এই বইয়ে 'জেনোসাইড' ধারনার ইতিহাস,তাত্ত্বিক কাঠামো,স্বীকৃত কয়েকটি জেনোসাইডের বিস্তারিত এবং এগুলোর সাথে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারী ফোর্সগুলোর নৃশংসতাকে তুলনা করে দেখানো হয়েছে- এটি শুধু গনহত্যা ছিলোনা, পূর্ণাঙ্গ জেনোসাইড ছিলো। এ ছাড়া ১৯৭১ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলোনা, বরং ছিলো এর ১০০ বছর আগে থেকে ভারতীয় উপহাদেশে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পরিনতি। কলকাতা দাঙ্গা- নোয়াখালিতে হিন্দু নিধন-বিহারে মুসলিম নিধন- পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় মদদে ১৯৫০ ও ১৯৬৪ এর হিন্দু নিধন ছাড়াও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন- বাঙালীদের প্রতি পাকিস্তানীদের মনোভাব, এসবই ছিলো জেনোসাইডের প্রাক প্রস্তুতি ।
জেনোসাইড বিষয়ে এরকম গ্রন্থ , সম্ভবত বাংলা ভাষায় এই প্রথম ।
হাসান মোরশেদের বেড়ে ওঠা এবং স্থায়ী আবাস সিলেট শহরে। পড়ালেখা এবং কর্মসূত্রে থেকেছেন ভারত ও যুক্তরাজ্যে। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর করেছেন। সিলেট অঞ্চলের পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন।
জগতজ্যোতি দাস ও তাঁর গেরিলা দলের যুদ্ধের কথা সংগ্রহের জন্য, দাসপার্টির জীবিত গেরিলাদের সাক্ষাতের জন্য প্রায় একবছর ধরে ঘুরেছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দিরাই হয়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচং আজমিরীগঞ্জ পর্যন্ত।
'দাস পার্টির খোঁজে' হাসান মোরশেদের তৃতীয় গ্রন্থ, এর আগে রাজনৈতিক ফিকশন 'শমন শেকল ডানা' এবং অরুন্ধতী রায়ের আলাপচারীতার অনুবাদ 'দানবের রূপরেখা' প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে।
বাংলা ভাষায় জেনোসাইড নিয়ে একাডেমিক আলোচনা দুস্কর। জেনোসাইড বনাম গণহত্যা (mass killing) নিয়ে আলোচনা একেবারেই নেই, যে পার্থক্যটা এই বই পড়েই প্রথমবারের মতো উপলদ্ধি করেছি। অপরাধ হিসেবে জেনোডাইসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তি একটি সুবিশাল ব্যক্তিগত সংগ্রাম, যার কেন্দ্রে রয়েছেন রাফায়েল লেমকিন নামক এক আইনজীবী ও একটিভিস্ট। এই সংগ্রামের উপাখ্যানে আমরা দেখি নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে বসেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশগুলো "জেনোসাইড" ধারণাটিকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি, কারণ এতে করে উপনিবেশ ও স্বীয় ভূমিতে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে নিজেদের কৃত জেনোসাইডকেও স্বীকার করতে হবে! অন্য দেশে চলমান জেনোসাইড বন্ধে মানবিক হস্তক্ষেপে অনীহা, বিশেষত তদ্রুপ হস্তক্ষেপে কোন আর্থ-রাজনৈতিক প্রাপ্তির সম্ভাবনা না থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপারপাওয়াররা জেনোসাইডের স্বীকৃতি দিতে চায় না, যেমনটা বসনিয়ার জেনোসাইডে পরিলক্ষিত হয়েছে। জেনোসাইড ধারণাটি সার্বজনীন করে তোলার বন্ধুর সংগ্রামটি লেখক ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন, তবে এই অধ্যায়গুলো পড়লে দুর্বল বাক্যগঠণ থেকে পরিস্কার বুঝা যায় এই অংশটি এক বা একাধিক ইংরেজি বই থেকে ভাবানুবাদ করা। এখানে সম্পাদকের দায় রয়েছে।
জেনোসাইড ধারণাটির ইতিহাস, ইতিহাসের কিছু কুখ্যাত জেনোসাইড, জেনোসাইডকে কেন "গণহত্যা" বলা উচিত নয় - এই বিষয়গুলো বাংলা ভাষায় পুস্তক আকারে সম্ভবত প্রথমবারের মতো আলোচনা করায় এই বইটি বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের জেনোসাইড লঘুকরণে শর্মিলা বসুর Dead Reckoning জাতীয় ফরমায়েশি বই ও তদ্রুপ দেশি-বিদেশী অপপ্রচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-সমৃদ্ধ পৃথক অধ্যায় থাকলে ভালো হতো, কারণ ব্লগ মণ্ডলে হয়ে যাওয়া এই আলোচনা ব্লগের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে বেশি প্রচার পায়নি। এই বইতে জেনোসাইড অস্বীকার নিয়ে একটা অধ্যায় আছে ঠিকই, কিন্তু বিষয়টির গুরুত্ব বিচারে আরও বিশদে আলোচনার দাবিদার।
হলোকস্ট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জেনোসাইড ও বর্তমানে চলমান উইঘুর ও রোহিঙ্গা জেনোসাইড পর্যালোচনা করলে True Detective সিরিজের একটা সংলাপ মনে পড়ে,
"Time is a flat circle. Everything we've done or will do, we're gonna do over and over again."
