Rafiqun Nabi (Bengali: রফিকুন নবী; also Ranabi) is a Bangladeshi artist and cartoonist. Nabi's most famous creation is Tokai, a character symbolizing the poor street boys of Dhaka who lives on picking things from dustbins or begging and having a knack of telling simple yet painful truths about current political and socio-economic situation of the country. He has written some story in magazine of Prothom Alo the most popular daily newspaper of Bangladesh
চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী'র জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জে। বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময় এতোটাই ঘটনাবহুল ও ঘাত প্রতিঘাতে পরিপূর্ণ ছিলো যে, লেখকের গদ্যশৈলী খুব আকর্ষণীয় না হলেও তরতর করে কৌতূহল নিয়ে পড়ে ফেলা যায়। স্মৃতিকথার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ "আর্ট কলেজ ও অন্য দিনকাল।" চিত্রকলা সম্বন্ধে আমার ধারণা ভাসা ভাসা। রফিকুন নবী সরল গদ্যে চিত্রশিল্প সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তা গভীর। যেমন-
"আসলে এই অদেখা জগৎ সৃষ্টির চেষ্টা শিল্পীরা যে করেন না তা নয় । কত রকমের কাণ্ডকীর্তিই না করা হয়। বিমূর্তের পথটিতে অচেনা জগৎ সৃষ্টির প্রয়াস থাকে অনেক ক্ষেত্রে। পরাবাস্তববাদী নামকরণে মগ্নচৈতন্য, স্বপ্ন-জগৎ, ভাবাবেগ ইত্যাদি দিকগুলোকে চিত্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টাও শিল্পীরা করেছেন। তাতে বিশেষ রীতি তৈরি হয়েছে, স্টাইল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, ‘ফ্যান্টাসি’ এসেছে। বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া হয়নি। এভাবে চেনা বস্তুর, রঙের, আকারের, রেখার, স্পেসের ঘরেই শেষতক রয়ে যাওয়া। সালভাদর দালির ছবিতে চেনা বস্তুই থাকে। তবে আঁকাটা অন্যরকম করে, আধিস্বাপ্নিক ভাবনাকে ইলাস্ট্রেট করে স্বপ্নিল ভাবের জগৎ সৃষ্টি করে। তো ওই ঘরের দরজা খুলে ভাবের নির্যাস নিতে পথে শিল্পীরা চলেন বটে, কিন্তু ঘুরেফিরে চেনা জগৎকে পুনঃ চেনাবার ঘটনাই ঘটে যায়। তবে কে কেমন করে উপস্থিত করে তেমনও একটা ব্যাপার থাকে । এটা আমার উপলব্ধি।"
তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানসহ অনেক মহীরুহ চিত্রকরকে। ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট এর জন্ম, সংগ্রাম, এখানে লেখকের পড়তে আসা, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দুর্যোগে শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ, বেড়ে ওঠার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা, গ্রিসে গমণ সবই এই স্মৃতিগদ্যের অংশ।আশ্চর্যজনকভাবে মুক্তিযুদ্ধের অংশটি অতি সংক্ষিপ্ত ও দুর্বল।
রফিকুন নবীর গদ্যে এক ধরনের অদ্ভুত সারল্য আছে। তার মধ্যে নিজেকে বড় দেখানোর প্রবণতাও অনুপস্থিত।আত্মজীবনীতে আমরা সাদাসিধা ও শিল্পের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষের দেখা পাই। তার এই সারল্য পাঠক হিসেবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
আজ আমরা যে ঢাকা শহরে বাস করছি, যেভাবে দেখছি এই শহরটাকে, সেই শহরটাই একসময় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। পঞ্চাশ- ষাটের দশকে ঢাকায় বেড়ে ওঠা অনেকের লেখাতেই পড়েছি আমাদের জনাকীর্ণ ঢাকা শহর একসময় ছিল আসলে একটি সবুজ গ্রাম। এখানে রাস্তার ধারে ধারে ছিল বৃক্ষের সাড়ি, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখির কলকাকলিতে পূর্ণ হত চারপাশ। স্কুল থেকে ফিরে ছোট্ট ছেলেরা বড় বড় মাঠে খেলতো নানা ধরনের খেলা। ধোলাইখাল কিংবা অন্যান্য পুকুরগুলোতে ঝাপিয়ে পড়ে সাঁতারও কাটত কেউ কেউ। পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে দেখত