ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন! নামটা শোনামাত্র আমাদের মাথায় ভিড় করে বিশালদেহী এক দানবের ছবি। তার চেহারাটা ভয়ংকর, এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সেলাইয়ের দাগে ভরা মাথা, সবজেটে হাত-পা, আর কুশ্রী চুলের ছাঁট, এগুলোকে কাছ থেকে দেখার কথা ভাবলেই অন্তরাত্মা অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু তার সঙ্গে ওই দানবের আধবোজা দু'চোখের শূন্য দৃষ্টিও আমাদের চোখে পড়ে। প্রাথমিক ভয় বা বীভৎসতার ধাক্কা কেটে গেলে সেই শূন্যতাই আমাদের কাছে বেশি অস্বস্তিকর ঠেকে। আমরা ভাবতে বাধ্য হই, এই দানব অ-মানুষিক বটে, কিন্তু...! ২০০ বছর আগে রচিত লেখাটি সম্ভাব্যতা, সেটি সায়েন্স ফিকশন না ফ্যান্টাসি সেই কূটপ্রশ্ন, এবং তার প্রায় অজস্র রূপায়নের অন্তর্দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে প্রাসঙ্গিক থেকে গেছে ওই 'কিন্তু'-র জন্যই। ওই দানব কি সত্যিই অমানবিক? তার স্রষ্টা কি ঈশ্বর হতে চেয়েছিলেন, নাকি আলোকবাহী লুসিফারের মতো তাঁকেও অক্ষমের বিচারের দায় মাথায় নিয়ে পালাতে হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুর পরেও?
বাংলায় ব্যারন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ও তাঁর আবিষ্কারকে নিয়ে লেখালেখি হয়নি, এ-কথা বলা যায় না। কিন্তু সেই কাজটির বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, সামাজিক, এবং আধিভৌতিক মূল্যায়ন করে একটা আস্ত বই প্রকাশের কথা ভাবা অসম্ভব ছিল বললেই হয়। কল্পবিশ্ব ওয়েবজিন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নানারকম অসম্ভবের আগুনকে সম্ভাবনার পৃথিবীতে পৌঁছে দিয়ে অভিশাপ কুড়িয়েছেন। তাঁরাই এই দুরূহ কাজটি করে ফেললেন এই বই প্রকাশ করে। কেমন হয়েছে বইটা? ঝকঝকে ছাপা, দারুণ বাঁধাই, আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ, এই জিনিসগুলো আজকের পাঠককে বইটি হাতে তুলে নেওয়াবেই। পাতা ওল্টালে একে-একে যা পাওয়া যাবে তা হল: (*) সন্তু বাগ ও সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকা: সুলিখিত ও সূচিমুখ এই লেখাটি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ২০০ বই তথা মুহূর্তটি উদযাপনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছে স্বল্প পরিসরে। (*) প্রকাশকের কথা ১. Rimi B. Chatterjee-র Frankenstein 200: Childhood's End ২. শঙ্কু ও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন~ সত্যজিৎ রায়: কাগজে-কলমে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নিয়ে বাংলায় লেখা বলতে এটার কথা মনে পড়ে ঠিকই। তবে রি-অ্যানিমেশন নিয়ে সত্যজিতের সেরা ডার্ক কমেডি 'প্রফেসর শঙ্কু ও হাড়'। ওই গপ্পোটা পেলে আরও খুশি হতাম। ৩. চন্দিরা~ প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: ব্রায়ান মুনি-র গল্পটির এই অসামান্য ভাবানুবাদ পাঠককে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। ৪. মেরি শেলি: সৃষ্টির ছায়ায় স্রষ্টা~ অঙ্কিতা'র এই নন-ফিকশন লেখাটি মেরি শেলির জীবনের ট্র্যাজেডি, এবং কল্পনা ও লেখনীর সাহায্যে তাদের ছাপিয়ে ওঠার চেষ্টা, দুই-ই বড়ো