বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
অসাধারণ লেখনী। যদিও আন্দাজ করা যায় কে দোষী, তবু টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। শেষ অবধি আগ্রহ ধরে রাখতে লেখক সক্ষম। প্রথম বইটাও খুবই ভালো লেগেছিল, এটা আরও ভালো লাগলো। বাংলায় এরকম ভালো Thriller আরও পাওয়ার আশায় রইলাম।
কৃত্তিবাস রহস্য বিনোদ ঘোষাল মুদ্রিত মূল্য-199টাকা প্রকাশক-বিভা পাবলিকেশন আসামের গভীর জঙ্গলের এক মন্দির। সেখানকার গুরুদেব বাবা রামচরণ। গৌহাটির রাস্তা থেকে ফুটপাথ বাসীর হঠাৎ উধাও হওয়া। কোটিপতি বিজনেস টাইকুন ক্রেট। একটি সুদৃশ চামড়ার লেডিস ব্যাগ। এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক হয় কি? আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব। আসলে এসবই এক ঘৃণ্যএ ইন্টার ন্যাশনাল র্যাএকেটের চূড়া। মানুষের বিকৃত লালসার আধুনিক প্রতিরূপ। এই জঘন্য আন্তর্জাতিক ব্যবসাকে ঘিরেই বিনোদ ঘোষালের এই রহস্য উপন্যাস। দিয়া অরণ্যের দ্বিতীয় অভিযান। বাজারে তো এখন থ্রিলার সাহিত্যের ঢেউ। দিয়া অরণ্য প্রচলিত গোয়েন্দা চরিত্রের থেকে কোথায় আলাদা? এই উপন্যাসে দুটো গোয়েন্দা চরিত্র আছে। দিয়া অরণ্য। অরণ্য দিয়াও বলতে পারেন। ব্যাপরটা একটু খোলসা করে বলি। যেকোনো রহস্য উপন্যাসেই একজন গোয়েন্দা থাকেন। আরেকজন থাকেন তার সহকারী। উপন্যাসে সহকারীর আলাদা অস্তিত্ব থাকলেও, গোয়েন্দাকে সে নানা ভাবে সাহায্যর করলেও, কেস সলভের ব্যাপারে তার বুদ্ধি যেন গোয়েন্দার থেকে কয়েক ছটাক কম। গোয়েন্দা সাহিত্যে এমনটা হওয়াই দস্তুর। এ উপন্যাসে এই প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছেন বিনোদ ঘোষাল। দিয়া অরণ্য পরস্পরের পরিপূরক। গোয়েন্দা সহকারীর তকমা ছেড়ে তারা প্রেমিক প্রেমিকা। দিয়া অরণ্যের খুনসুটি, পরস্পরের প্রতি কেয়ারিং মনোভাব এই দুই চরিত্রকে গোয়েন্দা নামক সুপার হিউম্যান থেকে রক্ত মাংসের মানুষ করে তুলেছে। খবরের কাগজের এসাইনমেন্ট নিয়ে আসাম যায় এই কপোত কপোতি সেখানেই জড়িয়ে পড়ে রহস্যের জালে। এই উপন্যাসের এক স্তম্ভ যদি হয় অরণ্য দিয়া, অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ক্রেট। ওমন ঠান্ডা মাথার নরপিশাচ! বাপরে। অথচ ক্রেট যখন বলে-"পৃথিবীর প্রতিটি জিনিয়াসই কোনো না কোনো ব্যাপারে ভয়ংকর নির্মম। নৃসংশতা আসলে প্রতিভারই অঙ্গ" একথা পাঠককে ভাবায়। ক্রেটকে শুধু নরপিশাচ প্রতিপন্ন করেই ক্ষান্ত হননি লেখক, ক্রেটের এমন হওয়ার পিছনে খুঁজেছেন তার বিপন্ন শৈশব। এখানেই এ উপন্যাসের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি। তবে বেশ কিছু জায়গা মনে হয়েছে একটু অন্যরকম হলেও পারত। কিছু জায়গায় সুতোর টানটান ভাবটা যেন কম। একটু মাঞ্জার দরকার ছিল। সে প্রসঙ্গেই আসি । শান্তিলাল ধরা পড়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে