রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
বনপলাশীর পদাবলী স্রেফ একটি উপন্যাস নয় — এ যেন এক শোকগাথা ও স্বপ্নমিছিলের সংমিশ্রণে তৈরি এক অনাবিল জীবনকাব্য। বইটি একটি সময়ের দলিল, একজন লেখকের সাহস, একজন আদর্শভ্রষ্ট প্রজন্মের আত্মস্মৃতি, আর একটি নিঃশব্দ অথচ ধ্বনিময় প্রতিরোধ। বাংলার গ্রাম নিয়ে এমন উপন্যাস আগে কেউ লেখেননি — এবং সম্ভবত এর পরেও আর কেউ লেখেননি।
রমাপদ চৌধুরী যখন ‘দেশ’ পত্রিকার পুজোসংখ্যার কাজ শেষ করেছেন, তখন একদিন হঠাৎ সাগরময় ঘোষ তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন—একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে হবে, তাড়াতাড়ি নামও দিয়ে দিতে হবে বিজ্ঞাপনের জন্য। রমাপদ তো হতভম্ব। আগে কখনো ধারাবাহিক লেখেননি। তবু সাগরময়ের আন্তরিকতা উপেক্ষা করা গেল না। তখনই স্থির করলেন — গ্রাম নিয়ে লিখবেন। কারণ? যাতে কাহিনি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। প্রথমে ঠিক করেছিলেন নাম হবে ‘পলাশবনির পদাবলী’। কিন্তু পরে মনে হলো, সেই নাম যথাযথ ঝংকার তৈরি করছে না। পরদিনই গিয়ে বদলে দিলেন—‘বনপলাশীর পদাবলী’।
আসলে রমাপদ কোনোদিনই প্রকৃত অর্থে কোনো গ্রাম দেখেননি। তিনি দেখেছেন খড়গপুর — একটা রেলশহর, যেখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে মিলেছে। সেটাই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল ‘গ্রাম’। বাঙালি মানসে খড়গপুরকে অনেক সময় একটি গ্রামসমাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কারণ এখানকার সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক। রেলশহর হলেও খড়গপুরে একটি বিশেষ ধরনের সাম্যভাব ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দেখা যায়, যা সাধারণত গ্রামীণ সমাজেই দেখা যায়। প্রতিবেশীরা একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশ নেন, উৎসব-পার্বণ যৌথভাবে উদযাপিত হয় এবং একধরনের 'কমিউনিটি সেন্টিমেন্ট' কাজ করে। এখানকার বাজার, স্কুল, ক্লাব—সবই যেন এক মিশ্র সংস্কৃতির উন্মুক্ত চৌহদ্দি, যেখানে নাগরিকতা ও গ্রামীণতা একসঙ্গে সহাবস্থান করে। এইসব কারণেই খড়গপুরকে অনেক সময় আধুনিক নাগরিক পরিকাঠামোর মধ্যেও এক 'গ্রামসমাজ' রূপে দেখা হয়েছে। নিজের এই অভিজ্ঞতাই তিনি ঢেলে দিয়েছেন বনপলাশীতে।
