ইতিহাস কথা বলে–বিজয়ীদের কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়–অতীত গৌরবের সাক্ষ্য। কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনাবলির কতটুকু তাতে অটুট থাকে?
শোণিত উপাখ্যান–বর্তমান-এ যে কাহিনীর পর্দা উন্মোচিত হয়েছিল, তার পূর্বের সূত্র এবং পটভূমি বর্ণিত হয়েছে শোণিত উপাখ্যান–অতীত-এ। এবারের পর্ব অতঃপর।
মোঘল সম্রাট বাবরের দরবারে পৌঁছানোর পর কী ঘটেছিল শোণিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লোহিতের ভাগ্যে? সেই ঘটনার পরিক্রমায় অবলোহিত আর বাঘাতুরই বা কী ভূমিকা রেখেছিল? এদিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মীরানা মোরেসকে অপহরণ করেছে কে? কায়েস-অবলাল যে কেসের তদন্ত করছে তার সঙ্গে এর কীসের সম্পর্ক?
হঠাৎ ঘনিয়ে ওঠা এই অরাজকতা সামাল দিতে কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সাদা হাত? কেনই বা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে রয়্যাল ভ্যাম্পায়ার রাতিবর?
ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে অর্ধ-জীবন্মৃত ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস, বেসেলি ক্ষমতার ধারক তরঙ্গ ওরফে অবলাল, দুই পুলিশ ইন্সপেক্টর কায়েস আর রবিউল।
আসলে কে রয়েছে নেপথ্যে? কী তার মহা-পরিকল্পনা? সর্বোপরি, কীভাবে এই নাটকের যবনিকাপাত ঘটবে?
সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে রক্তের উপাখ্যানে–‘শোণিত উপাখ্যান’।
বাঙ্গাল মুল্লুকের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সহকারে এপার বাংলার প্রথম, শরদিন্দু বাবু, বিভূতিবাবুর তারানাথ এর পরে তৃতীয় পরিপূর্ণ আরবান ফ্যান্টাসি সিরিজ মনে হচ্ছে শোণিত উপাখ্যান। বাঙ্গাল মুল্লুকের ইতিহাস বলতে আমি উপমহাদেশের দিগবিজয়ীদের, ঐতিহ্য বলতে বৈতাল, চুড়েল, রাক্ষস, স্কন্ধকাটা, পিশাচ, যক্ষ, পিশাচ সাধক, মানুষখেকো, অসুর যংকসুর যাতীয় আমাদের দেশীয় রূপকথার ভৌতিক চরিত্রকে বুঝিয়েছি। সম্ভবত আমার পড়া এই বছরের সেরা সিরিজ। সেরা বইগুলোর একটা।
বিল্ডাপ, ব্যপ্তি, প্লট তিন মিলিয়ে অতি অসাধারণ এক উপাখ্যান। প্রতিটি দৃশ্য আলাদা ভাবে দাগ কেটেছে মনে। উত্তেজনা, ভায়োলেন্স, সাইকোলজিকাল গেইম সব কিছু ছিলো রান্না করা সুস্বাদু তরকারির মতো; পারফেক্ট ব্লেন্ডিং হয়ে। মাঝখানের খন্ডে রুমী আর পিশাচ দ্বীপের অ্যাডভেঞ্চার, শেষ খন্ডের শেষ দৃশ্য মোটামুটি গুসবাম্পড হয়েছে। গুসবাম্পড হওয়া কয়টা লাইন উল্লেখ না করলেই নয়, এমন কিছু যখন গল্পের রথী, মহারথিরা - বাঘে মহিষে একঘাটে জল খাবার মতো একাট্টা হয় শত্রুতা ভুলে!_
''স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের পথ আলাদা বহু আগেই ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। তবে এটাও সত্যি যে একটা ভিন্ন মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আর ঐ ভিন্ন পথে অবস্থান করা সম্ভব নয়। ভয়ংকর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। আমি একা নই, গোটা বিশ্বই মনে হয় হুমকীর সম্মুখে! ব্যর্থতার অবকাশ নেই, তাই সর্বাত্মক সামর্থ্য দিয়ে সাহায্য করার আবেদন জানাচ্ছি।''
ট্রিলজি বা ত্রয়ী উপন্যাস টার মতোই প্রত্যেকটা চরিত্র মনে দাগ কাটার মতোন। চরিত্রগুলো আমি মনে রাখতে চাই অনেকদিন। ইতিহাস থেকে উঠে এসেছেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট, দ্য স্কার্জ অফ গড আটিলা দ্য হান, চেঙ্গিস খান, মুঘল বংশের নৃপতি বাবর, অসুস্থ হুমায়ূন, গ্রেট তৈমুর লং, চেঙ্গিস খানের অন্যতম প্রধান সেনাপতি সুবুতাই, বাবরের তরুণ সেনাপতি বৈরাম খা, শোণিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লোহিত, উপপ্রধান পুরোহিত অবলোহিত, অবলোহিতের বংশধারার বাইশতম প্রজন্ম সংহতি চৌধুরী, তেইশতম প্রজন্ম সংহার চৌধুরী তরঙ্গ ওরফে অবলাল, বাবরের বীর দেহরক্ষী বাঘাতুর রাদু আলাখ, পিশাচ সাধক তরপেশ্বর, জীবন্মৃত সাধক তরন্দীদেব, রুমি, ঝুমুর, রয়াল ভ্যাম্পায়ার রাতিবর, ভ্যাম্পায়ার হান্টার বিয়র্ণ ভিঙ্গার, অর্ধ ভ্যাম্পায়ার হাফ ব্রিড ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস, দিয়ন্ত, মীরানা মোরেস, রিচার্ড, অশিন ডাকাত আর তাঁর দলবল, শৈলেন ভট্টাচার্য, ওরাকল কায়েস সহ কত্ত অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব মাইরী!
পূর্ণ পাচ তারকা এই বইটির জন্যে না। পুরো ট্রিলজি হিসেবে পাচ তারা। শুধুমাত্র এই বই বললে চার তারা দেবো। দুটো কারনে। ভ্যাম্পায়ার হান্টার বিয়র্ণ এর চরিত্রটা আরো ব্যপ্তির অভাব বোধ করেছি। ওসি রবিউল সাহেব কে ঠিক একজন থানার ওসির মত ম্যানলি বা ওসি পোস্টের একজন মানুষের যেমন স্ট্রং পারসোনালিটির হয় তেমন মনে লাগেনি। এটা হতে পারে লেখকের ইচ্ছেকৃত সৃষ্টি।
প্রথম দু'টোর মত উচ্ছ্বাস দেখাতে পারলাম না। এবারে অ্যাকশন আছে, গতি আছে, কিন্তু নতুন কিছু নেই। যতটা তাড়াহুড়া করা হয়েছে, আসলে ২য় খণ্ডটাই আরেকটু বাড়িয়ে শেষ করে দেয়া যেত বইটা। মোটের উপর সোয়া ৩।
সাহিত্য আর ভিডিও-গেমের মধ্যে পার্থক্য কী? হিটম্যান, রেসিডেন্ট ইভিল প্রভৃতি গেমের অনুসারীরা তো বটেই, ম্যাথিউ রিলি'র ভক্তরাও এই লাইনটি পড়ে নির্ঘাত আমাকে (বা আমার গর্দান-কে) মাপতে শুরু করেছেন। দয়া করে শান্ত হোন। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম, ভিডিও গেম আপনাকে ভাবার সুযোগ দেয় না। এও বলা চলে যে ভাবতে না চেয়েই ওই জিনিস, বা ওইরকম সাহিত্যের আশ্রয় নেয় লোকে। তবে ফ্যান্টাসি, এমনকি প্রিন্স অফ পার্শিয়া বা কল অফ থুলু হলেও, অন্যরকম মনোযোগ দাবি করে। পরিতাপের বিষয়, শোণিত উপাখ্যানের এই (আপাতত?) শেষ অধ্যায়টি আমাদের ভাবার সুযোগ দেয়নি। গল্প এগিয়েছে ঝড়ের বেগে। তাতে মিশে থেকেছে রক্ত, অশ্রু, বিশ্বাসঘাতকতা, হিংসা, আর জিঘাংসা! শেষ অধ্যায়ে আমরা যখন মিলনান্তক পরিণতি দেখছি, তখনও ঠিক বিশ্বাস হতে চাইছে না যে সত্যিই থেমেছে মহাশক্তিধর ওইসব মানুষ আর অমানুষের লড়াই। আনপুটডাউনেবল, তবে সিরিজটা আর আর্বান ফ্যান্টাসি ছিল না। ইতিহাস... না, তাও ছিল নামে মাত্র। তবু, বাংলায় এমন লেখা সর্বার্থে দুর্লভ। সুযোগ পেলে নিশ্চয় পড়বেন।
এই সিরিজের তিনটে বইয়ে আমার এভারেজ রেটিং ৪ এর কাছাকাছি। তবে পুরো সিরিজ একত্রে আমার রেটিং ৫ এ ৫। আরবান ফ্যান্টাসি, সাথে একটু হিস্ট্রি, সুপারন্যাচারাল আর ভায়োলেন্স। ও হ্যা, সিরিজের প্রথম আর দ্বিতীয় বইয়ে হালকা সুপারহিরো ফ্লেভারও আছে। এই বইটাও ব্যাতিক্রম না। এটাকে একটা দারুণ ট্রিলজি ফিনিশিং বলা যায়। আগের গুলোর মত এত ধুন্ধুমার একশন আর ভায়োলেন্স না থাকলেও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে এখানে। আগের দুই বইয়ের মিলনমেলা। তো, এই সিরিজটা যে কয়েকটা কারণে আমার অনেকদিন মনে থাকবে:
১. ভায়োলেন্স: বেশীরভাগ দেশী লেখকদের লেখায় ভায়োলেন্স প্রদর্শনে আমার চুলকানি আছে। অনেকেই মনে করে রক্তাক্ত হাড়, মাংস আর ঘিনঘিনে কিছু বর্ণনা দিলেই যেন ভায়োলেন্স হয়ে যায়। তবে আমার কাছে মনে হয়, ভায়োলেন্সের মূল মজাটাই হইতেছে সাসপেন্স। আপনারে সাসপেন্সে রাখবে, অপেক্ষা করাবে ভয়াল দর্শনের কিছু দেখানোর জন্য। উত্তেজনার পারদ উর্ধ্বমুখী করবে। এই যেমন এই ট্রিলজির একাংশের একটা ঘটনার কথাই ধরুন। ঘটনার সারাংশ অনেকটা এই রকম: কায়েসকে পাঠানো হলো একটা ক্রাইমসিন দেখতে। সেইখানে গিয়ে দেখলেন বাইরে এক এসআই বইসা আছে মুখ গোমড়া কইরা। তারে দেইখাই কইলো, "লাশের অবস্থা ভালা না। সাবধানে যাইয়েন।" তারপর কায়েসে চইলা গেলো দোতলায়। সেইখানে এক জুনিয়রের চেহারা দেইখা মনে হইলো যেন এহনই বমি কইরা দিবো। হেয়ও তারে সাবধান করে দিলো। হেরে পাশ কাডায়া কায়েস ঢুকলো ক্রাইমসিনে। এহনও কিছু চোখে পড়ে নাই তার। সামনে দেখতে পাইলো কাপড় দিয়ে বিছানার ওপর কী যেন একটা ঢাইকা রাখছে।…… এই যে, এখানে এটারে যদি লেখক নাড়াচাড়া না করে ডিরেক্ট রক্তাক্ত, ভায়োলেন্ট এলিমেন্ট দেখায়া দিতো, তাহলে মজাটা থাকতো না। কিন্তু লেখক এটাকে দারুণ ভাবে হ্যান্ডেল করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মাখন করে হ্যান্ডেল করেছে। এজন্য কিছুটা হরর হরর ফিলিংসও হয়েছে।
২. লেখকের ন্যাচারাল লেখনী: লেখকের লেখনী দেইখা মনে হইছে যে, পুরোটাই এসেছে ওনার ভেতর থিকা। কোথাও বেশী ভঙ্গিচঙ্গিও করে নাই, আবার কিছু আঁটকেও রাখে নাই। একেবারে ঝড়ের মুখে উড়ে চ���া পাতার মত বর্ণনা করে গেছেন। সংলাপও হয়েছে একেবারে বাস্তবিক (কিছু কিছু জায়গায় ইম্ম্যাচিউর সংলাপও ছিলো)। সর্বোপরি গতিশীল এবং সুখপ্রদ লেখনী।
৩. অতিপ্রাকৃতবাদ: বাপস! মানে, কত রকমের ভূত দেখাইলো লেখক সাহেব! এমন এমন সব ভূতের দৈহিক বর্ণনা দিয়েছে, মাঝে মাঝে তাক লেগে গিয়েছিলো। আর শুরুর দিকে অতিপ্রাকৃত আইন আর সাদা হাতের অতিপ্রাকৃত পুলিশদের বর্ণনা পড়ে জাস্ট হাইস্যা দিছি। সর্বোপরি বাংলা আরবান ফ্যান্টাসি হিসেবে এটা শুধু সফলই নয়, রীতিমতো অনেকদিন অপরাজেয় থাকবে। আরবান ফ্যান্টাসি হিসেবে এটারে টপকাতে হইলে অন্যান্য লেখকদের তাল-ঘাম ছুটতেও পারে। লেখকের কাছে বাংলা সাহিত্যের এই বিরল জনরায় আরও লেখা আশা করবো।
" ইতিহাস কথা বলে – বিজয়ীদের কথা । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – অতীত গৌরবের সাক্ষ্য । কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনাবলির কতটুকু তাতে অটুট থাকে ? " - শোণিত উপাখ্যান : অতঃপর গল্পের শুরু হয় ঠিক এর আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল তার পরেই। যেখানে রহস্যময় এক ছায়ামূর্তি অবলাল, ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস, ডিটেকটিভ কায়েস হায়দার আর ইন্সপেক্টর রবিউল ইসলামের সামনেই মীরানা মোরেসকে বন্দী করে নিয়ে যায়। - এর পরেই সবাই তাদের সোর্স এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে মীরানাকে খোঁজা শুরু করে। এদিকে অ্যান্ড্রিয়াস তার পদ্ধতিতে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারে কিছু ভয়াবহ সত্য যার ভিতরে সবচেয়ে ভয়ের হলো শতাব্দী প্রাচীন কোন এক অশুভ শক্তি শীঘ্রই আঘাত হানতে যাচ্ছে ঢাকায় ! - এদিকে এর সাথেই কাহিনী এগিয়ে চলে সুদূর অতীতের নানা বাঁকে বাঁকে । যেখানে মুঘল সম্রাট সম্রাট বাবর চেষ্টায় রয়েছে তার পুত্র হুমায়ুনকে বাঁচাতে। অতীতের এই ঘটনাপ্রবাহে কি ভূমিকা রেখেছিল শোণিত মন্দিরের পুরোহিত এবং বাঘাতুর? সুদূর অতীত এর এইসব ঘটনাগুলোর সাথে বর্তমানের সম্পর্ক কি ? এই সব ঘটনার মূলে কে রয়েছে আর তার মহা পরিকল্পনা কি ? কায়েস - অবলাল - অ্যান্ড্রিয়াস আর তাদের সাথে থাকা বাকিরা কি পারবে এগিয়ে আসা সেই মহা শক্তির মোকাবিলা করতে ?
তা জানতে হলে বইয়ের ফ্ল্যাপের ভাষাতেই বলতে হয় - " সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে রক্তের উপাখ্যানে – ‘শোণিত উপাখ্যান’ এর শেষ পর্ব " শোণিত উপাখ্যান অতঃপর " এ। - আরবান ফ্যান্টাসি বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় এক ধারা। বেশ কয়েক বছর আগেও আমার আক্ষেপ ছিল বাংলা সাহিত্যে এই দিকটি ঠিকভাবে উঠে না আসায়।তবে বর্তমানে সাম্ভালা, শোণিত উপাখ্যান সিরিজ সহ বাংলা ভাষায় বেশ ভালো কিছু লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে এই জনরায় যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক আমার জন্য । - শোণিত উপাখ্যান : অতঃপর বইয়ের কাহিনী একদম প্রথম থেকেই চরম গ্রিপিং যা বজায় থাকে একদম শেষ পর্যন্ত। মূল কাহিনীতে এই পর্বের আগের দুই পর্ব বর্তমান এবং অতীতের নানা ঘটনাকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এতে আগের দুই পর্বের নানা ধরণের ধোঁয়াশা প্রথা/ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা বেশ সন্তোষজনক। প্রায় প্রতিটি ছোট ছোট পর্বে ছোটখাট ক্লিফহ্যাঙ্গার থাকলেও প্রতিবারের মতো এবারে বই শেষ করার পরেও ক্লিফহ্যাঙারে আটকে থাকার আক্ষেপ এই পর্বে নেই দেখে শেষটাও দারুন ভালো লেগেছে। - শোণিত উপাখ্যান : অতঃপর বইতে নানা ধরনের ভালো খারাপ গুপ্ত সংগঠন আর চরিত্রের সংখ্যা ছিল প্রচুর তাই আলাদাভাবে কারো উপর আলোচনা করা বেশ কঠিনই।তবে এর ভিতরে অনেক চরিত্র আর সংগঠন পূর্ব পরিচিত হওয়ায় তাদেরকে ক্যাচ করতে অনেক সুবিধা হয়েছে,এক্ষেত্রে আগের দুই পর্বের কাহিনী বিল্ডিং বেশ কাজে লেগেছে। চরিত্রের ভিতরে বর্তমান কালের অবলাল আমার বরাবরই ফেভারিট, এবারে ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস আর শৈলেন ভট্ট ও ছিল দুর্দান্ত। অতীত এবং বর্তমান এর বাকি নানা ধরনের অদ্ভুত সংগঠন, অদ্ভুত প্রথা এবং নতুন - পুরাতন চরিত্র গুলো গল্পের সাথে একবারে মানিয়ে গিয়েছে। এ কাহিনীতে এর আগের পর্বের চেয়ে লেখকের লেখনী আর কাহিনীর বুনোট বেশ পরিণত মনে হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয় এবং কাহিনীর সাথে মানানসই আর অন্যন্য ট্যাকনিক্যাল দিক ও চলনসই।
এক কথায়, সাম্ভালা এর পরে বাংলা সাহিত্যের আরেক দুর্দান্ত আরবান ফ্যান্টাসি সিরিজ হচ্ছে এই " শোণিত উপাখ্যান " সিরিজ। যাদের আরবান এবং হিস্টোরিক্যাল ফ্যান্টাসি পছন্দ করেন তারা পরে ফেলতে পারেন এই সিরিজ ,আর শোণিত উপাখ্যান এর আগের দুই পার্ট যাদের ভালো লেগেছে তাদের জন্য তো এটি অবশ্য পাঠ্য !