অরণ্য দিয়া। ওরা হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল, শান্তিলাল যে ফোনকল গুলো পায়, সেগুলোর মধ্যে কোনো বিশেষ শব্দ শুনেছে কিনা। প্রশ্ন খুবই সঙ্গত। কিন্তু দিয়া অরণ্য প্রফেশনাল ডিটেকটিভ নয়। এমন প্রশ্ন প্রথমেই তাদের মনে আসা একটু অস্বভাবিক। যদিও আমি দিয়া অরণ্যের প্রথম রহস্য উপন্যাস পড়িনি। এই তদন্ত পদ্ধতি যদি পূর্ব অভিজ্ঞতা লব্ধ হয় তাহলে আলাদা ব্যাপার। চুনীলাল তার কাকার অনুপস্থিতিতে নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে বিলাপ করে। সে বিলাপ শুনে ফেলে অরণ্য। যে মন্দিরে ছড়ানো রয়েছে বাবজির চর, সেখানে চুনীলালের এমন বিলাপ কিন্তু সঙ্গত নয়। সূর্যমন্দির, কৃত্তিবাসের মধ্যে অনেক পৌরানিক সম্পর্ক খুঁজেছেন লেখক। সেগুলো যথেষ্ট মনোগ্রাহী হলেও, মূল রহস্যের সাথে তার সম্পর্ক সামান্য। লেডিস ব্যাগের কোন চামড়া দিয়ে তৈরী, একথা যখন জানতে পারল পুলিশ অফিসার, সে জানাল অরণ্য দিয়াকে। পাঠককে কিন্তু এ ব্যাপারে অন্ধকারে রাখলেন লেখক। চামড়ার উপাদান রহস্য ভেদ করলেন একদম উপন্যাসের শেষে। বার বার চামড়ার প্রসঙ্গ ওঠা সত্ত্বেও প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপরটা কিছুটা আরোপিত ঠেকে। চুনীলাল যথেষ্ট ভীতু প্ৰকৃতির। অথচ যখন সে মাটির তলার কারখানা দেখাতে নিয়ে চলে অরণ্য দিয়াকে সেই বিভৎসতার মধ্যেও চুনীলালের হাবভাব, কথাবার্তা বড় সাদামাটা ঠেকে। উপন্যাসের শেষে অরণ্য দিয়াকে বন্দী করে রাখা, এবং শেষ অবধি পুলিশের জালে অপরাধীর ধরা পড়ার ব্যাপারটা একটু যেন তাড়াতাড়ি হল। ওটা একটু রুদ্ধশ্বাস হলেও পারত। মানুষের ঘৃণ্য রুচি মানসিকতার যে সুদীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেছেন লেখক, তা সমস্তটাই এক স্থানে না বলে সমস্ত উপন্যাসের মধ্যে একটু করে ছড়িয়ে দিলে পারতেন। কয়েকটা স্থানে মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ল। এক জায়গায় যেমন'ফ্লাইট' হয়ে গেছে ফাইট। প্রচ্ছদ কিন্তু আরও সুন্দর হতে পারত। ভিতরের অলঙ্করণ লেগেছে বেশ। এ উপন্যাসের বড় পাওনা অরণ্য দিয়া। বেশ কয়েক দশক ধরে বাঙালীর নতুন কোনো প্রমিনেন্ট গোয়েন্দা চরিত্র নেই। এমন চরিত্র যাকে সৃষ্টিকর্তার থেকেও বেশি চেনে পাঠক। যদিও পথ চলা অনেক বাকি এখনও, তবুও দিয়া অরণ্যের সেই ক্ষমতা আছে। জয়তু।
থ্রিলার/গোয়েন্দা গল্পের পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখা খুব চাপের ব্যাপার। একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলেই স্পয়লারের সম্ভাবনা।
দুই/চার কোথায় লিখবো। গোয়েন্দা গল্প হিসেবে বেশ ভালো, বিনোদ দার লেখার হাত নিয়ে কিছু বলার নেই। তবে আমার যেটা বেশি ভালো লাগলো- অরণ্যদেবের চরিত্রের খুব ধীর গতিতে বদলানো টা। গতবারের "গভীর জালের রহস্যে" অরন্যদেব খুব বেশি দিয়া নির্ভর ছিল। একে ওখানে নিজের দাদা তাই আবেগ প্রচুর, আর আবেগের কাছে বুদ্ধি প্রায় সময়ই পরাজিত হয়, ঐ বইতেও তাই হয়েছিলো। অরণ্যদেবের চরিত্র টাই সেটা ছিল, দাদার খোঁজে আবেগ প্রিয় বাঙালি যুবকের।
