#পাঠ_প্রতিক্রিয়া বইয়ের নাম: অপারেশন কে বি সি লেখক: চিত্রদীপ চক্রবর্তী প্রকাশক: বুকফার্ম দাম: ১৯০₹
কে বি সি শুনলেই একটা নাম মাথায় আসে: কৌন বনেগা ক্রোড়পতি, নাঃ এটা কৌন বনেগা ক্রোড়পতির ব্যাক হিস্ট্রি না সেটা সবাই বুঝতে পারছেন প্রচ্ছদ দেখে। তাহলে ইহা কী? কিষেনজি, বিকাশ, ছত্রধর মাহাতো, নামগুলো চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। সেই মাওবাদী আন্দোলন। এদের ধরার অপারেশন ছিল অপারেশন কে বি সি। বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে নামকরণকে একটু ডিফার করব। নাম হওয়া উচিত ছিল 'এক এসটিএফ হয়ে ওঠার গল্প'। বিশ্বাস করুন, কেবিসি অপারেশনটা জানার লোভে কিনলেও বইয়ের মেজর অংশতেই তার বর্ণনা নেই। মাত্র শেষের পঞ্চাশ-ষাট পাতা জুড়ে চলেছে সেই বিবরণ। আমি পাতার নম্বরটা ঠিক খেয়াল করিনি, একটু কমবেশি হতে পারে। তবে ১৫২ পাতার বইতে মূল বিষয়ের ওপর মাত্র এইটুকু বিবরণ দেখলে একটু দুঃখ হয় বইকি। তাহলে বাকি অংশ জুড়ে কী আছে? এক সাংবাদিকের পুলিশ হয়ে ওঠার কাহিনী, যাঁর এক চান্সে পুলিশের চাকরি পাওয়ার সাফল্যের অংশটা বাড়ির লোকজন পড়লে নির্ঘাত বলবে: 'দ্যাখ, এই লোকটা সারাদিন বই মুখে করে বসে থেকেছে বলে পেয়েছে, তোর দ্বারা হবে না শুধু এই মোবাইল আর গল্পের বই নিয়েই পড়ে থাকার জন্য।' কাজেই আমার মত সার্টিফায়েড বেকার যুবকরা বাড়ির লোককে ভুলেও পড়তে দেবেন না এ বই। বরং কিছু অংশ পড়ে শোনাতে পারেন। যাকগে, কাজের কথায় আসি। পুলিশ হওয়ার পর টানা কচকচি চলেছে তাঁর পুলিশ জীবনের দীর্ঘ বিচিত্র অভিজ্ঞতার, এবং তাতেই ভরে উঠেছে পাতা এবং অবশেষে শেষ পাতে এসেছে জঙ্গলমহল কিসসা। গোটা বইটা দুটি ঘন্টা সময় পেলে গল্পের মত পড়ে ফেলা যায়। মন্দ লাগবে না, কারণ ফেলুদার 'শতকরা নব্বই শতাংশ লোক খুনের খবর পড়তে পছন্দ করে' স্টেটমেন্টটা আসলে 'শতকরা পঁচানব্বই শতাংশ লোক ক্রাইম রিলেটেড ঘটনা (তা সে ফিকশন হোক বা ননফিকশন) পড়তে পছন্দ করে। ভাষা বেশ তরতরে। যেন গোয়েন্দাপীঠ খ্যাত সুপ্রতীমবাবুর লেখা পড়ছি বলে মনে হয়। তবে এত কিছুর পর হতাশ করে অলংকরণ। ছবিগুলো আরও সুন্দর হতে পারত। দেখলে পড়ার ইচ্ছেটা মরে যায়। ওয়ান টাইম রিড ইজ এনাফ ফর দিস বুক। শেষ একটাই কথা বলে যাই: শুনছি এই বই থেকে সিনেমা হচ্ছে এবং তা করতে চলেছেন দেব। একটাই অনুরোধ, প্লিজ নায়কের রোলটা উনি করবেন না। কবীর ওনার অভিনয়ে না, গল্পটা ভালো হওয়ায় কেটেছিল। এ গল্প নিয়ে ছবিও বক্স অফিস পাবে, তবে আড়াই ঘন্টা ভদ্রলোককে লিড রোলে সহ্য করাটা বিশাল চাপের।
This entire review has been hidden because of spoilers.
