ঠগির জবানবন্দি
লেখক: ফিলিপ মিডোয টেলর
রূপান্তর: মারুফ হোসেন
১৭ আর ১৮ শতকের দিকে বাংলাসহ উত্তর ভারতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা যত মানুষ হত্যা করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। কেবল ১৮৩০ সালেই ঠগীরা প্রায় ৩০,০০০ মানুষ হত্যা করেছে। ১৯ শতকের দিকে যেসব ঠগি ধরা পড়ে, তারা অন্যান্য ঠগিদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজসাক্ষী হিসেবে কাজ করা শুরু করে, বইয়ের মূল নায়ক আমির আলি তাদেরই একজন। আমির আলি তার দস্যুজীবনে নিজ হাতে ৭১৯ জন মানুষকে খুন করেছে। কী? শুনে অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার কিছু নেই, বইটি পড়লেই জানতে পারবেন যে সে এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলেনি৷ 'ঠগির জবানবন্দি' বইটিতে উঠে এসেছে কীভাবে আমির আলির পরিবারকে এক ঠগিই নিঃশেষ করে দিয়েছিল, আবার সেই ঘাতক ঠগিই আমির আলিকে নিজ সন্তানের মতন লালন করে একজন দক্ষ ঠগি হিসেবে তৈরি করেছে। অনুবাদের বই পড়ার সময় মনটা একটু খচখচ করে, তবে বইটা পড়ার সময় একটুও একঘেয়েমি পেয়ে বসেনি, পড়ার সময় মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন নিজের চোখের সামনেই ঘটা৷ বইটা পড়লে ঠগিদের সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক কিছুই জানা যাবে।
'ঠগি' সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি 'প্রথম আলো'র একটা প্রতিবেদনের মাধ্যমে। অনেক বছর আগে পড়েছিলাম, পুরো কাহিনি সেভাবে মনেও নেই। সেখান থেকে জানতে পেরেছিলাম এই উপমহাদেশে সপ্তদশকের শেষ দিকে বেশ কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ রকমের অস্থিরতা তৈরি হয়৷ হাজার হাজার লোক পথ চলতে যেয়ে হঠাৎ করেই হারিয়ে যেত৷ যেই রাস্তা দিয়ে তারা যেত, সেখানে কোনোধরণের রক্তপাতের চিহ্নও পাওয়া যেত না। বলা হয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকরতম গোপন খুনিদের দল এই ঠগিরা। ঠগিরা ছিল ভারতবর্ষের একটি বিশেষ শ্রেণীর খুনী সম্প্রদায়। এদের মতন নিষ্ঠুর আর নিপুণ খুনীর দল পৃথিবীতে শুধু নয়, ইতিহাসেই বিরল।
প্রাচীনকাল থেকেই গোটা ভারতবর্ষ অনেকগুলো খণ্ড-খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল, ফলে সব রাজ্যকে একসাথে আইনের আওতায় আনাও যেত না। একেক রাজ্য একেক খেয়ালের শাসক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। তাছাড়া পথঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো ছিল না৷ ফলে চলার পথে একদল পথিকের সাথে আরেক দল পথিকের দেখা হয়ে গেলে সাত-পাঁচ ভাবা ছাড়াই মিশে যেত তাদের সঙ্গে৷ আর এ অবস্থার সুযোগ নিয়েই ঠগিরা সন্তপর্ণে তাদের কাজ শেষ করতো৷ কারণ তারা চলত দলবেঁধে। কখনো ব্যবসায়ী, কখনো তীর্থযাত্রী, আবার কখনো সৈনিকদের বেশে চলত। চেহারায়, পোশাক-আশাকে আর দশজনের সঙ্গে মোটেই তাদের পার্থক্য করা যেত না। তাদের সাধাসিধে মুখ দেখলে কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারত না এরা এমন ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে।
