উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন হুগলি জেলার চন্দননগরের গোঁদলপাড়ায়।
চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দেন এবং সারা ভারত পরিক্রমা করেন।
এরপর চন্দননগরে ফিরে এসে শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করেন এবং ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে। যুগান্তর, কর্মযোগিন্, বন্দেমাতরম্ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা।
মুরারীপুকুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে নির্বাসিত হতে হয় আন্দামানে। টানা এগারো বছর কারাবাসের পর মুক্তি পান তিনি। তারপরেও অব্যাহত থাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তাঁর উত্তাল রাজনৈতিক জীবন।
পরবর্তীকালে গান্ধিজির অহিংস নীতির অনুরাগী হয়ে পড়েন উপেন্দ্রনাথ। সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি সমধিক।
১৯২১-এ প্রকাশিত হয় "নির্বাসিতের আত্মকথা"। উপেন্দ্রনাথের অন্যান্য উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থ: ঊনপঞ্চাশী, ধর্ম ও কর্ম এবং ভবঘুরের চিঠি।
আমৃত্যু দৈনিক বসুমতী-র সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল বিপ্লবী এই সাহিত্যিকের জীবনাবসান হয়।
উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এই সুবাদে আন্দামান জেলেও ঘুরে এসেছেন। কিছু সিনেমায় দেখা যায় ভিলেন হাসতে হাসতে মানুষজনকে গুলি করে দিচ্ছে। উপেন্দ্রবাবুকেও আমার তেমনিই লাগলো। তার চিঠিগুলোতে যে মজায় মজায় গান্ধীজির অহিংসা আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করলেন। লা জওয়াব! কিছুদিন আগে উপেন্দ্রবাবুর স্মৃতিকথা ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’ পড়ার সময়েই উনার সেন্স অফ হিউমার টের পেয়েছিলাম। এখন উনার এই ’ভবঘুরের চিঠি’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলুম।
চিঠি থেকে ছোট্ট একটা ঘটনা তুলে দিচ্ছি- "গোবিন্দর মেজ ছেলেটা এতক্ষণ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে সব ব্যাপার দেখছিলো। হঠাৎ পোঁ করে ছুটে গিয়ে সে কোথা থেকে একটা বাঁশের খুঁটি টেনে নিয়ে লাফাতে লাফাতে এসে উপস্থিত। একবার চীৎকার করে বলে উঠল, ‘বন্দেমাতরম! গান্ধী মায়িকি জয়।’ আর দেখতে দেখতে খুঁটি গিয়ে পড়ল দারোগা বাবুর মাথার উপর। রক্তাক্ত দেহে দারোগা বাবুর পতন ও মোর্চ্ছা; আর সঙ্গে সঙ্গে কনস্টেবলদ্বয়ের চোঁচা দৌড়। গোবিন্দের মেজো ছেলেটাকে নিয়ে আমি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে পড়লুম। রাস্তায় তাকে জিজ্ঞাসা করলুম, 'হাঁরে, ঐ যে গান্ধী-মায়ের নাম করে লাঠি চালালি, ও আবার কে? কোন নতুন দেবতা-টেবতা নাকি?' গোবিন্দর ছেলে আমার দিকে খানিক্ষণ হা করে চেয়ে থেকে বললে, ’আঃ পোড়া কপাল! হারু পন্ডিত যখন লঙ্কাপ্রাসনের পুঁথি থেকে শোলক পড়ে সেদিন সব বুঝিয়ে দিলে, তা আপনি শোনেন নি বুঝি? গান্ধী মায়ি হোলো দুগ্গা মায়ি, কালি মায়িরই আর একটি নাম। রোজ একশো আটবার তাঁর নাম জপ করলেই দু'মাসের মধ্যে ইংরেজ দেশ ছেড়ে পালাবে।"
ভবঘুরের চিঠি বাস্তবের কোন চিঠির সংকলন বলে মনে হয় নি। যে অজ্ঞাত প্রাপককে ভায়া সম্বোধন করে উপেন্দ্রনাথ চিঠিগুলো লিখেছেন সেই ভায়া আসলে পাঠককুল, আর চিঠিগুলোও ফিকশনাল। চিঠির বিষয়বস্তু সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আর শেষের দুটো চিঠি সুভাষ বোসকে নিয়ে। যদিও বইটির প্রকাশ হয়েছে পরে, তবে চিঠির সময়কাল গত শতকের চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষদিকে, তারমানে দেশ বিভাগের অব্যবহিত আগে ও পড়ে, স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ের সংকটগুলোই লেখার বিষয়বস্ত ছিলো। লেখকের বিশ্লেষন তার ব্যক্তিগত বিষয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার মতামতকে সমর্থন করেছি, অনেক সময় করিনি। তবে সবমিলিয়ে সুচিন্তিত, সুলিখিত লেখা।