লেখক তার গল্পের (আসলে গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে) কেন্দ্রীয় চরিত্র অরিন্দমকে তার জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে এই বইটিতে মোট তিনটি অংশে ভাগ করেছেন। যার প্রতিটি ভাগে রয়েছে পাঠকের জন্য উত্তেজনা আর পড়তে পড়তে রোমাঞ্চকর পরিস্থিতিতে হারিয়ে যাওয়ার রসদ।
শুরুতে আমরা একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিকের পরিচয় পাই যিনি এক বুক স্বপ্ন নিয়ে দায়িত্বের সঙ্গে তার প্রফেশনাল জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু শ্রমের অস্বীকৃতি ও চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু এখানেই তাঁকে থেমে যেতে হয় নি। জীবনের চরম সত্য উপলব্ধি করে অসহায়ত্ব-কে শক্তিতে পরিণত করে সে পুলিশের সার্জেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। ঠিক এখানেই শুরু হয় তার জীবনের নতুন ইনিংস.....
সার্জেন্ট অরিন্দম তার মেধা, মনন আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে শুরুতেই উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের নজর কেড়ে নেন। যার ফলে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ( স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) এর জন্মলগ্নেই তিনি সেই বিশেষ বাহিনীতে যোগদান করার সুযোগ পান। শুরু হয় তার একের পর এক অপ্রতিরোধ্য অপারেশন। বর্ডার থেকে কলকাতা পর্যন্ত জঙ্গি সংগঠনের বিশেষ বিশেষ ঘাঁটিতে সার্জেন্ট অরিন্দম সম্পন্ন করেন একাধিক নিখুঁত অপারেশন। এইসব ছোট-মাঝারি-বড়ো অপারেশন গুলো লেখক তার বইতে সুনিপুনভাবে ব্যখ্যা করেছেন যা পাঠককে ভাবাবে।
এই বইটি শেষ হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন দিয়ে,যার নাম অপারেশন কেবিসি। এই কেবিসির একটা মিনিং আছে যা এই রিভিউ তে লেখা ঠিক হবে না। পাঠককে পড়ে রসদ নিতে হবে। এবার সার্জেন্ট অরিন্দম ছদ্মবেশে জঙ্গলমহলে বিশেষ অপারেশন এর জন্য নিজেকে আত্মনিয়োগ করলেন। প্রথম জীবনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জঙ্গলমহলে জাল বিস্তার করতে লাগলেন। চলতে লাগলো রাত দিন এক করে গভীর জঙ্গলে পথ চলা .... এভাবেই সৃষ্ট অভিজ্ঞতা আর তদন্তের সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে মাওবাদী আন্দোলনের নেতা ছত্রধর মাহাতোকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেন ছদ্মবেশী সাংবাদিক অনির্বাণ রায় যার প্রকৃত নাম সার্জেন্ট অরিন্দম। এই শেষ অংশটুকু নতুন পাঠকদের জন্য একটি বিশেষ অপারেশনের দলিল হিসেবে তৈরি হয়ে আছে যারা জঙ্গলমহল বা মাওবাদীদের আচরণ অর্থাৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খুবই আগ্রহী ছিলেন বা এখনও আছেন।
এই মূল্যবান বইটির প্রতিটি পাতায় পাতায় রয়েছে রোমাঞ্চকর পরিবেশ আর এমন কিছু ছোট ছোট মেসেজ যা আপনাকে পড়ার মাঝে থামিয়ে দেবে আর ভাবাবে। যারা জীবনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে পছন্দ করেন আশা রাখি তাদের জন্য এই বই মোটিভেশন হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। পরিশেষে শ্রদ্ধেয় লেখক ও সাংবাদিক চিত্রদীপ চক্রবর্তী দাদা-কে এই বলে ধন্যবাদ দিতে চাই যে, অপারেশন কেবিসি বই এর মতো আমরা যেনো নতুন কোনো ঘটনা নিয়ে আরও নতুন নতুন বই আপনার কাছ থেকে উপহার পাই।