কিন্তু কৃত্তিবাস রহস্য তে অরণ্যদেব দিয়ার ছায়া থেকে বেড়িয়ে এসেছে, পিয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো আস্তে আস্তে। এই বিষয় টা যত পড়বেন ততো বেশি বুঝতে পারবেন। লেখক কিন্তু আবেগ সর্বস্ব যুবক কে, কখনই তার স্বভাব থেকে বের করেন নি। যেটা হলে চোখে লাগতো। খুব সমান্তরাল ভাবে সে এগিয়েছে। বুদ্ধি আর আবেগ সাথে নিয়ে।
খুব সুন্দর গতি নিয়ে এগিয়েছে রহস্য। তবে বিষয় টা খুব ইউনিক, গল্পের শেষে গিয়ে বিষয় টা বেশ একটা ঝটকা লাগায়। এর বেশি বলবোনা 😊। যদিও অনেক থ্রিলার পড়ার কারণে গল্পের মাঝামাঝি ধারণা করে ফেলেছিলাম বিষয় টা কি হতে পারে।
এই গল্পের ওই বিদঘুটে প্রচ্ছদের জন্য গুডরিডসে .5 তারা কাটতাম, যেহেতু 1তারার কম কিছু হয় না বলে এটাকে 3/5 দেয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু গল্পটার প্রতি ভালো লাগা থেকে, প্রচ্ছদের জন্য এতটা নির্মম হতে পারলাম না, তাই 4/5।
তবে পরবর্তী কালে যদি এই ধরণের প্রচ্ছদ দেখি 1 তারা ��ম দেব, বলে রাখলাম, সে কন্টেন্ট যতই ভালো হোক না কেন।
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পাঠ প্রতিক্রিয়া। বিনোদ দাকে ধণ্যবাদ আবার দিয়া অরন্যদেবকে নিয়ে আসার জন্য, অপেক্ষায় থাকলাম সিরিজের ৩নং বইয়ের জন্য।
বি:দ্র:- প্রি অর্ডার না করা সত্বেও কোনো অজ্ঞাত কারণে বইটি বিনোদ দার সই সহ পেলাম 😍 (অনলাইনে কিনেছিলাম)।
সম্প্রতি কৃত্তিবাস রহস্য পড়া শেষ করলাম। কয়েকটি টুকরো টুকরো ঘটনার সমাবেশ রয়েছে সমস্ত গল্পটিতে। বড়দিনের আগে অরণ্য আর দিয়া গুয়াহাটি এসেছে সেখানকার বড়দিনের উৎসব কেমনভাবে পালন করা হয় সেই ব্যাপারে খবরের কাগজে একটা স্টোরি করার জন্য। এছাড়া তাদের আরও একটা উদ্দেশ্য বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার ক্রেটের একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া। এদিকে ক্রেট কাউকে সাক্ষাৎকার দিতে চান না... এরপরে কি হল? অরণ্য আর দিয়া কি ক্রেটের সাক্ষাৎকার নিতে পারলো? নাকি তারা জড়িয়ে পড়লো অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে? একটি লেডিস ব্যাগকে নিয়ে গুয়াহাটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়? কিন্তু কেন? একটা সামান্য ব্যাগকে নিয়ে এতটা চিন্তা করার উদ্দেশ্যই বা কি? অন্যদিকে গুয়াহাটিতে রাতের অন্ধকারে হটাৎ করে কিছু মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা উধাও হচ্ছে কেন? রাতের অন্ধকারে কোথায় চলে যাচ্ছে তারা? পবিতরার গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে এক ধর্মীয় স্থান। কিন্তু সেখানে কৃত্তিবাস এলো কোথা