দুই তরুণের চিন্তা ও তৎপরতার নজির এই বই। সর্বাত্মকবাদী সময়ে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও শাসনপ্রণালীর স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তর এবং সেই রূপান্তরের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের উপায় ও পদ্ধতি অন্বেষণ এই বইয়ের প্রবন্ধসমূহের মূল প্রবণতা। সময়ের ঘটনাসমূহের প্রতিক্রিয়ায় নতুন চিন্তাভাবনা দানাবাঁধা ও মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা অবশ্যসম্ভাবী। ক্রমাগতভাবে মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত হতে থাকার রাষ্ট্রনৈতিক বাস্তবতায় প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই বইয়ের লেখকদ্বয়ের প্রতি সুবিচার করা হবে।
সূচিপত্র
সময়ের ঘটনা ১। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনঃ নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা ও সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রণালী ।। সারোয়ার তুষার ২। প্রোপাগান্ডা ও জনসংযোগের কৌশল ।। সহুল আহমদ ৩। 'নেতা হতে আসি না': নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও প্রতিরোধের নতুন ভাষা ।। সহুল আহমদ ৪। মিডিয়াঃ মনোজগতে উপনিবেশ ।। সহুল আহমদ ৫। শহিদুল আলমের একটি প্রবন্ধ ও 'গুজবে'র প্রোপাগান্ডা ।। সহুল আহমদ ৬। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন ও সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ ।। সারোয়ার তুষার ও সহুল আহমদ
সময়ের ভাবনা ৭। বাকস্বাধীনতা রাজনৈতিক শর্তের অধীন নয়, মানবীয়তার অংশ ।। সারোয়ার তুষার ৮। জাতীয়তাবাদী মন ।। জর্জ অরওয়েল, অনুবাদঃ সহুল আহমদ ৯। মিশেল ফুকোঃ শাসনপ্রণালী ও জৈব ক্ষমতার কথকতা ।। সারোয়ার তুষার ১০। ফ্যাসিবাদী দর্শন ।। মানবেন্দ্রনাথ রায়, অনুবাদঃ সারোয়ার তুষার ১১। রাষ্ট্র মেরামতঃ সময়ের প্রয়োজন ।। সারোয়ার তুষার ও সহুল আহমদ
তুষার আর আহমদ আমার সহনাগরিক, সহযোদ্ধা, সুহৃদ। তাই তাঁদের বই বেরোনোটা আমার জন্য আনন্দদায়ক। বই পড়ার অভিজ্ঞতাটাও।
লেখকদ্বয় সময়কে ঘটনা আর ভাবনায় ক্যাটেগোরাইজ করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে এই ক্যাটেগোরাইজেশনটা মিসলিডিং। এমনটা মনে হওয়ার কারণ, এতে ঘটনা আর ভাবনাকে আলাদা মনে হয়, যদিও তারা পরস্পরসম্পর্কিত। ঘটনা আমাদের ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে দেয়; ভাবনা আমাদের সক্রিয় করে তুলে নতুন ঘটনাকে সম্ভবপর করে তোলে। তাই এই ক্যাটেগোরাইজেশনটা বইয়ে ভিন্নভাবেও হতে পারতো। মৌলিক আর অনুবাদ লেখাগুলো আলাদা করতে পারতেন। অন্য কোনো ভাবেও লেখাগুলো ভাগ করা যেতো।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন, শহিদুল আলম, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন ইত্যাদি প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে তুষার আর আহমদ যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। সাহস ক্রিমিনালেরও থাকে, কিন্তু সেই সাহস ধবংসাত্মক। বিপরীতক্রমে, তুষার আর আহমদের সাহসটা গঠনমূলক, সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের কমিটমেন্টের কারনেই তাদের ভেতর জন্মেছে এই সাহস।
'প্রোপাগান্ডা ও জনসংযোগের কৌশল' প্রবন্ধে আহমদ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন চমস্কির প্রোপাগান্ডা তত্ত্বকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কনটেক্সুয়ালাইজ করার ক্ষেত্রে। 'মিডিয়াঃ মনোজগতে উপনিবেশ' সে-তুলনায় নিষ্প্রভ মনে হয়েছে, গৎবাঁধা বাম চিন্তাকে ক্রিটিকালি এনগেজ না করে, সরাসরি গ্রহণ করায়। এই বইয়ের একটা সেরা লেখা আহমদের 'জাতীয়তাবাদী মন' প্রবন্ধটি, যা কিনা জর্জ অরওয়েলের নোটস অন ন্যাশনালিজমের ভাষান্তর।
বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটিই সম্ভবত বইয়ের শক্তিশালীতম প্রবন্ধ, যাতে তুষার দেখিয়েছেন, নিরাপত্তার ডিজিটালাইজেশনের নামে নাগরিককে নিরাপত্তাহীন করার রাষ্ট্রপ্রণালী। তাঁর মিশেল ফুকো বিষয়ক প্রবন্ধটিও অত্যন্ত প্রাঞ্জল। কিন্তু ফ্যাসিজম নিয়ে বহু লেখাপত্র থাকতে তুষার এম এন রায়ের ফ্যাসিবাদবিষয়ক লেখা কী কারণে অনুবাদ করতে গেলেন সেটা কিছুতেই বোঝা গেলো না, এটাকে বইয়ের দুর্বলতম প্রবন্ধ মনে হয়েছে, মনে হয়েছে রায়ের বিশ্লেষণ অতিসরলীকৃত।
সময়ের ব্যবচ্ছেদ শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থাপন করে এবং সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র মেরামতের দাবি সামনে এনে।
সার্বিকভাবে বলা চলে, এটি একটি ভালো বই। তবে লেখকদ্বয়ের কাছে প্রত্যাশার মাত্রাটা অনেক বেশি হওয়ায়, একটু জোর দিয়েই বলা দরকার, আরো ভালো হতে পারতো। লেখকদ্বয়ের জন্য শুভকামনা।
দুজন বন্ধুপ্রতীম বড় ভাইয়ের বই। আমাদের এই সময়ের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বই। ভালো লেগেছে পড়তে। সত্যি বলতে এই দুজন মানুষের লেখার ধরণ আমার অত্যন্ত পরিচিত, এবং আমার কাছে এই লেখার ধরণটা অনেক বেশি কানেক্ট করার মতো বলেই এই বইটা আমি অনেক তাড়াতাড়ি এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে শেষ করতে পেরেছি বলে মনে হয়।