কোন বইয়ের রিভিও দেয়ার ব্যাপারে আমার মতো আনাড়ি খুবই কম আছে .. তবে এত টুকু বলতে পারি যারা আমার মতো রহস্যপ্রেমী ,অতিপ্রাকৃত বিষয়াদি খুব উপভোগ করেন তারা একবার এই সিরিজটা পড়ে দেখতে পারেন । বইয়ের কাহিনীর ব্যপারে আপনাদের কোন আভাস আমি দিতে চাই না । তবে হ্যাঁ অতীতের অনেক চরিত্রকে অথবা বলা যায় ঘটনাকে এতসুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পড়ার সময় মনে হয়েছিল সত্যি এমনটাই হয়তো ঘটেছিল । কে জানে হলেও হতে পারে .. 😜😜😜
***প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্বের রিভিউ পড়ে, এরপর এটা পড়লে বুঝতে সুবিধা হবে***
অতীত এবং বর্তমানের মেলবন্ধনে অবশেষে উন্মোচিত হলো সকল ঘটনার পিছনের ব্যক্তির পরিচয়। সাথে যুক্ত হলো নতুন চরিত্র আর পুরোনো চরিত্রদের নতুন ক্ষমতা। অবলোহিত আর শোণিত মন্দির ধ্বংসের রহস্যভেদও করা হলো। দেশীয় প্রেক্ষাপটে একটা ট্রিলজির মোটামুটি পারফেক্ট এন্ডিংই বলা যায় আসলে। এই পর্বেও অতীত ইতিহাসের বেশ বড় একটা অংশ উঠে এসেছে। তবে এবার পড়তে খুব একটা খারাপ লাগেনি। হালকা চমক ছিলো বইয়ে, সেটা অবশ্য যেকোনো অভিজ্ঞ পাঠক আগে থেকেই আন্দাজ করে নিতে পারার কথা। তারপরেও সেটুকু পড়তে খারাপ লাগেনি৷ শুভ এবং অশুভের চাল পালটা চালে গল্প এগুতে থাকে। সম্রাট বাবরের যে ইতিহাস শুরু হয়েছিলো ২য় পর্বে, সেটার রেশ টেনে এনে শেষ পর্বে যেভাবে আধুনিক সময়ের সাথে জোড়া লাগিয়েছেন তা বেশ ভালো লেগেছে।
তবে এই জোড়া লাগানোর সময়ে কিছু কাকতালীয় ব্যাপার স্যাপারের আশ্রয় নিয়েছেন লেখক। ফ্যান্টাসি গল্পে অবশ্য অতোটুকু মেনে নেয়াই যায়। পুরো সিরিজেরই দূর্দান্ত সব একশন সিকুয়েন্সের মধ্যে সবচেয়ে সেরা একশন সিকুয়েন্স সম্ভবত এই পর্বের সর্বশেষ দৃশ্যটা। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটা চরিত্রের মাঝে সমন্বয় ঘটিয়ে পুরো দৃশ্যটা একদম পারফেক্টলি ফুঁটিয়েছেন লেখক। কেউ ব্যবহার করছে অস্ত্র, তো কেউ জাদু, কেউ বা আবার ছায়ার মাঝে আঘাত হানছে, তো কেউ রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে। উফ!! দুরন্ত, দূর্দান্ত। মৌলিক আমি খুব কম পড়ি, তবুও যতোটুকুই পড়েছি নি:সন্দেহে বলতে পারি দেশীয় মৌলিক লেখকদের মাঝে একশন দৃশ্য সাজানোর ক্ষেত্রে সৈয়দ অনির্বাণই সবচেয়ে সেরা।
এই পর্বে আক্ষেপের জায়গায় রয়েছে বর্ণনাভঙ্গির দূর্বলতা, যেটা অবশ্য পুরো সিরিজ জুড়েই ছিল। বিশেষ করে মানা এবং বেসেলির ব্যবহার নিয়ে এই পর্বে বেশ অনেকগুলো শব্দ খরচ করেছেন লেখক, যার সবগুলোই কমবেশী একই রকম লেগেছে পড়ার সময়ে। আগের পর্বের কিছু রিপিটেশনও ছিলো। যেহেতু সিরিজের বইগুলো পুরোপুরি রিলেটেড, তাই এক পর্বের ঘটনা অন্য পর্বে আবার বলার আসলে কোনো মানে ছিলো না। বানান ভুলের কথা আর কি বলবো!! অনেকেই বাতিঘরের বই নাকী পড়তে পারেন না বানান ভুলের জন্য, অথচ আমার সেগুলোতে তেমন একটা সমস্যা হয়নি কখনোই। কিন্তু এই ৩টা বই পড়তে গিয়ে হাড়ে হাড্ডিতে টের পেয়েছি বানান ভুলের বিড়ম্বনা কাকে বলে!
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ০৪/০৫
পুরো সিরিজ নিয়ে নিজের ভাবনাঃ সাম্ভালা আমাদের দেশে যতোটা জনপ্রিয় এই সিরিজটা ততটা নয়। কিন্তু আমি মনে করি এই সিরিজটাও সাম্ভালার মতোই সাড়া জাগানো উচিত। এই রিভিউটা পড়লে হয়তো মনে হবে নেগেটিভি পয়েন্ট বেশী!! কিন্তু আদপে তা নয়। আমি আসলে কোনো স্পয়লার না দিয়ে রিভিউ লিখতে চেয়েছি, তাই ভালো লাগার আরো অনেক কিছুই উল্লেখ করতে পারিনি। যারা এখনো এই সিরিজটা পড়েননি, তারা অতি সত্ত্বর পড়া শুরু করে দিন। নয়তো মৌলিক গল্প হিসাবে বেশ ভালো কিছুই মিস করতে যাচ্ছেন নিশ্চিতভাবেই।
পুরো সিরিজের রেটিংঃ ০৮/১০ (অল্প কিছু অসামঞ্জস্যতা, সাদা হাত কিংবা শোণিত মন্দিরের শুরুর ব্যাপারে ইন ডিটেইলস না জানানো আর লেখকের বর্ণনাভঙ্গির দূর্বলতা না থাকলে আমি নি:সন্দেহে এই সিরিজটাকে পারফেক্ট রেটিং দিতাম। )
প্রোডাকশনঃ পাঁচ থেকে সাত বছর আগের বই হিসাবে গতানুগতিক প্রোডাকশনই বলা যায়। প্রচ্ছদও একদমই ভালো লাগেনি। শুধু প্রথম বইটার প্রচ্ছদ যাও বা কিছুটা চলে। বানান ভুল আর সম্পাদনার অভাবের কথা তো বললামই। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বইগুলোর নতুন জীবন দরকার। বাংলা মৌলিকের এতো চমৎকার একটা সংযোজন হিসাবে এই বইগুলো ভালো সম্পাদক এবং প্রুফ রিডারের হাত ঘুরে প্রিমিয়াম প্রোডাকশনে বের হওয়া উচিত। তা সেটা বর্তমান প্রকাশনী থেকে হোক বা অন্য কোনো প্রকাশনী থেকে।
কাহিনি সংক্ষেপঃ আশুলিয়ার ঝুপড়ি ঘরটা থেকে অপহরণ করা হলো মীরানা মোরেসকে। তাও একদম সংহার চৌধুরী ওরফে অবলাল, হাফ ভ্যাম্পায়ার ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস ও ইন্সপেক্টর কায়েসের চোখের সামনে থেকে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেন সবার। মীরানাকে খোঁজার তাগিদ তো অবলালের আছেই, সেই সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন এক সমস্যার সুলুকসন্ধানের তাগিদ। আর তা হলো, ঢাকার বুকে ঘটে যাওয়া অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলীর পেছনে আসলে হচ্ছেটা কি তা জানা।
শৈলেন ভট্টাচার্য গড়ে তুলেছে অদ্ভুত এক দল। ব্যান্ডেজে আগাপাশতলা মোড়ানো যংকসুর, কালো জাদুকর ডমিনিক বায়রান, জীবন্মৃত সত্ত্বাদের উপাসক তান্ত্রিক তরন্দীদেব সহ বেশ কিছু পিশাচ আর চুড়েল মিলে প্রাচীন ও ভয়ঙ্কর এক রিচুয়াল সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর ওদেরকে খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়ে গেছে সাদা হাতের অপারেটিভ অবলাল ও তার টিমের জন্য। রিচুয়ালটা যদি শৈলেন পালন করতে পারে ঠিকমতো, নরক নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। অতিপ্রাকৃত অন্ধকারে ছেয়ে যাবে সব।
এদিকে সুদূর অতীতে মুঘল সম্রাট বাবরের দরবারে তাঁর প্রধান দেহরক্ষী রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুরের হাত ধরে হাজির হলো শোণিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লোহিত ও উপপ্রধান অবলোহিত। ভয়াবহ অসুস্থ শাহজাদা হুমায়ুনের জীবন বাঁচানোই সম্রাট বাবরের প্রধান লক্ষ্য এখন। আর এই লক্ষ্য পূরণ করতেই শোণিত মন্দিরের পুরোহিত লোহিতের সাহায্য প্রয়োজন তাঁর। ঘনিষ্ঠ অমাত্য বৈরাম বেগকে নিয়ে বিখ্যাত সম্রাট আধ্যাত্মিক এক পন্থার আশ্রয় নেয়ার পরিকল্পনা করলেন।
সাদা হাতের কার্যক্রম ঝিমিয়ে এসেছে অনেকটাই। অশুভ সব অতিপ্রাকৃতের তৎপরতার ব্যাপারে আসলে চাইলেও তেমন কিছু করতে পারছেনা তারা। আর তাই অনন্যোপায় হয়ে ফ্রিল্যান্স ভ্যাম্পায়ার হান্টার বিয়র্ণ ভিঙ্গারের সাহায্য চেয়ে বসলো সাদা হাত। সাদা হাতকে কতোটুকু শক্তিশালী করতে পারবে কিংবদন্তিতুল্য বিয়র্ণ?
