বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী লেখক, স্প্যানিশভাষী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে নিয়ে নানা উপলক্ষে লেখা রচনাগুলোকে ইমতিয়ার শামীম এক মলাটের মধ্যে এনেছেন মার্কেস : সঙ্গে নিঃসঙ্গে নামের এই বইয়ে। সেই সঙ্গে রয়েছে ট্র্যাজিক এক মৃত্যুর শিকার চিলির জননন্দিত নেতা সালভাদর আলেন্দে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাক্রমশালী সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনকে নিয়ে লেখা মার্কেসের দুটি নিবন্ধের, লেখকের ভূমিকার ভাষায়, ‘দুর্বল অনুবাদ’। হয়তো নানা উপলক্ষই বাধ্য করেছে তাকে এসব লেখা লিখতে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর নিছক উপলক্ষে আবদ্ধ থাকেনি। হয়ে উঠেছে মার্কেসের টুকরো কিন্তু অখণ্ডিত অবলোকন, নিবিড় অধ্যয়ন। বিশ্বের সাহিত্য ও রাজনীতির ওপর মার্কেসের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের নানা দিক উঠে এসেছে এসব লেখায়; কীভাবে তিনি সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছেন জীবনযাপন দিয়ে, কীভাবে তার জীবনযাপন প্রভাবিত হয়েছে সাহিত্যের সংস্পর্শে; শৈশব আর তখনকার মানুষেরা কী করে আন্দোলিত করেছে মার্কেস ও তার সাহিত্যকে, কী করে তার ও কাস্ত্রোর বন্ধুত্ব সাহিত্য ও রাজনীতির মেলবন্ধন হয়ে উঠেছে এবং নতুন এক চিন্তার জগতের দুয়ার খুলে দিয়ে গেছে- ইমতিয়ার শামীম নানাভাবে আবর্তিত হয়েছেন এসবের মধ্যে। আবর্তিত হয়েছেন মার্কেসের বিভিন্ন গ্রন্থের সদরে-অন্দরে; তবে শুরুতেই বলে দিয়েছেন, আকাশচুম্বী সফলতার পরও কোনো কন্যার জনক হতে পারেননি বলে মার্কেস নিজেকে বরাবরই ভেবেছেন, অসফল এক মানুষ। মানুষের এই যাপন আসলে জীবন নয়; জীবন মূলত তাই, যা কেউ স্মরণ করে এবং যেভাবে করে একে বর্ণনা করতে গিয়ে- গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের এরকম কথাটিতেই বোধকরি বারবার আবর্তিত হয়েছেন লেখক এসব লেখার সময়।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
সাহিত্য পত্রিকা আর সাময়িকীতে নানান সময়ে প্রকাশিত গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে নিয়ে লেখা কয়েকটা প্রবন্ধের সংকলন এই বই। সেই সাথে আছে ইমতিয়ার শামীমের করা মার্কেজের দুটো প্রবন্ধের (চিলির জননেতা সালভাদর আলেন্দে আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে নিয়ে লেখা) অনুবাদ।
মাত্র দুটোই অনুবাদ আর প্রবন্ধ গুলো ইমতিয়ার শামীমের নিজেস্ব হওয়া সত্বেও বইটা নিতান্তই মনে হয় "দুর্বল অনুবাদ"এ লেখা। বিষয়বস্তুর কোন ঠিক ঠিকানা নেই, গোছালো হবে তা আশা করিনি কারন নানান সময়ে, নানান উপলক্ষে লেখা এসব প্রবন্ধ একক ভাবেও আগা থেকে গোড়া কোন মাথামুন্ডু নেই। পড়তে খুবই অধৈর্য লেগেছে, আনন্দ পাইনি। অথচ এই প্রবন্ধ গুলো এমন একজন কিংবদন্তী লেখককে নিয়ে লেখা, আর তার অল্পসল্প যতটুক টুকরো টাকরা ইমতিয়ার শামীম আনতে পেরেছেন এই লেখাগুলোতে, একটু সুখপাঠ্য করে লিখলে ধারনা করতে পারি কত দারুন কিছু হতে পারত। ভূমিকাতে যদিও লেখক ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন যে কয়েকটা প্রবন্ধে কিছু জিনিসের পুনরাবৃত্তি এসেছে যেহেতু নানান সময়ের লেখা এগুলো। তাই বলে এতো? আর একই মলাটে যেহেতু আনা হচ্ছে, এই পুনরাবৃত্তি গুলোর সংশোধন বা সামগ্রিক একটা সম্পাদনা করা যেত না?
