তন্ত্র!
এই ছোট্ট শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য, অনেক আশঙ্কা, আশা, ভয়। বাঙালির জীবনে এই জিনিসটি যখন প্রভাব বিস্তার করে তখনও বাংলা ভাষাটাই সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তারপরেও, রণ, রক্ত, অশ্রু ও উল্লাস পেরিয়ে আসা আমাদের এই জীবনে তন্ত্র থেকে গেছে পর্দার আড়ালে এক অমোঘ উপস্থিতি হয়ে। আমরা জানি, সে আছে। কিন্তু তাকে নিয়ে আমরা এত কম জানি যে তার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা অন্য কথায় চলে যাই।
সেজন্যই বিভূতিভূষণ তারানাথ তান্ত্রিকের দু'টি গল্প লিখলেও তারাদাস ছাড়া কেউ তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেননি।
সেজন্যই সৌমিত্র বিশ্বাস 'হেরুক' লেখার আগে বেশ কয়েক প্রজন্মের পাঠক জানতেনই না, গল্পের কত উপকরণ লুকিয়ে আছে তন্ত্রের মধ্যে।
অবস্থাটা বদলায় অভীক সরকারের সৌজন্যে। 'ঋতবাক'-এ প্রকাশিত তাঁর 'শোধ' গল্পটি আজকের পাঠককে মুগ্ধ করে। তারপর আসে 'ভোগ'। এবং অবশেষে আসে একটি আস্ত বই "এবং ইনকুইজিশন"। ফলে মনস্তত্ত্বের আলো-আঁধারির বাইরে, একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে দেখা ভয়ের আখ্যান ফিরে আসে বাংলায় নতুন করে।
মনীষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা এই ছোট্ট বইটি সেই ধারার ফসল।
কী-কী গল্প আছে এতে?
১) অভিশাপ: সত্যি আর সম্ভাবনার মাঝে দাঁড়ানো এক দারুণ ভয়ের, অথচ ট্র্যাজিক গল্প এটি।
২) পিশাচ: বিদেশি সিনেমায় যা হাস্যকর ঠেকে, সেই জিনিসই যদি একান্ত দেশজ হয়ে আসে তাহলে কী হয়? এই গল্প সেই শ্বাসরোধী আতঙ্কের রূপদান।
৩) রাতপরী: এই বইয়ের সবচেয়ে ফর্মুলাইক গল্প এটিই। সুখপাঠ্য, রোমাঞ্চকর, কিন্তু প্রত্যাশিত।
৪) রক্ষাকবচ: এই গল্পটা মারাত্মক! মাঝে কিছু ইনফোডাম্পিং হলেও যেভাবে সুদূর মিশরের বিশ্বাস আর আমাদের মহাবিদ্যার আরাধনাকে একই সূত্রে বাঁধা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
লেখকের কাজ এখনও ওয়ার্ক-ইন-প্রোগ্রেস। তাই পড়তে গিয়ে কোনো-কোনো অংশ অমসৃণ লাগে। কোথাও মনে হয়, একজন সম্পাদকের কল্যাণস্পর্শ গল্পগুলোকে আরও নিটোল করে তুলতে পারত।
তবে হ্যাঁ, গল্পগুলো আপনার যেমনই লাগুক, এই নাতিদীর্ঘ বইটি কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যে প্যারাডাইম শিফটের অন্যতম এভিডেন্স হয়ে থাকবে।
'ছদ্মবেশী' সিনেমায় মহানায়ক যে সংলাপটি বলেছিলেন, আমিও এই বইটির প্রসঙ্গে সেটিই বলব~ "ক্ষুদ্র বলিয়া উহাকে উপেক্ষা করিবেন না।" বইটি ঝটপট পড়ে ফেলুন। ভয় পান!