'মেঘে ঢাকা তারা' একটি ভিন্ন ধরনের বই। আমরা যখন কোনো শিল্পী, সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানী নিয়ে বই লিখি সবসময়েই তখন বিখ্যাত কাউকে বেছে নিই। আমরা ধরেই নিয়েছি কারও জীবনী লিখতে হলে এমন কাউকে বেছে নিতে হবে যাকে সবাইক এক নামে চেনে। অতনু চক্রবর্ত্তী কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কাজ করেছেন। তার বইটি লিখেছেন এগারোজন বাঙালি বিজ্ঞানী নিয়ে যারা সবাই বিস্মৃতপ্রায়। নূতন প্রজন্ম যদি এদের কাউকে না চিনতে পারে আমি একটুও অবাক হব না, কিন্তু তাদের কয়েকজন সম্পর্কে একটুখানি বলা হলেই তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে।
বিষয়বস্তু বিবেচনায় নিলে অতনু চক্রবর্তীর 'মেঘে ঢাকা তারা' খুবই গুরুত্বপূর্ণ বই। বিস্মৃতপ্রায় কয়েক জন বাঙালি বিজ্ঞানী নিয়ে এ ধাঁচের বই প্রকাশ জরুরীও বটে। আমি নিজে বিজ্ঞানে আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও কেবল রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ছাড়া আর কারও ব্যাপারে তেমন কিছুই জানতাম না। জ্ঞানচর্চা একটি সাংস্কৃতিক পরম্পরার বিষয়; অতীত বুকে রাখলে ভবিষ্যতের দিকে সাহসের সাথে তাকানো যায় বলেই মনে করি। বইটি এই পরপম্পরার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু অধ্যায় তুলে এনেছে যা বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি সাংস্কৃতিক পাটাতন নির্মাণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেবে।
গুরুত্বপূর্ণ এ বইটির প্রকাশক চাইলেই বইটির পাতাবিন্যাস এমনভাবে করতে পারতেন যার ফলে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা কমে আসতো এবং এতে করে বইটি আরেকটু সুলভ হতে পারতো। খালি পাতাগুলো বইয়ের মানবৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকাই রাখছে বলে মনে করি না। কিছু মুদ্রণপ্রমাদ রয়ে গেছে; আশা করি পরবর্তী সংস্করণে ভুলগুলো শোধরানো হবে। আর লেখকের রচনাভঙ্গী ও রচনার ব্যাপারে দু'টো ক্ষুদ্র অনুযোগ আছে: (১) কিছু কিছু জায়গায় লেখককে বাহুল্যদোষে আক্রান্ত বলে মনে হয়েছে। একটা উদাহরণ: 'তিনি কোনো দিন বিয়ে করেননি।'- পুরো বাক্যে প্রকাশিত এই তথ্যটি স্রেফ 'চিরকুমার' শব্দেই প্রকাশ করা যায়। (২) জীববিজ্ঞানসংক্রান্ত অধ্যায়গুলোয় লেখককে বেশ সাবলীল মনে হয়েছে; উক্ত অধ্যায়গুলোয় আলোচিত বিজ্ঞানীদের কাজের ব্যাপারেও যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানসংক্রান্ত অধ্যায়গুলোয় গবেষণাকর্মগুলো নিয়ে তেমন একটা বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করা হয়নি। আশা করি, ভবিষ্যতের সংস্করণগুলোয় লেখক উক্ত অধ্যায়গুলোয় প্রয়োজনীয় অংশগুলো যোগ করবেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই বইটি রচনার জন্য লেখকের ধন্যবাদ প্রাপ্য।
'মেঘে ঢাকা তারা' বলে যায় এগারো জন বাঙ্গালি বিজ্ঞানীর কথা, যাদের নামও হয়ত আমাদের প্রজন্মের কেউ শোনেনি। ১. গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য ২. মধুসূদন গুপ্ত ৩. রাধানাথ শিকদার ৪. রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ৫. আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ৬. অসীমা চট্টপাধ্যায় ৭. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ৮. মৃণাল কুমার দাশগুপ্ত ৯. হাবিবুর রহমান ১০. শম্ভুনাথ দে ১১. আবদুস সাত্তার খান - বইটিতে তাদের জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান তুলে ধরা হয়েছে। আরেকটু বিস্তারিত কলেবরে বইটি পড়তে পারলে আরো ভালো লাগল। তবে এক্ষেত্রে তথ্যের অভাবও একটা কারণ হতে পারে!
