শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদন্ড হয়, তাহলে শিক্ষাঙ্গনগুলো হলো সে মেরুদন্ডের কশেরুকা। কশেরুকা দুর্বল হয়ে গেলে যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষাঙ্গন দুর্বল হয়ে গেলে একটা জাতি শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। একটি দেশকে জাগাতে হলে শিক্ষাঙ্গনকে জাগাতে হয়। গবেষণাকে সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হয়। একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হয় শুধু কর্ম দিয়ে। যোগ্যকে উপযুক্ত স্থান দিতে হয়। অযোগ্যকে আগাছার মতো ধীরে ধীরে তুলে ফেলতে হয়। তারুণ্যের আগ্রহ ও নেশাকে রাষ্ট্রের সম্পদে রূপ দিতে হয়। মেধাকে লালন করতে হয়। মেধার তীব্র প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সারা দুনিয়ার সাথে জ্ঞান-গবেষণার আদান প্রদান করতে হয়। আর এই বিষয়গুলোই অণুবন্ধ আকারে রচিত হয়েছে 'একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়' বইটিতে। বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের সামনে একটি কালের দর্পণ ভেসে উঠবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই সময় একটি সমাজ ও সমাজের তারুণ্য কি করে সগৌরবে সমহিমায় দাঁড়াবে, সেসব দিকনির্দেশনা ও রূপরেখা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে সেই দর্পনে।
' যে বই তোমায় অন্ধ করে, যে-বই তোমায় বন্ধ করে সে-বই তুমি ধরবে না। '
কোন ধরনের বই পড়তে হবে তার একটি নির্দেশনা কবিতার লাইনগুলোতেই আছে। যে বই পড়লে চক্ষুষ্মান হব। যে গ্রন্থ পাঠে নিজের মনের, বিবেকের বন্ধ দ্বার খুলবে, সে বই ই তো পড়তে হবে। তেমনি একটি বই গবেষক রউফুল আলমের ' একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায় '।
দেশ আসলে কীভাবে দাঁড়ায়? তথাকথিত ডিজিটালের তকমা পেলেই দেশ স্বাবলম্বী। নাকী উন্নয়নের প্রকোপে যানজটে নাকাল হওয়ার নাম দেশের স্বাবলম্বিতা। এই প্রশ্নটির উত্তর ভিন্নভাবে দিয়েছেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টেরেট জনাব রউফুল আলম।
কোনো স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানসম্মান নির্ভর করে সেই দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা উন্নত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণায় কী পরিমাণ যত্ন নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। কিন্তু আমাদের সমাজের অবস্থা তো ভিন্ন।কারণ এখানে সমাজ তার সম্ভাবনাময় প্রাণগুলোর যত্ন নেয় না। পরিচর্যা করে না জাতিকে জ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব দিতে পারো এমন প্রজন্মকে।
লেখক রউফুল আলম সুইডেনে গবেষণা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গবেষণার সুযোগ তার হয়েছে। বাংলাদেশে পড়েছেন একটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আমরা চীন থেকে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন কিনি। অথচ সেই চীন ই নিজেদের দেশের মেধাবিদের উৎসাহিত করতে চালু করেছে ' Thousand Talent Plan'। লেখক আফসোস করে লিখেছেন,
' এই চীন থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে সরকার জাহাজ কিনছে। দুই যুগের পুরনো জাহাজ। অথচ সরকাট চীনকে বলতে পারত, আমরা আগামী পাঁচ বছর পাঁচ হাজার তরুণকে তোমার দেশে পাঠাব। তাঁরা কেউ কাজ করবেন মেডিসিন নিয়ে। কেউ এরো-ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ পারমাণবিক গবেষণা কিংবা কেউ আ্যস্ট্রোফিজিকস নিয়ে গবেষণা করবেন। বিনিময়ে দেড় হাজার কোটি টাকাই আমরা দেব। চীন যে টাকা পাওয়ার, সেটাই পেত। আর আমরা পেতাম কতগুলো জানালা। '
আমার রাষ্ট্র তো জ্ঞানের জানলা চায় না। তার চাই লেজুড়বৃত্তি করবে এমন শিক্ষক। দলীয় স্তুতি গাইবে এমন ছাত্র। রাষ্ট্র প্রত্যাশা করে একজন গবেষক তার গবেষণাকর্ম বাদ দিয়ে পত্রিকায় কলাম লিখবেন দলের পক্ষে।টক-শোতে দলের হয়ে উঁচু গলায় শাসাবেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক গত বছরের ১৫ই আগস্ট ক্লাসে বসিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছিলেন। তাতেই সরকারি ছাত্রসংগঠনের গাত্রদাহ হয়। তারা হেনস্তা করেন সেই শিক্ষককে। এবার শুনুন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনা।
' জুলাই মাসের ৪ তারিখ হলো আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। সরকারি ছুটির দিন। এখানের দোকানপাট, শপিংমলও সেদিন বন্ধ থাকে। অথচ ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখতাম অনেক ছেলেমেয়েই কাজ করছেন। দেখতাম, আমার প্রফেসরসহ আরও কয়েকজন শিক্ষকের রুমের দরজা খোলা। স্বাধীনতা দিবসেও তাঁরা কাজ করতে চলে এসেছেন। '
যেদেশ হেরে যায়, সেখানকার শিক্ষক নিয়োগ সম্পর্কে জানুন,
' দুনিয়ার কোনো সভ্য-শিক্ষিত দেশে এখন পিএইচডি ও পোস্টডক ছাড়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হওয়া যায় না। অন্তত বিজ্ঞান অনুষদে তো নয়ই। হয়তো আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত দেশে সম্ভব। মিয়ানমার কিংবা মঙ্গোলিয়ায় সম্ভব। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও সম্ভব নয়। শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানেও সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে সম্ভব। '
ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ছাড় দেয় না। আমরা দেই কেন? উত্তর হলো -
' কারণ ওরা জানে, দুনিয়ার সবকিছু তৈরি করে মেধাবীরা আর মেধাবীদের তৈরি করেন শিক্ষকেরা। শিক্ষকেরা হলেন কারিগরদের কারিগর। তাদের মানের বিষয়ে হেলাফেলা করা যায় না। '
দলীয় লেজুড়বৃত্তি, চামচামির ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের মানে, ' শত শত ছেলেমেয়েকে আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা। '
এদেশের যেকোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গেলে মনে হবে দলীয় নেতাদের পোস্টার, ব্যানার, চিকামারার জগতে চলে এসেছেন। দলীয় রাজনীতিই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। নেতার ছবি না থাকলে মামলা নিশ্চিত। অথচ পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারপারসনের রুমে কোনো জাতীয় নেতার ছবি দেখেন নি রউফুল আলম। বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলে শুনলেন,
' Keep the right things in right place. Don't messed up! '
দক্ষিণ কোরিয়ার নাম তো শুনেছেন ই। সেদেশ তাদের মোট জিডিপির সাড় ৪ ভাগ ব্যয় করে গবেষণায়। এবার গুগল করে জেনে নিন আপনার দেশে গবেষণা খাতে বরাদ্দ কত। গবেষণায় দু'পয়সা দিবেন না। অথচ মুখে চেঁচাবেন ডিজিটাল হচ্ছি, হব। এমনটি সত্যিই হওয়ার নয়। গল্পে, কাব্য এবং দলীয় স্লোগানে আর আপনাদের নেতাদের মুখ নিঃসৃত বাণীতে হতে পারে। বাস্তবে দেশ ডিজিটাল হবে না।
আপনার দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা বনাম উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার প্রকৃত চিত্র বুঝতে বইটি পড়ুন। কতটা আঁধারে ডুবে আছেন শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান চর্চায় তা জানতে হলেও পড়ুন রউফুল আলমের ' একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়'।
যা আশা করেছিলাম, তার তুলনায় পড়ে কিছুটা হতাশ। প্রবন্ধগুলো একেকটা ২/৩ পৃষ্ঠা করে। সহজে পড়ে ফেলা যায়। সহজবোধ্য লেখা। লেখার ফন্ট সাইজ এবং স্পেস আমাকে পড়ার সময় চোখে আরাম দিয়েছে এবং বইয়ের প্রচ্ছদ আমার কাছে বেশ রুচিশীল লেগেছে৷ বইটি ধরতেও একটা গুড ফিল দেয়৷
মুশকিল হল প্রতিটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু প্রায় এক। গবেষণা ছাড়া দেশ অচল, ভারত-চীন গবেষণায় এগিয়ে, গবেষকদের প্রাধান্য দিতে হবে এগুলো হল সার কথা। কিন্তু অন্য দেশের উদাহরণ দেয়া ছাড়া কন্সট্রাকটিভ কথাবার্তা কম৷ যেমন কি করতে হবে সেটা বলা আছে বইয়ের ৭৫% অংশজুড়ে, কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে উদাহরণ দেয়া ছাড়া গঠনমূলক কথা কম। কি করতে হবে-কোন দেশ কি করছে সে সম্বন্ধে সচেতন ব্যক্তি / পাঠকমাত্রই পত্রিকার কল্যানে জানেন ইতোমধ্যে, তার জন্য এক বইয়ে এক সারকথার এতগুলো প্রবন্ধ দেয়া লাগেনা। এর মধ্যে, শিক্ষার্থীদের কৌতূহল ধরে রাখা, স্কুলের পাঠ্যক্রম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কথা, ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য মিঃ হার্টিগকে নিয়ে লেখা, ইউজিসি ও একটা 'বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হয়' এই একটা প্রবন্ধ, মেয়েদের নিয়ে একটা লেখা ভাল লেগেছে ও নতুন কিছু পেয়েছি। এছাড়া সব প্রবন্ধের সার কথা এক৷ পুরো বইটি ১৯২ পৃঃ না করে বাছাই করা প্রবন্ধ নিয়ে ৬০-৮০ পৃষ্ঠায় করে ফেলা যেত বলে মনে হয়।
একটা দেশ কতটুকু উন্নত হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের মানুষের উদ্ভাবন ক্ষমতার উপর। আর সেই উদ্ভাবন ক্ষমতার সুযোগ এবং বিকাশ হওয়ার কথা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু প্রকৃত দৃশ্য তা নয়। বৈশ্বিক প্রতিযোগে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি, তা কল্পনার বাইরে চলে যাচ্ছে দিনকে দিন।