দেশী বিদেশী সিনেমা, উপভোগ করত থিয়েটার। শহরের মূল বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি আর রিকশা। নদী বলতে বুড়িগঙ্গা। তাতে টলটলে আর ঝকঝকে পানিতে চলত রঙিন পালের নৌকা, স্টিমার আর ছোট ছোট লঞ্চ। ঘাটে থাকতো সাড়ি সাড়ি বাঁধা বজরা ও গয়না নাও। ঢাকা শহরের যে রূপ আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য, স্বপ্নের মত মনে হয় সেই সৌম্য শহর দেখেই একসময় বেড়ে উঠেছেন রফিকুন নবী। জন্ম চাপাইনবাবগঞ্জে হলেও বেড়ে ওঠার পুরোটা জুড়েই আছে বর্তমানের পুরান ঢাকা। থাকতেন নারিন্দার মনির হোসেন লেনে। পাড়াটি বেশ কয়েকজন গুনী ও বরেণ্য মানুষের বসবাসে সমৃদ্ধ ছিল। সবাই ছিলেন আধুনিক মনস্ক খাঁটি বাঙালিয়ানা ধারণ করা রাজনীতি সচেতন মানী গুনীমানুষ।
টোকাই দিয়েই আমার কাছে চিরচেনা রফিকুন নবী। বইমেলায় আত্মজীবনীমূলক এই বইটি দেখেই চোখ বন্ধ করে কিনে ফেলা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা যায়, ভেসে ওঠে এই বাংলার তথা ঢাকা শহরের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার নানান দিক। বইটিতে রফিকুন নবীর শিল্পী হয়ে ওঠার কথা যতটুকু আছে তার থেকে বেশী আছে বাংলার স্বাধীন হয়ে ওঠার গল্প। বইপত্রে , প্রবন্ধে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বা শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে যা জানি অনেক সময় তার অনেকটাই অধরা থেকে যায়। এই বইটিতে রফিকুন নবী নিজের গল্পের পাশা্পাশি সরলভাবে তুলে ধরেছেন নিজের চোখে দেখা ইতিহাস। বিস্তরভাবে আছে চারুকলা অনুষদ, টোকাইয়ের জন্ম, জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসানদের কথা। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকে গণ অভ্যত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চিত্র ফুটে উঠেছে রনবীর সরল লেখনীতে। ফুটে উঠেছে এক সময় আমাদের এই নগরী সাংস্কৃতিকভাবে কতটা সমৃদ্ধ ছিল। লাইনের পর লাইনে উঠে এসেছে রনবীর নিজের চোখে দেখা একাত্তর। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন শিক্ষক। দেখেছেন ২৫ মার্চের পর কীভাবে নিরীহ মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পাক বাহিনী। স্বাধীনতার পর তিনি যখন গ্রিসে যান উচ্চশিক্ষা নিতে তখন স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, বীরের জাতি হিসেবে, সর্বোপরি স্বাধীনতার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশের মানুষ হিসেবে অনেকেই সম্মান করেছেন তাকে। ৭৫ এর ১৫ আগস্টে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে রনবী লিখেছেন, শেখ মুজিবের দেশের মানুষ হিসেবে যে শ্রদ্ধা-সম্মান, আদর-আহ্লাদটুকু পেতাম ১৫ আগস্টের পর তা ধসে গেল।” তখনই সিদ্ধান্ত নেন নিজ দেশে ফেরার। ৭৬ এর শেষ দিকে ফিরে আসেন দেশে। পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তুরের দশক বা ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসই উঠে এসেছে রনবীর স্মৃতির পথরেখায়। পরিপূর্ণ জীবনী নয়। এ যেন আমার বাংলার ইতিহাসের এক খন্ডচিত্র। বাকিটা হয়তো আবারো নতুন কোন বইয়ে লিখবেন তিনি। রনবীর চোখে ১৯৭৬ এর পরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ঢাকার চিত্র দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি।
রফিকুন নবীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ। বইটাতে তার ছোটবেলা থেকে শুরুর করে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময় পর্যন্ত কালপর্বের স্মৃতিচারণ আছে। এর মধ্যে তার দেখা পঞ্চাশ ষাটের ঢাকা পাঠককে টানবে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলী, ব্যক্তি পর্যায় দেখে দেখার ব্যপারটিও কৌতুহলোদ্দীপক। ২৫ মার্চের গণহত্যার পরের ঢাকাও দেখেছিলেন তিনি। সব মিলে দারুণ একটা অভিজ্ঞতা দেবে এ বই।