বিজ্ঞান একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজকে বিজ্ঞানের যতটুকু উন্নতি সাধিত হয়েছে তা অতীতের বিজ্ঞানীদের অবদান। অতীতে এই বিজ্ঞানীরা যেসব জিনিস শত বাঁধা পেরিয়ে আবিষ্কার করেছেন তা এখনকার এ প্রযুক্তিময় যুগেও আবিষ্কার করা বেশ শ্রমসাপেক্ষ৷ এ থেকে অনুমান করা যায় তারা নিজের কাজের জন্য কতটা পরিশ্রমী এবং নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। কিন্তু তাও তাদের অনেকেই জীবদ্দশাতেই হয়েছেন অবহেলার শিকার৷ রাধানাথ শিকদারের কথাই ধরা যাক। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে তুখোড় এ ব্যক্তি সারাজীবন সার্ভের কাজই করে গেলেন। বার বার বদলির জন্যে সুপারিশ করেও বদল হতে পারেননি অন্য জায়গায়৷ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়া আবিষ্কার করেও এর নাম দেয়া হল বড়সাহেব এভারেস্টের নামে। শুধু তাই নয়, 'হিস্টোরিকাল রেকর্ডস অফ দ্য সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (৫ম খণ্ড)' তে রাধানাথের নাম দিয়ে বলা হয় এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপে তার কোনো ভূমিকা নেই!
এরকম আরো অনেক বিস্মৃত বাঙ্গালি বিজ্ঞানীদের কথা আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। যদিও এখানে বিস্তারিতভাবে কারো জীবনী আলোচনা করা হয়নি। আমার মনে হয়েছে, শুধু বিজ্ঞানীদের অবদান সম্পর্কে জানানোই ছিল বইটির প্রধান উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্য যদি সেটাই হয়ে থাকে তবে বইটি নিঃসন্দেহে সে কাজে সফল হয়েছে।
বই:মেঘে ঢাকা তারাঃবিস্মৃতির মেঘে ঢেকে যাওয়া বাঙালি বিজ্ঞানী। লেখক:অতনু চক্রবর্তী। প্রকাশনী: ঐতিহ্য।
যদিও কথায় আছে প্রচারেই প্রসার,তবে পৃথিবীতে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিত্বরা ছিলেন যারা এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাদের মাঝে বিজ্ঞানীরা অন্যতম। তারা সর্বদা ই ছিলেন প্রচারবিমুখ । তবে অনেকেই আছেন সৌভাগ্যবান যারা প্রচার পান।তবে অনেক সফল বিজ্ঞানী ই আছেন যারা প্রচার পান না বা পায়নি ।তেমনি ১১ জন আপরিচিত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী নিয়ে লেখক অতনু চক্রবর্তী মেঘে ঢাকা তারা বইটি লিখেছেন।নতুন প্রজন্মের নিকট তুলে ধরেছেন মেঘের আড়ালে থাকা তারাদের।
এই বই এ তাদের নানা অবদান এর তথ্য উল্লেখ করা আছে।লেখক অনেক পরিশ্রম ও সময় দিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন।এসকল বিজ্ঞানীদের অবদানেই আজ আমরা সুন্দর জীবনযাপন করছি। বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। কিন্তু, এদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা তাদের প্রাপ্য সম্মান পান নি। অথচ যাদের দ্বারা আমরা হয়েছি সমৃদ্ধ,তাদের অনেকের নামই হয়তো জানি না । বিজ্ঞান চর্চায় বাঙালি জাতীর অবদান সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের ধারণাই নেই। যেমন রাধানাথ শিকদার এর কথাই ধরা যাক।