এখানে প্রতিটি চরিত্র যেন ঘোরতর বাস্তব। তারা নিখুঁত নয়, কিন্তু মানবিক, বিচিত্র, এবং হৃদয়মথিত।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছেন গিরিজাপ্রসাদ। শহরের মানুষ, যিনি তাঁর গ্রামে ফিরে এসেছেন বহু বছর পর। জীবনের ক্লান্তি, আদর্শহীন সমাজ, আত্মপরিচয়ের দুর্বোধ্য সংকট—সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বে জমে আছে সংশয়ের পলি। গিরিজা আদর্শবাদী, কিন্তু সেই আদর্শ কবে, কোথায় ফসিল হয়ে গেছে, তিনি নিজেই জানেন না। তাঁর গ্রামে ফিরে আসা কোনো নস্টালজিয়া নয়, বরং এক ক্লান্ত অন্তর্দর্শনের সূচনা।
গিরিজার আশপাশের চরিত্রগুলোও চমৎকারভাবে গাঁথা হয়েছে। নিভাননী, গিরিন, কালীমোহন, ব্রজমোহন, টিয়া, প্রভাকর — সবাই একেকটি আলাদা রঙ, আলাদা স্পন্দন। কেউ নিখুঁত নয়, কেউ নিছক খল নয়, ছলনা নয়। এমনকি উদাসের দজ্জাল স্ত্রী লক্ষ্মীমণিকেও লেখক এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, পাঠক শেষে গিয়ে তাঁর জন্য দুঃখ পায়। তাঁর কঠোরতার পেছনে যে বঞ্চনার দীর্ঘ রূপরেখা, সেই ব্যথার স্পন্দন অনুভব করে।
তবে এই উপন্যাসের দুই মেরুপ্রতিম চরিত্র—অট্টমা ও মোহনপুরের বউ। অট্টমা এক অনবদ্য প্রতীক। একাধারে দৃঢ়, নীরব, অথচ স্নেহময়ী। ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, তাঁর ভেতর আছে আত্মবিশ্বাসী আধ্যাত্মিকতা। তিনি কোনোদিন তাঁর স্বামীর মুখ দেখেননি, তবু ভাশুরের ছেলেদের নিজের সন্তানের মতো লালন করেছেন। তিনি গিরিজার ছোটমা, কিন্তু তাঁর অধিকার যেন জন্মগত। তাঁর চরিত্রে আছে এক ধরনের ঋজুতা, যা পুরনো দিনের নারীচরিত্রের অনন্যতম দৃষ্টান্ত।
মোহনপুরের বউ — এই নামটুকু শুনলেই প্রথমে যাঁকে কল্পনায় আঁকা যায়, তিনি নিঃসন্দেহে একজন সাধারণ গ্রামীণ গৃহবধূ, সংসারের চেনাজানা বলয়ের মধ্যে আটকে থাকা এক নারী। কিন্তু রমাপদ চৌধুরীর লেখনীতে সেই ‘সাধারণ’ চরিত্রই রূপান্তরিত হয়ে ওঠেন 'অসাধারণ' কিছুর প্রতীকে। উপন্যাসের শুরুতে তিনি যেন এক আড়াল-ভরা অস্তিত্ব, উপস্থিত কিন্তু প্রান্তিক, সমাজের পুরুষ-নির্ধারিত কাঠামোর অন্তরালে থাকা একজন নিঃশব্দ প্রত্যক্ষদর্শী। কিন্তু কাহিনির এক ব্রাহ্মমুহূর্তে, ঠিক যেন দৃষ্টিগোচর না হওয়া এক চাপা বিস্ফোরণের মতো, তিনি নেন একটি সিদ্ধান্ত—এবং ঠিক সেই জায়গা থেকেই গোটা কাহিনি মোড় নেয়, গভীর হয়, এবং এক ধাক্কায় পৌঁছে যায় অন্য মাত্রায়।
এই সিদ্ধান্ত আসলে কেবল একটি ব্যক্তিগত choice নয়। এটি একধরনের বোধ এবং সমাজের নির্ধারিত গণ্ডিকে চ্যালেঞ্জ করার নীরব শক্তি। মোহনপুরের বউ কোনো ফেমিনিস্ট ঘোষণাপত্র পড়ে আন্দোলনের ব্যানার হাতে তুলে নেন না—তাঁর প্রতিবাদ শব্দে নয়, আচরণে। যেন দেহে না থেকে, আত্মায় আগুন জ্বলে ওঠে।
যাবেন পাঠক, এই চরিত্রটি বিশেষভাবে স্মরণ করায় বিশ্বের বহু শক্তিশালী নারী চরিত্রকে, যাঁরা নিঃশব্দ, ন্যূনবাক, কিন্তু তাঁদের এক একটি সিদ্ধান্ত গোটা আখ্যানকে রূপান্তরিত করেছে?
