রক সঙ্গীত বিষয়ে আমাদের দেশে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা হাতে গুণে বলে দেয়া যাবে। মিলু আমান ভাই যখন প্রথম “রক যাত্রা” প্রকাশ করলেন, পড়েই বুঝেছিলাম যে মিউজিক তার কাছে কতটা আপন। বাংলাদেশি রক কালচারের প্রাথমিক দিনগুলো সম্পর্ক সাবলীল একটা ধারণা পাওয়া যায়।
কিন্তু “ফ্লয়েডিয়ান” রক যাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অবশ্য পিঙ্ক ফ্লয়েডকে নিয়ে লেখা যে কোন কিছুই ভালো হতে বাধ্য(ব্যক্তিগত অভিমত)। পিঙ্ক ফ্লয়েডের দু’ধরণের ভক্ত আছে, যারা আসলেও ফ্লয়েডকে মনে প্রাণে ধারণ করেন, আরেকদল খানিকটা “কুল” হবার আশায় ব্যান্ডের টি-শার্ট গায়ে চাপান, মাঝে সাঝে “ওয়াল” গানটির “উই ডোন্ট নিড নো এজুকেশন” লাইনের সাথে গলা মেলান। “ফ্লয়েডিয়ান” বইটির প্রথম কয়েক পাতা ওল্টানো মাত্র এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে মিলু ভাই এই দুই দলের প্রথমটির একদম উঁচু সারির বাসিন্দা।
নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে বইয়ের টপিক কি। সাবলীল বাংলায় পিঙ্ক ফ্লয়েডের অটোবায়োগ্রাফী। তবে একশো পাতার মধ্যে ডেভ, রজার, নিক, রিক আর সিডের মাহাত্ম্য ফুটিয়ে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য হলেও লেখক বেশ ভালোভাবেই কাজটা করতে পেরেছেন। শুরুতে অবশ্য আমরা মিলন নামের এক ছেলেকে দেখতে পাই। ব্যান্ড মিউজিক এন্থুসিয়াস্ট। সে যে সময়কার কথা বলছে, তখনো এলিফ্যান্ট রোডের রেইনবোতে নিয়মিত গান রেকর্ড করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সঙ্গীতপ্রেমীরা ঢুঁ মারতো। শুরু এই বর্ণনাটুকু তাই অনেককেই নিশ্চয়ই নস্টালজিক করে তুলবে।
বইয়ের মূল অংশে আমরা প্রবেশ করি মিলনের স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। পিঙ্ক ফ্লয়েডের ইতিহাস জানার অভিযানের এরকম শুরুটা আমার কাছে আসলেও ভালো লেগেছে। আমরা জানতে পারি কিভাবে পড়াশোনা শিকেয় তুলে ব্যান্ড গঠন করে সিড-রজার-রিক-নিক। সিডের শিশুসুলভ কথা আর গিটারের মূর্ছনা, নিকের অনবদ্য কিবোর্ড বাজানো, রজার আর নিকের যুতসই ব্যাকআপ- সব মিলিয়ে এক নতুন মহাজাগতিক সাউন্ডের আগমন ধ্বনি দারুণ ভাবে কলমের কালিতে ফুটিয়ে তুলেছেন মিলু ভাই। মন খারাপ করাবে সিডের ধীরে ধীরে ব্যান্ড থেকে সরে যাওয়ার ইতিহাস, আবার ডেভিড কিভাবে ব্যান্ডে যোগ দিল সেই ঘটনা উৎসাহ যোগাবে উঠতি মিউজিশিয়ানদের।
ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে পছন্দের অংশ পিঙ্ক ফ্লয়েডের “দ্য ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন” অ্যালবামটির রেকর্ডিং সংক্রান্ত বর্ণনা। প্রিয় অ্যালবামটা কিভাবে তৈরি হচ্ছে তা যেন দেখতে পাচ্ছিলাম চোখের সামনে।
There is no dark side in the moon, really. Matter of fact, its all dark. The only thing that makes it look light is the sun.
