দারুণ বই। এই ওয়েদারে পড়ার জন্য এর চেয়ে ভালো বই কম হয়। এই শীতে দরকার জম্পেশ খাওয়াদাওয়া আর ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি। সেটা কোনভাবে করতে না পারলে কম্বলের নিচে সেঁধিয়ে এই রসনাতৃপ্ত করা বইখানা নিয়ে বসে পড়াই যায়! লেখক নিজেই বলেছেন তাঁর নাকি নোলা-সর্বস্ব জীবন। যেখানে যা পান, চেখে দেখেন। এই বইতে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে গিয়ে পাহাড়ের খাবার চেখে দেখেছেন আর আমাদের জন্য রেখেছেন চমৎকার বর্ণনা। আসলে ভাষার মতোই প্রতিটা জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস ভীষণ ইউনিক আর খুবই প্রিয় তাদের নিজের কাছে। আমাদের কাছে পাহাড়ি কোন একটা পদ হয়তো নাক সিঁটকানোর মতো লাগতে পারে, আবার আমাদের কোন রান্না তাদের কাছে বাজে লাগতে পারে! আমি তো শুঁটকি কত ভালোবেসে খাই, আবার অনেকেই শুঁটকি নাম শুনলেই নাক কুঁচকায়! খাবার অভ্যাসটা বেশ ব্যক্তিগত। আর ভালো খাদ্য, সুন্দর পরিবেশনা সব মিলিয়ে নি:সন্দেহে উঁচুদরের শিল্প। এই বইয়ে খাবারের পাশাপাশি এসেছে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরার অপরূপ বর্ণনা। সংযোজনে বেশ কিছু বইয়ের নাম জানতে পেরেছি যেটা আমার জন্য উপরিপাওনা। চমৎকার মানানসই প্রচ্ছদসহ এই বইটি প্রকাশ করেছে লিরিকাল।
আমার মানসলোকে লেখক দামু মুখোপাধ্যায়ের খ্যাটন অভিজ্ঞতার সঙ্গী আমি বহুদিন। তাই প্রথম থেকেই এই বইয়ের ওপর তাক করে বসে ছিলাম। অতি বাজে লোক এই লেখক মশাই। আমাদের মত সাধারণ লোককে লোভ দেখানো যে অত্যন্ত অন্যায় কাজ। এন্তার লোভ দেখিয়েছেন লেখক। তবে এই বইটিকে শুধুমাত্র একটা সাধারণ খাবারের বইয়ের পর্যায়ে ফেলতে আমি নারাজ। বাংলাতে ফুড টুরিজ্যিম নিয়ে তেমন কোন বই সম্পর্কে আমার জানা নেই। পাহাড়ে আহারে তাই ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ী জাতি উপজাতির খাদ্য সংস্কৃতির একটা দলিল।
কাশ্মীর মানেই কেবল এ কে ফোর্টিসেভেন বা মর্টার নয়, এখানে শুধু বারুদের গন্ধ না এই স্বর্গে তুজ্জে কাবাব, রিস্তা আর গুশতবার গন্ধ ও ছড়িয়ে আছে। আর হ্যাঁ ওটাই আসল কাশ্মীর। পাঠক এখানে লেখকের হাত ধরেই পৌছে যাবে ভারতের বিভিন্ন না জানা খাদ্য ও পানীয়ের বিপুল সম্পদের বুফে তে।
অহেতুক জ্ঞান দেবার প্রবনতা বা বিদ্যা জাহিরের বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। বরং এক নির্ভেজাল স্বর্গীয় স্বাদের জগতে পাঠক কে স্বাগত জানিয়েছেন লেখক। বইটির প্রথম পাতা খোলার সাথে সাথেই পাঠক প্রবেশ করবে এক অনাস্বাদীত জগতে। তবে সতর্ক বার্তা আছে। এই বই পড়লে পাঠকের মনের ভেতরের দামু মুখোপাধ্যায় জেগে উঠতে পারে কিন্তু। আর পড়তে গিয়ে খিদে পেলে কিন্তু আমার দোষ দেবেন না।
বইয়ের জগতে এখন বেশ চেনা নাম লিরিকাল। নামের মতই ওনাদের প্রকাশিত বই গুলো যেন শব্দ সুরের যুগলবন্দী। তবে প্রতিবারের মতই বলি বইয়ের দাম বেশ গায়ে চ্যাকা দেবার মত। এই খাবারের থালা থুড়ি বইটা বেশ মহার্ঘ।
এই বইটি বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এই বই স্রেফ পাহাড়ি অঞ্চলের সৌন্দর্যের বিবরণ নয়, বরং সেসব অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতি, মানুষজন ও পরিবেশের এক মনোজ্ঞ মেলবন্ধন। লেখকের অনন্য লেখনশৈলী বইটিকে তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বইটি লেখকের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও সেইসব জায়গার খাদ্যসংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে রচিত। লেখক দামু মুখোপাধ্যায়ের ভাষা সহজ, সরল এবং বর্ণনামূলক। তাঁর লেখায় পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব চিত্র ফুটে ওঠে। একইসঙ্গে তিনি যে রন্ধনপ্রণালীগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠককে খাবারের স্বাদ কল্পনা করতেও সাহায্য করে। যদিও বইটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, তবে কিছু জায়গায় আরো বিস্তারিত তথ্য সংযোজন করা যেত। বিশেষত, কিছু খাবারের রেসিপি ও তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আরো আলোচনা করলে পাঠকদের জন্য আরও উপকারী হতে পারত। শেষত, এটুকুই বলার যে যারা ভ্রমণ ও রসনা সম্পর্কে আগ্রহী, তাদের জন্য বইটি অবশ্যই এক উপভোগ্য পাঠ্য। পড়ে দেখতে পারেন।