সত্যি ব���তে প্রায় প্রতি বছরেই শুনি 'বিশ্বের সেরা ৫০০/১০০০/২০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাতেও আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই', এই নিউজটা পড়তে পড়তে গা সওয়া হয়ে গেছে। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষের একটা মজার ব্যাপার হলো, যেকোনো অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনগ্রসরতাও এরা একটা সময় পর স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে, 'গা সইয়ে' যায়। আমি সেই সিংহভাগের দলেই পড়ি। এবং আমি জানি, এরকম উদাসিন আমি একাই নই।
রউফুল আলম এই ব���তে লিখেছেন দেশের মেধাবীদের নিয়ে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে, লেজুড়বৃত্তির পাকে পড়ে জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়টা নষ্ট করা নিয়ে, উদ্ভাবনের প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে তাঁর হতাশার কথা, কষ্টের কথা, এবং আশাবাদের কথা।
এই বইটা বাংলাদেশের প্রত্যেক ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও সরকার প্রধানের পড়া দরকার। যদি বইয়ের কথাগুলো বাস্তবে দেশে বাস্তবায়ন করা যায় তবে বাংলাদেশের ছাত্ররা উন্নত বিশ্বের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে একটা উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত করাতে পারবে।
সবার কাছে অনুরোধ থাকবে বইটা পড়ার জন্য। বইটা পড়ার পর আপনাদের সামনে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। পড়ালেখা করার নতুন প্রেরণা, শক্তি খুঁজে পাবেন। শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়, গবেষক-বিজ্ঞানী হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হবে।
আজকে একটা অন্যরকম বইয়ের কথা বলবো। বইটার কথা প্রথম শুনি সাদমান সাদিক ভাইয়ের ভিডিও থেকে। ভার্সিটি লাইফে যে ধরণের বই পড়া উচিৎ তালিকা করলে এই বইটা সেই তালিকায় থাকা দরকার। লেখক রউফুল আলম দেশের বাইরে গবেষণাকর্মে নিযুক্ত আছেন। বইটার মূল বক্তব্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বপ্ন, তারুণ্য ও অবকাঠামোগত দূর্বলতা নিয়ে। তিনি সমস্যাগুলো শুধু চিহ্নিত করেই থামেননি, সম্ভাব্য সমাধানের আইডিয়াও ব্যক্ত করেছেন।
দেশের দূর্বল শিক্ষাব্যবস্থার কথা সবাই মানি। কিন্তু এই পুরো সিস্টেমটাই কতটা নাজুক, সেটা আসলেই অকল্পনীয়। এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা, উদ্ভাবণের পেছনে না ছুটে, রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরে ঘুরে, স্লোগান দিয়ে জীবন ধন্য করে বেড়ায়। কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের চোখে মোহর পড়িয়ে দেয়া হয়েছে একটা। দেখেও দেখছিনা, বুঝেও বুঝছিনা। নেতার লেজুরবৃত্তি করেই সুখী হচ্ছি। শিক্ষকেরাও কম যান না, তাদের নিয়োগ হয় এক অদ্ভুত নিয়মে, যেখানে বাহিরের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া নিয়ে, গবেষণা পত্র বের করা নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, সেখানে এদেশের উপাচার্য, অধ্যাপকেরা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। দেশের মেরুদন্ড যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা, তাদের নিয়োগ দেয়ায় সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। আমরা বুঝিনা যার যেখানে যোগ্যতা, অভিভাবকত্ব থাকা উচিত, তাকে সেখানেই স্থান দেয়া উচিত। বিজ্ঞান, শিল্প, গবেষণা, শিক্ষা সব খানে ওই ব্যাপারে জ্ঞানহীন রাজনৈতিক আমলা বসানো কতটা বোকামি সেটা কবে বুঝবে দেশের সরকার কে জানে। দক্ষিণ কোরিয়া দেশটার আয়তন কিন্তু বাংলাদেশের চাইতে কম, কিন্তু তাদের উন্নতি অগ্রগতি আকাশচুম্বী। সারাবিশ্বে গবেষণায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী দেশ কিন্তু এখন তারাই। যোগ্যতার মূল্যায়ন তারা খুব ভালোভাবেই করতে শিখেছে। চাইনিজরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে তাদের মেধাবী তরুণদের। সারা বিশ্বের প্রতিটি কোণায় তাদের খুঁজে পাবেন, হোক সেটা চিরশত্রু জাপানের মতো দেশ কিংবা পরাক্রমশালী আমেরিকা। সারা পৃথিবী থেকে আহরণ করা জ্ঞান তারা ফিরিয়ে নিয়ে আসেন নিজ দেশে। বড় বড় প্রস্তাবণা দিয়ে সেসব তরুণদের দেশেই কাজ করতে ফিরিয়ে আনেন তারা। বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোটজেলা মেহেরপুরের সমান দেশ সিঙ্গাপুরের অবস্থান কল্পণা করতে পারেন? এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি উদ্ভাবণ তাদের। ঠিক এর পরপরই আছে পাশের দেশ ভারতীয়রা। এভাবে ছুটলে উন্নতি কেন হবেনা? আমাদের দেশেও শুরু হচ্ছে দেশ বিদেশে ছোটার প্রবণতা। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় ম্যাসেজ এটাই যে, সারা দুনিয়ার সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে হবে। সেসব দেশের জ্ঞান, চিন্তা, আইডিয়াগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে নিজ দেশে। অভিজ্ঞ সেসব তরুণের হুংকারে চুরমার হয়ে যাবে বাংলাদেশের দুর্বল, অযোগ্য ও বিনাশী সব কর্মকান্ড। দেশটা দাঁড়াবে একটা নতুন ফ্রেমে, নতুন লক্ষ্যে। মুছে যাবে সব মূর্খতা, ভন্ডামি।
বইটায় লেখক গবেষণা, শিক্ষা, শিক্ষক নিয়োগেই বেশি ফোকাস করেছেন বলা যায়। অন্যান্য আরও অনেক দিক তুলে এনেছেন বইতে, তবে এই ব্যাপারগুলোই বারবার বারবার রিপিট করেছেন বাকিসব প্রসঙ্গ হাইলাইট না করে। একই কথা বারবার না বলে বরং টপিক গুলো এক্সপান্ড করা যেতো হয়তো আরও। কিংবা লেখক এই ব্যাপারটায় অতীব জোর বোঝাতে বারবার লিখেছেন, হতে পারে। তবে তিনি যে ক্ষুদ্রে প্রতিটা টপিক তুলেছেন, সেসব নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে ফেলা সম্ভব।
বইটা আমি রিকোমেন্ড করবো অবশ্যই। অকপটে এভাবে চোখে আঙুল তুলে শিরদাঁড়া সোজা করে কথা বলার মতো বই দেশে খুব বেশি একটা নেই। অন্ততঃ কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের কাছে আমার আর্জি থাকবে, বইটা একবার হলেও পড়বেন।
এই বইটার ভালো দিক বলি। প্রথম ভালো দিক, বইটা কলেজ পড়ুয়া এবং সদ্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া তরুণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপকারী হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুরাবস্থার কারণে তারা যেভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একটা ডিসএডভানটেজে থাকবে এটা নিয়ে তাদের মনে সচেতনতা সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয় ভালো দিক, এই বয়সটা তো ব্রেন মোল্ডের সময়। কাউকে গাইডেন্স দেওয়া মানে যে শুধু কিভাবে কোন দেশে পড়তে যাবে তা বলে দেওয়া, এমন না। তরুণমনের ভয় দূর করার জন্য লেখক বারবার গবেষণার দিকে ঝুঁকতে, নানান দেশ এক্সপ্লোর করতে তাদের আগ্রহী করেছেন এটা আমার ভালো লেগেছে। এই অনুপ্রেরণাটা এই বয়সে দরকারি। উন্নয়নশীল দেশে স্কুল কলেজে তেমন কোনো প্রয়োজনীয় স্টিমুলেশন না পেলেও একেবারে নিজের মত করে চেস্টা করতে হবে এই বোধটা তাদের মধ্যে আসা অত্যন্ত জরুরী।
লেখক সময় এবং ইফোর্টের মূল্যটা সুন্দর করে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন পার্টে। একটা শক্তিশালী বাক্য দেখাই: "একটা দেশের শিক্ষক, গবেষক, তরুণেরা যদি এক মিনিট সময়ও ভালো কাজে মাথা খাটান, সে সময়টা দেশের সম্পদে পরিণত হয়। সেটা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হয়।" ছাত্রদের তিনি নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝেই স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। এর পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানান সমালোচনা স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। ছোট বয়সে এই বই পড়লে হয়তো আরো ভালো লাগতো।
এবার মন্দ দিকে আসি৷ বারবার লেখার মধ্যে রিপিটিশন এসেছে। অন্যদের কথা জানি না, পাঠক হিশেবে আমার মনে হয়েছে এতে লেখা অগোছালো হয়েছে। এখনকার অনেক লেখকের লেখা এরকম ফেসবুক স্ট্যাটাস গোছের লাগে, এইটা আমার ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে না। যাই হোক, দেশের এই সমস্যাগুলো পড়তে গেলে বুকে আসলে হাহাকার লাগে। আমরা সবাই কম-বেশ জানি এবং ভাবি এইগুলো নিয়ে। কিন্তু এর কোনো সমাধান প্রকৃতপক্ষে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব না। লেখকও যে কয়টি দেশের উদাহরণ টেনেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও সম্ভব হয়নি।
এই বাংলাদেশ ছেড়ে যারা বিদেশে গিয়ে স্থায়ী হয়, সে যে কারণেই হোক না কেন - ছোটবেলা থেকেই তাদের আমার খুব স্বার্থপর, কখনো কখনো খুব নিষ্ঠুরও মনে হতো; পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত পরিবেশ সর্বোপরি দেশ - সব ছেড়েছুড়ে থাকে বলে। সেই ধারণা বদলে এবারে দেশের নিয়মকানুনের প্রতি ক্ষোভ, আর যারা উচ্চতর পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারে না দেশের নানা আত্মঘাতী নিয়মনীতির কারণে, - তাদের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে আমার!