প্রথমেই আসেন সোফিয়া (Toni Morrison-এর Beloved)—সোফিয়াও একদা এক নির্যাতিত কালো নারী, যাঁর মাটির সঙ্গে সংযোগ আর আত্মপরিচয়ের খোঁজ তাঁর ভেতর একধরনের বিদ্রোহ এনে দেয়। মোহনপুরের বউয়ের মতোই তাঁর বাঁচা একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত, যা ব্যক্তিগত বাঁচার থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর নোরা (Henrik Ibsen-এর A Doll’s House)—নোরার বিদায় মুহূর্ত, যাকে পশ্চিমের নাট্যসাহিত্য এক মহাবিপ্লবী অধ্যায় বলে চিহ্নিত করেছে, মোহনপুরের বউয়ের মতোই গৃহ-সংসারের ভিতরে থেকে শুরু হওয়া এক মৌন ‘না’—যা আসলে চিৎকার। নোরা দরজা খুলে বেরিয়ে যান; মোহনপুরের বউ দরজা বন্ধ করেন, কিন্তু নিজের ভেতরে এক অন্য পৃথিবীর পথ খুলে দেন।
তারপর সেতসুকো (Kenzaburō Ōe-এর A Personal Matter)—যেখানে মাতৃত্ব, সমাজ এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতার প্রশ্নে এক নারী নিজেকে খুঁজে পান এক অস্বস্তিকর, কিন্তু সত্যগর্ভ সিদ্ধান্তে। মোহনপুরের বউয়ের মতোই সেতসুকোর ভেতরেও আছে দ্বিধা, সংকট, কিন্তু সেই সংকটের মধ্যেই জেগে ওঠে তাঁরা—‘নারী’ থেকে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার দিকে।
মোহনপুরের বউয়ের সিদ্ধান্তের মাহাত্ম্য এখানেই যে, তিনি কোনো স্লোগান তোলেন না, কোনো বিপ্লবের অংশ নন, কিন্তু তাঁর একা, নিরীহ, নীরব প্রতিবাদ—এক একটি বুলেটের মতো আঘাত হানে সমাজের মূল কাঠামোয়। তিনি বিপ্লব করেন না, কিন্তু বিপ্লবকে জন্ম দেন।
রমাপদের এই চরিত্র যেন চিত্রিত হন আঁধার আর আলোয় তৈরি এক পোর্ট্রেটের মতো—যেখানে নারী একা দাঁড়ায়, চারপাশে ধুলোর ঝড়, মনের মধ্যে মেঘ, তবু চিবিয়ে নেয় নিজের নিয়তি। বাংলা সাহিত্য এই ধরনের নারীচরিত্র আগে দেখেছে, যেমন ঘরে বাইরে-এর বিমলা কিংবা শঙ্খ ঘোষ-এর নারীচরিত্ররা। কিন্তু মোহনপুরের বউ, তাঁর ভাষাহীনতা, তাঁর অতিরিক্ত কিছু না বলেই সবটা বলে ফেলার ক্ষমতা—তাঁকে তুলে রাখে এক অনন্য উচ্চতায়।
তাঁর মধ্যে নেই বাহুল্য, নেই নাটকীয়তা—আছে শুধু সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তের মধ্যেই নিহিত থাকে তাঁর আত্মপরিচয়। তিনি যেন কাব্যের মতো স্নিগ্ধ, অথচ রাজনীতির মতো জটিল। উপন্যাসটি পড়ে শেষ করার পর, পাঠক বুঝে যায়—এই এক চরিত্রই বনপলাশীর নিরীহ ভূমিকে করে তোলে এক বিপুল অভিঘাতের মাঠ।
এই বউ, নামহীন, পদবীহীন, শিরোনামবিহীন—তাঁর নীরবতা যেন সাহিত্যের সবচেয়ে উচ্চকিত পঙ্ক্তি।
এই উপন্যাস প্রথম যখন ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল, তখন পাঠকের কাছ থেকে কোনও উল্লেখযোগ্য সাড়া আসেনি। মাত্র একজন পাঠিকার চিঠি এসেছিল প্রশংসাসূচক। কিন্তু বই হিসেবে প্রকাশিত হবার প���েই পাঠকমনে তার আসল পরিচয় গড়ে ওঠে। কবিশেখর কালিদাস রায় লেখকের বাড়ি এসে বইয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন, জানিয়ে গিয়েছিলেন শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও মুগ্ধ।