যতটুক যা ভালোর মধ্যে যদি বলি, "এক জীবনের নন্দনতত্ত্ব" প্রবন্ধটা পড়তে কিছুটা ভালো লেগেছে। লেখকের মতেঃ "মার্কেস যারা পড়েন, পড়তে ভালোবাসেন, তাদের পড়া অসম্পূর্ণই থেকে যায় তার 'লিভিং টু টেল দ্য টেল' না পড়লে। ...মার্কেসের পাঠককে ততক্ষণ মার্কেসের পাঠক বলা যায় না, যতক্ষণ না সে মার্কেসের 'লিভিং টু টেল দ্য টেল' না পড়ে।" এই লাইনটা আমার কাছে ভীষন ইন্টারেস্টিং, সেই সাথে দুঃখেরও কারন আমি গ্যাবোকে আমার এতো প্রিয় গল্প বলিয়ে দাবী করলেও আমিও এখনও 'লিভিং টু টেল দ্য টেল' পড়িনাই!
ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে মার্কেজের বন্ধুত্ব এক অনন্য অধ্যায়। এ ব্যাপারে যে প্রবন্ধটা "জাদুবাস্তবতার জননায়ক" এই প্রবন্ধটাও খুব খারাপ লাগেনি।
মৃত্যু এসে তোমাকে নিয়ে গেছে আরও অনেক বছর আগে। কিন্তু তুমি তো তোমার ঘোর বাড়িয়েই চলেছো। বিশ্বজুড়ে অগুন্তি পাঠকের মাঝে কেবল মুগ্ধতা ছড়িয়েই যাচ্ছো। শুধু লেখনির জন্যই নয়, তোমার জীবনযাপন, নিষ্ঠা, দর্শন সবকিছুর জন্যই।
যখন শুনি কেউ মার্কেস পড়েছে কিংবা মার্কেস কারও প্রিয় লেখক তখন আমি অধীর হয়ে থাকি তার মুখ থেকে মার্কেসকে নিয়ে বিস্ময়ের কথা শুনবো বলে।
অপেক্ষায় থাকি তিনি হয়তো এখন গাবোকে নিয়ে তার ঘোরের কথা বলবেন। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেই অধীরতার অবসান হয়নি।
প্রথম যেদিন মার্কেস পড়ি, প্রথম পৃষ্ঠা পড়েই গাবো প্রিয় লেখক হয়ে উঠেছে আমার। এরপর দিনে দিনে ভালোলাগা কেবল বেড়েই চলেছে। গাবোর প্রতি আমার এই মুগ্ধতার জন্য আমার বন্ধুরা বিভিন্ন সময় গাবোর বই উপহার দিয়েছে আমায়। এই ঘোর যে কেবল তার গল্প বলার ঢং-এর জন্য তা নয়, পুরো গাবোটাই যেন একটা বিশেষ কিছু, বিশেষ ভালোলাগা আমার কাছে।
ল্যাটিন আমেরিকার এই সাংবাদিক দেখিয়ে দিয়েছেন সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও দুনিয়া কাঁপানো সাহিত্যিক হওয়া যায়, ঔপন্যাসিক হওয়া যায়।
এত বড় সাহিত্যিক হয়েও মার্কেসের জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল তিনি কোন কন্যাশিশুর জনক হতে পারেন নি। পৃথিবীবিখ্যাত ফিদেল ক্যাস্ত্রো ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ফিদেলের কথামত নিজের অনেক লেখাই বহুবার কাটাছেঁড়া করেছেন গাবো।
সেই গাবো'র আজ ৯৬ তম জন্মদিন। গাবোকে নিয়ে লেখা ইমতিয়ার শামীমের এই বইটি অনেক আগেই এক প্রিয় বন্ধু উপহার দিয়েছিলেন আমায়। তখন পড়া হয়নি। আজ বইটা খুলে কেবল বিস্মিতই হলাম।
ঘোরলাগা গাবোকে নিয়ে বাংলাদেশের আরেকজন বিখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীমের অসাধারণ সব কথামালা। "আমরা হেঁটেছি যারা" পড়েই ইমতিয়ারে মুগ্ধতা আমার। গাবোকে নিয়ে এমন লেখা পড়ে সেই মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল। ভালোবাসা জানবেন প্রিয় ইমতিয়ার শামীম।