বই - একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায় লেখক - রউফুল আলম প্রকাশনী - সমগ্র প্রকাশন প্রচ্ছদ মূল্য - ৩০০৳ পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১৯২
'শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে শিক্ষাঙ্গনগুলো হলো সে মেরুদণ্ডের কশেরুকা। কশেরুকা দুর্বল হয়ে গেলে যেমন মানুষের মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়, মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষাঙ্গন দুর্বল হয়ে গেলে একটা জাতি শির উঁচু করে ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারে না।' আমাদের দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোর মানের ক্রম অবনতি, কেন বিশ্ব র্যাংকিংয়ে হাজারের মধ্যেও থাকে না বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, তার কারণগুলো এই বইতে উঠে এসেছে বিস্তারিতভাবে।
শর্টকাট-সাজেশনে বন্দী শিক্ষাব্যবস্থা, আর মুখস্ত বিদ্যা পরীক্ষার খাতায় উগলে দিয়ে অর্জন করা ভালো জিপিএ - আমাদের দেশে মেধাবী যাচাইয়ের মানদণ্ড। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কেউ ভিন্ন কিছু চিন্তা করলেই তাকে 'উদ্ভট' আখ্যায়িত করে থামিয়ে দেয়া হয় সেখানেই। এরপরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে 'সেশনজট' নামক বিভীষিকার কবলে পরে আমাদের দেশের অনেক ছাত্রছাত্রী হেসেখেলেই জীবন থেকে হারিয়ে ফেলে ২/৩টি বছর। অথচ সারা দুনিয়ায় তরুণরা পিএইচডি শেষ করে গড়ে ২৬-২৭ বছর বয়সে, অথচ আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর অনার্সই শেষ হয় না তখন। দেশের সর্ব শ্রেষ্ঠ শিক্ষাঙ্গন থেকে পড়ালেখা শেষ করেও তাদের বড় অংশের থাকে না গবেষণা বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা! এই বইটির লেখক রউফুল আলম এসব তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছেন অনেকগুলো অনুপ্রবন্ধের মাধ্যমে, আর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় দেশকে নিয়ে লেখকের আক্ষেপ ঝড়ে পরেছে সেই লেখনীতে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশের তরুণদের গবেষণা বিষয়ে ধারণা থাকে না কেন? কারণ তুলে ধরছি লেখকের ভাষায় - 'বর্তমান দুনিয়ায় সম্ভবত বাংলাদেশেই সবচেয়ে সহজে ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হওয়া যায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা সেখানে সবসময় মুখ্য নয়। রাজনৈতিক দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে অনায়াসে শিক্ষক হওয়া যায়। গবেষণার কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই হর-হামেশা শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দুনিয়ার কোনো সভ্য-শিক্ষিত দেশে এখন পিএইচডি ও পোস্টডক ছাড়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হওয়া যায় না। হয়তো আফ্রিকার কোনো ক্ষুধাপীড়িত দেশে সম্ভব। মিয়ানমার কিংবা মঙ্গোলিয়ায় সম্ভব। আমাদের পাশের দেশ ভারতে সম্ভব নয়। শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানেও সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে সেটা সম্ভব।' আমাদের দেশে ছেলেমেয়েরা পাসের জন্য প্রশ্ন চুরি করে আর তাঁদের পথপ্রদর্শকেরা প্রমোশনের জন্য গবেষণাকর্ম চুরি করেন। অথচ নিজ বিষয়ে বিশ্বের জগৎখ্যাত জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশ করা, কোরিয়া থেকে পিএইচডি-পোস্টডক করা, রইস উদ্দিন-মনিরুল ইসলামদের জায়গা হয় না এদেশে। নিয়োগ দেয়া হয় শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের, যাদের পিএইচডি ডিগ্রী পর্যন্ত নেই! লেখক খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছেন - 'আমেরিকার একটা আইভিলিগ স্কুল থেকে আমার ফিল্ডের খুব ডাকসাইটে প্রফেসরের অধীনে পোস্টডক করে, স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে, পৃথিবীখ্যাত জার্নালে ৭টি ফার্স্ট অথরশিপসহ মোট ১২টি পাবলিকেশন করে, সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটি থেকে সাড়ে ৩লাখ ক্রোনারের স্কলারশিপ পেয়ে, ৯টি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেও দেশের কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার পদে আবেদনের যোগ্যতাই আমার নেই!' অথচ তিনি দুনিয়ার যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের যোগ্যতা রাখেন, সরাসরি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে নিয়োগের জন্য নিয়োগপত্র পেয়েছেন চীনের সিয়ান জিয়াওতং ইউনিভার্সিটি থেকে। অথচ তিনি দেশে আবেদনের যোগ্যতাই রাখেন না! কারণ স্নাতকে তার জিপিএ ৩.৪৭।
ইউরোপ-আমেরিকায় কারও দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে শিক্ষক হওয়া যায় না, কাজ হয় না নেতা-নেত্রীর সুপারিশে, ম্যাট্রিক-ইন্টারের ফল, আর অনার্স-মাস্টার্স এর সিজিপিএ দিয়ে হয় না মেধা যাচাই। সেখানে শিক্ষক হওয়ার পূর্ব শর্ত হলো গবেষণায় কৃতিত্ব। শিক্ষক নিয়োগে এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতে কোনো ছাড় নেই সেখানে। কারণ ওরা জানে, 'দুনিয়ার সব কিছু তৈরি করে মেধাবীরা আর মেধাবীদের তৈরি করেন শিক্ষকরা।' সেসব দেশের একজন ভিসি দেশের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও তার শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। তেলবাজি-চামচামী আর উৎকোচের বিনিময়ে তাদের নিয়োগ হয় না বলে সরকারের পালাবদলের সাথে সাথে পরিবর্তিত হন না ভিসিরা।ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত থাকে না ছাত্রলীগ/দল নিয়ে। যে জাতি যেটির মূল্যায়ন করে সে জাতি সেটিই পায়। আমরা দেশ ভর্তি নেতা পেয়েছি, নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ। আর পশ্চিমা দেশগুলো পেয়েছে পৃথিবী বদলে দেয়া মানুষ। ১৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছিলেন। শোক দিবসে পড়াচ্ছিলেন - এই অপরাধের তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়। শোক দিবসে কি জ্ঞান চর্চা নিষিদ্ধ? লেখক রউফুল আলম লিখেছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা, জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিনকে আমেরিকায় ''প্রেসিডেন্ট ডে" হিসেবে উৎযাপন করা হয়। সেদিনও নিজের প্রফেসরকে কাজে চলে আসতে দেখে তিনি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি আজও কাজ করতে চলে এলে? ওয়াশিংটন ডেতে বিশ্রাম করতে পারতে।" সেই প্রফেসর উত্তর দিয়েছিলেন, " Washington did his job. I must do my job. His life and work won’t make me great!"- এই হলো ওদের দৃষ্টিভঙ্গি।
ক্রিকেটজ্বরে সময়ে সময়ে উন্মাদ হয়ে যায় সমগ্র বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় মোটা অংকের বরাদ্দ। অথচ এই প্রতিযোগিতাটা মাত্র কয়েকটি দেশের মধ্যে। অন্যদিকে, দ.এশিয়া থেকে শুধু বাংলাদেশই ২০১৮ সালের গণিত অলিম্পিয়াডে গোল্ড মেডেল পেয়েছে,যেটা প্রমাণ করে আমাদের তরুণদের মধ্যে জগৎজয়ীরা লুকিয়ে আছে। অথচ সেখানে কোনো বরাদ্দ নাই। দেশের কত টাকা কত দিকে অপচয় হয়, লুটপাট হয়; অথচ শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলেই দেশে টাকার অভাব দেখা যায়!
এমন হাজারো হতাশার গল্প বলার সাথে সাথে লেখক দেখিয়েছেন অনেক স্বপ্ন! বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা মেহেরপুরের আয়তনের সমান দেশ সিংগাপুরের উদাহরণ দিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জাপানের উন্নতি তুলে ধরেছেন, আমাদের মতই দারিদ্র্য নিয়ে বেঁচে থাকা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উদাহরণ টেনেছেন, শিখতে বলেছেন সব উন্নত দেশগুলো থেকে; তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে ব্যক্ত করেছেন নিজের আশাবাদ!
বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের সামনে একটি কালের দর্পণ ভেসে উঠবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই সময় একটি সমাজ ও সমাজের তারুণ্য কি করে সগৌরবে সমহিমায় দাঁড়াবে, সেসব দিকনির্দেশনা ও রূপরেখা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে সেই দর্পণে।
শেষ করছি লেখকের উল্লেখ করা একটি আফ্রিকান প্রবাদ দিয়ে,"If you think you are too small to make a difference, try sleeping with a mosquito." তোমার বলায়-লেখায় হুট করে হয়তো সমাজ বদলায় না। কিন্তু একজন কথা বললে পাশের জনও কথা বলার সাহস পায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যূথবদ্ধ হওয়া যায়।
সচারাচর কি হয়? আমরা বলি আমাদের এই সমস্যা, দেশের সেই সমস্যা! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সমস্যা বের করেই ক্ষান্ত দেই, সমাধান কি হতে পারে তা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাই না! "একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়" বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সমস্যার সাথে সাথে সমাধান গুলো আমাদের হাতে/ মুখে তুলে ধরতে। বইয়ের শুরতেই একটি আফ্রিকান প্রভার্ব আছে " If you think you are too small to make a difference, you haven't spent a night with a mosquito " মোট ছোট খাটো ৬৩ টি গল্পের/ঘটনার সমষ্টি হলো এই অমূল্য বইটি, প্রতিটিতে গল্পের ছলেই হোক আর উদাহরণ দিয়েই হোক লেখক চেয়েছেন আমরা যেনো বুঝতে পারি আমাদের গ্যাপটা কোথায় আর কিভাবে তা পূরণ করতে হবে আমাদের নিজেদের ভালোর জন্য! কিভাবে কাদের কাছ থেকে আমরা আমাদের উন্নতির জন্য শিখবো, পড়াশোনা যেন হয় আনন্দের জন্য, শেখার জন্য নট ফর সিজিপিএ! কোন গল্পই ২-৪ পৃষ্টার বেশি না কিন্তু প্রতিটি লেখা আপনাকে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য করবে, সত্যিই তো! এইভাবে করলেই তো আমরা ভালো করতে পারবো উন্নতি করতে পারবো! লেখক খুব করে চেয়েছেন আমরা বুঝি আর তার পর জেগে উঠি, এটা অবশ্যই আমাদেরই হাতে!