১৩৫৬ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি লিখিত ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ গ্রন্থে ঠগিদের কথা প্রথম জানা যায়। এই ঠগি শ্রেণীর মানুষেরা উত্তর ভারতে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এরপর বহু শতাব্দী ধরে বংশ পরম্পরায় তাদের এই কর্মকান্ড চালাতে থাকে। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়��তো, পথে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তারপর সময় সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মেরে ফেলে সবকিছু লুট করতো।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে তারা কিন্তু ঢাল-তলোয়ার কিংবা তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করতো না। তারা আক্রমণ করতো এক টুকরো রুমালের মধ্যে রূপার মুদ্রা পেঁচিয়ে। একবার গলায় পরলে সে ফাঁস থেকে নিস্তার পাওয়ার সাধ্য ছিল না কারও। রক্তপাত ছিল ঠগিদের মধ্যে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
'ঠগ' একটি সংস্কৃত শব্দ যা থেকে ঠগি শব্দটি এসেছে। শাব্দিকভাবে এর অর্থ ধোঁকাবাজ, প্রতারক। বাংলা অভিধানে ঠগি বলতে বিশেষ শ্রেণীর এক দস্যু দলকে বোঝায় যারা পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে হত্যা করে।
বইটি থেকে জানা যায়, ঠগিরা সবসময় দল বেঁধে চলাচল করতো। বেশিরভাগ সময়েই তারা বিদেশি বণিক, তীর্থযাত্রী কিংবা সৈনিকের ছদ্মবেশে ভ্রমন করত। এদেরই লোকজন গোপনে বাজার কিংবা সরাইখানা থেকে পথযাত্রীদের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য যোগাড় করত। তারপর যাত্রীদের সঙ্গে মিশে যেত। নানানরকম গল্প, গান বাজনা, খাবারের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তারা তাদের শিকারের বিশ্বাস অর্জন করতো৷ আর তখনই আসতো সর্দারের হুকুম। সর্দারের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যাত্রীদের ওপর ঘটতো নির্মম হত্যাকাণ্ড। একজন যাত্রীকে খুন করত তিনজনের একটি দল। একজন মাথা ধরে রাখত,অন্যজন ফাঁস পরাত, আরেকজন পা চেপে ফেলে দিত। কেউ পালিয়ে গেলেও রক্ষা নেই, ঠগীদের অন্য দলটি কাছেপিঠেই ওত পেতে থাকত।
বিজয়া দশমীর দিনকে ধরা হতো ঠগিদের জন্য সবচাইতে শুভদিন৷ ওইদিনই তাদের দীক্ষানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো৷ যদিও ঠগিদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বীর মানুষেরা ছিল, তবে তাদের একটা সাধারণ ধর্মবিশ্বাস ছিল। ঠগিরা সবাই ছিল মা ভবানী বা কালীদেবীর উপাসক। তাদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিমসহ অনেক ধর্মের লোক ছিল। তারা বিশ্বাস করত, তারা যা করছে সব দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য। অদ্ভুত সব কুসংস্কারও ছিল তাদের। যেমন রওনা হওয়ার আগে কোদাল মন্ত্রপূত করা, ঘুঘু, গাধা বা প্যাঁচার ডাকের জন্য অপেক্ষা করা। তাদের মতে এই কাজে কোনো পাপ নেই। দীক্ষানুষ্ঠানে দীক্ষাপ্রাপ্ত ঠগির হাতে ছোট একটা খন্তা তুলে দেওয়া হয়, যেটা তাদের পেশার পবিত্র চিহ্ন। এরপর তাকে পবিত্র গুড় খেতে দেওয়া হয়। তাদের মতে, যে একবার এই গুড় খাবে, সে ঠগি হয়ে যাবে।
তবে ঠগিরা সবাইকে হত্যা করতো না। কিছু গোত্রের ব্যক্তিদের হত্যা করলে নাকি সেই বলি দেবী গ্রহণ করেন না। সেই গোত্রগুলো হচ্ছে: ধোপা, ভাট, শিখ, নানকশাহী, মুদারি ফকির, নাচিয়ে, গায়ক, ভাঙ্গি, তেলি, লোহার, বুরেশ, পঙ্গু ও কুষ্ঠরোগী৷