বেসেলি। রক্তধারার মাঝে বয়ে যাওয়া অতিপ্রাকৃত অশেষ এক শক্তির আধার। দিগ্বিজয়কারী সমস্ত বীরের রক্তেই ছিলো বেসেলি। আর সেই বেসেলি ধারা বংশপরম্পরায় বয়ে গেছে তাঁদের বংশধরদের মাঝেও। এই বেসেলিধারী মানুষগুলো যখন পরস্পর যুদ্ধে জড়ায়, ভয়াবহ তাণ্ডব সৃষ্টি হয় চারপাশে। রক্তের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই উপাখ্যানের বর্তমান ও অতীত দুই সময়েই জমে উঠেছে একাধিক লড়াই। ক্ষমতার লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সাথেও আছে ন্যায়ের পক্ষে আর বিপক্ষের লড়াই। আর সমস্ত লড়াইয়ের সাথেই জড়িয়ে আছে একটা শক্তি। আর সেটা হলেও বেসেলি।
রক্তের এই সুবিশাল উপাখ্যানের বর্তমানে যা ঘটছে তার বীজ প্রোথিত আছে সুদূর অতীতে আর সবকিছুর পরেও ঘটনাগুলোর রেশ থেকে গেছে অতঃপরে৷ অবলাল, কায়েস, ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস, মীরানা, শৈলেন ভট্টাচার্য, রয়াল ভ্যাম্পায়ার রাতিবর, দুর্ধর্ষ ভ্যাম্পায়ার হান্টার বিয়র্ণ ভিঙ্গার আর বাঘাতুরের মতো চরিত্রদের নিয়ে অতীত আর বর্তমানে সরলরৈখিক ভাবে বয়ে চলা গল্পধারাটার যবনিকাপাত ঘটেছে অতঃপর।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সৈয়দ অনির্বাণের 'শোণিত উপাখ্যান' ট্রিলোজির শেষ বই 'শোণিত উপাখ্যান - অতঃপর'। মূলত আরবান ফ্যান্টাসি ঘরানার এই ট্রিলোজির বর্তমানকালের পটভূমি আমাদের ঢাকা। আর অতীতের পটভূমিতে দিল্লীর মুঘল রাজদরবার থেকে শুরু করে তৎকালীন বাঙ্গালমুলুক পর্যন্ত অনেক স্থানই আছে। যে গল্পটা শুরু হয়েছিলো প্রথম বই 'শোণিত উপাখ্যান - বর্তমান'-এ, তা দ্বিতীয় বই 'শোণিত উপাখ্যান - অতীত' ঘুরে এসে পূর্ণতা লাভ করলো তৃতীয় ও শেষ বই 'শোণিত উপাখ্যান - অতীত'-এ।
সৈয়দ অনির্বাণ তাঁর ট্রিলোজির শেষ বইয়ে খোলাসা করেছেন বেশ কিছু ব্যাপারে, যেগুলো পূর্বের বই দুটোতে রহস্য মণ্ডিত ছিলো। অ্যাস্ট্রাল বা অতিপ্রাকৃত জগৎ, রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুর, ও কৃষ্ণ গ্রহণ সম্পর্কে এবার সবটাই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ঢাকার বুকে অতিপ্রাকৃত সব ক্রিয়েচার যেমন, চুড়েল, পিশাচ, যক্ষদের কর্মকাণ্ড ও তাদেরকে থামানোর মিশনটা ভালোই লেগেছে। শেষ যুদ্ধের ব্যাপারটাও বেশ রোমাঞ্চকর ছিলো আর একই সাথে টুইস্ট ছিলো বেশ কিছু।
আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, 'শোণিত উপাখ্যান' ট্রিলোজির কোন খণ্ডটা আমার বেশি ভালো লেগেছে আমি আসলে উত্তর দিতে পারবোনা। তিনটা বই-ই পুরো উপাখ্যানের পরিপূরক। দেশীয় পটভূমিতে লেখা আরবান ফ্যান্টাসি ও সুপারন্যাচারাল থ্রিলারের এই কম্বিনেশন নিঃসন্দেহে অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা দিয়েছে আমাকে৷
যাঁরা ট্রিলোজিটা শুরু করতে চাইছেন, তাঁদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সিরিয়ালি পড়তে বলবো। এতে কাহিনিপট বুঝতে সুবিধা হবে, পাঠে আনন্দও আসবে।
বেশ কিছু টাইপিং মিসটেক ছিলো এই বইয়ে। যাই হোক, বইটার প্রচ্ছদ গতানুগতিক লেগেছে আমার কাছে। আরো ভালো হতে পারতো বলে মনে হয়েছে। বাঁধাই আর কাগজ নিয়ে কোন অভিযোগ নেই।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৮৫/৫ গুডরিডস রেটিংঃ ৩.৯৪/৫ ব্যক্তিগত রেটিং - ট্রিলোজিঃ ৩.৭৫/৫
এই সিরিজটা আমার ভিষন প্রিয়। এক একটা বইয়ের জন্য এত দিন অপেক্ষা করেছি যে পরে, আগের বইয়ে কি হয়েছিল তা ভুলেই গেছি! যাই হোক, প্রথম দুই অংশের মত তৃতীয় বইটা খুব ভালো লাগে নি। আবার যে খারাপ লেগেছে তাও না। তবে এক্��পেকটেশন ফুলফিল হয় নি পুরোপুরি। তবে লেখক ইতিহাসের চরিত্র 'বাবর' আর 'বাঘাতুর' কে যেভাবে উপস্থাপন করেছে তা খুবই প্রসংশার দাবি রাখে। আমি খুবই ইম্প্রেস। বইয়ের শেষের অংশের মেইন একশান টা একটু মেকী লেগেছে আরেকটু সিরিয়াস হতে পারত। তবে ওভারঅল আমার বেশ লেগেছে সিরিজটা। বাংলাদেশের আরবান ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রে বইটা সব সময়ই উপড়ের তালিকায় থাকবে। এই জন্য সাধুবাদ লেখকে।
ভালো। এন্ডিংটা আরও জম্পেশ হলে মজা হতো। বর্তমান-অতীত-অতঃপরের কাহিনী প্রবাহ এমন আলাদা না রেখে সমান্তরালে চালালেই বোধ হয় বেশি ভাল হতো। যাই হোক, সব মিলিয়ে রেকমেন্ডেড।
আরবান ফ্যান্টাসি ঘরানার বাংলা বই এই প্রথম পড়লাম। এই ঘরানার বইয়ের কাহিনীতে মূলত আধুনিক শহরের পরিবেশে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জাদু, অতিপ্রাকৃত ঘটনা কিংবা কাল্পনিক চরিত্রের মিশ্রণ দেখা যায়। তবে এই বই শুধু আরবান ফ্যান্টাসিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়নি, বরং এর পাশাপাশি ছিল থ্রিলার এবং হররেরও ছোঁয়া। বইটা তিনটা খণ্ডে বিভক্ত: বর্তমান, অতীত ও অতঃপর। . . ফ্ল্যাপে থাকা লেখাটা পড়লেই বইয়ের প্লট সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা পাওয়া যায়। "ইতিহাস কথা বলে – বিজয়ীদের কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – অতীত গৌরবের সাক্ষ্য। কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনাবলির কতটুকু তাতে অটুট থাকে? অসামাজিক কিন্তু তুখোড় পুলিশ অফিসার কায়েস হায়দারের কাঁধে চাপল অদ্ভুত এক কেস সমাধানের ভার। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়াল যেখানে যুক্তি কাজ করে না। রহস্য মানব অবলালের কাছে সাহায্য চাইল কায়েস। দু’জনে মিলে নেমে পড়ল তদন্তে। কিন্তু কেঁচো খুড়তে গিয়ে এ যে সাপের বাসা! একের পর এক অতিপ্রাকৃতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলো কায়েস আর অবলাল। আধুনিক ঢাকা শহরে এ কী নাটক জমে উঠেছে! শুধু পিশাচ, স্কন্ধকাটা, চুড়েল আর শক্তিশেলধারী যাদুকরই নয়, এর পেছনে রয়েছে আরও গুঢ় কোন রহস্য। জড়িয়ে পড়ল আরও অনেকে–সুদর্শনা মীরানা মোরেস, যে কি না প্রতি রাতে একই স্বপ্ন দেখে। শখের অকালটিস্ট নাজিম আর ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস–-কারা এরা? ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো ভয়াবহ এক চক্রান্তের জাল। সামনে রয়েছে শৈলেন ভট্টাচার্যের ভয়ঙ্কর দলবল, কিন্তু নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে অসীম শক্তিধর কেউ, কী তার পরিচয়? দেড় হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া এক প্রলয়ঙ্কর ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় সে। নিষ্ফল বসে প্রহর গোণা ছাড়া কি কিছুই করার নেই? নাকি কেউ বাড়িয়ে দেবে অযাচিত সাহায্যের হাত? সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে রক্তের মাঝে।" . . প্রথম খণ্ডটা শুরু একটা মৃত্যু দিয়ে। কয়েক হাত ঘুরে সেই কেসের দায়িত্ব পরে ইন্সপেক্টর কায়েসের হাতে। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে দৃঢ় ব্যক্তি সেইই। কিন্তু ওই মৃতদেহ দেখতে গিয়ে কায়েদের প্রায় ভিরমি খাওয়ার মতো দশা। এমনই বিকৃত সেই মৃতদেহ। মানুষ বা কোনো জন্তু-জানোয়ারের পক্ষে এমন কাজ করাটা সম্ভবই না। সেইসঙ্গে একটা গা শিরশিরে অনুভূতি কায়েসের চারপাশে জাঁকিয়ে বসে। এমন অনুভূতি চার বছর আগে আরো একবার পেয়েছিল সে। ঠিক কী ঘটেছিল চার বছর আগে? এসময়েই আচমকা আবির্ভাব ঘটল অবলাল নামক এক রহস্যময় চরিত্রের। অবলালের সাথে কায়েস হায়দারের পরিচয় হয় বেশ কয়েক বছর আগে। পরিচয়ের সূত্রপাত এক অতিপ্রাকৃত কেসকে কেন্দ্র করেই। সেটাও আবার আরেক ঘটনা। তো সেই কেসে একসাথে কাজ করতে যেয়েই দুইজনের পরিচয়, সেখান থেকে বন্ধুত্ব। আস্তে আস্তে আমরা জানতে পারি অবলাল সাদা হাত নামের এক সংস্থার সদস্য। এই সাদা হাতের কাজ হল অতিপ্রাকৃত জগতের এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের রক্ষা করা। তো কেসের সমাধান করার জন্য কায়েস চার বছর পর আবারও অবলালের শরণাপন্ন হয়। এরপর শুরু হয় একের পর এক অতিপ্রাকৃতিক আক্রমণ। একে একে আমরা দেখতে পাই যক্ষ,পিশাচ, স্কন্ধকাটা, মায়াবিনী চুড়েল, বৈতাল, জীবনমৃতসহ নানান মিথোলজিক্যাল চরিত্র। সাথে থাকে ভারতীয় উপমহাদেশের তন্ত্রমন্ত্র, হিন্দু মিথ, কিছু ডার্ক এলিমেন্টস এবং চার হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস। . . দ্বিতীয় খণ্ডটা শুরু হয় প্রথমটার লেজ ধরেই। দ্বিতীয় খণ্ডের নামই যেহেতু অতীত, তাই বোঝাই যাচ্ছে যে আমরা চলে যাব একদম পেছনের দিকে, তবে মুঘল সাম্রাজ্যে। এখানে আমরা দেখতে পাই সম্রাট বাবর বেশ চিন্তিত। কারণ অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন শাহজাদা হুমায়ুনের আয়ু আর বেশিদিন নেই। কিন্তু নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি হুমায়ুনকেই বেছে নিয়েছেন। তাই যেভাবেই হোক হুমায়ুনকে তাঁর বাঁচাতেই হবে। সেই সময় সম্রাট বাবরের দরবারে তাঁর প্রধান দেহরক্ষী রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুরের হাত ধরে হাজির হলো শোণিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লোহিত ও উপপ্রধান অবলোহিত। এভাবে শুরু হয় দ্বিতীয় খণ্ড। একই সমান্তরালে মাঝে মাঝে আমরা বর্তমানের কিছু ঘটনাও দেখতে পাই। যেমন অবলালের রহস্য কী, কেন ঢাকা শহরে অশুভ অতিপ্রাকৃতের ঘটনা বেড়ে চলছে, সাদা হাতের কাজ কী ইত্যাদি। এই খণ্ডে পাঠকদের সাথে পরিচয় করানো হয় বেশ কিছু নতুন চরিত্রের। যার মধ্যে হাফ ভ্যাম্পায়ার ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস ও সাদা হাতের প্রতিনিধি মীরানা মোরেস অন্যতম। . . এই বইয়ের শেষ খণ্ডে ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান করা হয়। যেখানে দেখানো হয় শৈলেন ভট্টাচার্যের গড়া অদ্ভুত এক দল। যেখানে আছে ব্যান্ডেজে আগাপাশতলা মোড়ানো যংকসুর, কালো জাদুকর ডমিনিক বায়রান, জীবন্মৃত সত্ত্বাদের উপাসক তান্ত্রিক তরন্দীদেব সহ বেশ কিছু পিশাচ আর চুড়েল। তারা সকলে মিলে প্রাচীন ও ভয়ঙ্কর এক যজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর ওদেরকে খোঁজার জন্য মরিয়া হয়ে আছে সাদা হাতের অপারেটিভ অবলাল ও তার দল। এই যজ্ঞটা যদি শৈলেন ঠিকমতো পালন করতে পারে, তাহলে নরক নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। অতিপ্রাকৃত অন্ধকারে ছেয়ে যাবে সবকিছু। . . রক্তের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই উপাখ্যানের বর্তমান ও অতীতে চলেছে একাধিক সংগ্রাম। ক্ষমতার জন্য লড়াই, টিকে থাকার জন্য লড়াই, ন্যায়ের পক্ষে ও বিপক্ষের লড়াই; সবকিছুই এখানে দেখানো হয়েছে। আর প্রতিটি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক অদ্ভুত শক্তি, যার নাম বেসেলি। এই বেসেলি সবার মাঝে থাকে না। কেবল বীরদের মাঝেই এই রক্তধারার মিলে। বেসেলিধারী ব্যক্তি কখনোই কোনো লড়াইয়ে হারেন না। কিন্তু যখন দুই বেসেলিধারীর মধ্যে লড়াইটা হয়, তখনই তৈরি হয় ভয়াবহ তাণ্ডব। . . লেখক শুরুতেই বলে দিয়েছেন যে ঐতিহাসিক রেফারেন্স টানা হয়েছে তার কিয়দংশ সত্যি হলেও বেশির ভাগই কল্পনা প্রসূত। তবে মূল গল্প ভালো লাগলেও, চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটু কাজ করা যেত। এখানে আমরা শুরু থেকেই দেখতে পাই রাফ অ্যান্ড টাফ পুলিশ অফিসার কায়েসকে। এরপর কাহিনীর সাথে সাথে গল্পের অন্য চরিত্রগুলোরও আবির্ভাব ঘটে। এই যেমন অস্ত্র চালনায় বিশেষভাবে দক্ষ প্যারানরমাল এক্সপার্ট অবলাল, সাদা হাতের প্রতিনিধি মীরানা মোরেস, অকাল্টিস্ট নাজিম, ক্যাপ্টেন আন্ড্রিয়াস, শবসাধক তরন্দীদেব। তো বলা যায় যে এখানে এখানে দেশীয় ভূত-প্রেত যেমন পিশাচ, স্কন্ধকাটা, চুড়েল, তন্ত্রসাধনা, অতিপ্রাকৃত শক্তি, থেকে শুরু করে বিদেশি ভ্যাম্পায়ার বা জীবন্মৃত– সবকিছুই একটু একটু করে পেয়ে যাবেন। প্রথম বইটা পড়ার পর মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই পরেরগুলো আরো ভালো হবে৷ কিন্তু তখনও বুঝিনি যে এরপর থেকে ভালো লাগার হার কেবল কমতেই থাকবে। প্রথম খণ্ডে লেখক বেশ ভালো একটা ক্লিফ হ্যাঙ্গার তৈরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বইয়ের ক্লিফ হ্যাঙ্গার ততটা শক্তপোক্ত হয়নি৷ প্রথম বই আগাগোড়া পুরোটাই ভালো ছিল। দ্বিতীয় বইয়ের মুঘল আমল অর্থাৎ অতীতের অংশটা ভালো লেগেছে, বর্তমানের পার্টটা ভালো লাগেনি। আর তৃতীয় বইয়ে আসলে ভালো লাগার মত কিছু পাইনি। জাস্ট শেষে কী হয় সেটা জানার জন্যই পড়ে যাওয়া। লেখার ধরন নিয়ে বলতে হলে বলব যে ভালোই ছিল, সাবলীল লেখা। তাছাড়া দেশীয় প্রেক্ষাপটে লেখা, তাই খারাপ লাগার কথাও না। আগের ভার্সনের তুলনায় নতুন ভার্সনের কভারটা দারুণ লেগেছে৷ বানান ভুলও একটু কম চোখে পড়েছে। বাংলা ফ্যান্টাসি বইয়ের তালিকা তৈরি করতে হলে এই সিরিজকে সেই লিস্টের একটু উপরের দিকেই রাখব। তিন বইয়ের গড় রেটিং ৩.৫/৫।
প্রথম দুইটার তুলনায় এই বইটা বোধহয় লেখক একটু তাড়াহুড়া করে লিখেছেন। বিয়র্ন ভিঙ্গার নামক চরিত্রটাকে এত কম সময় রাখা হলো, কিন্তু তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে যে আভাস পেয়েছিলাম, তাতে মনে হয়েছিল সে আরও বেশ কিছু পৃষ্ঠার দাবিদার অনায়াসেই। অবলাল আর কায়েসের চরিত্র দুইটা নিয়েও কেন যেন মনে হলো লেখক ছেলেখেলা করলেন। মোট কথায়, শোণিত উপাখ্যানের তৃতীয় খণ্ডে এসে মনে হলো লেখক শেষ করতে পারলে বাঁচেন। মোঘল দরবারে বাঘাতুর, বৈরাম খাঁ, শোণিত মন্দিরের পুরোহিত আর উপ-প্রধানের চরিত্রগুলোও উপভোগ করেছি কিন্তু মন ভরেনি। বর্ণনা অন পয়েন্টই ছিল কিন্তু কেন যেন টানেনি। সত্যি কথা বলতে সিরিজের বর্তমান আর অতীত হাত থেকে রাখতে মনই চাইছিল না। আর অতঃপরে এসে আমি আরও দুটো বই শেষ করেছি মাঝ দিয়ে। শোণিত উপাখ্যানের সাথে ভালোবাসা একদম শুরু থেকে। ট্রিলজির একদম শেষ বইটায় ভালোবাসা ফুরিয়ে না গেলেই একটু কমিয়েছে তো বটেই। তবে একটা কথা সত্য। বাংলায় আধুনিক আরবান ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রে এই সিরিজ প্রথম সারিতেই থাকবে।
যাই হোক, শোণিত উপাখ্যান আমার খুবই পছন্দের একটা সিরিজ। ফুরিয়ে গেল অতঃপরের মাধ্যমেই। চরিত্রগুলোকে নিয়ে চমৎকার সব স্পিন-অফ তৈরি করা যায়। লেখক ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন কিংবা রেখেছেন কিনা কে জানে! সিরিজের বাকিগুলোর জন্য আলাদা করে আর কিছু বললাম না।
ব্যক্তিগত রেটিং দিচ্ছি ৫+৪+৩ (আসলে অতঃপরের জন্য ৩.৫) কিছু টাইপো ছিল। সেগুলো তেমন ধর্তব্য নয়। প্রচ্ছদ বর্তমানেরটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে বেশি। প্রচ্ছদকারী এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। লেখককে ধন্যবাদ এমন চমৎকার একটা সিরিজ আমাদের উপহার দেবার জন্য...