হাসান মোরশেদ এর " জেনোসাইড ৭১, তত্ত্ব, তর্ক, তথ্য " পড়লাম। খুব ভালো লাগলো । জেনোসাইড নিয়ে বাংলাদেশে এমন কাজ আর হয় নি বলেই ধারণা। আইনের ছাত্র হিসেবে আমার বিষয় গুলো নিয়ে আরো কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। মানবতার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধের সংগা, ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট লেখক খুব সহজ ভাষায় বলে গেছেন। জেনোসাইড ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের অন্যতম দুই দিকপালের জীবন এবং তার সমান্তরালে তাদের এক্টিভিজম লেখক প্রাণবন্ত ভাবে গল্পের মতন তুলে ধরেছেন বই এর প্রথম অংশে। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত অংশে লেখক হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বিভাজনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড এর পটভূমি হিসেবে আলোচনা করেছেন। এই অংশটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। যদিও এই বিষয়ে অনেক কাজ হয়েছে, কিন্তু গনহত্যা র অপরাধ এর পটভূমির দৃষ্টিতে অবলোকন এমন কাজ আমার নতুন লেগেছে। ৭১ এর জেনোসাইড নিয়ে লেখক চমৎকার একটি প্রশ্নের অবতারণা করেছেন, জেনোসাইডকে গনহত্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা ও এর তত্ত্বীয় ও ভাষাগত ও আইনগত সমস্যা নিয়ে। জেনোসাইড অস্বীকার এর রাজনীতি নিয়ে ও লেখক চমৎকার আলোচনা করেছেন। যদিও পাঠক হিসেবে ৭১ এর জেনোসাইড না গনহত্যা বিষয়ক বিতর্ক টি আর একটু কলেবরে বাড়ানো যদি যেতো আক্ষেপ ছিলো , এটাই এই বইটার একমাত্র সমালোচনার দিক। তবে এই আলোচনা র যে সূচনা লেখক করেছেন, আইনের নগণ্য ছাত্র হিসেবে এই আলোচনা জারী রাখার একটা একাডেমিক দায়বদ্ধতা অনুভব করছি। হয়তো এটাই এই বই এবং লেখকের স্বার্থকতা। সবচেয়ে বড় বিষয় আমরা এখনো পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী দের বিচারের মুখোমুখি করতে পারিনি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ এর অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। তাই আমাদের জাতীয় জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা ও চর্চা এবং আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি তে এই বিষয় নিয়ে একাডেমিক আলোচনা বেগবান হোক। এই বই হোক তার পথ প্রদর্শক। লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
"জেনোসাইড ৭১ তত্ত্ব, তর্ক, তথ্য" বইটির নাম দেখেই বুঝা যায় জেনোসাইড ধারণা সম্পর্কিত কথাবার্তা এখানে রয়েছে। দুইটি ভাগে 'আন্তর্জাতিক পর্ব' এবং 'বাংলাদেশ পর্ব' লেখক জেনোসাইডের আলোচনায় দর আলোকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত 'জেনোসাইড' এর বর্ণণা তুলে ধরেছেন। লক্ষণীয় যে, আমরা অচেতন ভাবে 'জেনোসাইড' শব্দটি আড়াল করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে গণহত্যা বলে আখ্যা দেই। কিন্তু গণহত্যা হচ্ছে জেনোসাইডের অন্তর্ভুক্ত অনেকগুলো অপরাধের একটি। বইটিতে এসবের তুলনামূলক আলোচনার পাশাপাশি লেখক কিছু প্রশ্ন ও সীমাবদ্ধতা সেইসাথে রাষ্ট্রের করণীয় নিয়ে বলেছেন। বইটির শেষ পাতায় লেখক বলেছেন, "এখানে জেনোসাইড ঘটেছিলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তাদের সহযোগী শক্তি বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সব ধরণের নৃশংসতা চালিয়েছিলো - এটা ইতিহাসের সত্য, ঘটে যাওয়া বাস্তবত। এই সত্য, এই বাস্তবতা বিশ্বকে স্বীককরে নিতেই হবে।
তার আগে, বাংলাদেশকে নিজে বুঝে নিতে হবে - এখানে যা ঘটেছিলো তা সম্পূর্ণ একটি জেনোসাইড। অন্য কিছু নয়।"