রউফুল স্যারকে সালাম, অসম্ভব সুন্দর ভাবে আমাদের জাগিয়ে তোলার চেষ্টার জন্য।
লেখকের অন্য একটি বই "বাংলাদেশের স্বপ্নচোখ" পড়েছিলাম গতবছর, বেশ ভালো লেগেছিলো। তারই প্রেক্ষিতে উনার এই বইটা দেখার সাথে সাথেই পড়তে নিয়ে এসেছিলাম, এবং জানামতে এটিই উনার অধিক জনপ্রিয় বই। . উনার এই বইটিতে মূলত আলোচনা করা হয়েছে গবেষণা নিয়ে, আমরা উন্নত দেশগুলোর থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারন হলো গবেষক তৈরি করতে না পারা। আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই গবেষণা করার মতো নয়তো গবেষক তৈরি করার মতো। এছাড়াও যারা বিদেশে গিয়ে গবেষণা করছে, পিএইচডি-পোস্টডক করছে তাদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থা করা হচ্ছেনা। লেখকের ভাষায় যারা বিদেশে এতো গবেষণা করে গবেষক হলো তাদের জন্য দেশে উপযুক্ত গবেষণার পরিবেশ এবং কাজ না থাকলে তাদের তো দেশে ফিরত আসার কোনো প্রশ্নই আসেনা। দেশে তৈরি করতে হবে গবেষণার পরিবেশ, বিদেশ থেকে পিএইচডি এবং পোস্টডক করা শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেমনটা চীন এবং ভারত করে থাকে। গবেষণার খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থার মাঝে আনতে হবে বিপুল পরিবর্তন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল সংস্কার দরকার লেখক তা নিয়ে করেছেন আলোচনা, কখনো তা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে, কখনো ভিসি এবং শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে, কখনো বা ছাত্র রাজনীতি নিয়ে। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবহেলার পাত্রে পরিণত হবার এবং তারা যথাযথ সুযোগ সুবিধা কেনো পাচ্ছেনা তা নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেছেন, সেশনজটের কথাও এসেছে এখানে। বিসিএসের পিছনে এই যে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের যৌবন শেষ করছে, মুখস্থ করে চলেছে দেশ-শহরের রাজধানীর নাম, তারা সেই সময় কিভাবে চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়ে কোনো বড় কিছু করতে পারতো তারও রয়েছে দিকনির্দেশনা। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা কতোটা পরিশ্রম করে, কিন্তু কিছু অব্যবস্থাপনার জন্য কেনো তারা দুনিয়ার বাকি দেশগুলোর শিক্ষার্থীর থেকে পিছিয়ে রয়েছে, কেনো আামাদের দেশে বড় কোনো বিজ্ঞানী তৈরি হয়না তা নিয়েও রয়েছে বিশদ বিবরণ। . আমার মতে লেখকের বইয়ের মতো যদি আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন পরিবেশ, গবেষণা খাতে পরিবর্তন আনতে পারি তবে এই বাংলাদেশকে কেও এগিয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে পারবেনা।
ভালো রিভিউ দেখে আর অসাধারণ নাম দেখেই খুব আগ্রহ নিয়ে বই টি পড়া শুরু করি। পড়া শেষে যারপরনাই হতাশ। কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য থাকলেও বই এর কন্টেন্ট বই এর নামের প্রতি সুবিচার করতে পারে নি বলেই মনে করি। লেখা গুলো ছোট ছোট প্রবন্ধ এর মত। অনেক জিনিসই একাধিক বার এসেছে। কোনো কন্টিনিউটি পাই নি পুরো বই তে। কোনো বিষদ, মৌলিক আলোচনাও চোখে পড়ে নি। লেখক পরবর্তীতে এই ব্যাপারগুলো খেয়াল রাখলে আরো ভালো কিছু পাব বলে আশা রাখি।
"If you think you are too small to make a difference, you haven't spent a night with a mosquito.” (African Proverb)
একটা দেশকে স্ট্যাবল হয়ে দাঁড়াতে হলে এর ভিত (ফাউন্ডেশন) মজবুত রাখতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশের ফাউন্ডেশনের অবস্থা খুবই নড়বড়ে। একেবারে বেহাল দশা বলা যায় আরকি! এর কারণটা কি? একটা দেশের ভিত মজবুত করতে হলে এর তারুণ্যের মেধা আর উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে হয়। ঠিক এ জায়গাতেই মার খেয়ে বসে আছি আমরা। শিক্ষাব্যবস্থা সহ প্রতিটা সেক্টরে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের অবস্থা ও বিশ্ব দরবারে আমাদের অবস্থান খুবই নাজুক। কিছুদিন ধরে এ ব্যাপারটা বেশ ভালোই উপলব্ধি করতে পারছি আমরা, পারছি না? তাইতো সিঙ্গাপুরের মতো ছোট্ট একটা দেশ যখন সারা দুনিয়াকে তাক লাগানোর জন্য উদ্ভাবনের পেছনে ছুটছে আমরা তখন ছুটছি সিজিপিএর পেছনে। চীনারা তাদের মেধাবী তরুণদের পুরো বিশ্বজুড়ে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর আমরা পরে থাকি কোনোমতে পাশ করে গ্রাজুয়েট কমপ্লিটের আশায়। “এক হাতে কখনো তালি বাজেনা”- এক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরও যেমন কিছু দায়ভার আছে তেমনি রাষ্ট্রেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে।
লেখক রউফুল আলম দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাহিরে গবেষণা কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। সেখানের পারিপার্শ্বিকতা তাকে গণমাধ্যমে (দৈনিক পত্রিকার কলামে) লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২০১৯ এর দিকে লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ করা হয়। বইয়ের প্রতিটা প্রবন্ধমূলক রচনায় লেখক আমাদের দেশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেই থেমে থাকেননি সেগুলো সমাধানের সম্ভাব্য উপায়ও ব্যক্ত করেছেন। আমাদের নড়বড়ে অবকাঠামোকে মজবুত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। এই বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে লেখক এই ম্যাসেজটাই পৌঁছে দিচ্ছেন। সারা দুনিয়ায় দেশের মেধাবী তরুণদের ছড়িয়ে পড়তে হবে। তারপর সেখান থেকে জ্ঞান, চিন্তাধারা অন্বেষণ করে ছড়িয়ে দিতে হবে নিজের দেশের অভ্যন্তরে। তবেই না দেশটা নতুন ফ্রেমে বিশ্বমঞ্চে শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
বেশিরভাগ লেখায় শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষাঙ্গন বা শিক্ষা ব্যবস্থায় ফোকাস করা হয়েছে। লেখক হয়তো এই ব্যাপারটাতেই জোর দিতে চেয়েছেন। এর বাইরে অনেক টপিক নিয়ে আলোচনা করা যাবে। যেসব টপিকে বইয়ের অভ্যন্তরে আলোকপাত করা হয়েছে সেগুলো নিয়ে আরো বিস্তর আলোচনা সম্ভব���
এই বইটা সবার পড়া উচিত। বিশেষ করে হাই স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটা স্ট্রংলি রেকোমেন্ডেড!
আমি প্রবন্ধ সাধারণত পড়িনা, তবে এই বই টা অসাধারণ লেগেছে। লেখকের চিন্তা-ভাবনা এবং কিভাবে একটা দেশকে দাঁড় করানো যায় তাঁর প্রায় অনেক কিছুই লিখা আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে আমরা এই কর্ম গুলো করতে পারব নাকি তা এখনো বলা যায়না। বাংলাদেশে যতদিন এমন ঘৃণ্য রাজনীতি চলবে ততদিন আমরা ভূগব।
একটি দেশের বেড়ে উঠার পেছনে ঐ দেশের Key Metrics গুলো বেশ বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। আর একটি দেশের প্রধান Key Metric হলো, সেই দেশের মেধাবীরা। আর এই মেধাবীদের জন্য একটি দেশ যদি সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়,তাহলে এর ফল বেশ লম্বা সময় ধরে বয়ে নিতে হয় একটি দেশকে।
এসব বিষয় নিয়ে বেশ গভীর বিশ্লেষন করেছেন রউফুল আলম ভাইয়া।
বিস্তারিত রিভিউ লিখছি না। অনেকগুলো ছোট ছোট আর্টিকেলের সংকলন হচ্ছে এই বইটা। বইয়ের নাম দেখে মনে হতে পারে গুরুগম্ভীর ভারি কিছু প্রবন্ধ টাইপ লেখা। না, সেটা নয় বরং লেখকের ঝরঝরে সহজ ভাষায় অতি বাস্তব কথা উঠে এসেছে। আজ যেসব দেশ সভ্য-উন্নত সেগুলোর সাথে নিজের দেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন লেখক।
ব্যক্তিগত একটা মত দিয়ে শেষ করি। সত্যিকারের উন্নত দেশগুলো এমন কি করছে আর আমরা কি করছি সেই সত্য কথা নিয়ে সাজানো এই বইটা আরো ভালো হতে পারতো যদি না গতানুগতিক ধারার সাধারণ কিছু অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য মাঝে মাঝে না থাকতো।
"দেশের ব্যাংকগুলো থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়। সড়ক উন্নয়ন, সেতু, ফ্লাইওভার এসব নাম দিয়ে ৫০ বছর পর্যন্ত প্রতিটা সরকার কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছে। অথচ শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজন হলেই দেশে টাকার অভাব দেখা দেয়। দেশ তখন গরিব দেশ হয়ে যায়।"
প্রথমে লেখক সম্পর্কে একটু বলে নিই। স্টকহোম ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া থেকে উচ্চতর শিক্ষালাভের পর লেখক বর্তমানে scientist হিসেবে কাজ করছেন আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠানে৷ সময় প্রকাশন থেকে অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ এ বইটা প্রকাশিত হয়। ( আপু গিফট দিয়েছিল আমাকে 🙂 তাকে ধন্যবাদ..)।
বইটা হাতে নিলে সবার আগে নজর কাড়ে এর নাম- 'একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়' ; অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক একটি নাম। নামটা পড়েই বইয়ের প্রতি প্রত্যাশা বেড়ে যায়, জানতে মন চায় কী মূলমন্ত্র আছে বইতে যার মাধ্যমে লেখক একটি দেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন?