থেকে? চারটি ঘটনা প্রত্যেকটি ঘটে চলেছে আলাদা আলাদাভাবে। কিন্তু ঘটনাগুলির মধ্যে যোগসূত্র কোথায় সেটা এই উপন্যাসটি পড়লেই জানা যাবে। কয়েকদিন আগে গভীর জালের রহস্য উপন্যাসটিতে পড়েছিলাম অরণ্য আর দিয়ার প্রথম অভিযান যেখানে ডার্ক ওয়েব সংক্রান্ত একটি খারাপ ঘটনার তারা সমাধান করেছিল। অরণ্য আর দিয়ার দ্বিতীয় অভিযান কৃত্তিবাস রহস্য। দ্বিতীয় অভিযানে তারা অনেক বেশি সাহসী আর অনেক বেশি পরিণত। সবথেকে বড় কথা উপন্যাসটি লেখার জন্য শ্রদ্ধেয় লেখককে যে প্রচুর পরিমাণ পড়াশোনা এবং গবেষণা করতে হয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে স্বীকার করা যায়। উপন্যাসটি পড়তে ভীষণ ভাললেগেছে। পড়া শেষের পরেও একটা অদ্ভুত মাদকতার রেশ পড়ে থাকে মনের মধ্যে। বিধিমত সতর্কীকরণ : দুর্বল মনের মানুষ এবং বাচ্চারা সাবধানে পড়বেন।
একটু বোঝা গিয়েছিল শুরুতেই, যারা রহস্য ঘরানার বই পড়ে তারা বুঝেই যাবে, কিন্তু তথ্য ছিল, যেটা দারুন। মানুষ কত ভয়ংকর অদ্ভুত হতে পারে। লেখার ধরন দারুন। লেখকের জন্যে শুভ কামনা রইল।
বিনোদ ঘোষালের কৃত্তিবাস রহস্য পড়তে গিয়ে প্রথমেই মনে হল — এটা যেন বাংলা সাহিত্যের ভেতর থেকে উঠে আসা এক ছায়াচ্ছন্ন অভিযান, যার মধ্যে আছে আগাথা ক্রিস্টির ধারাবাহিক তদন্তপ্রক্রিয়ার টান, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেমস রোলিন্স বা ড্যান ব্রাউনের মতো অ্যাকশন-থ্রিলারের আন্তর্জাতিক আমেজ।
দিয়া ও অরন্যর দ্বিতীয় অভিযান গভীর জালের রহস্য–এর তুলনায় এই বইয়ের narrative structure অনেক বেশি পরিণত ও ঘনবদ্ধ— প্রথম বইয়ের অভিজ্ঞতা এখানে এক্কেবারে সঠিক ছন্দে মিশেছে।
কাহিনির প্রেক্ষাপট গুয়াহাটি ও পবিতরার ঘন জঙ্গল, যেখানে ফ্যাশন ডিজাইনার ক্রেটের রহস্যময় উপস্থিতি, নিখোঁজ ফুটপাথবাসী, এবং এক অদ্ভুত চামড়ার ব্যাগের সূত্র একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। লেখক সুচারুভাবে ছোট ছোট clue ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা পাঠককে শেষ পাতা পর্যন্ত আটকে রাখে।
এখানে শার্লক হোমস-ধারার deductive method নেই, বরং আধুনিক তদন্তপদ্ধতি, সাংবাদিকতার তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী মন, আর মানব-মনস্তত্ত্বের অন্ধকার দিক মিলেমিশে তৈরি করেছে প্লট। সেই দিক থেকে, এটা কিছুটা প্যাট্রিসিয়া হাইস্মিথের Ripley সিরিজের মনস্তাত্ত্বিক অ্যাডভেঞ্চারের স্মৃতি বহন করে, তবে গতি অনেক বেশি, প্রায় রবার্ট লুডলামের ছন্দে।
এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল লেখকের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি। সংলাপের স্বতঃস্ফূর্ততা, দিয়া-অরন্যর খুনসুটি, আর ক্রেটের চরিত্রচিত্রণ গল্পকে বাস্তবতার সঙ্গে একাত্ম করে রাখে। যেহেতু ঘটনাপ্রবাহে কোনো অপ্রয়োজনীয় গতি-হ্রাস নেই, পাঠকের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে কাহিনির শেষাংশ আরও কিছুটা দীর্ঘায়িত হলে, টানটান উত্তেজনার রেশ আরো একটু বেশি সময় টিকে থাকত —যেমন জন লে কার তাঁর The Spy Who Came in from the Cold–এ করেছিলেন।