সেরা একটা সিরিজ শেষ করলাম। পুরো ট্রিলজির কথা বলতে গেলে সুন্দর একটা সেট আপ, দেশী বিদেশী পৌরাণিক অতিপ্রাকৃত চরিত্রদের মিশেলে ভালো এক গল্প। কে নাই এখানে? পিশাচ, যক্ষ, স্কন্ধকাটা, চূড়েল, ভ্যামপায়ার, রাক্ষস, কাপালিক, তান্ত্রিক, আবার জেমস বন্ড স্টাইলের ওঝা গোষ্ঠীও সেই একটিভ। পুরোনো চরিত্র গুলো বর্তমান সময়ে এসে কিভাবে প্রযুক্তির সাথে অতিলৌকিক ক্ষমতার যুগল ব্যবহার করছে - লেখকের এই চিন্তাটা প্রশংসনীয়। আরবান ফ্যান্টাসি ঘরানার মাঝে এইটা একটা প্রিয় সিরিজ হয়ে থাকবে। স্পেশালি ব্যাসিলির কন্সেপ্টটা খুব মনে ধরেছে। কেনো দিগ্বিজয়ী রাজারা রাজা হয়ে শাসন করতে পারতেন? - এই প্রশ্নের একটা অতিপ্রাকৃত সলিউশন।
শেষ কিস্তির "অতঃপর" বইটা অনেক ফাষ্ট, রুদ্ধশ্বাসে একটার পর একটা একশন আসছে, সাথে আগের দুই বইয়ের জটগুলো খুলছে, সব মিলিয়ে পড়তে ভালোই লেগেছে। (লো কি ওয়ান্টেড টু উইটনেস মোর পাওয়ারফুল একশন ফ্রম দি ভিলেইনস, কেন যেন আবারও ফরচুন ফেভার্স দ্যা নায়ক চলে আসলো)
শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজি (ক্রম: বর্তমান, অতীত, অতঃপর) শেষ করে যথেষ্ট ভালো লেগেছে। লেখকের আরেকটা বই যকৃত পড়ে যতোটা বিরক্তি লেগেছিল সেটা কেটে গেছে ভালোভাবেই।
শোণিত উপাখ্যান আরবান ফ্যান্টাসি হলেও অতীতে এসে এটা ঐতিহাসিক ফ্যান্টাসিতে মোড় নেয়, আর তিনটি খন্ডেই থ্রিল আর হরর ছিল পুরোদমে। হরর এলিমেন্টগুলো ভয় জাগানোর চেয়ে রুদ্ধশ্বাস একশনেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ভালো লেগেছে দেশীয় হরর সাবজেক্ট এর ব্যবহার- পিশাচ, স্কন্ধকাটা, বৈতাল, যক্ষ। ভারতীয় হরর শো এর রেফারেন্স থেকে এসেছে চূড়েল আর ইউরোপ থেকে ভ্যাম্পায়ার।
এই বইয়ের প্লট নিয়ে লিখতে গেলে স্পয়লার দেয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তারপরও ফ্ল্যাপে যতোটুকু আছে তিন বইয়ের তার সাহায্য নিয়ে একটা আভাস দেয়া যেতে পারে। কিন্তু দিলাম না।
তিনটি খন্ড সম্পর্কে বরং পাঠপ্রতিক্রিয়া দেয়া যাক।
বর্তমান খন্ডে বর্তমানের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কায়েস এর সামনে থাকা জটিল আর অদ্ভুত কেস সমাধানে অবলাল এর সাহায্য নেয়া থেকে শুরু হয় মূল গল্প। ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট প্রাথমিক পর্যায়েই ছিল এক কায়েস আর অবলাল ছাড়া। অবশ্য অন্যান্যদের তখনও জোরেশোরে প্রকাশ ঘটেনি। শুরুটা হয়েছে খুবই অসাধারণভাবে, লেগে থাকার মতো। গল্পের পেস ছিল একদম ঠিকঠাক। মনযোগ না হারিয়ে কাহিনীতে ঢুকে পড়ে ফেলা যায়।
অতীতের গল্প শুরু হয় দিগবিজয়ীদের দিয়ে। এর সাথে আসে অবলালের শৈশবের গল্প৷ এবং বর্তমান অধ্যায়ে রেখে আসা কিছু প্রশ্নের উপর থেকে পর্দা উঠতে থাকে। এবং প্রথম খন্ডে লেখক প্লট, চরিত্র, গল্প মিলিয়ে যে একটা প্রমিসিং উপাখ্যান এর সূচনা করেছিলেন সে ব্যাপারটা একদমই হারায়নি। পেস একদম ঠিকঠাক, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো কাঠখোট্টা না হয়ে বরং গল্পের মতোই এসেছে। পড়তে ভালো লাগে। তুমুল একশন আর সুপারন্যাচারাল ফ্যান্টাসির সাথে গল্প একদম জমে ক্ষীর হয়ে গেছে।
অতঃপর এ এসে জালগোটানো শুরু হয়। জাল গোটানোর গতি একটু বেশিই ছিল। শেষের ওয়ান থার্ডকে সিনেম্যাটিক বলাই যায়। কিছু একশন দৃশ্য ছিল, এখানে পেস ধরে রাখা কঠিন হয়ে গিয়েছিল বইয়ের সাথে, কল্পনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। তারপরও যথেষ্ট উপভোগ্য ছিল। লেখকের মুন্সিয়ানা ছিল এইখানে যে 'প্রথম খন্ড ভালো হলেও পরেরগুলো তেমন নয়' এটা বলতে হয়নি। তিনটি খন্ডই ওয়েল কানেক্টেড। এটাকে আসলেই উপাখ্যান বলা যায়।
বইয়ের প্রোডাকশন এভারেজের চেয়ে ভালো। তবে পৃষ্ঠার মান খুবই ভালো। সে তুলনায় প্রচ্ছদের মান ভালো না। অতঃপরের প্রচ্ছদ কোন মুভি সিনের জানতে ইচ্ছা করছে। তবে প্রচ্ছদশিল্পী অনেক উন্নতি করেছেন তার পরের প্রচ্ছদগুলোতে, এটা ভালো। প্রুফ রিডিং এর অবস্থা যাচ্ছেতাই। বানান ভুল বলবো না, সব টাইপিং মিস্টেক। এমনকি ফ্ল্যাপে 'শখের' হয়ে গেছে 'রসখের'। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অদেখা করলেও শেষমেশ আর ভালো লাগছিল না। আমার গতো একবছরে পড়া বইয়ের টাইপিং মিস্টেক সব মিলেও বোধহয় এই তিনটার টাইপিং মিস্টেকের সমান হবে না।
শোণিত উপাখ্যান সিরিজ বাংলা সাহিত্যের একবারেই নতুন ধারা। এরকম বই আর লিখা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এটা ছাড়াও রাক্ষস, অসুর, ভ্যাম্পায়ার, চুড়েল, পিশাচ আর মানুষ নিয়ে অদ্ভুত একটা জগৎ সৃষ্টি করে গিয়েছেন ��েখক। কিছু কিছু জায়গা আমার কাছে অস্পষ্ট লেগেছে। সেটাকে এড়িয়ে গিয়েই বইটা ভাল বলছি। জাদুবিদ্যার ব্যাপক ব্যবহার আশা করলেও ব্যাপারটা চমকপ্রদ করতে পারেন নি লেখক। তবে মূল ভিলেনকে লেখক যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রস্তুত করেছেন। সেই তুলনায় তার মৃত্যুটা আমাকে অনন্দ দিতে পারে নাই। আর আরেক ভিলেন ভট্টাচার্য আবার আমার টাইটেলের লোক 😂। তাকে ভাল করেই মারা হয়েছে দেখে আমি খুশী। তবে তন্ত্র নিয়ে লেখক আরো পড়াশোনা করে ভাল ভাল কিছু টপিক যোগ করতে পারতেন। আশা করি আগামীতে পাবো এসব।
২০২১ এ শেষ করা প্রথম বই। লাস্ট সপ্তাহখানেক জার্নি 'শোণিত উপাখ্যান' এর সাথে এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে জার্নিটা চমৎকার ছিলো। আরবান ফ্যান্টাসি বলতে আমি যা বুঝি তাতে করে বাংলায় এমন কোন মৌলিক উপন্যাস বা সিরিজ যে আছে সেটা আমার জানাই ছিলো না।
সবচাইতে ভালো লাগার বিষয় লেখক বেশ সময় নিয়ে সিরিজের বইগুলো লিখলেও আমি পড়েছি পরপর এবং আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম বইগুলোর ফ্লো একদম ঠিকঠাক ছিলো। মনে হচ্ছিলো লেখক এক বসায় সিরিজের ৩ টি বই লিখে ফেলেছেন। বেশ চমৎকার প্লট এবং সেই সাথে মানানসই এক্সিকিউশন ও ভাষাগত বুননে সিরিজটি হয়ে উঠেছে অনন্য।
তবে এতদসত্ত্বেও একটা ব্যাপার আমার খুবই দূর্বল লেগেছে। আর সেটা হলো ওসি রবিউলের চরিত্রায়ন। যথেষ্ট দূর্বল, আনরিয়েলিস্টিক মনে হয়েছে। অন্য চরিত্রগুলো এতটাই শক্তিশালী যে আমি বই শেষ করে অবাক হয়ে ভেবেছি লেখক রবিউল চরিত্রটাকে এভাবে কেন লিখলেন? এইখানে বেশ আশাহত হয়েছি।
ফাইনালি, যারা থ্রিলার ভালোবাসেন, রহস্য ভালোবাসেন, ফ্যান্টাসি ভালোবাসেন তারা চোখ বন্ধ করে এই সিরিজটি হাতে নিয়ে নিন (অবশ্য আমি বাদে 'শোণিত উপাখ্যান' আর কারো পড়া বাকি আছে কিনা, তা নিয়ে আমি সন্দিহান)। স্পেশালি যারা 'ড্রেসডেন ফাইলস' এর ভক্ত তাদের জন্য তো এইটা মাস্টরিড।
ঘন্টা ২ লেগেছে শেষ করতে। এক বারেরই শেষ করলাম। কাহিনী এগিয়ে গেছে দুর্ধর্ষ গতিতে। অনেক সুন্দর ভাবে একটার পর একটা প্লট সাজিয়েছে৷ আরামছে পড়া গেছে৷ তবে গত সিরিজ দুটা অনেক আগে পড়ে কাহিনী ভুলে গেছিলাম এই কারনে লয় ফিরতে সময় লেগেছে৷
বইয়ের একটা প্রবেলেম এত এত ক্যারেক্টর এক কাহিনীতে তাদের আবার ডাবল ডাবল নাম পড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছি মাঝে কিন্তু লেখক সেটা সামাল দিয়েছে সুন্দর ভাবে৷ তবে শেষ দীকটা বেশি নাটকীয় বা মুভির কপি মনে হয়েছে৷