বইটা মূলত অনুপ্রবন্ধের সংকলন। বিভিন্ন সময়ে নানান পত্রিকায় লেখকের ছাপানো সর্বমোট ৬৩ টি অনুপ্রবন্ধ (article) কে এই বইতে সংকলিত করা হয়েছে। অনুপ্রবন্ধগুলোর মধ্যে যে দিকটাতে সবচেয়ে বেশী মিল সেটি হচ্ছে, সবগুলোই 'শিক্ষা' সম্পর্কিত লেখা। বিশেষত উচ্চশিক্ষাস্তর সম্পর্কিত নানা দিকই প্রধানত ফুটে উঠেছে।
বইটাকে মোটামুটি ২ ভাগে ভাগ করা যায় (আমার মতে) - একটা দেশ যেভাবে হেরে যায় একটা দেশ যেভাবে জিতে যায়
লেখকের মতে, পৃথিবীর সব দেশেই দুর্নীতি, অবক্ষয়, অপচর্চা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু কিছু দেশ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যায়। কীভাবে পারে তারা? লেখক বলছেন, জাদুকাঠিটা হল শিক্ষাব্যবস্থা। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত ত্রুটিমুক্ত, স্বচ্ছ ও আধুনিক, সে দেশ তত উন্নত। [এটা এই বইয়ের মূলভিত্তি। এই কথার সাথে যদি আপনি একমত হতে না পারেন, অন্য অংশে হবার সম্ভাবনা কম]। যা হোক, শিক্ষাব্যবস্থা বললেও লেখক আসলে বুঝিয়েছেন শিক্ষার উচ্চ শিক্ষাস্তরকে। বিভিন্ন জায়গায় 'একটি দেশ' উল্লেখ করলেও লেখকের মূল ভাবনা যে বাংলাদেশকে ঘিরে তা সহজেই চোখে পড়ে।
লেখকের মতে, কোনো দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে চাইলে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করতে পারেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর 'ভালো' শিক্ষকেরা। বৃক্ষের পরিচয় ফলে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় সেখানকার শিক্ষকদের যোগ্যতায়। এই 'যোগ্যতা' কী? - গবেষণা আর কাজের অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই পোড়া দেশে তাদের বড়ই অভাব। লেখক তার অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, এ দেশের বেশীরভাগ (সবাই নয় কিন্তু) শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদেরকে তাদের পুরোটা নিংড়ে দিতে অনিচ্ছুক, নিজেরা গবেষণা করেন না, শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেন না, বা করলেও উন্নত দেশের শিক্ষকদের তুলনায় অনেক কম। তারা বরং রাজনৈতিক মতালাপ, সভা সংসদ করতেই বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করেন (এতটাই যে, অনেক সময় ক্লাস নেবার সময় পান না)। এর কারণ হিসেবে লেখক বলছেন যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ না পাওয়া৷ মেধাকে তুচ্ছজ্ঞান করে নানান "বিবেচনায়" অযোগ্যদের নিয়োগ দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ করার পাশাপাশি তিনি আরো কিছু কারণ তুলে ধরেছেনঃ UGC প্রনীত 'আত্মঘাতি' অভিন্ন নীতিমালা, উপাচার্যদের উপরমহলের 'পুতুল' হয়ে যাওয়া ইত্যাদি৷ দেশের বাইরের মেধাবী গবেষকরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক/গবেষক হতে পারছেন না এ ব্যপারটি বইতে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। আর এর সাথে মারামারি, হরতাল, ধর্মঘট, আন্দোলন, ক্লাস বর্জন, লাগাতার ছুটির মতো অনুঘটকগুলো মিলে গেলে একটি দেশ হেরে যায়।
এতো গেল হারার দিক। কিন্তু উপায় কী? কীভাবে একটা দেশ ঘুরে দাঁড়ায়? লেখকের মতে, এ প্রশ্নের উত্তরঃ উদ্ভাবন - গবেষণা আর কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রতিযোগিতা ! আর এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। ছড়িয়ে পড়তে হবে পৃথিবীব্যাপি, সঞ্চয় করতে হবে সেরা মস্তিষ্কগুলোর জ্ঞান আর তারপর দেশে ফিরে সেগুলোকে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। আমাদের দেশের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তরুণদের নিজের প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে, অংশ নিতে হবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়, যেখানে 'অর্থ' বা 'ক্ষমতা' নয়, কেবল 'মেধা'র জোরেই টিকে থাকা যায়। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে লেখকের পরামর্শ, গবেষণার ক্ষেত্রে 'দেশ' কে মূখ্য বিষয় হিসেবে না দেখে বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জনকেই গুরুত্ব দেয়া দরকার, সেটা যে দেশেই হোক। এমন মনোভাবসম্পন্ন একটা প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারলেই দেশ গঠনের ভিত্তি রচিত হয়ে যাবে। বাকি কাজটা রাষ্ট্রের। এসমস্ত মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প (যেমনঃ চীনের Thousand Talent Plan) চালু করা, বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়োগের সুযোগ দেয়া, তাদের জ্ঞানকে জাতীয় প্রয়োজনে বিনিয়োগের মত কাজগুলো রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। পুরনো "Brain Drain" ধারণা ঝেড়ে ফেলে ধারণ করতে হবে "Brain Gain" কিংবা "Intellectual Scanning" এর মতো নতুন ধারণাগুলোকে। ১৫০০ কোটি টাকা দ��য়ে দু��� যুগের পুরনো জাহাজ না কিনে, বিভিন্ন দেশে ৫ হাজার তরুণকে গবেষণায় পাঠানোর মত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলেই দাঁড়াবে দেশ। এর পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ খুব দ্রুত নিতে হবেঃ
(১) সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, কোটা ইত্যাদি বন্ধ করা। (২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা। (৩) বিশ্ববিদ্যায়ে গবেষণায় জোর দিতে হবে। (৪) গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। (৫) শিক্ষকদের গবেষণাভিত্তিক পদোন্নতি বিবেচনা করতে হবে। (৬) গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিষদে রাজনৈতিক লোক/আমলা নিয়োগ না দিয়ে গবেষকদের নিয়োগ দিতে হবে।
আর, সবার শেষে লেখক একটা লিস্ট দিয়েছেন যে, একটা সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন।
মোটামুটি সারসংক্ষেপ এই.. বিস্তারিতভাবে জানতে হলে, আরো স্বচ্ছ ধারণা অর্জনের জন্য বইটা পড়তে হবে। পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে তার চিন্তাগুলো ইতিবাচক। তবে কিছু কথা না বললেই নয়৷ বইটা পড়তে গিয়ে আমার অনুমান হয়েছে (চাই না সত্য হউক) লেখক লেখাগুলোকে 'বই' হিসেবে প্রকাশের আগে যথেষ্ট সময় ও চিন্তা দেন নি। প্রথমত, প্রবন্ধগুলো ধারাবাহিকতা নেই, খানিকটা এলোমেলো। এখন শিক্ষক নিয়মে অনিয়মতা, একটু পর বাজেট প্রস্তাব, তারপর শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাস, একটুপর উপাচার্যের দীর্ঘশ্বাস.. এভাবে বলার কারণে মূল বিষয় (একটা দেশ কীভাবে দাঁড়ায়) এর সাথে চিন্তাকে মেলাতে বেগ পেতে হয়, সুবিন্যস্তকরণের অভাবে বইয়ের সামগ্রিকতার ভাব নষ্ট হয়েছে। বইয়ের ২৬ নং অনুপ্রবন্ধটা (শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ) বইয়ের একেবারে প্রথমে দেয়া উচিত ছিল বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এছাড়া কিছু কিছু কথা অনেকবার repete হয়েছে। ভালোভাবে সম্পাদনা করলে ১৯২ পৃষ্ঠার এই বইটিকে ১২০/১৩০ পৃষ্ঠাতেই কোন কিছু বাদ না দিয়ে আরো সুন্দর একটা রূপ দেয়া যেত। আরেকটা কথা, বইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেই দেশ গড়ার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা অন্য ধারাগুলোকে জোর দেয়া হয় নি৷ তাহলে কী এগুলো জরুরি নয়? এসব কিছু বিবেচনা করে বলা যায়, বইয়ের নাম 'একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়' না দিয়ে 'একটা বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে দাঁড়ায়' কিংবা 'একটা দেশের উচ্চশিক্ষা যেভাবে দাঁড়ায়' দেয়া হলে পাঠকের প্রতি সুবিচার করা হত।
একটা কথা আছে কাজকে যাচাই করতে হবে তার উদ্দেশ্য দিয়ে৷ কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও লেখককে সাধুবাদ জানাব তার লেখার মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য। শিক্ষার মতো বিষয় নিয়ে লেখাগুলোর সৃষ্টির আসলে কারণ যে তার দেশপ্রেম এবং উদার, ইতিবাচক চিন্তাধারা এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই এবং এর জন্য লেখক প্রশংসার দাবি রাখেন। একজন লেখকের প্রথম বই হিসেবে এর চাইতে বেশী কী চাইতে পারি আমরা?
বইয়ের উল্লেখযোগ্য কিছু উক্তিঃ
♦ চীন খুবই কৌশলী জাতি৷ অন্যের কাছ থেকে 'জ্ঞান' ধার করা ছাড়া ওরা অন্যকিছু সহজে ধার করে না।
♦ এই যে গভীর রাত পর্যন্ত ল্যাবরেটরির রুমে রুমে আলো জ্বলছে, সেটার কারণেই এই দেশ (USA) পৃথিবীর পরাশক্তি।
♦ যে দেশ তার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের ভালো রাখার চেষ্টা করে, সে দেশ রক্ষার জন্য বিদেশ থেকে সহস্র কোটি টাকার অস্ত্র কিনতে হয় না। প্রতিটি তরুণ প্রতিরক্ষার একেকটি বারুদ হয়ে যায়!