শেষদিকের অধ্যায়গুলোতে দেখানো হয়েছে ব্যান্ডের মেম্বারদের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি কিভাবে হলো, ব্যান্ডের পাশাপাশি নিজেদের সলো প্রজেক্টে ব্যস্ততা। তা সত্ত্বেও “দ্য ডিভিশন বেল”- এর রেকর্ডিং এবং ব্যান্ডের প্রাক্তন সদস্য সিডকে নিয়ে অন্যান্য সদস্যদের আবেগ পাঠক এবং শ্রোতা সবাইকেই ছুঁয়ে যাবে।
“ফ্লয়েডিয়ান” বইটি অনন্য তার বিষয়বস্তুর জন্যে। ঠিক শক্তিশালী বাক্য কিংবা সাহিত্য রস খুঁজতে চাইলে বইটি হাতে না নেয়াই উত্তম। কিন্তু আপনি যদি পিঙ্ক ফ্লয়েডের ভক্ত হন, মনে প্রাণে একজন ফ্লয়েডিয়ান হন তাহলে “ফ্লয়েডিয়ান” আপনার জন্যে।
একটা আক্ষেপ দিয়ে শেষ করি। অ্যালবামের কভারগুলোর ছবি রঙিন পৃষ্ঠায় ছাপা যেতো কিংবা অ্যালবাম আর্টগুলো দিয়ে চাইলে বইটিকে আরো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যেত। এ ব্যাপারে প্রকাশনী নজর দেবে আশা করি। বইটি প্রকাশিত হয়েছে পার্ল থেকে।
Remember when you were young, you shone like the sun. Shine on you crazy diamond. Now there's a look in your eyes, like black holes in the sky.
Shine on you crazy diamond. You were caught on the crossfire of childhood and stardom, Blown on the steel breeze. Come on you target for faraway laughter, Come on you stranger, you legend, you martyr, and shine!
পিংক ফ্লয়েড ফ্যানদের জন্যে বেশ উপযোগী একটা লাইট রিডিং বই। শেষের তিন-চার পৃষ্ঠায় হুটহাট বিভিন্ন আর্টিস্টদের নাম কপচানোর ব্যাপারটা খুব বেখাপ্পা এবং হাস্যকর মনে হয়েছে। কোনমতে টেনে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা। তবে ৯৪ পৃষ্ঠার একটা বই হিসেবে পিংক ফ্লয়েডের ইতিহাসের মালমশলা খারাপ নাই।
প্রথমেই বলে রাখি বইটা সবার ভালো লাগবেনা, কিন্তু কেউ যদি রক মিউজিক(এখানে রক বলতে হার্ড রক, পাঙ্ক রক, ব্লুজ রক, হেভি মেটাল, ডেথ মেটাল, ব্ল্যাক মেটাল, সিম্ফনিক মেটালসহ যেসব গান অনেকেই সহ্য করতে পারে না বা অনেকে গানের কাতারেই রাখেন না সেই সবধরনের গানের কথাই বুঝানো হয়েছে) বা পিঙ্ক ফ্লয়েডের ফ্যান হয়ে থাকেন বা কেউ যদি শো-অফ করার জন্য পিঙ্ক ফ্লয়েডের টি-শার্ট কেনার পরে চিন্তা করেন "এইটা জিনিসটা কি? খায় না মাথায় দেয়?" তাদের জন্য বইটা একটা ক্র্যাশ কোর্স বলা যায়। আমি নিজে পিঙ্ক ফ্লয়েডের ফ্যান হয়েও জেফ বেক যে দ্যা ডিভিশন বেল অ্যালবামে গিটার বাজাইছে যেখানে পিঙ্ক ফ্লয়েডের আমার সবচেয়ে পছন্দের কয়টা গান আছে তা এই বই পড়ে জানলাম। বইটা আংশিক অটোবায়োগ্রাফি আর পুরাটাই ঐতিহাসিক বই আর বইটার সাইজ ছোট কিন্তু বইটা একটা কাজ অনেক ভালো করে করছে যেটা বড় বড় ফ্যান্টাসিও অনেক সময় পারে না সেটা হলো ইমারশন, বই পড়ে ঘটনা ভিজুয়ালাইজ করা এক জিনিস কিন্তু ভিজুয়ালাইজেশনের ভিতরে ঢুকে পুরা ঘটনাটা দেখা এইটা খুব কম লেখাই পারে আর এইটা এই বইতে আমি পারছি। এই একটা কারনেই বইটা ৫ স্টার আমার কাছে।
কয়েকটা জায়গায় যদিও কয়েকটা ছোট অভিযোগ আছে যেটা হলো ছোট কিছু বানান ভুল, পড়ায় বাঁধা দেয় নাই কিন্তু একটু কেমন জানি লাগতেছিলো আর কিছু জায়গায় যুক্তাক্ষরের ব্যবহার কেমন জানি লাগছে। এই কয়টা জিনিস বাদ দিলে ফাটাফাটি একটা বই।