ঠগিদের নিজেদের মধ্যেই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন করা হতো। যেমন: 'সথা'রা হলো মিষ্টি কথায় পটু ঠগি৷ ওরা নানা ছলাকলায়, মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিরীহ পথিককে দলের বাকিদের কাছে নিয়ে আসে। যারা ফাঁসুড়ের কাজ করে, তাদেরকে বলা হয় 'ভুট্টোটি'। যাদের কাছে টাকাপয়সা জমা রাখা হয়, তাদেরকে বলা হয় 'জমাদার'। পুলিশের গতিবিধি নজরে রাখতো যারা তাদেরকে বলা হতো ‘তিলহাই’, তারা দল থেকে খানিকটা পিছনে থাকত। নিরাপদ জায়গা দেখে তাঁবু গড়ার দায়িত্ব থাকত ‘নিসার’দের উপর। কবর তৈরি করারে দায়িত্ব যার তাকে বলা হতো ‘বিয়াল’। শিকারকে যে ধরে রাখবে তাকে বলা হতো ‘চামোচি’।
এই ঠগিরা নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা আদান প্রদান করতো। যেমন- ‘বাসন মেজে আনার কথা’ বলার মধ্য দিয়ে সর্দার তার এক ঠগিকে কবর তৈরি করার নির্দেশ দিত। ‘ঝিরনি' শব্দে হত্যার প্রস্তুতি আর ‘তাম্বাকু লাও’ শব্দের মাধ্যমে হত্যার আদেশ দেয়া হতো। এই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস জড়ানো হতো শিকারের গলায়।
বছরের সব সময় তারা খুন করত না। এমনিতে তারা সাধারণ গেরস্তের মতোই জীবনযাপন করত। বিশেষ একটা সময় এলেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেত। আর দল ভারী করত বংশপরম্পরায়। ঠগির ছেলেকেও সে নিয়ে আসত এই পেশায়। তবে সেটা সাবালক হওয়ার পর। তার আগ পর্যন্ত তাকে দলে রাখা হতো কিন্তু কিছু করতে দেওয়া হতো না।
এ রকম যে ভয়াবহ একটা গুপ্ত সংগঠন আছে, সেটা ব্রিটিশ সরকার প্রথম জানতে পারে ১৮১২ সালে। গঙ্গার ধারে একটা গণকবরে পাওয়া যায় ৫০ জনের লাশ। তাদের সবার হাড়ের সন্ধিস্থল ভেঙে দেওয়া। এর পরেই আসলে টনক নড়ে সরকারের। কাকতালীয়ভাবেই ঠগিদের একটা দলের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন কর্নেল উইলিয়াম স্লিম্যান নামের এক ইংরেজ রাজকর্মচারী। ১৮৩০ থেকে ১৮৪১ সালের মধ্যেই প্রায় তিন হাজার ৭০০ ঠগি ধরা পড়ে। তাদের প্রায় সবাইকে পরে ঝুলতে হয় ফাঁসিতে, যে ফাঁস দিয়ে তারা মেরেছিল লাখ লাখ পথিককে।
তারপর ১৮৩০ সালে স্লিম্যান গুপ্তচরদের দক্ষতায় ঠগিরা দলে দলে ধরা পড়তে থাকে। এদের কারো কারো মৃত্যুদণ্ড, কারো যাবজ্জীবন জেল, কারো বা দ্বীপান্তর দিয়ে এদের দমন করতে সক্ষম হন। বাকি যারা ছিল তারা ভয়ে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ফলে ভারতবর্ষ ঠগি মুক্ত হয়। এরপর শুরু হয় তাদের বিচারপর্ব এবং সেখানে উঠে আসে তাদের নানা অজানা রোমহষর্ক কাহিনি। বাহরাম বলে এক নিষ্ঠুর ঠগীর নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ৯৩১ জন মানুষকে সে খুন করেছিল বলে দাবি করে এবং পরবর্তীতে ঐ নাম গিনেস বুক অব রেকর্ডে ওঠে!
পুরো বইটা পড়লেই ঠগিদের সম্পর্কে আরো অনেক কিছুই জানা যাবে। কীভাবে তারা তাদের অভিযানগুলো চালাতো, কীভাবে তারা তাদের শিকার ধরে আনতো এবং এক নিমিষেই মৃতদেহগুলো লুকিয়ে ফেলতো। এত বড় রিভিউ লিখতে আমার ভালো লাগে না, তবুও বইটা পড়ার পর মনে হলো এই বইয়ের ব্যাপারটা সবার সাথে শেয়ার করা দরকার। বইটা পড়ে দেখতে পারেন, আশা করি আপনাদের সবার ভালো লাগবে 😁