♦ এসব দেশে সব দিবস-ই কর্মদিবস- যদি কেউ কাজ করতে চান।
♦ জন্মকে যেখানে কর্ম থেকে বড় করে দেখা হয়, সেখানে কর্মবিশ্বাসীদের সংখ্যা কমে যায়। (কোটাব্যবস্থা প্রসঙ্গে)
♦ মাপকাঠি যেখানে নড়বড়ে, শৃঙ্খলা সেখানে দুরাশা।
♦ সারা দুনিয়া থেকে আমরা খাবারের সংস্কৃতি নেই, পোশাকের সংস্কৃতি নেই, বাংলিশে কথা বলার ঢঙ নেই, প্রযুক্তির সংস্কৃতি নেই, নাটক-মুভি অনুসরণ করি কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কৃতি নেই না।
♦ একুশ শতকে একটি মেধাবী মন-ই একটি দুর্গ।
♦ যে জাতি যেটির মূল্যায়ন করে, সে জাতি সেটিই পায়। আমরা দেশভর্তি নেতা পেয়েছি।
♦ "I don't create, what i don't understand"- ফ্যাইনম্যান
♦ আমাদের বহু শিক্ষক-ই বদমেজাজি। কারণ, যাদের 'মগজ' নেই, তাদের মেজাজ থাকতে হয়।
♦ জীবনযুদ্ধে কোন সহযোদ্ধা (বন্ধু/শিক্ষক/…) নেই, সেখানে আমরা সবাই একা।
♦ ১৮-৩০ হল নিজেকে পরখ করার বয়স, চ্যালেঞ্জ করার বয়স।
♦ মূর্খরা ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের জন্য, জ্ঞানীরা সেটা করেন সমাজের জন্য।
♦ গবেষণা হল একটা 'সংস্কৃতি'- এটা গড়ে তুলতে হয়।
♦ যারা হাত ও মাথা ব্যবহার করতে জানে, তাদের শুধু আকাশের দিকে হাত তুলে রাখতে হয়না।
♦ একটা জাতিকে দাঁড় করাতে GDP লাগে না, বড় বড় দালানকোটা লাগে না, লাখ লাখ সেনাবাহিনী লাগে না, পারমাণবিক বোমা লাগে না, লাগে শুধু মেধার পরিচর্যা।
♦ আজ যা হয় নি, কাল তা হবে। আজ যা নেই, কাল তা ধরা দেবে। আজ যে উপেক্ষা করছে, কাল সে দেবে সালাম। শুধু কাজে লেগে থাকো।
শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের মানদণ্ড। যে দেশ যত বেশি শিক্ষিত,সেই দেশ তত বেশি উন্নত। এবং শিক্ষা পারে একটি দেশকে এগিয়ে নিতে। এই শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের কতটুকু সামঞ্জস্য আছে কখনো কী এই বিষয়ে আমরা ভেবে দেখেছি?
এ দেশের শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক কাজে কতটুকু বরাদ্দ থাকে? দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকেরা কতটুকু নজর দেন? বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া মেধাগুলো আদৌ কী আর ফিরে আসছে দেশে? এদেশের শিক্ষার্থীদের নিজেরাই বা কতটুকু আগ্ৰহী শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন গবেষণা ভিত্তিক কাজে? প্রশ্নগুলো অমূলক নয়, বরং যুক্তিযুক্ত। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যাক। নাহলে এই দেশের উন্নতি আদৌ সম্ভব নয়। কারণ ছাত্র ছাত্রীরাই তো আগামীর বাংলাদেশ গড়বে।
গবেষণায় এদেশের কয়জন শিক্ষার্থীর আগ্ৰহ আছে? নতুন নতুন বিষয়ে জানার কৌতুহল কেন তাঁদের কম? যেকোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নতি করতে হলে গবেষণা ভিত্তিক কাজে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেরকম কী হচ্ছে? অথচ উন্নত দেশগুলোতে গবেষণা ভিত্তিক কাজে দিনরাত পরিশ্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শুরু করে মিডল স্কুলের শিক্ষকেরা পর্যন্ত।
ছোট থেকেই ওরা বড় হচ্ছে গনিত, রসায়নসহ বিজ্ঞানের নানান শাখার সাথে পরিচিত হয়ে। তাঁদের মধ্যে শেখার আগ্ৰহ রয়েছে। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠোনে পা রেখেই একেকজন বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় জড়িয়ে পড়ে। দেশগুলোও অকাতরে মেধাবী দিয়ে পেছনে খরচ করে চলেছে টাকা। ফলাফল? চীন, আমেরিকা এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী তৈরি হচ্ছে। যাঁরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।
আচ্ছা তারমানে কী আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্ৰহ কম? নাহ কখনো নয়। তাঁদের রয়েছে সেশনজটের অভিশাপ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। রয়েছে ভালো শিক্ষকের অভাব। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় তাঁর পিএইচডি, গবেষণার টার্ম পেপার, প্রকাশিত জার্নাল ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে, সেখানে এদেশে শিক্ষক হওয়া যায় ডিপার্টমেন্টে টপ করলে কিংবা কখনও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে।
একজন ভালো শিক্ষক হতে পারেন উন্নয়নমূলক গবেষণা ভিত্তিক কাজের পথপ্রদর্শক। তিনি শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদান করতে পারেন। তৈরি করতে পারেন তাঁদের জ্ঞানের আলোতে। কিন্তু এদেশে এসবের ধ���র ধারেন না শিক্ষকেরা। শিক্ষাদানের বাইরে কত কাজ তাঁদের। ঠিক করে কখনো কখনো ক্লাস নেয়ার সময়ই নেই।
এখন যদি এদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভালো সুযোগ পেলে যদি বিদেশে চলে যায় সেই দোষটা কাদের? এসব মেধাবীদের ধরে রাখার জন্য দেশ কী কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে আদৌ? এইসব মেধাবীদের কী কোনো কাজে লাগাতে পেরেছে রাষ্ট্র? চীনের মতো দেশ তাঁদের শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয় সারা বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য। আমেরিকা ছিল চীনের বড় শত্রু অথচ তাঁদের দেশেও প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থীদের পাঠায় চীন। এরা জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে শত্রুতা মাথায় রাখে না।
এর ফলাফল হিসেবে প্রতিবছর চীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গবেষণায় এগিয়ে চলেছে সাফল্যের সাথে। চীন প্রতিবছর যেমন মেধাবীদের বাইরে পাঠায় তেমনি তাঁদের ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগ করে ঈর্ষণীয়। চীনের থেকে আমাদের দেশ কী শিখতে পেরেছে? চীন বাদ দেয়া হলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন গবেষণা খাতে দিন দিন কত উন্নতি হচ্ছে আমরা কী খেয়াল করে দেখি?
তাঁরা তো নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। আর এদেশের শিক্ষকেরা ব্যস্ত সফরে কিংবা সেমিনারে। শিক্ষার্থীদের কেউ ব্যস্ত অন্য কোন কাজে। তাহলে একটি দেশ কীভাবে দাঁড়াবে বলুন! যখন তাঁর মেরুদণ্ড শিক্ষাব্যবস্থার এই হাল! যেখানে ছোট থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে শুধু জিপিএ ফাইভ এর চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাঁদের মেধা বিকশিত হয়ে কীভাবে দেশের উন্নয়নে সেটা কাজে লাগবে?
এমনিতেই এদেশের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা উঠে আসে গ্ৰাম থেকে। সংসারের পাহাড়সম প্রত্যাশা ছেলে বা মেয়ে চাকরি করে তাঁদের জীবন উন্নত করবে। সেখানে বছরের পর বছর সেশন জটের কবলে পড়ে না তাঁরা ঠিক করে অনার্স ডিগ্রি নিতে পারে না তাঁরা জীবনে এগোতে পারে। সংসারের হাল ধরতে কেউ কেউ নামে টিউশনিতে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে কেউ যদি উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা করেও দেখা যায় সে মাঝখানে হারিয়ে ফেলেছে জীবনের মহামূল্যবান কয়েকটা বছর।
অথচ উন্নত দেশগুলোতে ২২-২৬ এর মধ্যে একেকজন পিএইচডি করে লেগে পড়ে গবেষণায়। তাঁরা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে। সরকার তাঁদের জন্য দিয়ে রেখেছে অজস্র সুযোগ সুবিধা। তো তাঁরা কাজ কেনো করবে না বলুন। আর আমাদের ���েশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাবে দলীয়করণ, রাজনৈতিক রেষারেষি কিংবা শিক্ষদের উদাসীন ভূমিকা। বছরের অর্ধেক সময় তো বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই বন্ধ থাকে বিভিন্ন কারণে। তাহলে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা যেসব শিক্ষার্থীদের, যারা করতে চায় উন্নত গবেষণামূলক কাজ তাঁদের জন্য ঠিক কতটুকু সুযোগ আছে?