কিন্তু রমাপদ চেয়েছিলেন না এই উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হোক। সাত বছর ধরে উত্তমকুমার তাঁকে বোঝাতে বোঝাতে শেষমেশ রাজি করান। উত্তম জানিয়ে দেন—ছবির মুনাফা দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য ব্যয় হবে। এবং তিনিই নিজে পরিচালনায় আসেন। সিনেমা জনপ্রিয় হয়, চিত্রায়ণ প্রশংসিত হয়, কিন্তু যাঁরা কেবল সিনেমা দেখে উপন্যাস না পড়েছেন, তাঁরা জানেন না বনপলাশী গ্রাম কতটা গভীর, কতটা জীবন্ত। তাঁরা জানেন না গিরিজাপ্রসাদের বিবেকী দ্বন্দ্ব, জানেন না মোহনপুরের বউয়ের শক্তি, জানেন না ডঃ অবিনাশ গ্রাম ছাড়েননি। সিনেমা উপন্যাসের বহু সূক্ষ্মতা হারিয়ে ফেলেছে। যারা উপন্যাস পড়েননি, তাদের কাছে অনুরোধ—অবশ্যই বইটি পড়ুন।
এই উপন্যাসের ভাষা অসাধারণভাবে সংযত। অতিনাটকীয়তা নেই, অতিরিক্ত আবেগ নেই, সহজ অথচ হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা। প্রতিটি বাক্য যেন সযত্নে সাজানো। ‘ভোলা মন, মন আমার’ শ্যামল মিত্রের গান শুনতে শুনতে উপন্যাসটি পড়া অনেক পাঠকেরই অভিজ্ঞতা হয়েছে। উপন্যাসটি যেন সেই একতারার তার—ছিঁড়ে গেলেও যার সুর বাজতে থাকে মনোজগতের অন্তরালে।
যাঁরা বিমল কর বা রবিশঙ্কর বল বা অনুরূপ গ্রামীণ-পটভূমির লেখকদের পড়েছেন, তাঁদের জন্য রমাপদের লেখার মধ্যে এক আশ্চর্য স্বচ্ছতা খুঁজে পাওয়া যাবে। বাস্তব, আদর্শ, প্রেম, ধর্ম, প্রতিরোধ—সব কিছু এখানে একসাথে চলেছে, কিন্তু কোনওটিই অন্যকে গ্রাস করেনি।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে দেখলে, এই উপন্যাসটি স্মরণ করিয়ে দেয় The Possessed বা The Joke-এর মতো সাহিত্যের কথা, যেখানে আদর্শবাদের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে উঠে আসে এক মানবিক দহন। অথবা Snow বা Chronicle of a Death Foretold-এর মতো গ্রাম, সমাজ এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ছায়াচিত্র। একইসঙ্গে উপন্যাসটি ভেঙে দেয় ‘ভিলেন’ বনাম ‘নায়ক’ এর ফর্মুলা—এখানে সবাই মানুষ, যার যার আলো, ছায়া, দ্বিধা, ব্যর্থতা, অহংকার ও প্রেম।
বনপলাশীর পদাবলী আমাদের শেখায়—জীবন সরল নয়, কিন্তু তা গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। আর সেই উপলব্ধির জন্য দরকার শ্রবণশীল হৃদয়, অনুশোচনাপূর্ণ চোখ, এবং নির্জন আত্মপাঠ। আজকের পাঠকের জন্য এই উপন্যাস আরও জরুরি—কারণ এতে আছে নীরব প্রতিবাদ, মাটির গন্ধ, শিকড়ের স্পর্শ।
রমাপদ চৌধুরী এই একটি উপন্যাস লিখেই বাংলা সাহিত্যের অনন্য স্থান অধিকার করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি কলম দিয়ে ছবি এঁকেছেন—একটি গ্রাম, একটি সময়, একটি প্রজন্ম, এবং একটি বোধ।
আজ, ২৯ জুলাই, তাঁর প্রয়াণদিনে এটাই যেন হয়ে ওঠে পাঠকের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য। একটি উপন্যাস, একটি জীবন, একটি সত্য—বনপলাশীর পদাবলী।
বাংলা ভাষার নীরব কারিগর হিসেবে এটাই আমার নমস্কার লেখকের চরণে।
রমাপদ চৌধুরীর ভাষায় বলতে গেলে 'বনপলাশীর পদাবলী' লৌকিক জীবনের অনন্ত রহস্য।' সেই রহস্যকেই রমাপদ চৌধুরী তার লেখনশৈলী দিয়ে অনন্য করে তুলেছেন। দূগ্গা প্রতিমার দেহের প্রতিটি খাঁজকে যেমন কুমার তাল তাল মাটি দিয়ে, ভক্তি দিয়ে, প্রেম দিয়ে গড়ে তুলেন নিখুঁত ভাবে। তেমনি রমাপদ চৌধুরীও 'বনপলাশীর পদাবলী'কে শিল্পের সুষমায় ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তিনি বেশ খানিকটা সফলই হয়েছেন বলা যায়।