অতীতের পাপ, বর্তমানের প্রায়শ্চিত্ত, প্রলয়ের আতঙ্ক...অত:পর কি? আগের দু'খন্ডে লেখক আস্তেধীরে যে বিরাট কন্সপিরেসি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার সর্বাঙ্গীন পূর্ণতা এবং সমাধান হয়েছে এ পর্বে। গল্পের শুরুটা হয়েছিল যেরকম উত্তেজনা দিয়ে শেষও হয়েছে তেমনি উত্তেজনার সাথেই। কিন্তু লেখক লাস্টে 'শেষ হইয়াও হইলনা শেষ' মার্কা একটা ফিলিংস দিয়ে রেখেছেন। তবে একটা কথা না বললেই নয়, লেখক সাহেব যদি এ রিভিউ পড়ে থাকেন, তাহলে তার প্রতি অনুরোধ, শোণিত সিরিজের আরও বই লিখুন প্লিজ। কাহিনী তো এখনও আগানোর সুযোগ আছে। ৪.৮/৫
কেমন লাগবে যদি দেখেন আপনার এই প্রাকৃত শহরে হটাৎ করে অতিপ্রাকৃত জগতের পিশাচ, স্কন্ধকাটা, চুড়েল, বৈতাল সহ পশ্চিমা ভ্যাম্পায়ারও এসে হাজির হয়েছে? এইযে আমরা ইতিহাস পড়ি তার কতটুকুই বা আমাদের সামনে অটুটভাবে প্রকাশিত হয়?
বলছিলাম শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজির কথা। শোণিত মানে রক্ত, আর উপাখ্যান মানে কাহিনী অর্থাৎ রক্তের কাহিনী। আর এই রক্তের সব গূঢ় রহস্য নিয়ে কাজকারবার শোণিত মন্দিরের পুরোহিতদের। বলা হয়ে থাকে সম্রাট অশোকের সময় থেকে বা তারও আগে এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিলো এই পশ্চিম বঙ্গেরই কোথাও। যা কালক্রমে গেছে সময়ের গহব্বরে বিলীন হয়ে। সেই হাজার বছরের অতীতের ছায়া কোন সে রহস্য নিয়ে হটাৎ করে হাজির হয়েছে এই যান্ত্রিক নগর ঢাকায়?
ট্রিলজির ৩ খন্ডের নাম রাখা হয়েছে বর্তমান, অতীত ও অতঃপর। আগে কাহিনী সংক্ষেপ বলে নেই।
বর্তমানঃ এক ভয়াবহ অস্বাভাবিক হ ত্যা কান্ডের মাধ্যমে গল্পের শুরু। তদন্তের দায়িত্ব চাপলো অসামাজিক কিন্তু তুখোড় ইন্সপেক্টর কায়েসের উপরে। যুক্তির বাইরে ঘটা ঘটনার সমাধানের জন্য সাহায্য চাইতে কায়েস শরণাপন্ন হলো এক রহস্য মানব অবলালের সাথে। কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপের বাসা। একের পর এক অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটেই চলছে। সেই সাথে মঞ্চে উঠে আসছে রহস্যময় সব চরিত্র। তারপরে?
অতীতঃ বর্তমানে উঠে আসা রহস্যময় চরিত্রদের অতীত এই খন্ডে বর্ণিত হয়েছে। আটিলা দ্যা হান, চেঙ্গিস খান, আলেকজান্ডার এবং সম্রাট বাবর কিভাবে এই ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছেন তার কিছুটা আভাস রয়েছে এখানে। সাদা হাত, অবলাল, ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস, মিরানা তাদের পরিচয়ের খোলাসা তো হলো কিন্তু অভিযান শুরুর আগেই এ কেমন বিপদে জড়িয়ে গেলো তারা?
অত:পরঃ সেই যে বর্তমান শুরু হয়েছিলো এক অস্বাভাবিক হ ত্যা কান্ডের মাধ্যমে এর যবনিকাপাত ঘটে এই খন্ডে। অশুভর সাথে শুভর লড়াই। কিছু ছেড়া সুতোর সমাধান। এক অযাচিত ধবংসের হাত থেকে ঢাকাবাসীকে কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা গেলো?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সত্যি বলতে এরকম টান টান উত্তেজনা অনেক দিন বাদে অনুভব করেছি। শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনীর বর্ণনায় বুঁদ হয়ে ছিলাম আমি পুরোটা মূহুর্ত।
আমাদের দেশীয় মিথ নিয়ে দেশীয় পটভূমিতে এত দারুণ একটা ফ্যান্টাসি গল্প হতে পারে আমি আশা করি নাই। লেখক খুব দক্ষতার সাথে সাসপেন্স ধরে রেখেছেন একেবারে শেষতক।
বর্তমান খন্ডে যে প্রশ্ন উঠেছে মনে তার উত্তর বাকি দুই খন্ডেই সুন্দরভাবে পেয়েছি। আমি পড়তে পড়তে ভাবছিলাম যারা প্রথম খন্ড পড়ে বাকি দুই খন্ডের অপেক্ষায় ছিলেন তাদের ধৈর্য্য মাশাল্লাহ। আমি হলে পাগলই হয়ে যেতাম মনে হয়।
শেষ করার পর থেকে মনে হচ্ছে কেন শেষ হইলো? এই জগত থেকে আমি বের হতে চাই না। এমনই অবস্থা হয়েছে যে এখন যা পড়ছি সেটাও আমি ওই ইউনিভার্সে নিয়ে চিন্তা করতেছি।
যাই হোক আমি এটাও ফিল করলাম এইটা অনেক আন্ডাররেটেড। পড়ার আগে আমি জানতামও না যে এত আগে এইটা প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম প্রকাশনী নতুন করে বের না করলে আমার নজরে আসতো কিনা সন্দেহ আছে আমার।
বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি চমৎকার। বানান ভুল শেষ খন্ডে ছিলো কয়েকটা। আর তিন খন্ডেই "বিদ্যা" কে "বিদ্য" লেখা হয়েছে।
অতঃপর শেষ হলো শোণিত উপাখ্যান ত্রয়ী। বেশ ভালোই লেগেছে সিরিজটা, অন্তত যে-সময়টায় বেরিয়েছে সিরিজটা, সে-সময়ের বিচারে। কিছু জিনিস একটু চোখে লেগেছে, যেমন ক্রুশিয়াল মোমেন্টে এসে ডিয়াস এক্স মাকিনার ব্যবহার। বেশি বললে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই বলা যাচ্ছে না। আর কৃষ্ণ গ্রহণের ব্যাপারটা পুরোপুরি বার্জার্ক থেকে নেয়া হয়েছে বলেই মনে হলো। যেমন, বার্জার্কে গডহ্যান্ডরা যখন আবির্ভূত হয়, সেটার অনুরূপ চিত্রই দেখা যায় শোণিত উপাখ্যানে। তাছাড়া বলি হিসেবে দু জায়গাতেই একই ধরনের চরিত্রকে দেখা যায়, আর কৃষ্ণগ্রহণ আর এক্লিপ্স দুটোতেই যাকে উৎসর্গ করা হয়, দুজনের ক্ষেত্রেই একই ইফেক্ট পড়তে দেখা যায়। সিমিলারিটিজ খুব বেশি মনে হয়েছে। এছাড়া বেসেলির একটা ক্ষমতা শেষে যেভাবে দেখানো হয়েছে, পছন্দ হয়নি।
ওভারল সিরিজটা বেশ ভালো। লেখনশৈলী, কাহিনির বিল্ড-আপ, অতিপ্রাকৃত চরিত্রসমূহ নির্মাণ, অ্যাকশন সিকোয়েন্স সবমিলিয়ে বেশ চমৎকার কাজ হয়েছে বলা যায়। অ্যাকশন সিকোয়েন্সের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে সামনাসামনি বসে মারপিট দেখছিলাম। বই রেটিং - ৩.৫/৫ ওভারল সিরিজ রেটিং - ৪/৫
কিছু কিছু সিরিজ পড়ার সময় মনে হয়, যে বইগুলো আলাদাভাবে যাচাই করা কষ্ট হয়ে পড়ছে। শোণিত উপ্যাখ্যান পড়তে গিয়ে এমনই লাগলো। এজন্যই রিভিউটা আলাদাভাবে না দিয়ে শেষ বইটায় দেয়া।
প্রথম বইটা অনেক একশননির্ভর তবে অনেককিছু বুঝা যায় না। তবে এই বইটা বেশ ভালো ছিল যেই কারণেই এর পরপরই পরের বইটা শুরু করেছি।
দ্বিতীয় পর্ব আবার, প্রায় পুরোটাই ইতিহাসকেন্দ্রিক। এইখানে কাহিনি কিছুটা স্লো লাগে। আমার মতে এই দ্বিতীয় বইটার বিষয়বস্তু আমি প্রথম বইতে পড়লে ভালো লাগতো।
শেষ বইটায় কিছুটা হতাশ। কারণ,এবার কাহিনি এবং মালমশলা উভয়ই থাকার পরও সমাপ্তিটা তাড়াহুড়ো লেগেছে। অন্য বইদুটো থেকে যা পেয়েছিলাম সেই তুলনায় শেষটা খানিকটা দায়সারা হয়ে গেল। আর এইবইটাই শেষ করতে আমার বেশি সময় লেগে গেছে।
কেন এই অনির্বাণ লোকটা আরেকটু বেশি করে লেখে না? আমি জিন্দেগিতে দুটার বেশি ফ্যান্টাসি বই পড়ি নাই- আর পড়বও না মনে হয়। কিন্তু ভদ্রলোকের জন্য তিন পর্ব পড়লাম। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য তাকে ধন্যবাদ।
শোণিত উপাখ্যান পড়ে একটা কথাই বলতে পারি- লেখকের অসম্ভব মেধাকে প্রতিফলন করছে এই ট্রিলজি- তবে তার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের ছাপ লেখার মানে পড়ায় বেশ একটা ক্ষতি হয়েছে... হয়তো আরেকটু যত্ন নিলে এই আরবান ফ্যান্টাসি কালোত্তীর্ণ হয়ে থাকতে পারত! আফসোস... শুভেচ্ছা রইল...