যেহেতু দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবস্থা, তাই সুযোগ পেলেই উচ্চশিক্ষার জন্য তাগিদ রয়েছে এই বইয়ে। গবেষণার সাথে যুক্ত হতে। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে বৃত্তি দিয়ে থাকে। এই বৃত্তিগুলো গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষায় নিজেদের এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। যুক্ত হতে হবে উচ্চতর গবেষণামূলক কাজে। উচ্চশিক্ষা নিতে যাবার মানে এটা নয় যে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা শেষ না করেই টাকা কামানোর কাজে লেগে পড়া। পৃথিবীকে জানার আগ্ৰহ থাকতে হবে। সবার মতো চিন্তা না করে চিন্তাগুলোকে করতে হবে প্রসারিত আরো।
বইটিতে আমার ভালো লেগেছে লেখক উচ্চশিক্ষায় গবেষণার প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলার তাগিদ দিয়েছেন এবং গবেষণামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন যেখানে দেশ এখনো পিছিয়ে আছে। তবুও লেখক সম্ভাবনার আলো দেখেন কারণ দেশে গবেষণামূলক কাজ হচ্ছে। এখনো কিছু মানুষ এই কাজে আছেন। সরকারের উচিত কী হবে না এইসব কাজে বেশি বেশি বিনিয়োগ করে দেশকে এগিয়ে নেয়া? দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির জন্য যদি মেধাবীরা বঞ্চিত হয় তবে এটা কার ক্ষতি? এটা সমগ্ৰ দেশের ক্ষতি।
আমি নন ফিকশন পড়তে অভ্যস্থ নই। এবং এই বইটা নিয়ে কীভাবে গুছিয়ে লিখবো বুঝতে পারছিলাম না। তবে বইটা আমার ভালো লেগেছে। একটি দেশ দাঁড়ায় তাঁর শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে। ছাত্র-ছাত্রীরা এদেশের ভবিষ্যৎ। এদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
লেখক সহজ সাবলীল ভাষায় বলেছেন সম্ভাবনার কথা, বলেছেন সমস্যাগুলোর কথা, তেমনি তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে সুযোগ তৈরি করে নেয়ার। উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণামূলক কাজ একটি দেশে যত বেশি হবে দেশ এগিয়ে যাবে। লেখক ছোট ছোট অনুপ্রবন্ধ দিয়ে টপিকগুলো বুঝিয়েছেন। বেশ খটমটে লাগেনি এবং আমিও যেহেতু একজন শিক্ষার্থী তো বলা যায় এই বইয়ের টপিকগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং সহায়ক।
সম্ভাবনা বেঁচে থাকুক এবং এগিয়ে যাক বাংলাদেশ বিশ্বে। এইটুকু প্রত্যাশা রইলো।
মাধ্যমিক শ্রেণিতে আমরা সবাইই 'শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড' ভাব সম্প্রসারণটি পড়েছিলাম। অর্থাৎ সু-শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরে একটি জাতি জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত হতে পারবে। কিন্তু জাতির শিক্ষাব্যবস্থায় যখন ঘুনপোকা বাসা বাঁধবে তখন উন্নতি আশা করা বাতুলতা। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা মোট তেষট্টি টি অনুপ্রবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন রউফুল আলম। প্রায় সবগুলো প্রবন্ধই উচ্চ শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে গবেষণার গুরুত্ব বিষয়ক।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরূপ প্রকাশ পায় সাধারণত তার উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। যদিও মিডল স্কুলগুলো এই ভিতটা গড়ে দেয়, তবে উচ্চ শিক্ষার মান ভালো হলো মিডল স্কুলও বিনিময়ে ভালো শিক্ষক পায়। কোনো দেশ স্বনির্ভরতার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্পের উন্নতি করতে চাইলে অবশ্যই উচ্চশিক্ষার প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চ শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হলো গবেষণা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এই গবেষণা খাতে ব্যাপক খরচ করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণার ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ কেমন? অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অন্যের গবেষণাপত্র চুরি করে নিজের নামে প্রকাশ করেন এবং কিছুদিন পর পরই পত্র পত্রিকায় এ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ হয়।
আমরা একটু চীন ও আমেরিকার দিকে তাকাই। চীন ও আমেরিকা পরস্পর বাণিজ্য ও কুটনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও; আমেরিকায় যত গবেষক বা শিক্ষার্থী আসে, তার সিংহভাগ চীনের নাগরিক। চীন তাদের প্রতিপক্ষের থেকেও নিজেদের উন্নতির স্বার্থে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় পড়ালেখা করতে গিয়ে উন্নত বিশ্বের বিলাসি জীবন যাপনের হাতছানি তাদের সেই দেশেই স্থায়ী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়। চীন বা অন্যান্য দেশগুলো কিন্তু এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ফেরত নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চলমান রেখেছে। যাতে করে তাদের মেধাসম্পদ পাচার না হয় এবং দেশের উন্নতিতে মেধার ব্যয় করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে গমন করেন; তারা আর দেশে ফিরতে চান না। এর কারণ খুঁজলে দেখা যায় যে, তাদের মেধা অনুযায়ী দেশে মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও তা���ের যোগ্যতাক��� ছোট করে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার জন্য নূন্যতম যে গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে, তা অনেক শিক্ষককেরই নেই। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে, একজন পিএইচডি থিসিস সম্পন্নকারী প্রার্থীর চাইতে রাজনৈতিক কিংবা স্বজনপ্রীতি সুবিধাভোগীরাই এগিয়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বে এমনটা কখনোই দেখা যায় না।
পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু ছিল কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই বিভাগের বেহাল দশা। একজন শিক্ষক ও ছয়জন শিক্ষার্থী নিয়েই চলছে সেই বিভাগ। পাকিস্তানে বাংলা শিখতে না পেরে একজন পাকিস্তানি কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন জানান। অদ্ভুত এক নিয়ম রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেখানে বলা হয়েছে পাকিস্তানের কোন নাগরিককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে না। এবার একটু উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে দুইটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পরও জাপান আমেরিকা হতে জ্ঞান-বিজ্ঞান গ্রহণ করতে পিছপা হয়নি। তারই ফলাফল হিসেবে জাপান আজ উন্নত বিশ্বের দেশ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক গর্ব করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর গ্রহণযোগ্যতা চান। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রসারে কোনো উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে? যে কয়েকটি দেশে বাংলা ভাষা শিক্ষা করা হতো, তাও আজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি অনিয়ম দেখা যায়, সেটা হলো সেশনজট। চার বছরের কোর্সকে টেনে ছয় থেকে সাত বছর করে ফেলা হয়। অথচ এই নিয়ে কারো কোনো বিকার নেই। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করেও বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছেন ইউজিসির কর্মকর্তারা।তারা কি আসলে শিক্ষার দান করতে ইচ্ছুক নাকি শুধুমাত্র দেখানোর জন্যই 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড', 'প্রাচ্যের ক্যালটেক' বলে গলাবাজি করেন। এত বছর পড়ালেখা করেও একটি সার্টিফিকেট ব্যতীত শিক্ষার্থীরা আর কিছুই পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের পদলেহন করতেই ব্যস্ত, সেখানে তারা কতটা দায়িত্ব পালন করেন সেখানে সন্দেহ রয়েই যায়। বিশেষ দিনগুলোতে ক্লাস করালে যেখানে ছাত্র নেতাদের দ্বারা শিক্ষকরা লাঞ্চিত হন, সেখানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাটাই বিরাট চ্যালেঞ্জ। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা কখনোই দেখিনা শিক্ষকেরা রাজনীতির সাথে যুক্ত নিয়ে নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা করেন। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির অস্থিতিশীল পরিবেশও শিক্ষা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের আরো জ্ঞান বৃদ্ধি করা, নিজ নিজ বিষয়ে পারদর্শী করে তোলা এবং গবেষণার মাধ্যমকে দেশকে স্বনির্ভর করে তোলা। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যই হয়ে গিয়েছে সার্টিফিকেট অর্জন। তাই লেখক বারবার তাগিদ দিয়েছেন গবেষণার সাথে যুক্ত হতে। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে বৃত্তি দিয়ে থাকে। এই বৃত্তিগুলো গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষায় নিজেদের এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা ঘটেছিল যে, রোমানিয়া তাদের দূতাবাস গুটিয়ে বাংলাদেশ থেকে চলে গিয়েছে। কারণ রোমানিয়ায় শিক্ষার্থীরা যাওয়ার পর পড়ালেখা শেষ না করেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যায়। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কীভাবে তারা দেশের জন্য কাজ করবে!
বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো উচ্চশিক্ষায় গবেষণার প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলা এবং গবেষণামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া। আমাদের দেশে যে গবেষণা একেবারে হয়না তা না; কিন্তু যে পরিমাণ গবেষণা হয়, তার সঠিক মূল্যায়ন হয় না। তাই যখন একজন গবেষক বেগুনের মাঝে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেন; তখন তাঁকে প্রশ্ন শুনতে হয় তিনি কেন বেগুন নিয়েই গবেষণা করলেন! বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার তুলনামূলক যে চিত্রটি লেখক তুলে ধরেছেন, তাতে সহজেই আমাদের অবস্থান বোধগম্য হবে। বাংলাদেশের এত পিছিয়ে পড়ার কারণ দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর সামাজিক অবস্থান। শিক্ষা গ্রহণের পর চাকরিতে কোটা বৈষম্য দূর করা উচিত। কোটা এমনভাবেই রাখা উচিত যাতে সুবিধাবঞ্চিতরাই সুযোগ পায় এবং যোগ্যরাও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
লেখকের এই অনুপ্রবন্ধগুলো বিভিন্ন সময়ে লেখা হয়েছে বিধায় কিছু জায়গায় লেখার মাঝে পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তবে লেখার গতি এবং বর্ণনা সহজ সাবলীল হওয়ায় ভালোই লেগেছে। বাংলাদেশ ও উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা্র যে চিত্র অংকন করেছেন, তাতে করে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ছাত্রদের বিশেষ করে যারা এখনো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেনি কিংবা মাঝপথে রয়েছে তাদের এই বইটি পড়া উচিত বলে মনে করি। বইটি পড়লে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমন এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহী হবে। হ্যাপি রিডিং।
একটা দূর্দান্ত বই হতে পারতো! কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত লেখকের ছোট ছোট লেখা গুলো ( ১৯০ পৃষ্ঠার বই এ ৬৩ টা বিভিন্ন সময়ের লেখা!!) জাস্ট ধরে এনে পুরে দেওয়াতে বইটার সর্বনাশ হয়ে গেছে। বেশ কিছু দরকারি টপিক, না জানা গল্প আর কৌতুহলোদ্দীপক রেফারেন্স আছে বইটাতে কিন্তু চর্বিত চর্বণ এত বেশী যে পাঠক বিরক্ত হতে বাধ্য।
কোথাও আমি একবার একটা লেখা পড়েছিলাম লেখাটা অনেকটা এমন যে, একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি দূর্নীতি হয় প্রশ্ন ফাঁস হয় তাহলে ঐদেশের সেইসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া মেধাবীদের যারা ইঞ্জিনিয়ার হবে তাদের দ্বারা বানানো ইমারত, ব্রিজ ভেঙে দূর্ঘটনা হবে। ডাক্তারদের হাতে রোগী মারা যাবে। আবার যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে যথাযথ ভাবে পরিচালনা করা যায়, গঠন করা যায় তাহলে সেই দেশ খুব দ্রুতই বদলে যাবে।
লেখক 'রউফুল আলম' এর 'একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়' বইটার লেখাটাও অনেকটা এই ভিত্তিক। লেখক একটা দেশকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তিসহ নানান দিকে উন্নয়নের শিখরে আহরণের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। যেখানে এসব উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে জোর দিয়েছেন সঠিক এবং মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা ও গবেষণায়।
এক্ষেত্রে লেখক তার ব্যক্তিজীবনের গবেষণা চালানোর সময়ের অভিজ্ঞতা, গবেষণায় আসার রাস্তায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নানান বাঁধা নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটা দেশের শিক্ষার্থীদের গবেষণা মান সম্মত করা, দেশে সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশের বাইরে যাওয়া মেধাবীরা কেন ফিরছে না তার স্বরূপ আলোচনা করেছেন।
আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় আপনি পুরোপুরিভাবে একাডেমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে চাইলে ২৫-২৭ বছর পেরিয়ে যায়, তারপরেও সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। এরপরই আসলে যুদ্ধটা শুরু হয়, চাকরির যুদ্ধ। তার জন্য আবার আলাদাভাবে পড়াশোনা করতে হয���, এক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের দেশের আরো একটা সমস্যা হলো পড়ালেখা জীবনে আপনি যে বিষয় নিয়ে পড়েছেন তার উপরই ভিত্তি করে সেই সেক্টরেই যে চাকরিটা পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার উপর আবার চাকরিটা অর্জন করতে হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সিলেবাসও যেমন ঠিক গবেষণা উপযুক্ত নয়, আবার উপযুক্ত নয় আমাদের দেশীয় শিক্ষক নিয়োগ। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে গবেষণা, মেধার চেয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয় তার সিজিপিএ, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডকে। যার ফলে তার হাত ধরে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা বা গবেষণার রাস্তাটা দেখতে পায় না। লেখক তা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
বইটিতে লেখক বিদেশে নিজের অভিজ্ঞতা, গবেষণা করতে গিয়ে হওয়া নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আমেরিকা, চীন, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আমাদের দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক একটা চিত্র দাঁড় করিয়েছেন। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন কোনো শিক্ষার্থী দেশের বাইরে গবেষণার জন্য যেতে চাইলে কী কী বিষয়ের সম্মুখীন হতে হবে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই সাথে মেধাবী শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ দিলে তা একটা দেশের জন্য কী বয়ে আনে বা কীভাবে সহযোগীতা করে তা নিয়েও আলোচনা করেছেন। এর পাশাপাশি অবশ্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকা রাজনৈতিক ক্ষতিকারক প্রভাব এবং ভুলভ্রান্তিগুলোও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ বইটি পড়ার ফলে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছেন বা ভবিষ্যতে বিদেশে পোস্টডক, মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে চান তারা ঠিক কী কী বিষয়ে জোর দিবেন বা কীভাবে নিজের ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নিবেন তা নিয়ে সহযোগীতা করবে। এতে লেখকের অভিজ্ঞতা অনেকের জন্যই সহায়ক হবে।
তবে এই বইটারও কিছু সমস্যা আছে। লেখক বইটিতে তার ছোটো ছোটো কলামে ঘুরেফিরে গবেষণার কথাই বলে গিয়েছেন, সেই সাথে নিজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি ও তাদের কাজে লাগানোর কথাই তুলে এনেছেন। ফলে প্রতিটি কলামে একই টপিকে আলোচনা কিছুটা বিরক্তিকর লেগেছে। এছাড়াও লেখক সম্ভবত বিজ্ঞানের ব্যাকগ্রাউন্ডের ফলে এক্ষেত্রে তিনি তার গবেষণার কথায় এই সেক্টর সম্পর্কিত আলোচনই তুলে এনেছেন।
তবে যারা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করছেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে আছেন এবং ভবিষ্যতে বিদেশে পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য যেতে চান তাদের জন্য ক্যারিয়ার গঠনে বইটা নতুন বা ভিন্ন চিন্তার ধার উন্মোচন করবে। কিন্তু এর বাইরে সাধারণ মেধার মানুষের জন্য বইটি অতোটা সহায়ক হবে না। তাছাড়া বইটার নাম দেখে কেউ যদি মনে করেন বইটা পড়লেই একটা দেশকে সামগ্রিকভাবে কীভাবে গঠন করলে ভালো হবে তা নিয়ে ধারণা পেয়ে যাবেন তাহলে ভুল করবেন। কেননা এতে কেবল একটা বিষয় নিয়েই আলোচনা করেছেন আর তাতে আরো অনেক বিষয়ের আলোচনাই অনুপস্থিত। তবে বইটা অবশ্যই ভালো, যা পড়লে আমাদের নদীর স্রোতের মতো একমুখি লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া ক্যারিয়ার প্রত্যাশী মানুষদের চিন্তার পরিধি আরো বাড়াবে, ভিন্ন একটা জগৎ উন্মোচন করবে যা হয়তো ভবিষ্যতে দেশীয় ট্রেন্ডিং চাকরি ছাড়াও ভিন্ন ক্যারিয়ার গঠনে সাহায্য করবে।
বই: একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায় লেখক: রউফুল আলম প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ প্রকাশক: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী মূল্য: ৩৫০৳ পৃষ্ঠা: ১৬০
বইটি আমি এমন সময়ে পড়েছি যখন আমি দেশ,দেশের সিস্টেম এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি। বলা বাহুল্য, ২৪'এর জুলাইয়ের বিপ্লবের পর আমি দেশ, দেশের বিভিন্ন জিনিস নিয়ে ভাবি,দেখি,শুনি, জানার চেষ্টা করি।
বইটি মূলত দেশের মেরুদণ্ড বা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বলা হয়েছে। আমারা সবাই কমবেশি জানি যে দেশের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা জুড়ে রয়েছে। তেমনি একটি ক্ষেত্র হলো শিক্ষা। এই দেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বাদ রাখেনি কলুষিত হতে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি শিক্ষাক্ষেত্রে ঢুকে রয়েছে রাজনীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা। যেদিকে উন্নত দেশগুলো প্রতিটি দিন চেষ্টা করে তাদের শিক্ষা ক্ষেত্রকে উন্নত করতে। আমরা করি কি যতো পারি নিচে নামাতে। আমাদের দেশে "সেশনজট" শব্দটা প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে রয়েছে। এই সেশনজট জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করছে। কিন্তু এসব নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। এদেশের শিক্ষক নিয়োগ হোক, স্কুলে ভর্তি হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক দুর্নীতি জড়িয়ে রয়েছেই। আমাদের দেশে গবেষণা, পিএইচডি, পোস্টডক এসব নিয়ে তেমন কোনো উদ্যেগ দেখা যায় না। কিন্তু উন্নত বিশ্বে লক্ষ্য করলে দেখা যায় তারা গবেষণা, নতুন কিছু তৈরি, মেধাকে কাজে লাগানো সবকিছুতে এগিয়ে আছে।
লেখক বাহিরে থেকে গবেষণা করছে। তিনি এই বইয়ে শিক্ষা, মেধাকে কাজে লাগানো এসব জিনিস তুলে ধরেছে। আমার মনে হয় তিনি পারতেন আরো অনেক বিষয় তুলে ধরতে। দেশে শুধু শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ছাড়া আরো অনেক বিষয় রয়েছে যেসবে পরিবর্তন আনতে হবে। উন্নত বিশ্বে আইন-কানুন, চাকরি ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছুতে এগিয়ে রয়েছে।আমাদের উচিত একেকটি ক্ষেত্রকে দুর্নীতি ও কলুষিত মুক্ত করা। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আবশ্যক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদন্ড হয়, তাহলে শিক্ষাঙ্গনগুলো হলো সে মেরুদন্ডের কশেরুকা। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া দরকার এবং বাংলাদেশে তা কেমন তার একটি ভাল ধারণা এই বই থেকে পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে অনেকটুকু উদ্দীপ্ত করবে বইটি। পুরো বইটিতে লেখক গবেষণার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। উল্লেখ্য কেউ যদি গবেষণাই যেতে চান তার একটি প্রাথমিক দিক-নির্দেশকও হতে পারে বইটি।
ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলোকে বই আকারে প্রবেশ করায় গভীরতা কমে গেছে। অনেক জিনিস বারবার আসায় বিরক্তির উদ্রেক করেছে। যদি সবগুলো নিয়ে কয়েকটা পার্টে যেমন বর্তমান অবস্থা, সমস্যা, সম্ভাবনা আর উত্তরণের পথ এই নিয়া বড় বড় কিছু প্রবন্ধের সংমিশ্রণে হত তাহলে চমৎকার একটি কাজ হতে পারত। খুবই ছোট(অণুপ্রবন্ধ) আর এডিটেড মনে হয়নি।
তবে অনেক ভাল কিছু দিক চেষ্টা করে গেছেন। এই বইটিকেই ঘষে মেজে একটু এদিক সেদিক করলেই চমৎকার বই হবে।
উচ্চশিক্ষার দিক দিয়ে আমরা যে বাকি দুনিয়া থেকে কত শত মাইল পেছনে পড়ে রইলাম তা উপলব্ধি করানোর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমাদের সরকার প্রশাসন যদি এরপরও এখনো যদি এসব বিষয় নিয়ে পদক্ষেপ না নেয় তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা চিন্তা করে শিহরিত হই। এই বইটি প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া জরুরি, নিজের অবস্থান ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত হবার জন্য।
অসাধারন বই। চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেশের মূল সমস্যাগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়েছে। গঠনমূলক সমালোচনা করা হয় কল্যাণের জন্যই, এটাই উপলব্ধি হয় বইটি পড়ে। কিন্তু পড়তে পড়তে হঠাৎ হঠাৎ আপনার মনটা সামান্য খারাপ হয়ে যাবে।