মার্কেজ পাঠক হিসেবে আমি নিজেকে এখনো দাবি করতে পারি না কারণ লিভিং টু টেল দ্য টেল বইটা এখনো আমার পড়া হয়ে ওঠেনি। মার্কেজের অনেক লেখাই আসলে আমার পড়া হয়ে ওঠেনি এখনো। কেবল পড়া হয়েছে নি:সঙ্গতার একশ বছর-যা আরো অনেকবার পড়ার ইচ্ছে রাখি আমি, কর্নেলকে কেউ লেখে না এবং আমার দুঃখভারাক্রান্ত বেশ্যাদের স্মৃতিকথা। কর্নেলকে কেউ লেখে না পড়ে আমার মনে হয়েছিল কোথাও না কোথাও এর সাথে যোগ আছে নি:সঙ্গতার একশ বছরের। আজ বুঝি সেই মিলটা আসলে একাকীত্বের, নি:সঙ্গতার, বিষণ্ণতার। যে একাকীত্বের কথাই মার্কেজ বলতে চেয়েছেন সারাটা জীবন ধরে। এমনকি গোটা লাতিন আমেরিকা যে একটি উপন্যাস লিখে চলেছে এতকাল ধরে। গাবো ছিলেন একজন সাংবাদিক আর সংবাদপ্রকাশের সাথে সাহিত্যের নাকি কোথাও রয়েছে এত অদৃশ্য ব্যবধান। এমনটাই বলা হয়ে থাকে। তাই সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সেরা পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় শিক্ষকতাকে। কিন্তু সাংবাদিক হয়েও গাবো রচনা করলেন জাদুবাস্তবতার এক শ্রেষ্ঠতম আখ্যান। জাদুবাস্তবতা তাঁর হাতেই সূচিত হয়েছে-এমনটা না হলেও, উৎকর্ষ যে লাভ করেছে সর্বোচ্চ এমনটি হলফ করে বলাই যায়। আর আরেক সাংবাদিক-সুলেখক-সুপাঠক ইমতিয়ার শামীমের হাতেই মূর্ত হয়ে উঠেছেন এক চেনা-অচেনা ছায়ায় ঢাকা মার্কেজ যে মার্কেজ সারা জীবন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনটি জীবন পাশাপাশি রচনা করে গেছেন। একটি প্রকাশ্য জীবন, একটি ব্যক্তিগত জীবন অন্যটি একান্ত গোপন। মার্কেজ বিশ্বাস করতেন সেই শ্রেষ্ঠ যে গোপনীয়তাকে বুকে ধরে হারিয়ে যায় কবরে। অর্থাৎ গোপনীয়তা রক্ষাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতেন তিনি। বাস্তবেও এর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁর বন্ধুতা ইমতিয়ার শামীমের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মার্কেজের জীবনের। সেই কাস্ত্রো যিনি একজন সফল বৈপ্লবিক এবং সফল রাজনীতিক আমরা সবাই জানি- কিন্তু একজন গভীরভাবে সংবেদনশীল পাঠকও যাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে এড়াত না কোন ছোটখাট ভুলও কোন লেখার। যাঁর কাছে সাম্যবাদের সংজ্ঞা ছিল এমন, ' তা হলো এমন একটি সময়, যখন মানুষ অবসরে মাছ শিকার করবে আর প্লেটোর দর্শন নিয়ে কথা বলবে।' ফিদেল আর মার্কেজের বন্ধুত্বটা অবিস্মরণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিক এবং রাষ্ট্রনেতা, যেখানে উভয়ই উভয়কে প্রভাবিত করছেন, এমন যুগল পাওয়া দুষ্কর। মার্কেজের সুসম্পর্ক ছিল মিতেরাঁ এবং বিল ক্লিনটনের সঙ্গেও। মার্কেজের সমস্ত লেখা প্রভাবিত হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে। তাঁর নিজের জীবনের গল্পগুলোই অন��যরূপে হাজির হয়েছে তাঁর নানা লেখায়। জাদুবাস্তবতার মিশেলে তাতে উপস্থাপিত হয়েছে ইতিহাস-রাজনীতি-ঐতিহ্য-মিথ। মার্কেজকে বুঝতে হলে তাই পাঠক হওয়া সত্যিই জরুরি। ইমতিয়ার শামীমের এই লেখাগুলোতে কিছু পুনরাবৃত্তি থাকলেও বিষয়গুলোর সামগ্রিকতার জন্য জরুরি ভেবেই সম্পাদনা না করেই লেখাগুলো সংকলিত হয়েছে। আর পাঠক হিসেবে আমারও বুঝতে সুবিধা হয়েছে আরেকজন সাংবাদিক-লেখক এবং মার্কেজ-পাঠকের ভাবনা।
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ওরফে গাবো ছিলেন একজন কলম্বীয় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।এই বইটিতে ইমতিয়ার শামীম একইসাথে সাহিত্য ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রে গাবোর প্রভাব এক মলাটে আনার চেষ্টা করেছেন।