গিরিজা আর গিরিন দুই ভাই সম্প্রতি জমিজমা ভাগ করে একদম আলাদা হয়ে গেছে৷ গিরিজা শহরে শিক্ষকতা করতেন আর গিরিন এতদিন গ্রামের জমিজমা দেখাশোনা করেছে। গিরিজা অবসর নেওয়ার পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই আবার দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছেন। এক্ষেত্রে যা হয় আরকি। নতুন কেউ বাড়িতে বেড়াতে এলে প্রথম প্রথম বাড়ির সকলের ই খুব ভালো লাগে কিন্তু সেই বেড়ানোটা যদি একসময় স্থায়ী হওয়ার উপক্রম হয় তখন কি আর ভালো লাগে! হোক সে আপন ভাই..... গিরিন ধীরেধীরে লক্ষ্য করে এভাবে আর চলে না। গিরিজার অর্থনৈতিক অবস্থা জানার পর গিরিন হতাশ হয়। হতাশ হয় গ্রামের আরো দশজন যারা ভেবেছিলো গিরিজা শহর থেকে অনেক অর্থ নিয়ে এসেছে। গিরিজার বড় মেয়ে আর গিরিনের বড় মেয়ে প্রায় সমবয়সী। গিরিন গ্রামের একজন সরকারি চাকুরিজীবী ঠিক করে মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য। কিন্তু সেই ছোকরা আবার পছন্দ করে বসে গিরিজার কন্যাকে। একই বাড়ির দুইবোনের একজন কে পাত্রপক্ষ দেখতে এসে আরেকজনকে পছন্দ করে দিন তারিখ ঠিক করে চলে গেছে- এমন ঘটনা বাংলা চলচ্চিত্রে হরহামেশাই হচ্ছে। পাত্রীপক্ষ রে জটিল সংকটে ফেলাইয়া পাত্রপক্ষ বিয়ের কেনাকাটার ফর্দ করতে বসে যায়। কিন্তু এতে পারিবারিক কোন্দলে যে কতটা অশান্তি সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে তাদের কোন আইডিয়া নাই। যাই হোক শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে দুই পাত্রীর মধ্যে যেকোন একজনের Bride of sacrifice হওয়া লাগে । আপনারা বই পড়তে না চাইলে ইউটিউবে এই চলচ্চিত্র টা দেখে ফেলতে পারেন। প্রথমে লিখবেন বি ও এন পি এ এল এ এস এইচ আই আর - বনপলাশীর। এরপর লেখবেন পদাবলী। লেখার সময় খেয়াল করে লেখবেন। পদাবলী তে পি এর পরে কিন্তু ও না। এ হবে। পি এ ডি এ বি এ এল আই
শৈশব বা কিশোর কালে কাটানো জায়গার প্রতি এক অমোঘ টানে মানুষ ফিরে ফিরে যায়। কিন্তু অনেকগুলো বছর পরে আমরা ভাবি সেই নদী, তালগাছের সারি, মেঠো রাস্তা বা স্কুল, আড্ডার জায়গা, আড্ডার মানুষগুলো এবং সেই জায়গার সবই বুঝি একই আছে। সেই আশা নিয়ে ফিরে নিরাশই হতে হয়। দুদিন কাটিয়ে আসলে তবুও একরকম। কিন্তু শৈশবের টানে বৃদ্ধ বয়সে অবসরের পর শৈশবের জায়গায় শেষ বয়স কাটাতে সবাই বোধহয় পারেন না। এটা নিয়েই লেখকের এই অসাধারণ উপন্যাস।
‘এমন হবে আগে ভাবিনি। ধারণা ছিল, উপন্যাস লিখবো। সেই উপন্যাস- চিরকাল যা জেনে এসেছি, যা লিখতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু বনপলাশিতে পা দেওয়া মাত্র জানা গেল, তা অসম্ভব। ছেঁটেকেটে বনপলাশিকে বৃত্তের পরিধিতে হয়তো ধরা যায়, কিন্তু তখন আর সেই মানুষ ও মৃত্তিকার উদ্বেলিত নিসর্গ থাকে না, তা সাজানো বাগানে পরিণত হয় মাত্র। অথচ আমার স্থির বিশ্বাস, বনপলাশি তা নয়, জীবনের মতই যতি আছে হয়তো সেখানে, কিন্তু বিরতি- সে কখনো নয়।
বনপলাশি তাই শাস্ত্রীয় উপন্যাস না হয়ে শেষ পর্যন্ত লৌকিক জীবনের অনন্ত রহস্য নিয়ে- বনপলাশির পদাবলীই রয়ে গেল।’
স্বাধ���নতা উত্তর সময়ের জলছবিতে সময় ও পরিবর্তনের ধারায় এক অনবদ্য দলিল। প্রেম প্রীতি ও নিবিড় সমাজ বন্ধনের ছবির পটভূমি গ্রামবাংলা।বনপলাশী .. শুধু একটা গ্রামের নাম নয় সে নিজেই এক অপরূপ প্রাণসত্বা সে নিজের ইচ্ছাধীন না হয়েও অনেক ইচ্ছার স্বপ্ন ও মৃত্যুর কথারূপ যেন....