কজন জানে তার কথা? পৃথিবীর সর্বোচ্চশৃঙ্খ এভারেস্ট এই গণিতবিদ এর আবিষ্কার। কিন্তু, বাঙালি বলে তিনি তার প্রাপ্য মর্যাদা পান নি।কারন তখন ব্রিটিশ শাসন চলছিলো।ব্রিটিশ রা একজন বাঙালিকে এতো মর্যাদা দিবে আশা করা যায় না। আবার ধরা যাক উপেন্দ্রনাথ ব্রাক্ষ্মচারীর কথা। তিনি ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ কালাজ্বর এর চিকিৎসা আবিস্কার করে বাচিঁয়েছেন হাজার মানুষের প্রাণ।এছাড়া, অসীমা চট্টোপাধ্যায় এর কথা না বললেই নয়।একজন নারী হয়েও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা কে জয় করে বিজ্ঞানচর্চা করে গেছেন। হিন্দু সমাজের গোড়ামি কে কাটিয়ে শবব্যবচ্ছেদ এর মতো সাহসী কাজে হাত দেন মধুসূদন গুপ্ত । কারণ,মরা কেটে পড়তে হবে বলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ই ছিলো একমাত্র ভরসা। এই মানুষটার হাত ধরেই বাঙালি চিকিৎসা বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। উল্লেখিত প্রত্যেক বিজ্ঞানীদের এমন আশ্চর্য সব অবদান ও তাদের পরিশ্রম এর বর্ননা রয়েছে বইটিতে।
বইটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি।বারবার ভেবেছি কেনো আগে জানা হলো না এসব তারা দের সম্পর্কে। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমরা দেখি, কোনো লেখক যখন অন্যদের জীবনী বা কৃতিত্ব নিয়ে বই লিখেন। তখন সর্বদা বিখ্যাত ব্যক্তিদের বেছে নেন । এতে হয়তো বইটি বেশি বিক্রি হবে বা জনপ্রিয়তা পাবে এ আশায়।আর সেদিক থেকে লেখক অতনু চক্রবর্তী হেঁটেছেন ভিন্ন পথে।এমন সব ব্যক্তিদের নিয়ে লিখেছেন যারা বিখ্যাত ত দূরে থাক আমরা নাম ই জানি না। বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের মাঝে দেখা যায়,তারা বেস্টসেলার বই এর পিছে ঘুরে।কিন্তু, আদৌ কয়জন খোঁজে দেখে এসব বই এর বেস্টসেলার যোগ্যতা আছে কিনা। অনেক বেস্টসেলার বই ই এখন সারশূন্য। বাঙালি জাতি যে ইতিহাস এ সমৃদ্ধ এবং রয়েছে গর্ব করার মতো কতো কিংবদন্তি। তা বর্তমান প্রজন্মের নিকট তুলে ধরার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি লেখক করেছেন পরম মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে।দুই মলাটের মাঝে পাওয়া যাবে এর প্রমান।।
এই বইকে বাঙালি জাতির জন্য দলিল বললে ভুল হবে না হয়তো । তাই তথাকথিত সারশূন্য বেস্টসেলার বই এর পিছনে না ছুটে, ভালো কিছু বই এর মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। না হয় এসব বিজ্ঞানীদের মতো এসব সমৃদ্ধ বই গুলোও মেঘের আড়ালে ঢেকে যাবে। পাঠকদের উচিত বিস্মৃতপ্রায় এসব বিজ্ঞানীদের কথা ছড়িয়ে দেয়া।
মূলত কোরিয়ান প্রবাসী বিজ্ঞানী, গবেষক এবং লেখক অতনু চক্রবর্তী বাংলার হারিয়ে যাওয়া কিংবা বর্তমানে প্রায় অনালোচিত বিজ্ঞানীদের জীবনী এবং অবদান সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন বইটিতে। স্থান পেয়েছে এপার আর ওপার বাংলার মিলিয়ে মোট এগারজন বিজ্ঞানীর।