মায়াবি ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছে। ৫. পুনর্জন্ম~ দীপ ঘোষ: র্যামসে ক্যাম্পবেলের অতুলনীয় গল্পটি এই সযত্ন অনুবাদে পড়তে পাওয়াও এই বই পড়ার অন্যতম সুফল। ৬. প্রহর শেষের আলো~ সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়: রক্ত, ঘাম, অশ্রু দিয়ে তৈরি হওয়া এক কিংবদন্তিকে নরম আলোয় দেখার এই চেষ্টাটি বড়ো ভালো লাগল। ৭. আয়নার ঠান্ডা কাচ ও অষ্টাদশীর স্বপ্ন~ বিশ্বদীপ দে: এও এক নির্জন, ব্যক্তিগত, অথচ শাশ্বত অনুভবের আখ্যান। এটি এক অর্থে লেখকের একার, আবার ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ও তাঁর দানবকে নিয়ে ভাবা সব্বারও বটে। ৮. সৃষ্টির নেশায়~ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: না, ইনি তিনি নন। 'আশ্চর্য!'-তে প্রকাশিত এই বড়োগল্পটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর মানবিক দ্বন্দ্বের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছে চমৎকারভাবে। ৯. এ কমপ্লিট ওম্যান~ সুদীপ দেব: রোবার্তো ল্যানেস-এর এই গল্পটি সূক্ষ্ম মানবিক উথালপাতাল আর ক্রূর বৈজ্ঞানিক দর্শনের দ্বন্দ্বের যে রূপ তুলে ধরে, তা অসামান্য। সেই গল্পটিকে এমন সুখপাঠ্য ভাবানুবাদ করার জন্য রইল কুর্নিশ। ১০. ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের 'দানব'-এর বিবর্তন~ দেবজ্যোতি গুহ: এই ছোট্ট লেখাটায় দানবের শতরূপের এক চিলতে পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই সময় যে হলিউড উক্ত দানবকে হয় জড়বুদ্ধি কিন্তু শুভ (ভ্যান হেলসিং) বা সরাসরি মসিহা হিসেবে দেখাচ্ছে, তার কারণটাও একটু বিশ্লেষণ করলে আলোচনাটা জমে যেত। ১১. যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল~ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়: অথেনটিক! প্রাপ্তমনস্ক বায়োথ্রিলার কাকে বলে সেটা বোঝার জন্য এই লেখাটি পড়াই যথেষ্ট। লেখাটা রূদ্ধশ্বাসে পড়লাম বললে অত্যুক্তি হবে না। ১২. শ্রীমতী~ রণেন ঘোষ ১৩. মেরি শেলির 'কাল্পনিক' সাক্ষাৎকার~ ক্রিস্টি ফার্ন (সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুবাদে) ১৪. ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আর্মি~ বিশ্বজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়: দুর্দান্ত লেখা। হয়তো প্রেডিক্টেবল, কিন্তু তাতে এই লেখার ব্যাপ্তি বা গভীরতা কমেনি, অন্তত আমার কাছে। ১৫. ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন: কল্পনার অন্তরালে বাস্তব বিজ্ঞান~ সন্তু বাগ ১৬. ডসনের চিঠি~ প্রতিম দাস: ভালো গল্প। ১৭. সমকালীন বিজ্ঞানের বিবর্তনের সঙ্গে মেরি ওলস্টনক্রাফট শেলির জীবনের তুলনামূলক কালক্রম: মূল্যবান লেখা।
যৎসামান্য মুদ্রণ প্রমাদ এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিছু লেখায় ব্যবহৃত প্রাচীন বানান, এগুলো কিঞ্চিৎ গুঁতো দিল। আর মনঃক্ষুণ্ন হলাম গোলেম-কে নিয়ে ইউরোপে প্রচলিত ভাবনার উল্লেখ না থাকায়। এটুকু বাদে এই সংকলন লা-জবাব। কল্পবিজ্ঞান বা ভয়ালরসের অনুরাগী পাঠক তো বটেই। সার্বিকভাবে জীবনরহস্য নিয়ে কৌতূহল আছে এমন যেকোনো পাঠক এই বইটি উপভোগ করবেন বলেই আমার ধারণা। শুভেচ্ছা রইল।