্রকটভাবে দেখতে পারেন, ব্ল্যাক নিগ্রহ নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ রা সংখ্যালঘু দের ওপর অত্যাচার করছে। তিনি মনের ভেতর যুদ্ধ করেন এই বলে, যে ব্ল্যাকরাই যে আসামি তা তিনি মানেন না৷ সেটা সামনাসামনি দেখতে চান তিনি। তবু নিরাশ হতে হয় তাকে৷ আস্তে আস্তে পরিচিত হন অনেকের সাথেই৷ বইয়ের শেষের দিকে তিনি ছিনতাই এর শিকার হন ছোটখাটো।
বইটার সারসংক্ষেপ বলে লাভ নেই৷ এ বই উপভোগের, অনুভব করার৷
অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এতে তুলনামূলক কম স্বাদ পেয়েছি কেন জানি৷ কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু কি যেন একটা অভাব লাগছিল৷