তাদের নাম যথাক্রমে উল্লেখ করছি, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য মধুসূদন গুপ্ত রাধানাথ শিকদার রাধাগোবিন্দ চন্দ্র আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র অসীমা চট্টোপাধ্যায় উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী মৃণাল কুমার দাশগুপ্ত হবিবুর রহমান শম্ভুনাথ দে আবদুস সাত্তার খান
এনাদের মাঝে অনেকের নামই আমরা জানিনা। তবে আজ যারা বিজ্ঞানী চর্চা করছেন তাদের পথ মসৃণ করতে এসব বিজ্ঞানীর ভূমিকা সত্যি অনস্বীকার্য। বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষের বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস এসব ব্যক্তিবর্গ ছাড়া সম্পূর্ণ।
প্রথমে ধরা যাক মধুসূদন গুপ্তের কথা। ১৮৩৬ সালের ১০ই জানুয়ারী উনি ঝুঁকি নিয়ে এলোপ্যাথিক পদ্ধতিতে শবব্যবচ্ছেদ করেন যা ছিল গোটা ভারতবর্ষে প্রথম। ঐভাবে শবব্যবচ্ছেদ করা ছিল হিন্দু সংস্কারের পরিপন্থী। কিন্তু মধুসূদন গুপ্ত সেই অসাড় সংস্কারে কষাঘাত করে মেডিকেল সায়েন্সকে এদেশের জন্য আরও প্রসারিত করেন।
রাধানাথ শিকদারের কথাই বলা যেতে পারে যিনি ছিলেন একজন প্রচণ্ড মেধাবী গনিতবিদ। প্রকৃত মাউন্ট এভারেস্টের আবিষ্কারের কৃতিত্ব মূলত এই প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বধর মানুষটির। যদিও ইংরেজ সরকার কখনো সেই স্বীকৃতি ওনাকে দেননি।
অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের কথা না বললেই নয়। এই এগার জনের মধ্যে একমাত্র নারী বিজ্ঞানী। স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়নে অনার্স পড়তে গিয়ে পারিবারিক বাঁধার সম্মুখীন হন কারণ ঐ কলেজ ছিল কো-এডুকেশন। কিন্তু বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায় দমে যান নি। পড়াশোনো শেষ করেন এবং ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হন। সারাজীবন উনি বিজ্ঞানের সাধনা করেছেন সফলতার সাথেই। উনার রিসার্চ পেপারের সংখ্যা চারশোরও অধিক।
শম্ভুনাথ দে কলেরার চিকিৎসা উদ্ভাবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বাচিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ। কিন্তু জীবনে উনি তেমন উল্লেখযোগ্য স্বীকৃত পাননি। তবুও লড়ে গেছেন। বিজ্ঞানের এই সন্তান অনেকটা অনাদরে অবহেলায় আমারদের সবাইকে ছেড়ে গেছেন।
হবিবুর রহমান আমাদের দেশের সূর্যসন্তানদের একজন। ইসলামি রক্ষণশীল অনুশাসনকে পাশ কাটিয়ে মানুষটি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। গনিতশাস্ত্রে মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন দেশের। বহু স্বনাধন্য প্রতিষ্ঠান অধ্যাপনা করেছেন। থিতু হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। '৭১ এ যখন সব শিক্ষকররা ক্যম্পাস ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছিলেন তিনি যাননি। উনাকে যাবার অনুরোধ করলে উনি বলেছিলেন,
"Like the captain of the ship I shall be the last to leave."