যদিও থ্রিলার হিসেবে রহস্য উন্মোচনের বেশ কিছুটা আগেই অনেক মরমী পাঠক প্লটের সমাপ্তি আন্দাজ করতে পারবেন, তবু লেখক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টান বজায় রেখেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ সংযত, যা কাহিনীকে বাস্তবতার মাটিতে রাখে—এখানে হালিউডি কাকতাল নেই। ভয়াবহতার চিত্রায়ণ পাঠককে আঁতকে তোলে না, বরং গায়ে হালকা শিরশিরানি ধরিয়ে দেয়, যেমন ক্যালেব কারের The Alienist–এ দেখা যায়।
সব মিলিয়ে, কৃত্তিবাস রহস্য বাংলা থ্রিলারের মানচিত্রে এমন এক সংযোজন, যা স্থানীয় আবহ, আন্তর্জাতিক প্লটস্ট্রাকচার, আর চরিত্রের মানবিক টানাপোড়েনকে একসঙ্গে বেঁধেছে। যদি দ্বিতীয় সংস্করণে প্রচ্ছদকে কাহিনির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, তবে বইটি শুধু বাংলা পাঠকের নয়, অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বপাঠকেরও পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে।
একদম টানটান ঠাসবুনোট থ্রিলার রান্না করতে কী কী লাগে? ক্রমশঃ দানা বাঁধা রহস্য, প্রয়োজনীয় সাসপেন্স, স্বাদমতো কমিক রিলিফ, আধুনিকতার ছোঁয়া, একটা কোল্ড ব্লাডেড ভিলেন, প্লট টুইস্ট। লেখক অসাধারণভাবে এই সমস্ত উপাদানগুলো যথামাত্রায় প্রয়োগ করে রেঁধেছেন কৃত্তিবাস রহস্য। অরণ্য আর দিয়ার প্রথম অভিযান 'গভীর জালের রহস্য' আমার পড়া হয়নি, হইচইতে দেখাও হয়ে ওঠেনি 'ডার্ক ওয়েব'। তবে দেখব। কারণ কৃত্তিবাস রহস্য ইন্টারেস্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। একটা সাসপেন্স প্রায় ১০০ পাতার ওপর ধরে বয়ে নিয়ে গেছেন লেখক অত্যন্ত সফলভাবে। পাঠক একবারও আঁচ করতে পারবে না যে আসলে তার পেছনে কী রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োগও পরিমিত। যাতে কোনোভাবে না মনে হয় যে এটা দক্ষিণী সিনেমার স্ক্রিপ্ট চলছে বা নায়কের কপাল খুব ভাল তাই সময়ে সময়ে সব পেয়ে গেল। লেখক এখানে ভয়াবহতার ব্যাপারটা যেভাবে ফুটিয়েছেন, তাতে আঁতকে না উঠলেও, গা শিরশির করে উঠেছে বটে। তবে আমার কিন্তু ভিলেনটিকে দুর্ধর্ষ লেগেছে। নিজেরও ওরকম হওয়ার ইচ্ছে আছে। তবে টাইরন ল্যানিস্টারের অংশটা বাদে। গোটা কাহিনীটাই বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো জায়গা পড়তে গিয়ে মনে হয়নি যে এটা এভাবে করলে ভালো হত বা ওটা ওভাবে। বহুদিন বাদে একটা থ্রিলার মনে দাগ কাটল। শেষে শুধু একটা প্রশ্ন রইল: ১১৬ পাতায় বলা আছে 'চশমার চ, বিড়ালের তালেব্য শ'। ওটা কী "চন্দ্রবিন্দু" হবেনা? আসলে হযবরল-তে তো তাই-ই আছে, তাই জিজ্ঞাসা করলাম আর কী!