শেষ করলাম বাংলাদেশের প্রথম urban fantasy genrer সিরিজ । শেষটা একটু বিক্ষিপ্ত মনে হলেও, পুরো সিরিজটাই ছিল টানটান। অত্যন্ত সুন্দর ভাবে আমাদের দেশীয় পেত্নী, পিশাচ এর কনসেপ্ট এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে বিদেশী royal vampire এর কনসেপ্ট। যদি না আগে এইধরনের বই পড়া থাকত, তাহলে আরো সুখপাঠ্য হত এই সিরিজটি।
শোণিত উপাখ্যান অতিত এবং বর্তমানের পর এই পর্বটা, গতদুটার বইয়ের মিলন ঘটে এই পর্বের। বর্তমানে অবলাল, মীরানা এবং অ্যান্ডিয়াসের অতিত শেষ করার পর দিয়েই শুরু হয় অতঃপর এর গল্প। সব শক্তিশালী সাদা হাতের দল এক হচ্ছে, মীরানাকে বন্দি করে নিয়ে যায় এক ছায়া মানব। যে ছায়ার থেকে বের হয়ে ছায়াতেই হারিয়ে যায়। তার ভীতর আবার অবলালের ভালোবাসা জেগে উঠে মীরানের জন্য। তারই ভীতর কায়েস আহত, অ্যান্ডিয়াসের ভ্যাম্পায়ার ক্ষমতা কি পারবে ছায়া মানবকে ট্রেক করতে? নাকি সত্যি আবারও মীরানাকে হারাতে যাচ্ছে অবলাল, অ্যান্ডিয়াসের ট্রেক করতে গিয়ে দেখতে পায় বিশাল এক কালো অধ্যায় এগিয়ে আসছে এই প্রানের শহর ঢাকাতে।কি করে কি করতে পারবে তারা? নাকি মীরানের সাথে ধ্বংস হবে এই শহর? কি এমন অশুভ শক্তিকে নামিয়ে আনতে চাচ্ছে অন্ধকার জগৎতে র বাসিন্দারা,যার কারণে অ্যান্ডিয়াসের মাথা নামাতে হয় তার পিতার কাছে? আবার অবলাল বিপদ সংকেতও পাঠাতে হচ্ছে সাদা হাতের হেডকোয়াটারে?
অপর পাশে সম্রাট বাবর শোণিত মন্দিরে র প্রধানের জন্য অস্থির হয়ে আছে। বাঘাতুর কি ফিরে আসবে নাকি তার সন্তান হুয়ামূন কে বাচাতে ব্যর্থ হবে? সব কিছুর অবসানের অপেক্ষায় বাবর, যে সম্রাটের কাছে সমস্ত ভারত উপমহাদেশেও মাথা া নিচু করে থাকে, সেখানে বরাবরই আজ শোনিত মন্দিরের প্রধান লোহিতর কাছে অপারগতা দেখিয়ে আছে। হুমায়ূন কে বাঁচাতে বাবর কি করবেন?
-আমারকথা
বাংলাদেশে এমন ফ্যান্টাসি বই সত্যি ভাবা যায় না,চরম লেভেলের একটা টান টান ভাব রেখেই গল্পটা শেষ হয়। সত্যি বলতে আমার কাছে প্রথম পর্বটার থেকেও এটা ভালো লেগেছে। তবুও লেখকের একটা ব্যাপার খুব বিরক্তি কর ছিলো। যে পর্ব হিসেবে গল্পটা এগিয়েছে, সে খানে তিনি আরও একটু বড় করে একটা পর্ব থেকে অন্যটাতে যেতে পারতেন। এমন হয়েছে যে,একটা পর্ব শেষ হবার সময়টা খুব কম সময় নিয়েছেন। বার বার গল্পটার ছন্দপথ হয়েছে যার কারণে।
লেখক পুরা বইটাতে পর্ব গুলাকে ছোট একটা গল্পের মতো পার্ট পার্ট করতে গিয়ে এই ব্যাপারটা হয়তো এড়িয়ে গেছেন। যখনই কোনো একটা কাহিনী জমে উঠেছে,ঠিক তখনই অন্য একটা পর্বের ডুকতে হয়েছে। তখন পুরা মুডটাই বদলে যাচ্ছে পাঠকের, সেটা খুব বিরক্তি কর। তিনি চাইলে একটু বেশি সময় রেখে একটা পর্ব শেষ করতে পারতেন।
এই একটা ব্যাপার ছাড়া পুরা বইটাতে একটুও খারাপ লাগেনি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি,লেখকের সমালোচনা করা যায় যদি যুক্তি দিয়ে দেখানো যায়,তাই কথা গুলা বলা।
আমি মনে করি বইটা ১০ এ ১০ পাবার মতোই। এই বইমেলা থেকে ২১টা বই কালেক্টকরা। তার মধ্যে এটাও আমার মনে হয় সেরা গুলার একটা বই।
-আপনারাপড়বেন কেনো?
আপনাদের পড়া উচিৎ এই জন্য যে,বাংলাদেশি লেখক হিসেবে এই বইটা সত্যিই চমৎকার। তাছাড়া এই বইটাতেও লেখক তার চরিত্র গুলাকে জীবন্ত হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন। তার থেকেও বড় কথা যারা ফ্যান্টাসি টাইপ বই পছন্দ করেন তাদের এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি পড়া উচিৎ। সময় এবং টাকা কোনোটাই ক্ষতি হবে না। প্রত্যিটা চরিত্রকে খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। মনেই হয় না ওনার চার নাম্বার বই এটা।
“শোণিত উপাখ্যান: অতঃপর” শেষ করার ভেতর দিয়ে “শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজি”র সমাপ্তিতে আসা হল। এই ট্রিলজির সাথে যাত্রাকে একেবারে মন্দ বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। শতাব্দী বিস্তৃত প্লট, অদ্ভুতুড়ে চরিত্র সব, সব গুটিয়ে একটা সন্তোষজনক পরিসমাপ্তি টানা হলো শেষ পর্যন্ত। তাতে উপলব্ধি হল, সৈয়দ অনির্বাণের সবচাইতে বড় দূর্বলতা সংলাপ। গল্পের বিস্তৃতি, ঘটনা সৃষ্টি, চরিত্র তৈরীতে তিনি সংলাপ লেখার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। অবলাল আর অবলোহিত কিংবা সংহার আর সংহতি অথবা এ্যান্ড্রিয়াস আর রাতিবর’র সম্পর্ক চমকপ্রদ ছিল। ট্রিলজির ২য় বইটার সংলাপ ভাল ছিল তূলনামূলক ভাবে কিন্তু সেটাতে “চটক” বা “গিমিক” কমে গিয়েছিল অনেকটাই। শেষ বইয়ে গল্পকে ছাপিয়ে গেছে ব্যখ্যার পরিমাণ, হয়তো র্যাপাপের তাগিদ থেকেই; সেটা মেনে নিলেও পড়ার জন্য আরামদায়ক ছিল না ব্যাপারটা। তবে মোটা দাগে, “শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজি”কে খারাপ বলে ফেলার জায়গা নেই একদম। লেখকের কৃতিত্ব বা মেধাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তার বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা, পড়বার সময় অবিশ্বাস্য বিষয়-আশয় কে দেখে নিতে দেয়।