অবশেষে পাকবাহিনী একটি দল ওনাকে তুলে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের কর্মকান্ডের পক্ষে সাফাইপত্র লিখতে বলে। কিন্তু আপোষহীন আমাদের এই নক্ষত্র রাজি হননি এবং পাক বাহিনীর হাতে সম্ভবত মৃত্যুবরণ করেন কারণ উনাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বইটি সংক্ষিপ্ত। সমৃদ্ধ জ্ঞানভান্ডার না হলে চিন্তার খোরাক যোগাতে, হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানীর সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করতে বইটি সফল। নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতে নিঃসন্দেহে এটি ২০১৯ সালের বইমেলার অন্যতম সেরা বই।
বইটা বেশ ভাল লেগেছে । এতকিছু জানতে পেরেছি আমাদেরই দেশের মানুষদের নিয়ে , এইসব রত্ন যে আমাদের চোখের আড়ালেই ছিল -- তা আসলেই অবিশ্বাস্য ! প্রত্যেকটা মানুষ এমন সব সেক্টর নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন, অথচ তারা অজানা-- ব্যাপারটা খুবই দুঃখ দিবে আপনাকে ।
বইটি ৫ স্টার পেতে পারত । কিন্তু পুরো বইটাতেই কেমন জানি তাড়াহুড়োর ছাপ রয়েছে । লেখক পরিশ্রম করে , রেফারেন্স দিয়ে বইটি লিখেছেন ঠিকই , কিন্তু লেখাটা ঠিক মন কাড়ার মত ভাষায় লেখা হয়নি --যা ব্যাপারটাকে সাধারন জনগনের কাছে আরো গ্রহনযোগ্য করতে পারত । আর প্রচুর বানান ভুল , যা নিয়ে অবশ্য আর গাঁ করিনা । বিজ্ঞানের কোনো ল (Law) বা ফর্মূলা বোঝাতে সেই আদ্দিকালের সাধু ভাষা ব্যবহার-- যা বইটাকে খটমটে করেছে আরো ।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত প্রচারবিমুখ হয়। তারপরও সফল ও সৌভাগ্যবান অনেকেই প্রচার পায়, আবার অনেক সফল বিজ্ঞানীই প্রচারের আলোয় আসে না। তেমন কিছু অপরিচিত বাঙালি বিজ্ঞানীদের পরিচিতি নিয়েই গবেষক অতনু চক্রবর্তীর চমৎকার উদ্দ্যোগ এই বইটি। অনেক জায়গাতেই সহজভাবে বিজ্ঞানের অনেক টার্ম বোঝানোর চেষ্টা করেছেন লেখক, তবে কোথাও কোথাও কয়েক প্যারাগ্রাফ সাধারণ প্রাঞ্জল ভাষায় লেখার পর হঠাৎ লেখার ধরণ অনেকটা পাঠ্যবইয়ের মতো করে লিখেছেন মনে হয়েছে। তারপরও সব মিলিয়ে বাঙালি বিজ্ঞানীদের তুলে ধরার এ প্রয়াসের জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাই।
বাংলায় এ ধরনের বইয়ের বড় অভাব। আমাদের এত চমৎকার সব বিজ্ঞানী বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন! তাঁদের কথা আমরাই ঠিক করে জানি না, পরের প্রজন্ম জানবে কীভাবে? অতনু চক্রবর্ত্তী দারুণভাবে তেমনই কিছু বিজ্ঞানীর জীবন তুলে এনেছেন এই বইতে।
বিজ্ঞান ও আমাদের ইতিহাসে আগ্রহী যে কারো জন্যে অবশ্যপাঠ্য।
বইটা পড়ে শেষ করার পর ভালো একটা অনুভূতি হচ্ছে কারণ বইটা তার নামের সার্থকতা বজায় রেখেছে। আরামদায়ক পাঠ ছিল, লেখক সহজ সরল করে বলে গেছেন এবং আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করানোর জন্য সহজ করে সমস্যার উত্থাপনও করেছেন। ভালো লেগেছে। মেঘে ঢাকা তারা সিরিজ হয়ে উঠুক। জানা হোক অজানা অনেক কথা যা নিয়ে গর্ব করার মত। অনেকেই যারা গর্ব করার মত কিছু নেই বলে ভাবছেন, এটা অবশ্যপাঠ্য। বইমেলায় কেনা বইয়ের মধ্যে ভালো একটা সিদ্ধান্ত ছিল এটা কেনা।