রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
রমাপদ চৌধুরীর ভাষায় বলতে গেলে 'বনপলাশীর পদাবলী' লৌকিক জীবনের অনন্ত রহস্য।' সেই রহস্যকেই রমাপদ চৌধুরী তার লেখনশৈলী দিয়ে অনন্য করে তুলেছেন। দূগ্গা প্রতিমার দেহের প্রতিটি খাঁজকে যেমন কুমার তাল তাল মাটি দিয়ে, ভক্তি দিয়ে, প্রেম দিয়ে গড়ে তুলেন নিখুঁত ভাবে। তেমনি রমাপদ চৌধুরীও 'বনপলাশীর পদাবলী'কে শিল্পের সুষমায় ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তিনি বেশ খানিকটা সফলই হয়েছেন বলা যায়।
গিরিজা আর গিরিন দুই ভাই সম্প্রতি জমিজমা ভাগ করে একদম আলাদা হয়ে গেছে৷ গিরিজা শহরে শিক্ষকতা করতেন আর গিরিন এতদিন গ্রামের জমিজমা দেখাশোনা করেছে। গিরিজা অবসর নেওয়ার পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই আবার দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছেন। এক্ষেত্রে যা হয় আরকি। নতুন কেউ বাড়িতে বেড়াতে এলে প্রথম প্রথম বাড়ির সকলের ই খুব ভালো লাগে কিন্তু সেই বেড়ানোটা যদি একসময় স্থায়ী হওয়ার উপক্রম হয় তখন কি আর ভালো লাগে! হোক সে আপন ভাই..... গিরিন ধীরেধীরে লক্ষ্য করে এভাবে আর চলে না। গিরিজার অর্থনৈতিক অবস্থা জানার পর গিরিন হতাশ হয়। হতাশ হয় গ্রামের আরো দশজন যারা ভেবেছিলো গিরিজা শহর থেকে অনেক অর্থ নিয়ে এসেছে। গিরিজার বড় মেয়ে আর গিরিনের বড় মেয়ে প্রায় সমবয়সী। গিরিন গ্রামের একজন সরকারি চাকুরিজীবী ঠিক করে মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য। কিন্তু সেই ছোকরা আবার পছন্দ করে বসে গিরিজার কন্যাকে। একই বাড়ির দুইবোনের একজন কে পাত্রপক্ষ দেখতে এসে আরেকজনকে পছন্দ করে দিন তারিখ ঠিক করে চলে গেছে- এমন ঘটনা বাংলা চলচ্চিত্রে হরহামেশাই হচ্ছে। পাত্রীপক্ষ রে জটিল সংকটে ফেলাইয়া পাত্রপক্ষ বিয়ের কেনাকাটার ফর্দ করতে বসে যায়। কিন্তু এতে পারিবারিক কোন্দলে যে কতটা অশান্তি সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে তাদের কোন আইডিয়া নাই। যাই হোক শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে দুই পাত্রীর মধ্যে যেকোন একজনের Bride of sacrifice হওয়া লাগে । আপনারা বই পড়তে না চাইলে ইউটিউবে এই চলচ্চিত্র টা দেখে ফেলতে পারেন। প্রথমে লিখবেন বি ও এন পি এ এল এ এস এইচ আই আর - বনপলাশীর। এরপর লেখবেন পদাবলী। লেখার সময় খেয়াল করে লেখবেন। পদাবলী তে পি এর পরে কিন্তু ও না। এ হবে। পি এ ডি এ বি এ এল আই
শৈশব বা কিশোর কালে কাটানো জায়গার প্রতি এক অমোঘ টানে মানুষ ফিরে ফিরে যায়। কিন্তু অনেকগুলো বছর পরে আমরা ভাবি সেই নদী, তালগাছের সারি, মেঠো রাস্তা বা স্কুল, আড্ডার জায়গা, আড্ডার মানুষগুলো এবং সেই জায়গার সবই বুঝি একই আছে। সেই আশা নিয়ে ফিরে নিরাশই হতে হয়। দুদিন কাটিয়ে আসলে তবুও একরকম। কিন্তু শৈশবের টানে বৃদ্ধ বয়সে অবসরের পর শৈশবের জায়গায় শেষ বয়স কাটাতে সবাই বোধহয় পারেন না। এটা নিয়েই লেখকের এই অসাধারণ উপন্যাস।
‘এমন হবে আগে ভাবিনি। ধারণা ছিল, উপন্যাস লিখবো। সেই উপন্যাস- চিরকাল যা জেনে এসেছি, যা লিখতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু বনপলাশিতে পা দেওয়া মাত্র জানা গেল, তা অসম্ভব। ছেঁটেকেটে বনপলাশিকে বৃত্তের পরিধিতে হয়তো ধরা যায়, কিন্তু তখন আর সেই মানুষ ও মৃত্তিকার উদ্বেলিত নিসর্গ থাকে না, তা সাজানো বাগানে পরিণত হয় মাত্র। অথচ আমার স্থির বিশ্বাস, বনপলাশি তা নয়, জীবনের মতই যতি আছে হয়তো সেখানে, কিন্তু বিরতি- সে কখনো নয়।
বনপলাশি তাই শাস্ত্রীয় উপন্যাস না হয়ে শেষ পর্যন্ত লৌকিক জীবনের অনন্ত রহস্য নিয়ে- বনপলাশির পদাবলীই রয়ে গেল।’
স্বাধীনতা উত্তর সময়ের জলছবিতে সময় ও পরিবর্তনের ধারায় এক অনবদ্য দলিল। প্রেম প্রীতি ও নিবিড় সমাজ বন্ধনের ছবির পটভূমি গ্রামবাংলা।বনপলাশী .. শুধু একটা গ্রামের নাম নয় সে নিজেই এক অপরূপ প্রাণসত্বা সে নিজের ইচ্ছাধীন না হয়েও অনেক ইচ্ছার স্বপ্ন ও মৃত্যুর কথারূপ যেন....